ঢাকা, শুক্রবার,২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

ইসলামী দিগন্ত

সময়ের বাগডোরে জীবন

মিযানুর রহমান জামীল

০৬ জানুয়ারি ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বেঁচে থাকার অপর নাম জীবন আর জীবনের জন্য সময় অনিবার্য। দুনিয়ায় যারা অমর হয়েছেন তারা সময়ের মূল্যায়ন করেই খ্যাতি আর কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। তবুও মাঝে মধ্যে মেলে না জীবনের হিসাব। অসমাপ্ত রয়ে যায় হায়াতলিপির ভুলগুলো। এটা যেন প্রাণসঞ্চারকে বারবার থামিয়ে দিতে চায়? এ প্রশ্ন দিয়েই যেন মানুষের সৃষ্টি! কাজ করলে যে পরিমাণ সময় যায় বসে থাকলেও সে পরিমাণ। সুতরাং সূর্যদয়ের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জীবনের একেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর অতীত হলো সামনের সময় সঠিকভাবে নির্ণয় করা এবং কাজে লাগানোর মাপকাঠি। শরিয়তের মানদণ্ডে রোজনামচার পৃষ্ঠা দিয়ে সময়ের হিসাব কষলে হায়াতের যোগ-বিয়োগ বের হয়ে আসবে। সে দিক থেকে আমরা যদি বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবনাধ্যায়ের দিকে দৃষ্টি ফেলি তবে তাঁর জীবনাধ্যায় বেশি সমৃদ্ধ।
সময় আমাদের সহায়ক। আর এ সময় নদীর স্রোতের মতো প্রবহমান। ঘড়ির কাঁটা কারো জন্য অপো করে না। জীবনঘড়ি মানুষের প্রত্যাহিত বিবর্তনশীল চালচলনে হায়াতের ওপর নির্ভরশীল। টিকে থাকার জন্য এটাই চিরসত্য কথা। বেঁচে থাকার যুদ্ধে যৌবনের জোয়ারে প্লাবিত এ জীবন নদীতে একদিন ভাটা পড়বে। হায়াত শেষ হলে কারো শক্তি নেই বেঁচে থাকার এবং কারো মতা নেই প্রাণকে ধরে রাখার। জীবনকে সুন্দর করে সাজাতে হলে সময়ের মূল্যায়ন অত্যাবশ্যকীয়। এক বছরে ১২ মাস, ৫২ সপ্তাহ, ৩৬৫ দিন। সে হিসাবে ৩৬৫ দিন সমান ৮৭৬০ ঘণ্টা, ৫২৫৬০০ মিনিট, ৩১৫৩৬০০০ সেকেন্ড। কে কিভাবে জীবনের সময়গুলো ব্যয় করেছে হাশরের মাঠে আল্লাহ কড়ায়-গণ্ডায় তার হিসাব আদায় করে ছাড়বেন।
আজ আমাদের জীবনের আরেকটি বছর শেষ হলো। জানা নেই এটাই কি নির্দিষ্ট কারো শেষ বছর, না আরেকটি বছর সামনে অপো করছে! একটি বছর শেষে আরেকটি বছর আসে ঠিকই কিন্তু গত হওয়া বছরটির হিসাব মেলালে বের হয়ে আসে জীবনের পরিমার্জনশীল ও অমার্জনীয় ভুলগুলো। স্পষ্ট হয়ে ওঠে হায়াতের অপচয়ের হিসাব। তখন অতীতের মূল্যবান দিনগুলোর জন্য একজন ভালো মানুষের অনুশোচনা সৃষ্টি হয়। নতুন বছর আমি কিভাবে চলব সেটা না হয় পরে হিসেব মেলানো যাবে কিন্তু পেছন থেকেই সংশোধনের পথ স্পষ্ট করা ছাড়া সামনে চলার পথ রুদ্ধ থেকে যায়। আজ আফসোস করে বলতে হয়, আমরা পেছন দিকে না তাকিয়ে নতুন বছরকে এমনভাবে বরণ করি যা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অমার্জনীয়। হিসাব মেলানো ছাড়াই পেছনের দিনগুলোকে ধিক্কার জানিয়ে নতুন বছরের মিলন ঘটিয়ে পাপকাজ দিয়ে শুরু করি বছরের সূচনাপর্ব। বছর শেষ হওয়া মানে উৎসবে মেতে ওঠা নয়। মদপান করা নয়। চিৎকার করা নয়। এ জন্য হিসাব করা উচিত। ২০১৬ ইংরেজি শেষে ২০১৭-এর রাত ১২টা ১ মিনিটে কোনো মুসলমান নর-নারী থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করার জন্য ঢাকার অভিজাত হোটেলগুলোতে যেতে পারে না। কনসার্ট বা গান-বাজনায় লিপ্ত হতে পারে না। পারে না স্বীয় সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতিতে প্লাবিত হতে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে অন্য জাতির সাথে আচার-আচরণে, কৃষ্টি-কালচারে সামঞ্জস্য গ্রহণ করবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বিবেচিত হবে।’
একজন বিশিষ্ট আলেম বলেন, ‘হ্যাঁ! ত্রিশ বছর পর্যন্ত প্রতিদিন রাতে হিসাব করেছি। সারা দিন কী করেছি কলমে লিখে রেখেছি। এক দিন দুই দিন নয়, ত্রিশটি বছর হিসাবে বসেছি রাতের বেলা। সারা দিনের দফতরকে খুলে বসেছি। আজ কী কী ভালো করলাম, কী কী অন্যায় করলাম। অন্যায় ধরা পড়লে সাথে সাথে কানটানা খেয়েছি। আল্লাহর দরবারে মাথা নত করেছি ‘হে আল্লাহ! ভালো কাজ করার জন্য দুনিয়াতে প্রেরণ করেছ, খারাপ কাজ করেছি। তাই কানটানা খেলাম আর করব না। ভালো কাজ দেখলে সাথে সাথে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছি। হে আল্লাহ! তাওফিক দিয়েছ বলেই ভালো কাজ করতে পেরেছি। ত্রিশ বছর এই কাজ করেছি। এক দিনও বাদ দেইনি। কোনো আনন্দ উল্লাসের কারণে বাদ যায়নি হিসাব। আর সে হিসাবের পরিপ্রেেিত আল্লাহ পাক আমাকে মর্যাদা দান করেছেন। তোমরা আমাকে চেনো। এই পরিচিতি, এই খ্যাতি, এই মর্যাদা ত্রিশ বছরের সাধনা ও শ্রমের ফসল। এটাকে বলা হয় ‘মোহাসাবা’ বা নিজের হিসাব গ্রহণ। বছর শেষে তাই হিসাব নিতে হবে ভালো কাজে কতটুকু অগ্রসর হলাম! ন্যায়ের পথে আমি কতটুকু গেলাম! নিজের মনকে ডেকে ওলিগণ বলেন, ‘হে মন! লাশবাহী খাটে কতজনের কাফন পরা লাশ তুমি দেখেছ? হে পাষাণ মন! তোমার মন কি বিগলিত হয় না? তার পরও তোমার এত দীর্ঘ লোভ-লালসা ও পদের জন্য কাড়াকাড়ি! সম্পদ দখলে তোমার এত আগ্রহ! হে মন! এত লাশ দেখেও, এত মৃত মানুষ দেখেও, এত কবর দেখেও তোমার মন কি একটুও বিগলিত হয় না? মাটির নিচে তোমাকে একদিন যেতে হবে।
তিরমিজি শরিফের বর্ণনায় রাসূল সা: বলেন, ‘আমি তো মাটির ঘর হে মানুষ! আমার ভেতরে তোমাকে আসতে হবে। আজ খুব অহঙ্কার করে তুমি চলো, আমার এই ঘর একাকী অন্ধকার ঘর, কীট-পতঙ্গের ঘর, সুতরাং আমার কাছে তোমাকে আসতেই হবে। সুতরাং সময়ের হারিয়ে যাওয়াকে ভুলে না গিয়ে অতীত থেকে শিা নেয়ার মাধ্যমে জীবন সাজানো সবার করণীয়। যাতে করে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত থেকে শরিয়তের সর্বেেত্র পাবন্দি করা যায় এবং দ্বীনের ওপর পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠিত থাকা যায়। গত হওয়া প্রতিটি সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুগ আমাদের আগামীকে করুক আরো প্রাণবন্ত ও সমৃদ্ধ। সময়ের গুরুত্বদানে মানুষের পৃথিবী কল্যাণের ছোঁয়া লেগে ভরপুর হয়ে যাক। প্রতিটি অতীত হোক আগামী দিনের উন্নতি ও পরকালের পাথেয়।
লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫