ঢাকা, শুক্রবার,২৩ জুন ২০১৭

মতামত

লাগাম টেনে ধরা কি অসম্ভব?

মহিউদ্দিন খান মোহন

০৫ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:৪৪


প্রিন্ট

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর ছাত্র আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং স্বাধীনতাযুদ্ধ, সব ক্ষেত্রেই এই সংগঠনের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ ও অবদান উল্লেখযোগ্য। বড় বড় রাজনৈতিক নেতা, যারা এমপি, মন্ত্রী, উপ-প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, এমনকি উপ-রাষ্ট্রপতিও হয়েছেন, রাজনৈতিক জগতে তারকা খ্যাতি অর্জন করেছেন, তাদের অনেকেই ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে পা দিয়েছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও ছাত্রলীগেরই প্রডাক্ট।
কিন্তু বর্তমান ছাত্রলীগের সাথে যদি অতীতের ছাত্রলীগকে কেউ মেলাতে যান, তিনি যে চরমভাবে হতাশ হবেন। গণতন্ত্র, স্বাধিকার, সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতার জন্য যে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা লড়াই করেছেন, সেই সংগঠনের আজকের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মারামারি, খুনোখুনি, অপহরণ-ধর্ষণসহ নানাবিধ অপকর্মে লিপ্ত। অনেক নেতাকর্মীর নৈতিক অধঃপতনের কারণে ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির মুখমণ্ডলে কলঙ্কের অনপনেয় কালিমা লেগে যাচ্ছে, তা বোধকরি তাদের চেতনায় নেই।
ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের তাণ্ডবে বারবার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনপদ কেঁপে উঠছে। তাদের হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সমাজের নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। কিন্তু তাদের কিছু বলার সাহস যেন কারো নেই। ওরা এতটাই বেপরোয়া যে, প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কিছু বলতে বা করতে সাহস পায় না। এহেন অনৈতিক ও অনাকাক্সিক্ষত কর্মকাণ্ডে একসময় যারা এ সংগঠনটির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, তারা যে বেদনাহত হন তা বলাই বাহুল্য। তাই তো ছাত্রলীগের একসময়ের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীকে টকশো কিংবা তার লেখায় আফসোস করতে এবং হতাশা ব্যক্ত করতে শোনা যায়। ছাত্রলীগের আরেক সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। বাংলা একাডেমিতে ছাত্রলীগের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি ছাত্রলীগ যাতে ‘খারাপ খবরের শিরোনাম’ না হয়, সেজন্য নেতাকর্মীদের আহ্বান জানিয়েছেন। নেতাকর্মীরা যেন খারাপ কাজে না জড়ান অনুষ্ঠানে সে শপথও করিয়েছেন তিনি। অভিভাবক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্রলীগের প্রতি মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের এ আহ্বান বা আশাবাদ অস্বাভাবিক নয়। অনুজরা যদি বিপথে যায়, তাহলে অগ্রজদেরই দায়িত্ব তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনা।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, তার আহ্বানের আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই ছাত্রলীগ আবার খারাপ খবরের শিরোনাম হয়েছে। কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ২৮ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘটিত ব্যাপক সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনার খবর পরদিন দেশের সব গণমাধ্যমেই প্রচারিত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়েছিল যে, কর্তৃপক্ষ কলেজ বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়েছেন। সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জনের আহত হওয়ার খবর দিয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলো। ৩০ ডিসেম্বর আরেকটি খারাপ খবরের জন্ম দিয়েছে ছাত্রলীগ। নয়া দিগন্তের খবরে বলা হয়েছে, সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির সৌজন্যে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয় পার্কের মোড় গেটের কাছে যাত্রী ছাউনির নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতারা। তারা ছাউনি নির্মাণকারীদের কাছে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। তা না দেয়ায় নির্মাণকাজ বন্ধ করে উপরে লাগানো ছাউনিটিও ফেলে দেয়া হয়। এ ধরনের খবর গত কয়েক বছর ধরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে।
তারিখ ও ঘটনা ধরে ধরে লিখতে গেলে তা একটি বৃহৎ পুস্তকের আকার ধারণ করতে পারে। সোনার ছেলেদের কীর্তিকলাপ বাংলাদেশে বসবাসকারী কাউকে নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। প্রতিনিয়ত যেসব খবর ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সংবাদপত্রের পাতায় ঠাঁই পাচ্ছে, তাতে ছাত্রলীগ অনেকের কাছেই একটি মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। এমনকি ছাত্রলীগের যিনি লিগ্যাল গার্জেন, খোদ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাও সংগঠনটির কার্যকলাপে বিব্রত ও ক্ষুব্ধ বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। গত ১৮ আগস্ট দৈনিক যুগান্তরে ‘যুবলীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ’ শীর্ষক খবরে বলা হয়, মন্ত্রিসভার বৈঠকে সারা দেশে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ শাসক দলের সহযোগী সংগঠনগুলোর খুনোখুনি ও সন্ত্রাসের ব্যাপারে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। খবরে বলা হয়, রাজধানীর বাড্ডায় গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মাহবুবুর রহমান গামাসহ কর্মী নিহত, কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ কর্মীদের হাতে আরেক কর্মী নিহত হওয়া, চাঁদার দাবিতে যুবলীগ নেতাকর্মীদের চাঁদপুরের একটি স্কুলে হামলা প্রভৃতি ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে অপরাধীদের আশ্রয় না দেয়া এবং তাদের পক্ষে তদবির না করার নির্দেশ দেন মন্ত্রীদেরকে।
বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়, পরিস্থিতি কতটা খারাপ হলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এমন ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তার সে ক্ষোভ ও নির্দেশনা তার দলের নেতাকর্মীরা খুব একটা আমলে নিয়েছে বলে মনে হয় না। স্মরণযোগ্য, কয়েক বছর আগে ছাত্রলীগের সন্ত্রাস ও অন্যবিধ অপকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংগঠনটির অভিভাবকের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার সে অভিমানকেও তারই ‘সোনার টুকরো ছেলেরা’ এতটুকু আমলে নেয়নি। যদি নিত তাহলে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ প্রভৃতি থেকে বিরত থাকত।
যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হলো, এরপরও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সন্ত্রাস-সংঘর্ষে লিপ্ত হয় কোন্ সাহসে? খোদ প্রধানমন্ত্রী ও মূল দলের সভানেত্রী কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করেন, সাধারণ সম্পাদক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন, তখন ছাত্রলীগের ছেলেদের এ ড্যামকেয়ার ভাব কেন? আর এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার শক্তি ও সাহস আসে কোথা থেকে? এ প্রশ্নের কিছুটা জবাব মেলে গত ২৯ ডিসেম্বর দৈনিক ইনকিলাবে বর্ষীয়ান সাংবাদিক মোহাম্মদ আব্দুল গফুরের লেখা ‘ছাত্রলীগের সুনাম যখন হুমকির মুখে’ শীর্ষক নিবন্ধে। তিনি মন্তব্য করেছেন, “আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সুযোগে ছাত্রলীগ যেসব অপকর্মের জন্য জনাব ওবায়দুল কাদের কর্তৃক নিন্দিত হয়েছে, এসব যে হঠাৎ ছাত্রলীগ শুরু করেছে, তা নয়। অতীতেও আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীন থাকার সুযোগে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হতো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তখন এসব অপকর্মের ধারা থেকে ফিরিয়ে আনার তেমন চেষ্টা করা হতো না। উল্টা তাদের ‘সোনার ছেলে’ আখ্যা দিয়ে উৎসাহিত করা হতো। ফলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকাকালে অতীতে সব সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসব অপকর্মকে তাদের স্বাভাবিক অধিকার বলেই ধরে নিত।’
এই মন্তব্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। কেননা, দূর কিংবা নিকট অতীতে কখনোই ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে করতে দেখা যায়নি। সাম্প্রতিক কালে শীর্ষ নেত্রীসহ আওয়ামী লীগের দু’একজন শীর্ষ স্থানীয় নেতা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের শাসন করার চেষ্টা করছেন বটে। কিন্তু তাতেও যে কাজ হচ্ছে না, তার প্রমাণ অহরহ মিলছে। কেন শীর্ষ নেতানেত্রীদের সতকর্বাণীকে থোড়াই কেয়ার করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা যা খুশি তাই করে যাচ্ছে, এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে। সচেতন ব্যক্তিদের অভিমত হলো, উপর মহলের কোথাও না কোথাও থেকে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও অভয়বাণী না পেলে নেতাকর্মীরা এতটা বেপরোয়া হতে পারেন না, এমন ড্যাম কেয়ার ভাব দেখাতে পারেন না। আর দেশের বিভিন্ন স্থানে কারা এদেরকে আশকারা দেয়, কখনো বা স্বার্থোদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাও অজানা থাকার কথা নয়। মাথার ওপর আশীর্বাদের ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শক্তিধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যদি সরকার প্রধান কঠোর হতে পারেন, তাহলে কিছুটা ফল লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যথায় পরিস্থিতি ‘যাহা পূর্বং তাহা পরং’ থাকবে। এমনকি, তা আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
E-maile : mohon91@yahoo.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫