ঢাকা, শনিবার,২৪ জুন ২০১৭

আলোচনা

শীতের চাদরে মোড়ানো পঙ্ক্তিমালা

জা ফ রু ল আ হ সা ন

০৫ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৪৯


প্রিন্ট

ঋতুবৈচিত্র্যের বাংলাদেশে প্রকৃতি যখন শীতের চাদর মুড়ি দিয়ে হিম কুয়াশায় ঢেকে দেয় প্রভাতের আলোকরশ্মি, কিংবা ঘাসের ডগায় জমে থাকা কুয়াশার জলবিন্দুর ওপর অস্পষ্ট সূর্যালোক প্রতিবিম্বিত হয়ে যে অপার সৌন্দর্যের আলপনা তৈরি করে তখুনি মনে হয় শীত এসেছে। শীতের আগমনী বার্তার সাথে যোগ হয় হাওর-বাঁওড়, খাল-বিলে অতিথি পাখির আনাগোনা। মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতিতে কড়া নাড়ছে শীত।
যতদূর চোখ যায় শর্ষেফুলের নয়নাভিরাম হলদে ক্যানভাস দুলে ওঠে হিমেল হাওয়ায়। রাতের কুয়াশা পুকুরের জলে বিছিয়ে দেয় দুধের শরের মতো হাল্কা আস্তরণ, তার ওপর মাকড়সার দৌড়-ঝাপ দেখে মনে হতেই পারে সারারাত জেগে কোনো এক শিল্পী তুলির আঁচরে এঁকে দিয়েছে শীতের ছবি।
শীতের পাতাঝরা দিন। খেঁজুরগাছ কাটায় গাছির ব্যস্ততা, নতুন খেজুরের রসে বানানো পায়েস আর পিঠা-পুলির মৌ মৌ গন্ধ শীতের উপস্থিতি জানান দেয়। শীতবন্দনায় মেতে ওঠে গ্রামবাংলা। অবশ্য শীতের চিত্রটা প্রকট হয়ে ওঠে বস্ত্রহীন মানুষের কাছে। দরিদ্র, অসহায় ও শ্রমজীবী মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে আগুনের আঁচে শীত নিবারণের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায়। শীত স্বভাবতই অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়, অসহায়-বস্ত্রহীন মানুষের কাছে। শীতের এপিঠ ওপিঠ নিয়ে বাংলাকাব্য সাহিত্যে বিচিত্র সব কবিতা রচিত হয়েছে। শীত বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে আছে আমাদের বাংলা কবিতা ও গানে। অবশ্য এ কথা সত্য বিভিন্ন কবির কবিতায় শীতের উপস্থিতি বিভিন্নভাবে এসেছে। মহাকবি কালিদাস মনে করেন শীতকালে রমণীদের কামভাব প্রবল হয় বলেই পুরুষের কাছে শীত বেশ উপভোগ্য। মহাকবি কালিদাস [৩৭০-৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ] তাঁর ‘ঋতুসংহার’ কাব্যগ্রন্থে পঞ্চমসর্গে শীতকাল প্রসঙ্গে লেখেন-
হে সুন্দরী, এবার শীতঋতুর কথা শ্রবণ করো। এই ঋতু শালিধান ও আমের প্রাচুর্যে মনোহর। এখানে ওখানে উপবিষ্ট ক্রোঞ্চের নিনাদ এখন মধুর। এই ঋতুতে কাম বড় প্রবল, এ কাল রমণীদের প্রিয়।
কবি কালিদাসের পর আমরা যদি মধ্যযুগের কবিদের দিকে তাকাই তখন দেখব, মধ্যযুগের বাংলাকাব্যে শীতের উপস্থিতি অনেকটাই ক্ষণিকের অতিথির মতো অবহেলিত। মধ্যযুগের কবিদের হাতে শীত নিয়ে তেমন কোনো মহৎ সৃষ্টি নেই বললেই চলে। তবে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ মধ্যযুগের একখানি সুবৃহৎ ও উল্লেখযোগ্য কাব্য। সেই সুবৃহৎ ‘চণ্ডীমঙ্গল’ প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত (১) দেবখণ্ড (২) আক্ষোটিক খণ্ড (৩) বণিক খণ্ড। এখানে উল্লেখ্য যে, আক্ষোটিক খণ্ড কালকেতু-ফুল্লরা উপাখ্যান। চণ্ডীমঙ্গলের ‘কালকেতু উপাখ্যানে ফুল্লরার বারো মাসের দুঃখের অংশে শীতের বর্ণনা দিতে গিয়ে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (১৫৪০-১৬০০) লিখেছেন-
উদয় পুরিয়া অন্ন দৈবে দিলা যদি।
যম-শম শীত তথি নিরমিলা বিধি॥
শূন দুঃখের কাহিনী শুন দুঃখের কাহিনী।
পুরাণ দোপাটা গায়ে দিতে করে পানী॥
পউষে প্রবল শীত সুখী যগজন।
তুলি পাড়ি পাছড়ি শীতের নিবারণ॥
কবি আলাওল (১৬০৭-১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ) ‘পদ্মাবতী’ কাব্যের ‘ষট-ঋতু বর্ণন’ খণ্ডে শীতের বর্ণনা প্রসঙ্গে দেহ মিলনের এক মধুর চিত্র তুলে ধরেছেন-
‘সহজ দম্পতি মাঝে শীতের সোহাগে
হেমকান্তি দুই অঙ্গ এক হইয়া লাগে।
...
পুষ্পশয্যা ভেদগুলি বিচিত্র বসন।
ওরে ওরে এক হইলে শীত নিবারণ।
মধ্যযুগের পর আধুনিক যুগের যাত্রা শুরুর পর্বে আমরা কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে (১৮১২-১৮৫৯) পাই। তার ‘কাব্য কানন’ গ্রন্থের শীতকালের প্রভাতে ‘মানিনী নায়িকার মানভঙ’ শীর্ষক কবিতায় কবি শীতের বর্ণনা তুলে ধরেছেন বেশ খানিকটা কৌতুক ও হাস্যরসের মাধ্যমে-
বসানে ঢাকিয়া দেহ গুঁড়ি মেরে আছি।
উহু উহু প্রাণ যায় শীত গেলে বাঁচি॥
হাসিয়া নাগর কহে, খোল প্রাণ মুখ।
শীত-ভীত হয়ে এত ভাব কেন দুখ॥
ছয় ঋতু মধ্যে শীত করে তব হিত।
হিতকর দোষী হয় একি বিপরীত॥
ঈশ্বরগুপ্তের বর্ণনায় পুরুষের দৃষ্টিতে ছয় ঋতু মাঝে শীত উৎকৃষ্ট ঋতু হলেও রমণী এ কথা মানতে নারাজ। শীত ভয়ে ভীত রমণীর শরীর ফেটে চৌচির, হাড় কাঁপানো শীতে যেখানে ঘর থেকে বেরুনো দায় সেখানে জল স্পর্শ তো কল্পনাতীত তাহলে শীত কি করে শ্রেষ্ঠ ঋতু হয়?
মধ্যযুগ থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত কবিরা শত-সহস্র কবিতা রচনা করেছেন, আগামীতেও করবেন; কেননা কবি তো আমাদের সমাজেরই একজন। কবি আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে তৃতীয় নয়ন। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের দৃষ্টি যেখানে থেমে যায় সেখান থেকেই কবির কল্পনার শুরু। স্বভাবতই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য কবিকে যেমন পুলকিত করে তেমনি প্রকৃতির নির্মমতায় কবিচিত্ত হয় ব্যথিত। যার প্রতিফলন কবির কবিতার পঙ্ক্তিমালা।
সুপ্রিয় পাঠক, কবি কালিদাস, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, আলাওল ও ঈশ্বরগুপ্তের পাঠ শেষে চলুন ঘুরে আসা যাক আধুনিক কবিতার বিশাল কাব্যভুবনে।
বলছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। ঋতু বিষয়ক কবিতার কমতি নেই রবীন্দ্রকাব্যে। সব ঋতু নিয়েই সর্বত্রই তার উপস্থিতি। তবে শীতঋতু বিষয়ক কবিতা প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর লেখনিতে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
রবীন্দ্রনাথ শীতকে দেখেছেন নানাভাবে, শীতের উদ্বোধন, শীত, শীতের বিদায় ও সামান্য ক্ষতি কবিতায় শীতের যে চিত্র উঠে এসেছে তা মোটেও সুখকর নয়। কবির ভাষায় শীতের নির্মমতা প্রকাশ পেয়েছে কখনো ‘অভিনব খেলা’ কিংবা ‘হে তীব্র নির্মম’ অথবা ‘ক্ষয়ের দুঃখে দীক্ষা যাহারে দিলে’ এমনতরো বাক্য ব্যবহারে। সঙ্গতকারণেই বলা যায় শীতের ভয়ঙ্কর চিত্র কখনোই রবীন্দ্রনাথের কাছে সুখকর ছিল না।
কবি তার ‘কথা’ কাব্যগ্রন্থের ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতায় রাণীর শীত নিবারণের যে নিষ্ঠুরতার বিবরণ দিয়েছেন, বাংলা কাব্যসাহিত্যে তা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। কাশীর মহিষী করুণা মাঘ মাসে শীতের বাতাসে সখীবেষ্টিত পরিবেশে বরুণা নদীতে স্নান শেষে কূলে উঠে রাণী যা বলেন।
স্নান সমাপন করিয়া যখন
কূলে উঠে নারী সকলে
মহিষী কহিলা, ‘উহু! শীতে মরি,
সকল শরীর উঠিছে শিহরি,
জ্বেলে দে আগুন ওলো সহচারী-
শীত নিবারিব অনলে।’
কাশীর মহিষী করুণার নিষ্ঠুরতার সাজা প্রাপ্তি সেতো সবারই জানা। রাণীর শীত নিবারণের নির্মমতার পরিণতি যা হয়েছিল-
রাজার আদেশে কিংকরী আসি
ভূষণ ফেলিল খুলিয়া-
অরুণবরণ অম্বরখানি
নির্মম করে খুলে দিল টানি,
ভিখারি নারীর চীরবাস আনি
দিল রাণীদেহে তুলিয়া।
রবীন্দ্রবলয় থেকে বেরিয়ে এবার না হয় কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পাঠ উদ্ধার করতে গিয়ে দেখবো, কবি তাঁর দৃষ্টিতে কিভাবে শীতকে দেখেছেন।
পউষ এলো গো।
পউষ এলো অশ্রু পাথর হিম পারাবার পারায়ে।
ঐ যে এলো গো
কুজঝটিকার ঘোমটা-পরা দিগন্তরে দাঁড়ায়ে॥
সে এলো আর পাতায় পাতায় হায়
বিদায়-ব্যথা যায় গো কেঁদে যায়,
অস্ত-বধূ (আ-হা) মলিন চোখে চায়
পথ-চাওয়া দীপ সন্ধ্যা-তারায় হারায়ে॥
(দোলন চাঁপা/পউষ/কাজী নজরুল ইসলাম)
শীত কি কেবলি কুয়াশা ভেজা? বস্ত্রহীন মানুষের গায়ে শীতের চপেটাঘাত? শীতের নিষ্ঠুরতা আর নির্মমতা কি শুধুই মৃত্যুর হাতছানি? পাতাঝরা দিনে শীতের কাঁপন জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ভিন্ন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে।
এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে
বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা
কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো।
....
চারদিককার আবছায়া সমুদ্রের ভিতর জীবনকে স্মরণ করতে গিয়ে
মৃত মাছের পুচ্ছের শৈবালে, অন্ধকার জলে, কুয়াশার পঞ্জরে হারিয়ে যায় সব।
[মহাপৃথিবী/ শীতরাত/ জীবনানন্দ দাশ]
প্রকৃতি ও নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাশ ‘শীতরাত’ ছাড়াও ‘শীতের রাতের কবিতা’, ‘সে এক শীত’, ‘শীত শেষ’, ‘এইসব শীতের রাত’, ‘শীতের’ কুয়াশা-মাঠে’, কিংবা ‘শীতের সকাল’ সর্বত্রই এক ধরনের নির্জনতা প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতির নির্মম রুক্ষতা যেন জীবনানন্দ দাশের কাছে শীতের অপর নাম।
শীতে নির্মমতা যতই বাড়–ক, শীতে দেহ যতই কাঁপুক, তাপমাত্রা হিমাঙ্কের যত নিচেই নামুক না কেন ষড়ঋতুর এই দেশে নিয়মমাফিক পালা করে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত শীত ও বসন্ত আসবে। আসা-যাওয়ার পরিক্রমায় প্রতিটি ঋতুই স্ব মহিমায় উজ্জ্বল। দেখা যাক কবি বুদ্ধদেব বসুর কলমে শীত কিভাবে চিত্রিত হয়েছে-
বাইরে বরফের রাত্রি। ডাইনি হাওয়ার কনকনে চাবুক
গালের মাংস ছিঁড়ে নেয়, চাঁদটাকে কাগজের মতো টুকরো করে
ছিটিয়ে দেয় কুয়াশার মধ্যে, উপড়ে আনে আকাশ, হিংসুক
হাতে ছড়িয়ে দেয় হিম; শাদা, নরম, নাচের মতো অক্ষরে
পৃথিবীতে মৃত্যুর ছবি এঁকে যায়।
...
শীত এলে মরে যায় পৃথিবী, ঝরে যায় পাতা, নেয় বিদায়
ঘাস-ফুল, ঘাসফড়িং, নেকড়ে আসে বেরিয়ে; কালো, কালো
নিষ্ঠুর কবরে
হারিয়ে যায় প্রাণ ধবধবে তুষারের তলায়
[শীতের প্রার্থনা : বসন্তের উত্তর/ শীতরাত্রির প্রার্থনা/ বুদ্ধদেব বসু]
এভাবেই বিভিন্ন কবিতায় বিভিন্ন মেজাজে শীত নন্দিত হয়েছে কিংবা নিন্দিত হয়েছে। তবে এ কথা সত্য যে শীতের নির্দয় চপেটাঘাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় অসহায় পীড়িত বস্ত্রহীনদের কথা। মানসপটে ভেসে ওঠে করুণ সব মুখচ্ছবি। এসব মানুষের কথাই সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় উঠে এসেছে সাবলীলভাবে, শীতার্ত মানুষের জন্য কবি প্রার্থনা করেছেন এভাবে-
হে সূর্য
তুমি আমাদের স্যাঁতসেতে ভিজে ঘরে
উত্তাপ আর আলো দিও
আর উত্তাপ দিও
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে
[প্রার্থী/ সুকান্ত ভট্টাচার্য]
ব্যথিতচিত্তে শক্তি সঞ্চার করে কবি শীতের মুখোমুখি হতে চান; সামান্য উষ্ণতার জন্য কবিচিত্ত ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কবির পঙ্্ক্তিমালা-
হে জীবন, হে যুগ সন্ধিকালের চেতনা
আজকে শক্তি দাও, যুগ যুগ বঞ্চিত দুর্দমনীয় শক্তি
প্রাণে আর মনে দাও শীতের শেষের
তুষার গলানো উত্তাপ।
[বোধন/ সুকান্ত ভট্টাচার্য]
শীতের উষ্ণতার কথা ভাবলেই প্রেমাস্পদকে কাছে পাওয়ার বাসনায় আনচান করে উঠে মন। প্রেমাস্পদের কাছে পৌঁছতে হলে পোশাক-পরিচ্ছদে নিজেকে খানিকটা সাজিয়ে গুছিয়ে নিলে মন্দ হয় না; কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় এমন একটা আবহ নির্মিত হয়েছে।
শেষ হয়ে আসা অক্টোবরে
শীতের দুপুরে নিউ ইয়র্কের অরচার্ড স্ট্রিটে ঘুরে ঘুরে
একটি দোকান দেখি মায়াপুরী। দোকানি ওয়াল্ট ডিজনির
আশ্চর্য ডবল, বলা যায়। দিলেন পরিয়ে গায়ে
স্মিত হেসে সহজ নৈপুণ্যে নীল একটি ব্লেজার।
[উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ/ শামসুর রাহমান]
পোশাক-পরিচ্ছদে কেতাদুরস্ত হয়ে লাভ কি, যদি শীতের তীব্রতা থেকে নিজেকে বাঁচানো না যায়। শীতের কাছে মানুষ বড় বেশি অসহায়; তাইতো শীত থেকে বাঁচার জন্য কি যেসব প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। গলায় গলাবন্ধ মাথায় কান ঢাকা বানর টুপি, উলের বাহারি সব সুয়েটার, স্যুট-কোট কিংবা পশমি শালসহ কতো কি! মূলত শীতকে প্রতিহত করাই মূল কথা। পাশাপাশি শীতের ব্যাধি শ্বাসকষ্ট আর নিমোনিয়া থেকে তো সজাগ থাকতেই হবে। কিন্তু প্রেমিকা যদি ভুল করে তার ব্যবহৃত মাফলার ফেলে যায় তাহলে সেকি ভালো থাকতে পারে? কবি আল মাহমুদের উদ্বিগ্নতায় দেখি-
বাসি বাসনের মতো কারা যেন ধুয়ে দিল ঢাকার আকাশ
ঈষৎ ডিটারজেন্টগন্ধী জানুয়ারি তোমারও কি শ্বাসকষ্ট
না শীত, না গরমের মজা ফেরি করে ভোরের বাতাস
ফেলে যাওয়া মাফলারে জানি লেগে আছে তোমার ছোঁয়া
[জানুআরি দু’হাজার/ আল মাহমুদ]
অন্য দিকে শীতের দাপট থেকে বাঁচার জন্য চুলোর আগুনে তাপ পোহাবার জন্য কবি আসাদ চৌধুরীর ব্যস্ততা দেখার মতো-
চিরল চিরল তেঁতুল পাতা
বাতাস পাইলে কাঁপে
সাপের মতোন লক লকাইয়া
চুলার আগুন তাপে
(আমার) শীতে কাঁপে দেহ।
[সন্দেহ/ আসাদ চৌধুরী]
কবি উনুনের তাপে শীত তাড়ালেও, শীতের কথা ভেবে কোনো এক কবি অকাতরে ভিক্ষা দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। কী হতে পারে ভিক্ষা সামগ্রী? কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় যা বলেন-
রোদ্দুরের সঙ্গে কিছু ভিখারির শীতের আঙুল ভিক্ষা চায়
এখন নিরন্ন ঘরে তাকে ভিক্ষা দেবো
হাতে গুঁজে দেব বুনো ভাং, শুকনো পাতা।
[ভিক্ষা চায়/ শক্তি চট্টোপাধ্যায়]
পাঠক, প্রাচীণযুগ-মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগের কবিদের কবিতার উদ্ধৃতাংশে শীতকে দেখেছি। এবার স্বাধীনতার (সত্তর দশক) দশকের কবিদের কবিতায় শীত কিভাবে চিত্রিত হয়েছে জানতে হলে চলুন সত্তরের বিশাল কাব্যভুবন থেকে ঘুরে আসি-
স্থানস্বল্পতার জন্য সত্তর দশকের দশজন কবির কবিতার উদ্ধৃতি তুলে ধরছি মাত্র-
১.
এই শীতেই আমার প্রচণ্ড অসুস্থতা ভরে উঠতে থাকে দীপ্ত নতুন কবিতায়
এই শীতেই আমর শ্বাসকষ্টের কালো জল ঝলকাতে থাকে
মাছের আশের রৌদ্র ও জীবিত কবিতায়
শীত তাই আমার ভালোবাসার ঋতু
শীত তাই আমার কবিতার ঋতু।
[শীত আমার কবিতার ঋতু/ আবিদ আজাদ]

২.
এসো শীত! এসো শীতের সকাল
এসো তুমি কুয়াশার চাদরে বিকাল
এসো রাতে নিয়নের আলোটাকে ঢেকে
এসো শীত, নামো তুমি হিমালয় থেকে।
[শীতের আবাহনী/ হাফিজুর রহমান]

৩.
শীতই একমাত্র ঋতু
অন্তত আমার বোধে অন্য ঋতু নেই
যদিও গোলাপ ফোটে দক্ষিণ হাওয়ায়
কোকিলের কুহুস্বরে মুখরিত হয়ে উঠে সংসারী বাগান
[শীতার্ত চরাচরে/ নাসির আহমেদ]

৪.
পাতা ঝরার শব্দ নিয়ে আসে শীত, ন্যাড়া ডালে
সফরিচঞ্চল পুচ্ছ নিত্যসঙ্গী হয়ে আসে শীত, বকুল ফুলের গন্ধ
নিয়ে আসে শীত, ডালিয়ার রঙে রেঙে ওঠে ভোরবেলার
শীতের আকাশ।
[শীতের পঙ্ক্তিমালা/ মুজিবুল হক কবীর]

৫.
এই শহরেই ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আমার সমস্ত শীত
কালোজাম ভরা এই শীতকাল এই শহরেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আসে
[সারা শীতকালজুড়ে/ মাহবুব হাসান]
৬.
তখন তাহার শাশুড়ি ননদ
নকশিকাঁথা বোনা উষ্ণতা নিয়ে শীতে
স্মৃতির উঠোনে আগুন পোহায়, হায়! নববধূ
কুয়োতলা শেষে উষ্ণ হেসেলে
চিতই পিঠার পাশে
মনের শরটি উঠিয়ে
হৃৎপিণ্ডের মাঝে যার নাম লেখা ছিল
তাকে ভেবে খুন্তিতে পিঠাটি উল্টায়।
[শীতে পুড়ে যাচ্ছে/ জাহাঙ্গীর ফিরোজ]

৭.
... তোর চোখে কুয়াশা হেনেছে বর্ষা
কানটুপি ভেদ করে ঢুকে যায় তীব্র হু হু শীত।

আগুন জ্বেলেছে কারা? অস্পষ্ট আলোয় নড়ে ছায়া
খড় জ্বেলে মানুষেরা বানিয়েছে আগুনের ছাদ
কুয়াশা মাথায় চেপে উড়ে আসে আলো কবুতর
সামান্য আলোর নেশা বেঁচে আছে শীতার্ত মানুষ।
[এই শীতে/ কামাল চৌধুরী]

৮.
কুয়াশা প্রবল বেগে ধেয়ে আসে
আছড়ে পড়ে উইণ্ডশিণ্ডে
তার ভেতর দিয়ে আমি দেখতে পাই
রাস্তার মাঝখানে হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জীবনানন্দ দাশ
কখন ভাঙবে বনলতার ঘুম সেই অপেক্ষায় তিনি
শীতের মধ্যরাতে দাঁড়িয়ে আছেন নাটোর রোডে
[মধ্যরাতে নাটোর রোডে/ শাহবুদ্দীন নাগরী]

৯.
শীতের চাদরে ঢেকে থাকা নিসর্গ
নিজের ভেতর নিজেকে হারায় অবিরত
টাইগার হিলে সূর্য ওঠে
কাঞ্চনজঙ্ঘার স্তন ছুঁয়ে যায় তার আভা
[দার্জিলিং/জাফরুল আহসান]

১০.
ধূসর শিশির নিয়ে
ব্যক্তিগত কিছু ‘উল্লাস’ ডাংগুলি খেলে! উল্লাস-
ডাংগুলির ‘গুলি’ হয়ে উঠে যায়। নিমেষে ফিরে এসে
হিম হিমেল বাতাসে ‘এক্কা দোক্কা’র ছলে
তৈরি করে শীতের বচন।
তখন একগুচ্ছ স্বপ্নের ব্যস্ততা খেজুর গাছের নিচে
জড়ো হয়।
[সাথী/আইউব সৈয়দ]
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশ ষড় ঋতুর দেশ হলেও বৈশ্বয়িক জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশে এখন কেবলমাত্র তিনটি ঋতুই দৃশ্যমান। গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত। সত্তরের কবিদের কবিতা পাঠ শেষে নিঃসন্দেহে বলে যায় শীতের নির্মমতা, রুক্ষতা, বিষণœতা কিংবা ভয়াবহতা সত্তরের কবিতায় অনুপস্থিতি। অনেকেরই ধারণা সত্তরের কবিদের কবিতায় শীতের কোমলতা, পেলবতা আর উষ্ণতার কথা বলা হয়েছে। শীতকে অভিবাদন জানানো হয়েছে। শীতের নানা অনুষঙ্গ কবিতার শরীর নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। শীত কেবলি কুয়াশা ভেজা পাতাঝরার ঋতু হলেও শীত কখনো প্রাণহীণ ঋতু নয়, এটাই বোধ হয় সত্তরের কবিতার মর্মার্থ। সত্তরের কবিতার মূলবাণী।
আগেই বলেছি শীত ঋতু কবিচিত্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে; এক দিকে শীতের নিষ্ঠুরতা, পাতাঝরার নিঃসঙ্গতা অপর দিকে খালে-বিলে শাপলা-পাপড়িতে জমে থাকা কুয়াশায় সূর্যরশ্মির প্রতিফলন, অতিথি পাখির কল-কাকলি, ক্ষেতে বিছানো শর্ষে ফুলের হলুদ বিছানা প্রকৃতিকে ভিন্ন রঙে রাঙিয়ে তোলে। এমনতরো প্রেক্ষাপটে দেখার বিষয় সত্তরের পরবর্তী দশকের কবিরা কিভাবে শীতকে তুলে এনেছেন তাদের কবিতায়। সত্তর পরবর্তী দশকের ক’জন কবির কবিতার উদ্ধৃতাংশ তুলে ধরা হলো।
১.
নারীগন্ধে, জ্যোৎস্নারোদ সূর্যরোদ বৃক্ষ বোনে মুগ্ধ স্বপ্নবীজ;
কী যে অন্তর্দাহ কুরুক্ষেত্র লোহা-পোড়া শাদা হাসি ঝরে পড়ে
জলের শিশিরে; শূন্য গেরস্থালি অশ্রুভাষা কুয়াশার পূর্ণ
গ্রাস নক্ষত্র আকাশ; শীতের গোধূলি-ছেঁড়া পৃথিবীর অন্ধ
দীর্ঘপথে অতিথি পাখিরা আসে অস্থির ডানায় ছিন্নভিন্ন
মেঘে ভিজে;
[শীতের গোধূলি/ সোহরাব পাশা]

৮ পৃষ্ঠার পর

২.
শীতভীরু বলে ফায়ারপ্লেসের মধ্যে!
এখন কি সাধ্য আছে উত্তরে-হাওয়া নিয়ে
নিজের উঠোনে ঠাণ্ডা হই?
কাঠের আগুন, কয়লার আগুন, টিকের আগুন
তুষের আগুন জ্বলে!
অগ্নিপ্রস্তরের গান আজ কি পোড়ায়?
[মাত্রাজ্ঞান/ গোলাম কিবরিয়া পিনু]

৩.
এমন শীতার্ত সন্ধ্যার আর্শিতে
হিম কুয়াশার আচল ধরে ঝুলে আছি পৌষের ডালে
বিস্তৃত হৃদয় এবং সামগ্রিক সুন্দরের সারাংশ বুঝিয়ে দাও আমাকে
ইঙ্গিতে হাজার বছরের দ্যুতি ছড়ালে পৃথিবীর হৃদয় হবে
আমার হৃদয়ের কনিষ্ঠতম বোন।
[শীতার্ত সন্ধ্যার আর্শিতে/ জাকির আবু জাফর]

৪.
পাখিরা সদয় হও, তোমাদের প্রাচীন সঙ্গীতে
ডিমের কুসুমমাখা প্রভাতের রবি রশ্মিকণা
সযতেœ ছড়ায় আজ, দুর্বিষহ করুণ এ শীতে
হিমেরা ছোবল হানে হিংস্রতায় তোলে বিষ ফনা
বিষম এ রাতে কাঁপে অর্ধনগ্ন প্রিয় অনুভব
পুঁজির পলক নিয়ে হিমবধ নিয়ন্ত্রিত ঘরে
তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে পুঁজিবাদী বিত্তের বৈভব
কেমন রেষম আহা, শীত হয়ে হিমকণা ঝরে।
[হে পাখি সদয় হও/ নূরুল হক]

৫.
একটু এসো না কাছে আজ পড়েছে জবর জাড়
শরীরের ওমে রক্ত নেচে যাক গতি পাক জান
কাকভোরে ডাক দিও-শিশিরের ঘাসে হবে গান
কুয়াশা কাফন ছিঁড়ে কাল খেজুর রসের ভাড়
পেড়ে আনবো উঠোনে, আগুনের জ্বালে জ্বালে
গরম কড়ায় সূয়াদের গুড় ছড়াবে সৌরভ
হাঁটবারে হাঁটের মানুষ গাবে আমার গৌরব
পাতাঝরা পার হয়ে পা রাঙাবো আলতার লালে
[শীত/ ফজলুল হক তুহিন]

৬.
এ কোন আলোর তীর্থে পড়েছি ঢুকে
রোদের মালশা নিয়ে বসে আছে শীতকাতর মানুষেরা
মুরগির পাখাঝাড়া দৃশ্যের মতোই গাছের পাতারা জেগে ওঠে
শাদা ধবধবে শাড়ি পরা মেয়েটিকে দেখি না কোথাও
ওম ছড়ানো বালিকার আগমনে হয়েছে উধাও
বৈশাখ ডাকে চোখ টিপে
রৌদের মৈথুনে শিরশির কাঁপে সবুজ পাতা।
[রোদ টোকা/ মনসুর আজিজ]
ঋতু পরিক্রমায় শীত আসবে শীত যাবে কিন্তু কবিচিত্তে রেখে যাবে তার সরব উপস্থিতি। বাংলাকাব্য সাহিত্য শীতবিষয়ক প্রতিটি কবিতাই হীরকখণ্ডের বিচ্ছুরিত দ্যুতি নিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। চাঁদ, জ্যোৎস্না, প্রেম, বিরহ, প্রত্যাশা-হতাশা যেমন কবিতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তেমনি শীতে আড়ষ্ট কবি। শীত বন্দনায় কবির পঙ্্ক্তিমালায় নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা আর অসহায়ত্বের চিত্রটি প্রকট হয়ে দেখা দিলেও কোনো কোনো কবির পঙ্ক্তিমালায় শীত বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। শীতের মাঝেই প্রেয়সীর শারীরিক উষ্ণতায় শীত নিবারণ করতে চেয়েছেন কেউ কেউ, পাশাপাশি কারো কারো কবিতায় সরাসরি শীত না এলেও শীতের নানা অনুষঙ্গ কবিতার শরীরে ছড়িয়ে দিয়েছে আলোর বর্ণচ্ছটা।
কুয়াশা জড়ানো ভোর, পাতাঝরার দিন, কাকডাকা ভোরে খেজুর গাছ থেকে গাছির রস আহরণ, শর্ষে ফুলের হলুদ বিছানা, অতিথি পাখির আনাগোনা কিংবা শাপলার পাপড়িতে শিশিরের জলকণা এত শীত ঋতুরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বভাবতই শীতের মুগ্ধতা কিংবা নির্মমতা যাই বলি না কেন, বারবার কবির কলমে নিত্যনতুন পঙ্ক্তিমালায় উঠে আসবে শীত। শীত নিয়ে রচিত নতুন সব পঙ্ক্তিমালা বাংলাকাব্য সাহিত্যে হীরকখণ্ডের দ্যুতি নিয়ে বেঁচে থাকবে হাজার বছর; এ প্রত্যাশা আপনার মতো আমারও।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫