ঢাকা, বুধবার,২৮ জুন ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

মুমিন চরিত্রের বৈশিষ্ট্য

লুৎফর রহমান

০৫ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৪৪


প্রিন্ট

‘রহমানের (আসল) বান্দাহ তারাই, ক. যারা পৃথিবীর বুকে নম্রভাবে চলাফেরা করে খ. এবং মূর্খরা তাদের সাথে কথা বলতে থাকলে বলে দেয়, তোমাদের সালাম। গ. তারা নিজেদের রবের সামনে সিজদায় অবনত হয়ে দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দেয়। ঘ. তারা দোয়া করতে থাকে : ‘হে আমাদের রব! জাহান্নামের আজাব থেকে আমাদের বাঁচাও, তার আজাব তো সর্বনাশা। আশ্রয়স্থল ও আবাস হিসেবে তা বড়ই নিকৃষ্ট জায়গা। ঙ. তারা যখন ব্যয় করে তখন অযথা ব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না বরং উভয় প্রান্তিকের মাঝামাঝি তাদের ব্যয় ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। চ. তারা আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যে প্রাণকে হারাম করেছেন কোনো সঙ্গত কারণ ছাড়া তারা তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। ছ. এসব যে-ই করে সে তার গোনাহের শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন তাকে উপর্যুপরি শাস্তি দেয়া হবে এবং সেখানেই সে পড়ে থাকবে চিরকাল লাঞ্ছিত অবস্থায়। তবে তারা ছাড়া যারা (ওই সব গোনাহের পর) তাওবা করেছে এবং ঈমান এনে সৎ কাজ করতে থেকেছে। জ. এ ধরনের লোকদের অসৎ কাজগুলোকে আল্লাহ সৎ কাজের দ্বারা পরিবর্তন করে দেবন। ঝ. এবং আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও মেহেরবান। যে ব্যক্তি তাওবা করে সৎ কাজের পথ অবলম্বন করে, সে তো আল্লাহর দিকে ফিরে আসার মতোই ফিরে আসে। ঞ. (আর রহমানের বান্দাহ হচ্ছে তারা) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং কোনো বাজে জিনিসের কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করতে থাকলে ভদ্রলোকের মতো অতিক্রম করে যায়। তাদের প্রতি তাদের রবের আয়াত শুনিয়ে উপদেশ দেয়া হয় তাহলে তারা তার প্রতি অন্ধ, বধির হয়ে থাকে না’
- সূরা আল ফুরকান ৬৩-৭৩
ব্যাখ্যা :
ক. অর্থাৎ অহঙ্কারের সাথে বুক ফুলিয়ে চলে না। গর্বিত স্বৈরাচারী ও বিপর্যয়কারীর মতো নিজের চলার মাধ্যমে নিজের শক্তি প্রকাশ করার চেষ্টা করে না। বরং তাদের চালচলন হয় একজন ভদ্র, মার্জিত ও সৎস্বভাবসম্পন্ন ব্যক্তির মতো।
খ. মূর্খ মানে অশিক্ষিত বা লেখাপড়া না জানা লোক নয় বরং এমন লোক যারা জাহেলি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এবং কোনো ভদ্রলোকের সাথে অশালীন ব্যবহার করতে শুরু করেছে। রহমানের বান্দাহদের পদ্ধতি হচ্ছে, তারা গালির জবাবে গালি এবং দোষারোপের জবাবে দোষারোপ করে না। এভাবে প্রত্যেক বেহুদাপনার জবাবে তারাও সমানে বেহুদাপনা করে না।
গ. অর্থাৎ ওটা ছিল তাদের দিনের জীবন এবং এটা হলো তাদের রাতের জীবন। তাদের রাত আরাম-আয়েশে, নাচ-গানে, খেলা-তামাশায়, গপসপে এবং আড্ডাবাজি ও চুরি-চামারিতে অতিবাহিত হয় না। জাহেলিয়াতের এ সব পরিচিত বদ কাজগুলোর পরিবর্তে তারা এ সমাজে এমন সব সৎকর্ম সম্পাদনকারী যাদের রাত কেটে যায় আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে দোয়া ও ইবাদত করার মধ্য দিয়ে। কুরআন মজিদের বিভিন্ন স্থানে তাদের জীবনের এ দিকগুলো সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন-
সূরা সাজদায় বলা হয়েছে : ‘তাদের পিঠ বিছানা থেকে আলাদা থাকে, নিজেদের রবকে ডাকতে থাকে আশায় ও আশঙ্কায়’- ১৬ আয়াত।
সূরা জারিয়াতে বলা হয়েছে : ‘এ সব জান্নাতবাসী ছিল এমন সব লোক, যারা রাতে সামান্যই ঘুমাত এবং ভোররাতে মাগফিরাতের জন্য দোয়া করত’- ১৭-১৮ আয়াত।
সূরা জুমারে বলা হয়েছে : ‘যে ব্যক্তি হয় আল্লাহর হুকুম পালনকারী, রাতের বেলা সিজদা করে ও দাঁড়িয়ে থাকে, আখিরাতকে ভয় করে এবং নিজের রবের রহমতের প্রত্যাশা করে তার পরিণাম কি মুশরিকের মতো হতে পারে?’-৯ আয়াত
ঘ. অর্থাৎ এ ইবাদত তাদের মধ্যে কোনো অহঙ্কার জন্ম দেয় না। আমরা তো আল্লাহর প্রিয়, কাজেই আগুন আমাদের কেমন করে স্পর্শ করতে পারে, এ ধরনের আত্মগর্বও তাদের মনে সৃষ্টি হয় না। বরং নিজেদের সব সৎ কাজ ও ইবাদত বন্দেগি সত্ত্বেও তারা এ ভয়ে কাঁপতে থাকে যে, তাদের কাজের ভুলত্রুটিগুলো বুঝি তাদের আজাবের সম্মুখীন করল। নিজেদের তাকওয়ার জোরে জান্নাত জয় করে নেয়ার অহঙ্কার তারা করে না। বরং নিজেদের মানবিক দুর্বলতাগুলো মনে করে এবং এজন্য নিজেদের কার্যাবলির ওপর নয় বরং আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের ওপর থাকে ভরসা।
ঙ. অর্থাৎ তাদের অবস্থা এমন নয় যে, আরাম-আয়েশ, বিলাসব্যসন, মদ-জুয়া, ইয়ার-বন্ধু, মেলা-পার্বণ ও বিয়েশাদীর পেছনে অনেক পয়সা খরচ করছে এবং নিজের সামর্থ্যরে চেয়ে অনেক বেশি করে নিজেকে দেখাবার জন্যই খাবার-দাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ, বাড়ি-গাড়ি, সাজগোজ ইত্যাদির পেছনে নিজের টাকা-পয়সা ছড়িয়ে চলছে। আবার তারা একজন অর্থলোভীর মতো নয় যে, এক একটা পয়সা গুনে গুনে রাখে। এমন অবস্থাও তাদের নয় যে, নিজেও খায় না, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজের ছেলেমেয়ে ও পরিবারের লোকজনদের প্রয়োজনও পূর্ণ করে না এবং প্রাণ খুলে কোনো ভালো কাজে কিছু ব্যয়ও করে না। আরবে এ দুই ধরনের লোক বিপুল সংখ্যায় পাওয়া যেত। এক দিকে ছিল একদল লোক যারা প্রাণখুলে খরচ করত। কিন্তু প্রত্যেকটি খরচের উদ্দেশ্য হতো ব্যক্তিগত বিলাসিতা ও আরাম আয়েশ অথবা গোষ্ঠীর মধ্যে নিজেকে উঁচু মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত রাখা এবং নিজের দানশীলতা ও ধনাঢ্যতার ডংকা বাজানো। অন্য দিকে ছিল সর্বজন পরিচিত কৃপণের দল।
ভারসাম্যপূর্ণ নীতি খুব কম লোকের মধ্যে পাওয়া যেত। আর এ রকম লোকদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগণ্য ছিলেন নবী সা: ও তাঁর সাহাবিরা।
এ সম্পর্কে নবী সা: বলেন : ‘নিজের অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা মানুষের ফকিহ (জ্ঞানবান) হওয়ার অন্যতম আলামত’ (আহমদ ও তাবারানি, বর্ণকারী আবুদ দারদা)।
চ. অর্থাৎ আরববাসীরা যে তিনটি বড় গোনাহের সাথে বেশি করে জড়িত থাকে সেগুলো থেকে তারা দূরে থাকে। একটি হলো শিরক, দ্বিতীয়টি অন্যায়ভাবে হত্যা করা এবং তৃতীয়টি জিনা। এ বিষয়বস্তুটিই নবী সা: বিপুলসংখ্যক হাদিসে বর্ণনা করেছেন : যেমন আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা:) বর্ণিত হাদিস। তাতে বলা হয়েছে : একবার নব:কে (সা.) জিজ্ঞেস করা হলো, সবচেয়ে বড় গোনাহ কী? তিনি বললেন : ‘তুমি যদি কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড় করাও। অথচ আল্লাহই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর? বললেন : ‘তুমি যদি তোমার সন্তানকে হত্যা করো এ ভয়ে যে, সে তোমার আহারে অংশ নেবে।’
ছ. যারা ইতোমধ্যে নানা ধরনের অপরাধ করেছে এবং এখন সংশোধনীর প্রয়াসী হয়েছে তাদের জন্য এটি একটি সুসংবাদ। এটি ছিল সাধারণ ক্ষমার একটি ঘোষণা। এ ঘোষণাটিই সেকালের বিকৃত সমাজের লাখো লাখো লোককে স্থায়ী সংশোধনে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যথায় যদি তাদের বলা হতো, তোমরা যে পাপ করেছ তার শাস্তি থেকে এখন কোনো প্রকারেই নিষ্কৃতি পেতে পারো না, তাহলে এটি তাদের হতাশ করে চিরকালের জন্য পাপসাগরে ডুবিয়ে দিত এবং তাদের সংশোধনের আর কোনো সম্ভাবনাই থাকত না। অপরাধীকে একমাত্র ক্ষমার আশাই অপরাধের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে পারে।
জ. এর দু’টি অর্থ হতে পারে। এ. যখন তারা তাওবা করবে তখন ইতোপূর্বে কুফরি জীবনে তারা যেসব খারাপ কাজ করত তার জায়গায় এখন ঈমান আনুগত্যের জীবনে মহান আল্লাহ তাদের সৎ কাজ করার সুযোগ দেবেন এবং তারা সৎ কাজ করতে থাকে। ফলে সৎ কাজ তাদের অসৎ কাজের জায়গা দখল করে নেবে। দুই. তাওবার ফলে কেবল তাদের আমলনামা থেকে তারা কুফরি ও গোনাহগারির জীবনে যেসব অপরাধ করেছিল সেগুলো কেটে দেয়া হবে না বরং তার পরিবর্তে প্রত্যেকের আমলনামায় এ নেকি লেখা হবে যে, এ হচ্ছে সেই বান্দাহ যে বিদ্রোহ ও নাফরমানির পথ পরিহার করে আনুগত্য ও হুকুম মেনে চলার পথ অবলম্বন করেছে। তারপর যতবারই সে নিজের পূর্ববর্তী জীবনের খারাপ কাজগুলো স্মরণ করে লজ্জিত হয়ে থাকবে এবং নিজের প্রভু রাব্বুল আলামিনের কাছে তাওবা করে থাকবে, ততটাই নেকি তার ভাগে লিখে দেয়া হবে। কারণ ভুলের জন্য লজ্জিত হওয়া ও ক্ষমা চাওয়াই একটি নেকির কাজ।
ঝ. অর্থাৎ প্রকৃতিগতভাবে তাঁর দরবারই বান্দাহর আসল ফিরে আসার জায়গা এবং নৈতিক দিক দিয়েও তাঁর দরবারই এমন একটি জায়গা যেদিকে তার ফিরে আসা উচিত। আবার ফলাফলের দিক দিয়েও তাঁর দরবারের দিকে ফিরে আসা লাভজনক। নয়তো দ্বিতীয় এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে এসে মানুষ শাস্তি থেকে বাঁচতে অথবা পুরস্কার পেতে পারে। এ ছাড়া এর অর্থ এও হয় যে, সে এমন একটি দরবারের দিকে ফিরে যায়, যেখানে সত্যি ফিরে যাওয়া যেতে পারে, যেটি সর্বোত্তম দরবার, সমস্ত কল্যাণ যেখান থেকে উৎসারিত হয়, যেখান থেকে লজ্জিত অপরাধীকে খেদিয়ে দেয়া হয় না বরং ক্ষমা ও পুরস্কৃত করা হয়।
ঞ. এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে, তারা এমন লোক নয় যারা আল্লাহর আয়াত শুনে একটুও নড়ে না বরং তারা তার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোতে যেসব নির্দেশ দেয়া হয়েছে তারা সেগুলো মেনে চলে। যেটি ফরজ করা হয়েছে তা অবশ্য পালন করে। যে কাজের নিন্দা করা হযেছে তা থেকে বিরত থাকে। যে আজাবের ভয় দেখানো হয়েছে তার কল্পনা করতেই তাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে।
লেখক : শিক্ষাবিদ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫