ঢাকা, বুধবার,২৮ জুন ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

আসুন শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই

আতিকুর রহমান নগরী

০৫ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৩৭


প্রিন্ট

রেললাইনের ওই বস্তিতে, বাসস্ট্যান্ডের ওপাশে, গাছতলায় কিংবা ব্রিজের রেলিংয়ে লুঙ্গি অথবা গামছা দিয়ে শরীরটা মুড়িয়ে শুয়ে আছে কত ছিন্নমূল মানুষ আর পথশিশু। একটি উষ্ণ কাপড়ের অভাবে শীতের সাথে আলিঙ্গন করে রাত যাপন করছেন। অথচ আমি-আমরা আর আপনারা যারা আছেন বিত্তবান, তারা হয়তো গেলো বছরের শীত সিজনের পোশাকটা থাকা সত্ত্বেও আরেকটা কেনার ইচ্ছে করছে। কেউ আবার হাজার খানেক টাকা দিয়ে কিনেও নিয়েছেন। সে যাই হোক পুরনোটা দিয়ে আপনি পারেন অসহায়-দরিদ্র আর ছিন্নমূল শীতার্ত মানুষকে হাড় কাঁপানো শীত থেকে বাঁচাতে।
শুধু ইসলামই নয়, প্রতিটি ধর্মে মানবসেবার গুরুত্ব রয়েছে। ইসলাম ধর্ম তার অনুসারীদের জন্য একে একটি ইবাদত হিসেবে গণ্য করে।
প্রকৃতির আবর্তন-বিবর্তন, পরিবর্তন ও বিরূপ প্রভাব মহান আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ এবং এর মধ্যেও মহান আল্লাহর আনুগত্যের আহ্বান ধ্বনিত হয় ‘যেহেতু আসক্তি আছে কুরাইশদের/ গ্রীষ্ম ও শীতকালে দূরে সফরের/ তারা করুক তবে তার ইবাদত/ কাবার প্রভুর দেয়া নির্ধারিত পথ...’ (কাব্যানুবাদ, সূরা-কুরাইশ : ০১-০৩)। এ শাশ্বত ঘোষণায় বোঝা যায় ‘গ্রীষ্ম-শীত’ সবই মহান আল্লাহর হুকুম এবং সর্বাবস্থায় তাঁরই ইবাদত করা বান্দার কর্তব্য।
আবহাওয়ার পরিবর্তন ও ঋতু পরিক্রমায় শীত জনজীবনে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে যা, খুবই কষ্টকর। ‘উত্তরিয়া শীতে পরান কাঁপে থরথরি/ছেঁড়া বসন দিয়া মায় অঙ্গ রাখে মুড়ি’ (মৈমনসিংহ গীতিকা : ‘মলুয়া’)। পৃথিবীর আহ্নিক গতির কারণে দিন-রাত্রি এবং বার্ষিক গতির প্রভাবে ঘটে ঋতুচক্রের পরিবর্তন, এর সবই কিন্তু হয় মহান আল্লাহর নির্দেশে ‘তিনিই রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে পরিবর্তন করেন, তিনি সূর্য ও চাঁদকে নিয়ন্ত্রণ করছেন; প্রত্যেকেই এক নির্দিষ্টকাল আবর্তন করে..., (সূরা- ফাতির : ১৩)। ফলে বছর ঘুরে আসে শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল।
বয়স্ক ও শিশুসহ অনেক মানুষের শতিকালের সহনমাত্রা ছাড়িয়ে দেখা দেয় সর্দি-কাশি, জ্বর, হাঁপানি, পেটেরপীড়াসহ নানা জটিল রোগশোক। দৈনন্দিন কর্মপরিবেশে ছন্দপতনের কারণে খেটে খাওয়া মানুষের কাজের সুযোগ ও সক্ষমতা কমে আসে। শীত নিবারণের সামান্য কাপড় ও দুর্যোগকালে খাবারের অভাবে কষ্ট পায় অসংখ্য ‘বনি-আদম’। তাই সামর্থ্যবানদের কর্তব্য হলো মানবসেবার ব্রতে এগিয়ে আসা এবং শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানো। কারণ, বাংলাদেশে শীত আসে কষ্টের বারতা নিয়ে। আমাদের গ্রামীণভাবনায় উচ্চারণ ‘পৌষ গেল, মাঘ আইল-শীতে কাঁপে বুক/দুঃখীর না পোহায় রাতি হইল বড় দুঃখ’ শীতার্তসহ বিপন্ন সব মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অনুপম আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহর প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে দরিদ্র, ইয়াতিম ও বন্দীদের খাদ্য দান করে’ (সূরা : দাহর-০৮)।
মানবসেবায় ত্র“টি হলে কেয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। জিজ্ঞাসিত হতে হবে বস্ত্রহীনদের বস্ত্র সম্পর্কে, ক্ষুধার্তদের ক্ষুধা সম্পর্কে। মানবসেবা, মানবকল্যাণ ও জনহিতকর কাজকে গুরুত্ব প্রদান করেছে ইসলাম। ইসলামে মানবসেবা বা পরোপকার সর্বোত্তম গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারায় আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘যদি তোমরা দান-সদকাহ বা সাহায্য-সহযোগিতা প্রকাশ্যে কর, তাও ভালো। আর যদি এমন কাজ গোপনে বা অপ্রকাশ্যে কর, তা আরো ভালো।’ কুরআনুল কারিমের আরেক সূরা কাসাসের ৭৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি তেমনি অনুগ্রহ করো, যেমনি আমি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছি।’ প্রতি বছর অনেক অসহায় মানুষ শীতের এই নির্মম কষ্টে মারা যায়। রাজপথের এসব মানুষের একবেলা খাবারের ঠিক নেই তারা কিভাবে শীতবস্ত্র পরিধান করবে বর্তমানের এই সময়ে? তারা রাত কাটায় পথে-প্রান্তরে, তাদের শিশুদের নিজেদের বুকের ভেতর নিয়ে শীতের রাত পাড়ি দেয়। একজন মুসলমান হিসেবে মানবকল্যাণমূলক কাজে জড়িত থাকা, মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখা ঈমানি দায়িত্ব। মানবসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সাহাবায়ে কেরাম রা:।
প্রচণ্ড এক শীতের রাতে বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবুদ্দারদার রা: বাড়িতে কিছু লোক মেহমান হলেন। তিনি গরম খাবার দিয়ে তাদের মেহমানদারি করলেন। যখন ঘুমানোর সময় হলো, তখন মেহমানরা দেখলেন, কক্ষে লেপ বা কম্বল নেই। তাদের একজন বললেন, আমি আবুদ্দারদার রা: কাছে তা বলি। অপরজন বাধা দিলেন। কিন্তু তিনি গিয়ে হজরত আবুদ্দারদার রা: কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেলেন, তিনি শুয়ে পড়েছেন এবং তার গায়ের ওপর একটিমাত্র পাতলা কাপড়, যা ঠাণ্ডা প্রতিহত করতে পারে না। তিনি আবুদ্দারদা রা:কে লক্ষ্য করে বললেন, আমরা যেমন শীতের কাপড় ছাড়া রাতযাপন করছি, আপনাকেও তো তেমনি দেখছি। হজরত আবুদ্দারদা রা: বললেন, আমাদের অন্য একটি বাড়ি আছে। আমরা যা কিছু সংগ্রহ করতে পারি তা সেখানে পাঠিয়ে দেই। এ বাড়িতে কিছু অবশিষ্ট থাকলে তা অবশ্যই তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দিতাম। আর ওই বাড়িতে যাওয়ার পথ বড় দুর্গম। হালকা ও বোঝাহীন ব্যক্তি বোঝাবাহী ভারী ব্যক্তির চেয়ে অনেক সহজে সেই পথ অতিক্রম করতে পারবে।
আর্তমানবতার সেবায় উৎসাহ দিয়ে প্রিয় নবী সা: বলেন, ‘মানুষের মধ্যে সে-ই উত্তম, যার দ্বারা মানবতার কল্যাণ সাধিত হয়। বিপন্ন মানবতার কল্যাণে বিশ্বনবী, মানবতার কাণ্ডারী, আমার প্রিয় নবীর সা: আদর্শ। আর মানবকল্যাণের মাধ্যমে জান্নাতি সুখ লাভ করা যায়। এ জন্যই প্রিয় নবী সা: বলেন, ‘কোনো মুসলমান কোনো মুসলমানকে বস্ত্রহীন অবস্থায় বস্ত্র দান করলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে সবুজ বর্ণের পোশাক পরাবেন..., খাদ্য দান করলে তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন..., পানি পান করালে...’ (আবু দাউদ শরিফ)।
লেখক : প্রাবন্ধিক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫