ঢাকা, রবিবার,২৬ মার্চ ২০১৭

দেশ মহাদেশ

পুতিনের কৌশলে হেরে গেলেন ওবামা

আহমেদ বায়েজীদ

০৫ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
ভূ-রাজনীতিতে রাশিয়া এখন অনেক দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে আছে

ভূ-রাজনীতিতে রাশিয়া এখন অনেক দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে আছে

সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে অপ্রীতিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের সাথে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সরকারের সম্পর্ক যে কখনোই উষ্ণ ছিল, তেমনটি নয়। যুগ যুগ ধরেই ক্ষমতার লড়াই নিয়ে বৈরিতা দুই পরাশক্তির। তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে ওবামা-পুতিন যুগেও। কিন্তু অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবারের বিষয়টি অনেকটাই আলাদা। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মাত্র দুই সপ্তাহ পর ক্ষমতা গ্রহণ করবেন ট্রাম্প। বছরের পর বছর ধরে বিশ্ব মোড়লের আসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে যখন ঠাণ্ডা লড়াই চলছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেয়েছে যিনি ঘোষণা দিয়েই নিজেকে ‘রুশপন্থী’ হিসেবে জাহির করছেন। এক দিকে বারাক ওবামা যখন বিভিন্নভাবে রাশিয়াকে কোণঠাসা করতে ব্যস্ত, ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন রাশিয়ার প্রতি তার মুগ্ধতা প্রকাশ করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। দীর্ঘ দিনের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির জন্য যা সত্যিই বিব্রতকর।
মস্কো-ওয়াশিংটন সম্পর্কের সর্বশেষ নজির যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৫ জন রুশ কূটনীতিককে সপরিবারে বহিষ্কার।
নতুন বছর উদযাপনের মাত্র এক দিন আগে হঠাৎ করেই ওবামা প্রশাসন ওয়াশিংটন ডিসি ও সান ফ্রানসিসকো কনসুলেটের ওই কূটনীতিকদের তার দেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। তাদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনে মার্কিন সরকার। নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মার্কিন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নির্বাচিত করায় রাশিয়াকে এই ‘শাস্তি’ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রে রুশ গোয়েন্দা কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তারা। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া রাশিয়া কিভাবে দেখায় সেটি নিয়ে আগ্রহ ছিল বিশ্ববাসীর।
অনেকেই ভেবেছে বড় ধরনের কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নেবে রাশিয়া। রাশিয়ার বর্তমান অবস্থা-অবস্থানে সেটি ভাবাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রতিশোধের পন্থায় হাঁটেননি ভøাদিমির পুতিন। তিনি বরং রাশিয়ায় কর্মরত সব মার্কিন কূটনীতিককে নববর্ষ উদযাপন করতে ক্রেমলিনে আমন্ত্রণ জানান। অথচ রাশিয়া পাল্টা কূটনীতিক বহিষ্কার করছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সমানসংখ্যক মার্কিন কূটনীতিক বহিষ্কারের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন ক্রেমলিনের কাছে। কিন্তু পুতিন কেন সেই পথে হাঁটেননি কিংবা পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কোনো ঘোষণা দেননি সেটি একটি রহস্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে।
বর্তমান বিশ্বে রাশিয়ার অবস্থান কোনো অংশেই দুর্বল নয় যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে। বরং গত কয়েক বছরে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। বেশ কিছু ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে পাত্তা না দেয়ার মানসিকতা দেখিয়েছে পুতিন সরকার।
২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে রাশিয়া। ওই ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা। কিন্তু কোনো কিছুই পুতিনকে দমাতে পারেনি তার অভিযান থেকে। সেই থেকেই মূলত দুই দেশের ঠাণ্ডা লড়াই রূপ নেয় প্রকাশ্য বৈরিতায়। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলো অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাশিয়ার ওপর। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এরপর সিরিয়া যুদ্ধেও রাশিয়ারই ‘জয়’ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা দেশটির বিদ্রোহীদের সমর্থন ও সহযোগিতা দিলেও রাশিয়া সরাসরি মাঠে নেমেছে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ক্ষমতায় রাখতে এবং তারা সফলও হয়েছে। পরাজিত হয়ে মাঠ ছেড়েছে বিদ্রোহীরা। যদিও বেসামরিক লোকদের ওপর নির্দয় বোমা হামলার জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠেছে বিশ্বব্যাপী। তবু তারা পিছু হটেনি। উল্টো আইএস-বিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এর বাইরে পোল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন, কৃষ্ণ সাগরে রুশ যুদ্ধজাহাজের মহড়া বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু ঘটনায় মস্কো ও ওয়াশিংটনের দ্বন্দ্বের মাত্রা বৃদ্ধিই পেয়েছে দিন দিন। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি উপেক্ষা করে উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের একের পর এক বেপরোয়া কর্মকাণ্ডও রাশিয়ার পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া হয়নি বলে মনে করছেন অনেকে। এসব ঘটনা বিবেচনা করলে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় রাশিয়া তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থায়ই আছে বলেই মনে হয়। বৈশ্বিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পুতিন অনেক গুণ অগ্রসর হয়েছে বারাক ওবামার তুলনায়। সিরিয়া ও ইরানের পাশাপাশি শক্তিধর মুসলিম দেশ তুরস্ক এখন রাশিয়ার মিত্র, যা মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার অবস্থান সুদৃঢ় করার ইঙ্গিত বহন করছে। সাম্প্রতিক পাক-ভারত উত্তেজনার মধ্যেই রুশ সৈন্যদের সাথে পাকিস্তানের যৌথ মহড়া প্রমাণ করে দক্ষিণ এশিয়ায়ও তারা শক্তিধর একটি দেশকে পাশে পাচ্ছে। অথচ তুরস্ক ও পাকিস্তান বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তার ওপর ট্রাম্প যদি পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেন, তাহলে মুসলিম বিশ্বের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক আরো কমার আশঙ্কা রয়েছে।
পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনও প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতায়। বিশেষ করে রড্রিগো দুতার্তে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ে দেশটির নীতিই আমূল পাল্টে গেছে। ফিলিপাইন এখন মার্কিনবিরোধী হিসেবে পরিচিত। অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের সাথে রাশিয়ার বরাবরই ভালো সম্পর্ক। এ ছাড়া খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রভাব বিস্তারের যে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র থেকেই উঠেছে, তা যদি সত্যি হয় তাহলে বলতে হবে নিজেদের পরাশক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে রাশিয়ার আর কোনো কিছুই করে দেখানোর বাকি নেই।
এসব বিষয় সামনে রাখলে বলা যায়, ভূ-রাজনীতিতে রাশিয়া এখন অনেক দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে আছে। তথাপি পুতিন কেন কূটনীতিক বহিষ্কারের বিষয়টিকে এত ঠাণ্ডা মাথায় গ্রহণ করলেন তা নিয়ে নানামুখী চিন্তা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভাষ্যকারেরা। বেশির ভাগই মনে করছেন, পুতিন হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতা গ্রহণের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুগে মস্কোর সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক যে নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করবে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ট্রাম্প বারবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের প্রতি তার মুগ্ধতা প্রকাশ করে আসছেন। ওবামার চেয়ে পুতিনকে যোগ্যও বলেছেন প্রকাশ্যে। ঘোষণা দিয়েছেন, বৈরিতার নীতি এড়িয়ে রাশিয়ার সাথে তার দেশের সম্পর্ক হবে বোঝাপড়ার।
সর্বশেষ কূটনীতিক বহিষ্কার ইস্যুতে পুতিনের ধীরে চলো নীতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কাজেই ট্রাম্পের সাথে পুতিনের সম্পর্ক আরো বেশি উষ্ণ হবে সেটি বোঝাই যাচ্ছে। আর সে হিসেবে পুতিন হয়তো তার ‘পছন্দের মানুষটির’ ক্ষমতা গ্রহণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই পারেন। অন্য দিকে ক্ষমতার শেষ মুহূর্তে বারাক ওবামা রাশিয়া ইস্যুতে এতটা কঠোর কেন হচ্ছেন সেটি নিয়েও রয়েছে বিভিন্নমুখী চিন্তা-ভাবনা।
রুশ বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্পের সাথে পুতিনের সম্পর্ক যাতে মধুর হয়ে উঠতে না পারে সেটি ঠেকানোর জন্যই ওবামার এই প্রচেষ্টা। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাশিয়াবিষয়ক নীতির যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাতে রাশিয়ার একক পরাশক্তি হয়ে ওঠা ঠেকানোর কোনো ব্যবস্থা থাকবে না যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। তাই বিদায়বেলা শেষ চেষ্টাটা করে যাচ্ছেন বারাক ওবামা।

 

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫