ঢাকা, শনিবার,১৯ আগস্ট ২০১৭

দেশ মহাদেশ

রাশিয়া-পাকিস্তান সম্পর্কের নতুন মোড়

মীম ওয়ালীউল্লাহ

০৫ জানুয়ারি ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ দেশের একটি পাকিস্তান। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্কন্নোয়নের ফলে পাকিস্তান রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক জোরদারে সক্রিয় হয়েছে। ইতোমধ্যেই চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরকে (সিপিইসি) সমর্থন দিয়েছে রাশিয়া। অবশ্য রাশিয়ার এ সমর্থনকে পাকিস্তানের উষ্ণ সমুদ্র বন্দরের সুবিধা পেতে কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী তিন দেশের বোঝাপড়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে ভারত।
কয়েক দশকের বৈরীভাব কাটিয়ে ধীরে ধীরে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে পাকিস্তান ও বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়া। ¯œায়ু যুদ্ধের পর এ প্রথম খুব সতর্কভাবে পাকিস্তানকে কাছে টানতে চাইছে রাশিয়া। অন্যান্য বিষয় ছাড়াও বিশেষ করে আফগানিস্তানে তালেবানদের সাথে যুদ্ধ অবসানে ইসলামাবাদকে প্রভাবিত করতে মস্কোর এ প্রয়াস। কেন না সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি গোটা মধ্য এশিয়ার জন্য বড় ধরনের হুমকি। বহু দিন ধরে ভারত, আফগানিস্তান ও ইরান অভিযোগ করে আসছে, পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে তালেবানসহ বিভিন্ন চরমপন্থীরা আস্তানা গাড়লেও তাদের দমনে পাকিস্তান তেমন কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোও পাকিস্তানের কড়া সমালোচনা করে যাচ্ছে। তবে শুধু চীন অব্যাহতভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানকে। এর সাথে হয়তো খুব শিগগির রাশিয়াকে আরেকটি মিত্র হিসেবে পেতে যাচ্ছে পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের নানা চাপ মোকাবেলায় মস্কোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের বিকল্প দেখছে না ইসলামাবাদ। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল চেরাটে দুই দেশের সামরিক বাহিনী যৌথ মহড়ায় অংশ নেয়। এ মহড়া বন্ধ রাখার জন্য ভারত রাশিয়াকে আহ্বান জানালেও তাতে পাত্তা দেয়নি মস্কো।
ভূ-রাজনৈতিক কারণে রাশিয়া উষ্ণ সমুদ্রবন্দরের জন্য মরিয়া। এবার হয়তো সেই বহু প্রতিক্ষিত স্বপ্ন পূরণ হতে পারে। ১৯৭৯ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণের সময় পাকিস্তান বুঝতে পেরেছিল, তাদের উপসাগরে রাশিয়া একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে চায়। সে সময় পাকিস্তান অন্যতম রাশিয়াবিরোধী অবস্থান নেয়। কিন্তু আজ পাকিস্তান নিজেই তার পুরনো শত্রুকে বন্ধুত্বের স্মারক স্বরূপ উষ্ণ সমুদ্রবন্দরে সুযোগ দিতে চাচ্ছে। পাকিস্তান বেলুচিস্তান প্রদেশের উপকূলে আরব সাগরে গোয়েদার গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়াকে। সিপিইসি পরিকল্পনার আওতায় এ বন্দর নির্মাণ করেছে চীন।
গত ১৯ ডিসেম্বর এ করিডোরকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে রাশিয়া। পাকিস্তানে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত অ্যালেক্সি দেদভর সমর্থনের এ ঘোষণা দেন। চীনের জিনজিয়াং প্রদেশ থেকে পাকিস্তানের গিলগিট বালতিস্তান হয়ে করিডোরটি গোয়েদারে গিয়ে ঠেকবে। ফলে এ করিডোরও নির্মিত হলে সীমান্তে পাকিস্তান ও চীনের দিক থেকে আরো চাপে পড়বে ভারত। এ প্রসঙ্গে ভারতের স্ট্রাটেজিক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানি বলেছেন, সম্ভবত ভারতকে আর বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু মনে করতে পারছে না মস্কো। পাকিস্তানে অবস্থানরত তালেবানকে দেখেও প্রচ্ছন্নভাবে সিপিইসিকে রাশিয়ার সমর্থন, সে দিকেই ইঙ্গিত করছে।
তবে উরি হামলার পর পাকিস্তান-রাশিয়া যৌথ মহড়া নিয়ে ভারতের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের নৈকট্য নিয়ে রাশিয়া কোনো মন্তব্য করেনি, তাই পাকিস্তানের সাথে রাশিয়ার সম্পর্কে ভারতেরও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা উচিত নয়। ফলে ইসলামাবাদের সাথে মস্কোর এ নতুন ঘনিষ্ঠতাকে তীক্ষ্ম নজরে রাখবে পাকিস্তানের চির বৈরী ভারত। মস্কো-ইসলামাবাদ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে ভারত।
তবে রাশিয়া-পাকিস্তান সম্পর্ক কতটা গভীর হবে তা এখনো স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। কারণ, ইতোমধ্যে গোয়েদার বন্দর ব্যবহারে চীনের নৌবাহিনীকে অনুমতি দিয়েছে পাকিস্তান। কিন্তু সেখানে রাশিয়ার যুদ্ধ জাহাজ ভিড়তে দেয়া হবে কি না সে প্রসঙ্গে এখনো কিছু বলেনি পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ। কয়েক দশক ধরে চলা ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সরঞ্জাম বিক্রির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে রাশিয়া। তারা পাকিস্তানের কাছে হেলিকপ্টার বিক্রি করতে সম্মত হয়েছে। অপর দিকে সমরাস্ত্র কিনতে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে ভারত। স্বাভাবিকভাবে ভবিষ্যতে রাশিয়ার অস্ত্রের বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারবে পাকিস্তান। এর ফলে দু দেশের সামরিক সম্পর্ক গভীর হতে পারে।
পাকিস্তান খুব আগ্রহ ভরে রাশিয়ামুখী হলেও রাশিয়া খুব সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ নেবে। কারণ রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির বিশ্বে সবচেয়ে বড় বাজার ভারত।
রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান ও ভারতকে নিয়ে আলোচনা হলেও দক্ষিণ বা মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র প্রাসঙ্গিক নয়। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা ভøাদিমির পুতিনের সৌহার্দ্যরে কথা ইতোমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে। ¯œায়ু যুদ্ধের যুগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এক নম্বর শত্রু রাশিয়া। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুগে এ দুই দেশের সমিকরণ কেমন হবে তা দুনিয়াজুড়ে আলোচনায় পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চীন অবশ্যই সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। এখন রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তান কতটুকু সমঝোতায় পৌঁছতে পারছে, তার আলোকে পৃথিবীর শক্তি বিন্যাসের মানচিত্রের গতিপথ নতুন করে মোড় নিতে পারে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫