ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

মতামত

একটি সামাজিক অপরাধ

মো: মাকসুদ উল্যাহ

০২ জানুয়ারি ২০১৭,সোমবার, ১৯:৫০ | আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০১৭,সোমবার, ২০:১৬


প্রিন্ট
প্রতীকি ছবি

প্রতীকি ছবি

বাবার মৃত্যুর পর নিজের আয় করা অর্থ দিয়ে ছোট ভাই-বোন বা পরিবারের খরচ জোগানোর ব্যাপারে বড় ছেলে বাধ্য নয়। এটা তার দায়িত্ব নয়। বরং ছোট ভাইবোন নাবালেগ বা অবুঝ হলে বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ সততার সাথে সংরক্ষণ করার মাধ্যমে সেই সম্পদ যুক্তিসঙ্গত এবং ন্যায্য উপায়ে ছোট ভাইবোনের লেখাপড়া এবং কর্মসংস্থান করার জন্য ব্যয় করতে পারে। কিন্তু যদি বাবার মৃত্যুর পর বড় ছেলে ছাত্র থাকা অবস্থায় কষ্ট করে নিজে খেয়ে না খেয়ে মা, ভাইবোনের আহার জোগায়, ভাই-বোনকে সাধ্যমতো লেখাপড়া করায় এবং পরে মাসহ ভাইবোন সেটাকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করে; তাহলে সেটা কেমন হয়? গ্রামের নিম্নবিত্ত অশিক্ষিত পরিবার থেকে উঠে আসা বড় ছেলেদের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া তাই হচ্ছে অহরহ। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটা সত্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মা তার এ ধরনের বড় ছেলের সাথে সৎ মায়ের চেয়েও খারাপ আচরণ করেন। অনেক সময় দেখা যায়, মা তার বড় ছেলেকে নিছক অন্য সব সন্তানের সুখ-শান্তির হাতিয়ার মনে করে মাত্র। মা একসময় ঘোষণা করে, বড় ছেলে আমার সংসারে কিছুই দেয়নি, যা দিয়েছে ছোট ছেলেরা দিয়েছে! সাত-আট সন্তানসহ দিন এনে দিন খাওয়া যে বাবার জন্য রীতিমতো কষ্টের ব্যাপার, সেই বাবার বড় ছেলে যদি অক্লান্ত পরিশ্রম করে লজিং থেকে, টিউশনি করে, কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করে এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের বৃত্তি পেয়ে টেনেটুনে কোনো দিন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, আইনজীবী বা অন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি অফিসার হয়; তখন সবাই বলতে শুরু করে, বাবা অনেক কষ্ট করে ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করে মানুষ বানিয়েছেন, যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেখানে বাবার ‘বিশেষ’ কোনো অবদান ছিল না। এ ক্ষেত্রে তার দোয়া থাকে মাত্র। কিন্তু বড় ভাই যখন নিজে কষ্ট করে সাত-আটজন ছোট ভাইবোনকে নিজের কষ্টের উপার্জিত টাকা ব্যয় করে লেখাপড়া করান, তখন সমাজের অনেকেই সেটা কোনো দিন স্বীকার করেন না বরং দেখেও না দেখার ভান করেন, যদিও সেটা প্রকৃতপক্ষে বড় ভাইয়ের দায়িত্ব ছিল না।
পরিবারের বড় ছেলেরও শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। তার অতি প্রাকৃতিক কোনো ক্ষমতা বা সামর্থ্য নেই। দেখা যায় কোনো বাবা যখন তার সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে স্বাবলম্বী করতে পারেন না, তখন সমাজের কেউ এ নিয়ে পিতাকে কোনোদিন কোনো প্রশ্ন করে না; অথচ একই ব্যাপারে আর্থিকভাবে অক্ষম বড় ভাইকে সমাজের লোকেরা নাস্তানাবুদ করতে চেষ্টা করে পরিবারে ফাসাদ সৃষ্টি করে। শিক্ষিত সচ্ছল পরিবারে এমন ঘটনা সাধারণত ঘটে না। কারণ সেখানে সব সন্তানকে পিতামাতা নিজেরাই প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া এবং স্বাবলম্বী করান।
সমাজে কিছু লোক থাকে যারা নিজেরা নিজেদের জীবনে কিছু গড়তে জানে না, কিন্তু অন্যের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে গড়া জিনিস ভাঙতে ওস্তাদ এবং এ জন্য তারা অপচেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখে না। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। গ্রামের এক হতদরিদ্র পিতার চার ছেলে তিন মেয়ে আছে, তিনি দিন আনেন দিন খান। জমিজমা নেই বললেই চলে। কালের পরিক্রমায় তার বড় ছেলে একসময় বুয়েটে চান্স পায় এবং প্রথম বর্ষেই পিতা মারা যান। যাই হোক টিউশনি করে, কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিয়ে এবং কোনো সংস্থার কিছু বৃত্তি পেয়ে, টেনে-টুনে, খেয়ে না খেয়ে সে তার লেখাপড়া চালিয়ে যায় আর বাকি টাকা বাড়িতে মা-ভাইবোনের জন্য পাঠায়। একসময় ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে। পাস করা মাত্রই গ্রামের কিছু অসাধু লোক তার মাকে বলতে শুরু করে, আপনার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, লাখ লাখ টাকা ইনকাম করতেছে, কই বাড়িতে একটি দালান বানায় না কেন? ছোট ভাইগুলোকে চাইলেই বিদেশ পাঠিয়ে দিতে পারে, অথচ তা করছে না! আর ভাইগুলোকে বলতে থাকে, তোদের বড় ভাই তো অনেক টাকা আয় করতেছে, শহরে অনেকগুলো বাড়ি-গাড়ি আছে; তোদেরকে আর স্কুলে পাঠায় না কেন? তোদেরকে বিদেশ পাঠিয়ে দিলেই তো পারে। বোনদের বলতে থাকে, তোরা আর স্কুলে পড়ে কী করবি? তোদের ভাই ইঞ্জিনিয়ার, লাখ লাখ টাকা! এখন তোদেরকে শুধু বড়লোকদের কাছে বিয়ে দিলেই তো পারে! অসাধু লোকদের প্ররোচণায় ভাইবোনগুলো বাস্তবতার দিকে না তাকিয়ে তাদের চলমান লেখাপড়া বা কর্মসংস্থানের চেষ্টায় ঢিলেমি শুরু করে একসময় অঘোষিত বিদ্রোহ শুরু করে! এতে করে আর্থসামাজিক অবকাঠামোর অপচয় হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে এখনো কোনো চাকরিতে যোগদান করতে পারেনি বা কোনো চাকরি করলেও বেতন মাত্র ২০-৩০ হাজার টাকা। এ বেতন দিয়ে সে নিজেই একটি শহরে ঠিকমতো চলতে পারে না। হুট করে বাকি তিনটি ভাইকে বিদেশ পাঠানোর জন্য আর তিনটি বোনকে বড়লোকের কাছে বিয়ে দেয়ার জন্য লাখ লাখ টাকা আনবে কোথা থেকে? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, একসময় মাও ওই অসাধু লোকদের নিজের শুভাকাঙ্ক্ষী ভেবে তার বড় ছেলেকে অবিশ্বাস করতে শুরু করেন! বড় ছেলে তার মা, ভাইবোনকে হাজারো বুঝিয়েও ব্যর্থ হন। ছোট ভাইবোনেরা তার কোনো আদেশ বা উপদেশ না মেনে ওই অসাধু লোকদের উপদেশ মানতে শুরু করে! তবে শিক্ষিত মাকে অসাধু লোকেরা এভাবে বিভ্রান্ত করতে পারে না। এভাবে সর্বোচ্চ ছয় মাস থেকে দেড় বছর সময়ের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। এভাবেই অসাধু লোকেরা বড় সন্তান বা বড় ভাইয়ের সাথে গ্রামের সহজ সরল মা আর ছোট ভাইবোনের অবিশ্বাস আর ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে পরিবারটিকে ধ্বংস করে। ফলে সমাজে অস্থিরতা, হিংসা- বিদ্বেষ, হানাহানি, অপপ্রচার বৃদ্ধি পায়।
অনেক সময় দেখা যায়, কোনো একটি নিম্নবিত্ত পরিবারে একটি মাত্র ভাই আর পাঁচটি বোন আছে। ভাইটি কষ্ট করে লেখাপড়া করে ব্যাংক অফিসার হিসেবে চাকরি পেয়েছে। বোনেরা সবাই বিবাহিত। ভাইটির বেতন ২০-২৫ হাজার টাকা। বোনেরা অল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত। এমতাবস্থায় বোনেরা চায়, ভাইটি যেন প্রতি মাসে অন্তত একবার তাদের দাওয়াত করে পোলাও কোরমা খাওয়ায়!
কোনো ছেলে যখন তার মায়ের চেয়ে তার শাশুড়িকে বেশি শুভাকাঙ্ক্ষী মনে করে, তখন সেটা যেমন দুঃখজনক, তেমনি মা যখন তার গর্ভজাত ছেলের চেয়ে পাশের বাড়ির কোনো লোককে বেশি শুভাকাক্সক্ষী মনে করে, তখন সেটাও হয় খুবই দুঃখজনক। মাকে এ কথা বুঝতে হবে, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর তার এই বড় ছেলেই ছাত্রাবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করে বাড়িতে তার জন্য এবং তার বাকি সন্তানদের জন্য টাকা পাঠিয়েছে, পাশের বাড়ির ওই লোকেরা নয়। ঠিক একই কথা ছোট ভাইবোনদের জন্যও প্রযোজ্য। এখন একটি ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কারণে ওইসব অসাধু লোকেরা সেটা সহ্য করতে না পেরে মা আর ছোট ভাইবোনদেরকে ভুল বুঝাচ্ছে! কোনো পরিবারে পিতার মৃত্যুর পর ছোট ভাইয়েরা যখন বালেগ হয়, তখন তাদের উচিত কোনো অসাধু লোকের প্ররোচনায় বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে না থেকে বরং নিজেদের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেরা স্বাবলম্বী হতে চেষ্টা করা। কারণ, প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা আছে। কিন্তু কুসংস্কারবশত বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলে এ ক্ষেত্রে বরং নিজের যোগ্যতা ও সময়ের অপচয় হয় মাত্র। সবাই পরিবারের বড় সন্তান নন, কিন্তু একসময় সবার বড় সন্তান থাকবে। তখন তিনি যেন অন্যায়ভাবে বড় সন্তানের ওপর বা কোনো একটি মাত্র সন্তানের ওপর বাকি সন্তানের রিজিকের দায়িত্ব চাপিয়ে না দেন।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় মেয়েকে এ ধরনের অন্যায় পরিস্থিতিতে পড়তে দেখা যায়। সব পরিবারে বড় ছেলেকে বা বড় মেয়েকে এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না। শুধু বড় ছেলেই নয়, পরিবারের কোনো একটি মাত্র ছেলে বা মেয়ের ওপর কখনোই বাকি সব ভাইবোনের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়ার পক্ষে কুরআন বা হাদিসে কোনো সমর্থন আছে বলে শুনিনি বা দেখিনি কোনো দিন।

লেখক : স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণরত চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫