ঢাকা, শুক্রবার,২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

কর্পোরেট দিগন্ত

নিম্নমানের রডে বাজার সয়লাব : শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ

আলমগীর কবির

০২ জানুয়ারি ২০১৭,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট

শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ
বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান। এ শিল্পের সঙ্কট ও সম্ভাবনা নিয়ে তার সাথে কথা বলেছেন
আলমগীর কবির
অভিযোগ আছে অসৎ রি-রোলিং মিল মালিক কিছু অসৎ লোকের সহযোগিতায় নকল 500W (TMT), 400W (60G) গ্রেড সিল মেরে রড বাজারজাত করছে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
Ñবিএসটিআই লাইসেন্সবিহীন বেশির ভাগ রি-রোলিং মিলের মালিক কিছু অসাধু দোকানদারের যোগসাজশে ভোক্তাদের ঠকিয়ে অধিক মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার জন্য ভুয়া 500W (TMT), 400W (60G) গ্রেড সিল মেরে রড বাজারজাত করছে। এসব বন্ধ করার জন্য শিল্পমন্ত্রীর সঙ্গে গত ৩ নভেম্বর ২০১৫ ও বিএসটিআইর সাবেক মহাপরিচালকের সঙ্গে গত ৪ নভেম্বর ২০১৫ সাক্ষাৎ করলে তা বন্ধ করার জন্য র্যাবের ম্যাজিস্ট্্েরট দিয়ে বিএসটিআইর কয়েকটি অভিযান চট্টগ্রামে পরিচালিত হলে কিছু মিলকে জরিমানা ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এ অভিযানের ফলে তখন চট্টগ্রামে ভুয়া সিল 500W (TMT), 400W (60G) গ্রেড মেরে রড বাজারজাত অনেকাংশে হ্রাস পায়। পাশাপাশি ঢাকায় বিএসটিআইর কয়েকটি অভিযান পরিচালিত হলে কিছু রি-রোলিং মিলকে সামান্য জরিমানা করে। ঢাকায় রি-রোলিং মিলগুলোয় ওই সময়ের অভিযানের ফলে ভুয়া 500W (TMT), 400W (60G) গ্রেড সিল মেরে রড বাজারজাত কিছুটা কমলেও বর্তমানে আবার বেড়েছে। র্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে বিএসটিআইর এ অভিযান অব্যাহত রাখতে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ জানিয়ে আসছি এবং বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচার করে যাচ্ছি কিন্তু বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা রাখছে না। উল্লেখ্য, ভুয়া সিল ব্যবহারের রড দিয়ে সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ে স্থাপনা নির্মিত হলে তা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ও ভূকম্পনে ভেঙে যাবে। এমনিতেই আমাদের দেশ ভূমিকম্পপ্রবণ। তাই ভুয়া সিল ব্যবহারের রড দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ না করা এবং রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে তার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার এগিয়ে আসা প্রয়োজন। ভুয়া সিল 500W (TMT), 400W (60G) গ্রেড মেরে রড বাজারজাত বন্ধের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গত ৬ জুন ২০১৬ সাক্ষাৎ করলে তিনি আইজিকে নির্দেশনা দেন, এরই ধারাবাহিকতায় আমরা আইজির সঙ্গে গত ১৯ জুন দেখা করলে তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন। পরে এ ব্যাপারে আমরা র্যাবের ডিজির সঙ্গে গত ৩০ অক্টোবর ২০১৬ ও বর্তমান বিএসটিআই ডিজির সঙ্গে ২৭ নভেম্বর সাক্ষাতে ভুয়া সিল 500W (TMT), 400W (60G) গ্রেড মেরে রড বাজারজাত বন্ধ করার দাবি জানালে তারা র্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অসাধু রি-রোলিং মিলগুলোতে অভিযান পরিচালনা করবেন বলে আমাদেরকে আশ্বস্ত করেন। এ বিষয়ে বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ গত ১ ডিসেম্বর দু’টি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচার করে কিন্তু ভুয়া সিল 500W (TMT), 400W (60G) গ্রেড মেরে রড বাজারজাত বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় অসাধু দোকানদারের পরামর্শে অসৎ রি-রোলিং মিল মালিক পুরোদমে ভুয়া সিল 500W (TMT), 400W (60G) গ্রেড মেরে রড বাজারজাত করছে। এ অবস্থায় ভুয়া সিল 500W (TMT), 400W (60G) গ্রেড মেরে রড বাজারজাতের বিরুদ্ধে সরকার এখনই যদি আইনানুগ ব্যবস্থা না নেয় তাহলে ভুয়া সিল 500W (TMT), 400W (60G) গ্রেডের রড দিয়ে যেসব স্থাপনা নির্মিত হবে সেসব স্থাপনা রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনা ঘটে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটবে। তাই রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনা এড়াতে এবং দেশের সব স্থাপনা সুরক্ষার স্বার্থে ভুয়া গ্রেড সিল মেরে রড বাজারজাত বন্ধের জন্য অসৎ রি-রোলিং মিল ও দোকানগুলোতে র্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে বিএসটিআই কর্তৃক মোবাইল কোর্টের অভিযান পরিচালনা করা ও অব্যাহত রাখা।
এনবিআরের কাছে আপনারা কী চান?
Ñ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিলেট ও ইংগট আমদানিপর্যায়ে শুল্ক বৃদ্ধির জন্য আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রস্তাব দাখিল করি। সরকার আমাদের প্রস্তাবের শুধু বিলেট আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বৃদ্ধি করে কিন্তু ইংগট আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়ায়নি। এমনকি বাজেট-পরবর্তী বিভিন্ন ফোরামে আমরা দাবি জানিয়ে এলেও ইংগট আমদানির ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত শুল্ক বাড়ানো হয়নি। ফলে সাফটা চুক্তির সুযোগে শূন্য শুল্কে ভারত থেকে লাখ লাখ টন নিম্নমানের ইংগট আমদানি হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারের কাছে আমাদের দাবি স্থানীয় স্টিল শিল্পগুলোকে বাঁচানোর স্বার্থে অবিলম্বে বিলেট আমদানির মতো ইংগট আমদানির ক্ষেত্রেও ১৫% ভ্যাট, ২০% আরডি এবং ট্যারিফ ভ্যালু ৩৮০ ইউএস ডলার প্রতি টনে নির্ধারণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে এসআরও জারি করা।
চলতি বাজেটে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে? গত বাজেটে কী শুল্ক ছিল?
Ñবর্তমান জাতীয় বাজেটে ইংগট আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বৃদ্ধি না হওয়ায় সাফটা চুক্তির আওতায় ইংগট আমদানিতে শুল্ক শূন্য। গত ২০১৫-২০১৬ জাতীয় বাজেটে ইংগট ও বিলেট আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক সমপর্যায়ে অর্থাৎ টন প্রতি শুল্ক নির্ধারিত ছিল ৭ হাজার টাকা।
কোন কোন শিল্পে এ কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়? বছরে কত টাকার টার্নওভার হচ্ছে?
Ñইংগট হলো রড তৈরির কাঁচামাল। এটা রি-রোলিং শিল্পে ব্যবহৃত হয়। আজকে রডের দাম টনপ্রতি ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। দেশে রডের বার্ষিক চাহিদা ৫০ লাখ থেকে ৫৫ লাখ টন। বর্তমান হারে বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ২৭ হাজার ৫০০ লাখ কোটি টাকা। তবে দেশীয় রি-রোলিং শিল্পের উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৭০ লাখ টন। আমরা যদি বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিরবচ্ছিন্ন সুবিধা পাই, তাহলে আমাদের শিল্পের উৎপাদনক্ষমতার পুরোটাই কাজে লাগাতে পারব। দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রফতানি করতে সক্ষম হবো।
আপনাদের পক্ষে পদক্ষেপ নিতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে কিভাবে যোগাযোগ করেছেন?
Ñ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, এফবিসিসিআই, ট্যারিফ কমিশনসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে এ ব্যাপারে পত্র পাঠিয়েছি। এমনকি আমি ব্যক্তিগতভাবে কাস্টমস মেম্বার সাহেবের সঙ্গে দেখা করে দাবি তুলে ধরি। মেম্বার সাহেব আমাকে আশ্বস্ত করলেও অজানা কারণে ইংগট আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়ানো হয়নি। আমাদের দাবি যৌক্তিক মনে করে তা বাস্তবায়নের জন্য এফবিসিসিআই গত ২৬ অক্টোবর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে সুপারিশ দিলেও অদ্যাবধি তা আমলে নেয়নি এনবিআর। এ ব্যাপারে কাস্টমস মেম্বার সাহেব গত ২৩ নভেম্বর একটি সভা ডাকলেও পরে তা স্থগিত করে এবং গত ২৬ ডিসেম্বর আমাদেরকে নিয়ে এনবিআরে একটি সভা করেন এবং সভায় আমাদেরকে আশ্বস্ত করেন যে, অচিরেই এ বিষয়ে ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রজ্ঞাপন জারি করবেন।
বর্তমান পদক্ষেপে স্থানীয় শিল্প কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
Ñবর্তমান বাজেটের আলোকে বিলেট আমদানিতে প্রায় ১২ হাজার টাকা শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। তেমনি ইংগট আমদানির ক্ষেত্রেও ১২ হাজার টাকা শুল্ক পরিশোধ করার কথা। কারণ বিলেট ও ইংগট দুটোই রড তৈরির কাঁচামাল। ইংগট আমদানিকারকেরা প্রতি টনে ১২ হাজার টাকা ছাড় পাচ্ছে কিন্তু স্থানীয় বিলেট ও ইংগট উৎপাদনকারী শিল্পগুলো তা পাচ্ছে না। অথচ একই বাজারে আমরা রড বিক্রি করি ফলে স্থানীয় স্টিল শিল্পগুলো অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছে। উল্লেখ্য, ইংগটের মান বিলেটের চেয়ে ভালো হয় না। বিশেষ করে ভারতে ইংগট তৈরি হয় স্পঞ্জ আয়রন দিয়ে বা ওর থেকে। এর মধ্যে ফসফরাস, সালফার কন্ট্রোল করা সম্ভব হয় না, তাতে ফসফরাস, সালফার বেশি থাকে। এ জন্য ইংগটের স্ট্রেন্থ সঠিক মাত্রায় হয় না। নিম্নমানের ইংগটে তৈরি রডও নিম্নমানের হয়। ফলে এসব রড দিয়ে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ে যেসব স্থাপনা নির্মাণ করা হবে তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। এমনিতেই আমাদের দেশ ভূমিকম্পপ্রবণ, তাই স্থাপনাগুলো ঝুঁকি থেকে রক্ষাকল্পে এবং দেশীয় বিলেট ও ইংগট উৎপাদনকারী স্টিল শিল্পগুলোকে অসম প্রতিযোগিতার কবল থেকে মুক্ত করতে এবং শিল্পগুলোকে বাঁচানোর জন্য বিলেট আমদানির মতো ইংগট আমদানির ওপর ১৫% ভ্যাট, ২০% আরডি এবং ট্যারিফ ভ্যালু ৩৮০ ইউএস ডলার প্রতি মেট্রিক টনে নির্ধারণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে এসআরও জারি করা।
ধন্যবাদ।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫