ড. ইউনূস ও ২২ বিশিষ্টজনের খোলা চিঠি

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন প্রফেসর ইউনূসসহ আরো ২২ জন নোবেল বিজয়ী ও বিশ্বের বিশিষ্ট ব্যক্তি।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি বরাবর এক খোলা চিঠিতে তারা এই দাবির কথা জানান।

নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে বলা হয়, জাতিগত নিধন ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধতূল্য একটি মানবীয় বিপর্যয় মিয়ানমারে বিস্তৃতি লাভ করছে। গত দুই মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক রাখাইন প্রদেশে যে সামরিক আগ্রাসন চালানো হচ্ছে তাতে শত শত রোহিঙ্গা নাগরিক হত্যার শিকার হচ্ছে। ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ এর ফলে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে, নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, বেসামরিক মানুষদের নির্বিচারে আটক করা হচ্ছে, শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে। আরো ভয়ের ব্যাপার, মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলোকে সেখানে প্রবেশ করতে বাধা দেয়া হচ্ছে না, যার ফলে আগে থেকেই চরম দরিদ্র এই এলাকাটিতে মানবীয় সংকট ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার মানুষ নিকটবর্তী বাংলাদেশে পালিয়ে যাচ্ছে যেখান থেকে তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। কোনো কোনো আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ঘটনাটিকে গণহত্যাতুল্য বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিকট অতীতে রুয়ান্ডা, দারফুর, বসনিয়া ও কসোভোয় সংগঠিত গণহত্যাগুলোর সব বৈশিষ্ট্য এখানে দৃশ্যমান।

চিঠিতে স্বাক্ষর করেন- নোবেল শান্তি পুরষ্কার জয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, হোসে রামোস-হরতা, আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু, মেইরিড মাগুইর, বেটি উইলিয়াম্স, অসকার অ্যারিয়াস, জোডি উইলিয়াম্স, শিরিন এবাদী, তাওয়াক্কল কারমান, লেইমাহ বোয়ি, মালালা ইউসাফজাই, স্যার রিচার্ড জে. রবার্টস, এলিজাবেথ ব্ল্যাকবার্ন, এমা বোনিনো, এসডিজি সমর্থক ও চলচ্চিত্র কাহিনীকার রিচার্ড কার্টিস, এসডিজি সমর্থক ও লিবীয় নারী অধিকার প্রবক্তা আলা মুরাবিত, দ্য হাফিংটন পোস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক অ্যারিয়ানা হাফিংটন, ব্যবসায়ী নেতা ও সমাজসেবী স্যার রিচার্ড ব্র্যানসন, ব্যবসায়ী নেতা পল পোলম্যান, উদ্যোক্তা ও সমাজসেবী মো. ইব্রাহীম, ব্যবসায়ী নেতা ও সমাজসেবী জোকেন জাইট্জ, মানবাধিকার কর্মী কেরী কেনেডী ও ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী রোমানো প্রদি।

চিঠিতে আরো বলা হয়, জাতিসংঘ রিফিউজি হাইকমিশনের বাংলাদেশ কার্যালয় প্রধান জন ম্যাককিসিক মিয়ানমার সরকারকে জাতিগত নিধন পরিচালনার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংহি লী রাখাইন রাজ্যে প্রবেশের উপর বিধিনিষেধ আরোপকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিযোগ করেছেন।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা বলেন, রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর একটি, যারা দশকের পর দশক পরিকল্পিত প্রান্তিকীকরণ ও অমানবিক আচরণের শিকার। ১৯৮২ সালে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয় ও তাদের রাষ্ট্রহীন করে ফেলা হয়, যদিও তারা বংশ পরম্পরায় মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে। তাদের চলাচল, বিবাহ, শিক্ষা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। মিয়ানমারের সরকার, সামরিক বাহিনী ও মিয়ানমার সমাজের অনেকেই এই দাবি করেন বটে, কিন্তু বাংলাদেশ তাদেরকে তার দেশের নাগরিক বলে কোনোদিন স্বীকার করেনি। তাদের দুর্দশা নাটকীয়ভাবে ঘনীভূত হয় ২০১২ সালে, যখন দু’টি ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনায় লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এবং পাশাপাশি অবস্থিত মুসলিম ও বৌদ্ধ রাখাইনদের বর্ণবৈষম্যের ভিত্তিতে আলাদা করে ফেলা হয়। এরপর থেকে তারা চরম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিনাদিপাত করে আসছে।

তারা বলেন, সর্বশেষ সংকটটির সৃষ্টি হয় ৯ অক্টোবর মিয়ানমার বর্ডার পুলিশের উপর আক্রমণের একটি ঘটনায়, যাতে মিয়ানমার বর্ডার পুলিশের নয়জন সদস্য নিহত হন। এই আক্রমণ কারা, কিভাবে ও কেন করলো সে সত্য এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি, তবে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপকে এজন্য দায়ী করছে। এই অভিযোগ যদি সত্য হয়েও থাকে, এতে সামরিক বাহিনীর প্রতিক্রিয়া একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্য সন্দেহভাজনদের আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচারের মুখোমুখি করা এক জিনিষ, আর হাজার হাজার নিরীহ বেসামরিক নাগরিকের উপর হেলিকপ্টার গানশিপ দিয়ে গুলিবর্ষণ করা, নারীদের ধর্ষণ করা এবং শিশুদের আগুনে নিক্ষেপ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিষ।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কাছে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে একজন রোহিঙ্গার ও প্রত্যক্ষদর্শীর উদ্ধৃতি দিয়ে সেখানকার অমানবিক অবস্থা চিঠিতে তুলে ধরা হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী নারী অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে জানান, তখন সবেমাত্র ভোর হয়েছে। সামরিক লোকজন আমাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। কয়েকজন ঘরে ঢোকে এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে বের করে আনে। তারা আমার দুই ছেলেকে বেঁধে ফেলে। তাদের পিঠমোড়া করে বাঁধা হয়, এরপর বেধড়ক পেটানো হয়। মিলিটারিরা তাদের বুকে লাথি মারে। আমার সামনেই এটা ঘটে, আমি চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। আমি কাঁদতে থাকলে তারা (মিলিটারি) আমার দিকে বন্দুক তাক করে। আমার অন্য সন্তানরা মিলিটারিদের কাছে হাতজোড় করে তাদেরকে না পেটাতে অনুরোধ করে। তাদের নিয়ে যাবার আগে প্রায় ৩০ মিনিট এভাবে মারধোর করা হয়। তিনি তাঁর ছেলেদের এরপর আর দেখেননি।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, অং সান সু’চির কাছে বারবার আবেদনের পরও তিনি রোহিঙ্গাদের পূর্ণ ও সম-নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় আমরা হতাশ। সু’চি মিয়ানমারের নেত্রী এবং দেশটিকে সাহস, মানবিকতা ও সমবেদনার সাথে পরিচালনা করার দায়িত্ব তারই।

মিয়ানমার সরকারকে মানবিক সহায়তার উপর সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সম্ভাব্য সব উদ্যোগ নিতে চিঠিতে জাতিসংঘের নিকট অনুরোধ জানানো হয়, যাতে মানুষ জরুরি সহায়তা পেতে পারে।

তারা বলেন, সাংবাদিক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদেরও সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেয়া উচিত এবং বর্তমান পরিস্থিতি বিষয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে একটি নিরপক্ষে, আন্তর্জাতিক তদন্ত পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। একই সাথে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি এজেন্ডা হিসেবে সংকটটিকে উপস্থাপনের জন্য তারা নিরাপত্তা পরিষদকে বিশেষভাবে আহ্বান জানান। জাতিসংঘ মহাসচিবকে জরুরি ভিত্তিতে সামনের সপ্তাহগুলোতে মিয়ানমার পরিদর্শন করতে অনুরোধ করেন।

তারা বলেন, বর্তমান মহাসচিবের পক্ষে এটা সম্ভব হলে আমরা তাকেই সেখানে যেতে অনুরোধ করবো, অন্যথায় নতুন মহাসচিবকে জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেবার পরই এ বিষয়টিকে তার কর্ম-তালিকায় অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার অনুরোধ জানাবো।

চিঠিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক কমিউনিটিকেও এখন এ বিষয়ে সম্মিলিতভাবে আরো বেশি সোচ্চার হতে হবে। রুয়ান্ডার পর বিশ্ব নেতারা বলেছিলেন, ‘আর কখনো নয়’। আমরা এখনই ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে মানুষগুলো খেয়ে না মরলেও অনাহারে মারা যাবে এবং আমরা মানবতাবিরোধী এসব অপরাধের নিরব দর্শক হয়ে আরো একবার ‘আর কখনো নয়’ বলার জন্য বিলম্বে হাত কচলাতে থাকবো।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: Cannot modify header information - headers already sent by (output started at /home/dailynayadiganta/public_html/application/controllers/Page.php:54)

Filename: core/Output.php

Line Number: 879

Backtrace:

File: /home/dailynayadiganta/public_html/index.php
Line: 315
Function: require_once

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: Cannot modify header information - headers already sent by (output started at /home/dailynayadiganta/public_html/application/controllers/Page.php:54)

Filename: core/Output.php

Line Number: 880

Backtrace:

File: /home/dailynayadiganta/public_html/index.php
Line: 315
Function: require_once

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: Cannot modify header information - headers already sent by (output started at /home/dailynayadiganta/public_html/application/controllers/Page.php:54)

Filename: core/Output.php

Line Number: 881

Backtrace:

File: /home/dailynayadiganta/public_html/index.php
Line: 315
Function: require_once

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: Cannot modify header information - headers already sent by (output started at /home/dailynayadiganta/public_html/application/controllers/Page.php:54)

Filename: core/Output.php

Line Number: 882

Backtrace:

File: /home/dailynayadiganta/public_html/index.php
Line: 315
Function: require_once