ঢাকা, শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭

আলোচনা

সাহিত্যের ২০১৬

ড. ফজলুল হক সৈকত

২৯ ডিসেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৭:০১


প্রিন্ট

বিশ্বসাহিত্য একটা সমুদ্র। এই সমুদ্রে পরিভ্রমণ করতে চাইলে ভেসে পড়া ছাড়া কোনো গতি নেই। আর ভেসে যাওয়া মানেই ফিরে না আসা। সারা বছরের সাহিত্যে চোখ রাখার অর্থও অনেকটা তেমনই। সাহিত্যের সাগরে হারিয়ে যাওয়ার আনন্দকেও আমরা মাঝেমধ্যে খুঁজে বেড়াতে পারি। সাহিত্যের ’১৬ লেখাটা শুরু করা যেতে পারে ‘নুস্টাড আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬’ দিয়ে। ইউরোপে এটি বেশ নামকরা পুরস্কার, প্রায় নোবেলের সমতুল্যও বলা হয় নুস্টাডকে। গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, অক্তাভিও পাজ, টমাস ট্রানসট্রোমার নুস্টাড লরেটদের অনেকেই আগে কিংবা পরে নোবেল জিতেছেন। ১৯৭০ সাল থেকে দুই বছর পরপর এ পুরস্কার দেয় আমেরিকার ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৬ সালের ২৪তম খেতাবটি জিতলেন প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়ায় জন্ম নেয়া নেদারল্যান্ড নিবাসী নারী ঔপন্যাসিক দুবরাভকা ইউগরেসেক। সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম মূল্যয়ন করে এ পুরস্কার প্রদান করে থাকে কর্তৃপক্ষ। ইউগরেসেকের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস স্টেফি স্পেক ইন দ্য জস অফ লাইফ (১৯৮২)।
ফ্যান্টাসি সাহিত্য রচয়িতা এবং হ্যারি পটার সিরিজের স্রষ্টা জে কে রাউলিং- হ্যারি পটার সিরিজ লিখে তিনি যতটা খ্যাত, তেমনি বিশেষ কোনো ঘটনায় সময়োপযোগী বক্তব্য এবং নারী অধিকার নিয়ে তিনি বেশ সরব। সৃষ্টিকর্মের পাশাপাশি ব্যক্তি হিসেবে তার এই চেতনার জন্য তিনি অর্জন করলেন ২০১৬ সালের পেন অ্যালেন ফাউন্ডেশন প্রবর্তিত ‘পেন অ্যাওয়ার্ড’। নারী স্বাধীনতা ও সমতা এবং সেন্সরশিপের বিরোধীতাকারীদের একজন হিসেবে তাকে এই সম্মান প্রদান করা হয়েছে বলে জানানো হয় ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে। তার আগে লেখক হিসেবে এই সম্মাননা পেয়েছেন টনি মরিসন ও সালমান রুশদি। বেস্ট সেলার হ্যারি পটার সিরিজের ¯্রষ্টা রাউলিং এই পুরস্কার প্রাপ্তিতে বলেন- ‘ফ্রি স্পিস অর্গানাইজেশন পেন আমাকে তাদের পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে জেনে আমি আনন্দিত। এই প্রাপ্তি আমাকে আমার কাজের প্রতি আরো বেশি আন্তরিক এবং যত্নশীল করে তুলবে।’ ক্রাইম রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘ডায়মন্ড ড্যাগার ২০১৬’ পেলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ রহস্য-লেখক পিটার জেমস। পুলিশি রহস্য সাহিত্যের অন্যতম প্রধান এই সাহিত্যিকের আজীবন কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হলো। ক্রাইম রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, পিটার জেমসের সৃষ্টি তার সময়কে অনেক এগিয়ে দিয়েছে। তাকে ‘মাস্টার স্টোরিটেলার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় সংগঠনটির পক্ষ থেকে। গোয়েন্দা গল্প লেখার পাশাপাশি পুলিশি কেসগুলোতে সহযোগিতার মাধ্যমে পিটার জেমস ইতোমধ্যে বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। সাহিত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট রচনায়ও বিখ্যাত এই রহস্য-সাহিত্য¯্রষ্টা। ২৬টি চলচ্চিত্রে কাজও করেছেন তিনি। ধর্ষণবিরোধী প্রচারণার অংশ হিসেবে তার গল্পে নির্মিত একটি শর্টফিল্ম ২০১২ সালে ব্রাইটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সম্মাননা লাভ করে। সম্মানজনক আন্তর্জাতিক ‘ম্যান বুকার পুরস্কার-২০১৬’ পেয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার লেখক হ্যান ক্যাং। দ্য ভেজিটেরিয়ান উপন্যাসের জন্য তাকে এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। উপন্যাসটি মাংস আহার ছেড়ে দেয়া এক নারীকে নিয়ে লেখা। কোরিয়ান ভাষায় লেখা উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ব্রিটেনের দেবরাহ স্মিথ। তিনি ২০১০ সাল থেকে কোরীয় ভাষা শেখা শুরু করেছিলেন। উপন্যাসটির হ্যান ক্যাং ও ব্রিটিশ অনুবাদক স্মিথ যৌথভাবে ৫০ হাজার পাউন্ড অর্থ পুরস্কার পাবেন। বিচারক প্যানেলের চেয়ারম্যান বয়েড টকিন বলেন- ‘হ্যাং ক্যাংয়ের সাহিত্য খাঁটি এবং শক্তিশালী, যা ভোলার মতো নয়।’ দেবরাহ স্মিথ বলেন- ‘কোরিয়ান সংস্কৃতির সাথে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমি চিন্তাও করিনি একজন কোরিয়ান মানুষের সাথে আমার সাক্ষাৎ হবে। পড়া এবং লেখার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে আমি ¯্রফে আনুবাদক হতে চেয়েছিলাম, ভাষা শিখতে চেয়েছিলাম।’ লন্ডনের কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ে শ্যারন দোদুয়া ওতু পড়াশোনার জন্য জার্মানির একটি প্রাদেশিক শহরের এসেছিলেন ২৪ বছর আগে। সম্প্রতি জার্মান ভাষায় সাহিত্য রচনা করে লাভ করেছেন ‘ইংবার্গ বাখম্যান’ পুরস্কার। তাঁর প্রথম ও একমাত্র ছোটগল্প ‘হার গোট্রুপ সিটস ডাউন’ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বিজ্ঞানী হেলমুট গোট্রুপকে নিয়ে লেখা। ২৫ হাজার ইউরো অর্থমূল্যের এই পুরস্কার পাওয়ার পর জার্মানির বড় বড় প্রকাশনা সংস্থা থেকে লেখা ছাপানোর বেশ কয়েকটি প্রস্তাব পেয়েছেন ঘানার বংশোদ্ভূত ওতু। গল্পের বইয়ের আগে তাঁর দু’টি উপন্যাসও প্রকাশিত হয়। একটি বাক্যে লেখা উপন্যাস জিতে নিয়েছে এ বছরের ‘গোল্ডস্মিথস প্রাইজ’। উপন্যাসটির নাম সোলার বোনস। এর রচয়িতা আইরিশ লেখক মাইক ম্যাককরম্যাক। ২০০৮ সালের নভেম্বরের অল সোলস ডে-তে পশ্চিম আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি মায়োর মার্কাস কনওয়ে নামের মাঝবয়সী এক ইঞ্জিনিয়ারের মনের ভেতরে প্রবাহিত এক অতীত ইতিহাসের বয়ান এই উপন্যাস। কনওয়ে সেই অতীত সময়েরই মানুষ। তাঁকে গভীর ধ্যানের মাধ্যমে ডেকে আনা হয়েছে। তিনি একে একে বলে যাচ্ছেন, কিভাবে একটি জনগোষ্ঠী এক বৃহৎ উদ্দেশ্য ও নৈতিক স্বার্থের জন্য নিদারুণ ক্ষুধা ও দারিদ্র্য সহ্য করে গেছে। গোল্ডস্মিথস প্রাইজের চার বছরের ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো আইরিশ কোনো লেখক এটি জয় করলেন। উপন্যাস ছাড়াও ছোটগল্পের দু’টি বই রয়েছে ম্যাককরম্যাকের। গোল্ডস্মিথস পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ হাজার পাউন্ড। উঁচুমানের সাহিত্য রচনার স্বীকৃতিস্বরূপ পুলিৎজারসহ বহু পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন ঔপন্যাসিক ও প্রবন্ধকার মেরিলিন রবিনসন। তাঁর উপন্যাস ও প্রবন্ধগুলোতে শান্তি, সামাজিক বিচার ও বৈশ্বিক বোঝাপড়ার বিষয়গুলো সযতেœ লালিত হওয়ার স্বীকৃতি মিলল এবার ‘ডেটন শান্তি পুরস্কার’-এ। বাবার বিষাদগ্রস্ততা দূর করতে বনের পশুপাখিদের সাহায্য চায় এক কিশোর- এমন কাহিনির একটি উপন্যাস জিতে নিয়েছে এ বছরের শিশু সাহিত্যের ‘ব্রানফোর্ড বোস অ্যাওয়ার্ড’। ওয়েলসের লেখক হোরাসিও ক্লেয়ারের লেখা উপন্যাসটির নাম অব্রে অ্যান্ড দ্য টেরিবল ইয়ুথ। ২০০০ সালে প্রবর্তিত এ পুরস্কারটি প্রতি বছর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসের ওপর দেয়া হয়। এ বছর ‘কেইন সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা লিদুদুমাঙ্গিলানি। ‘দ্য ট্রানজিট অব ভেনাস’ উপন্যাসখ্যাত মার্কিন লেখক শিরলি হ্যাজার্ড মারা গেছেন। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ওই বইটি প্রকাশের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল বুক ক্রিটিশ সার্কেল অ্যাওয়ার্ড’ জিতে নেয়। দুবার বুকারজয়ী লেখক হিলারি ম্যানটেল ও কবি ল্যাভিনিয়া গ্রিনলয়ের মতো লেখককে হারিয়ে এ বছরের ১৫ হাজার পাউন্ডের ‘বিবিসি শর্ট স্টোরি প্রাইজ’ লাভ করেছেন নবীন লেখক কেজে অর। অরের পুরস্কারজয়ী গল্পটির নাম ‘ডিজ-অ্যাপিয়ারেন্সেস’। গল্পের বিষয় বুয়েনস এইরেসের এক অবসরপ্রাপ্ত প্লাস্টিক সার্জনের সঙ্গে স্থানীয় একটি ক্যাফের এক পরিচারিকার মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্ক। লন্ডনে জন্ম নেয়া অরের প্রথম ছোটগল্পের বই লাইট বক্স চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। ‘ডিজ-অ্যাপিয়ারেন্সেস’ এই বইয়েরই গল্প। ভিয়েতনামি বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক ভিয়েত থান নগুয়েনের পুলিৎজারজয়ী উপন্যাস দ্য সিমপ্যাথাইজার পেয়েছে এ বছরের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ওপর লেখা এ উপন্যাস ফিকশন ক্যাটাগরিতে ‘ডেটন শান্তি পুরস্কার’ পেয়েছে। বসনিয়া যুদ্ধ অবসানে স্বাক্ষরিত ডেটন চুক্তির স্মরণে এ পুরস্কার দেয়া হয়। ‘শান্তি, সামাজিক বিচার ও বৈশ্বিক বোঝাপড়া’ সমুন্নত করতে সাহিত্যের অমিত শক্তির স্বীকৃতি মেলে এই পুরস্কারের মধ্য দিয়ে। ’১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন সঙ্গীতশিল্পী বব ডিলান। সঙ্গীতে নোবেল নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু সঙ্গীত যে সাহিত্যেও অংশ বা শাখা, তা বোধহয় নোবেল কমিটি আরেকবার প্রমাণ করল। গত বছর সাংবাদিকতাকে সাহিত্যে নোবেলের কাতারে এনে নোবেল-ভুবনে যুক্ত করা হয়েছে নতুন মাত্রা। তবে, নানান সংশয় আর বিভ্রমে পড়ে ডিলান শেষ পর্যন্ত নোবেল আনতে কিংবা নোবেল ভাষণ দিতে যাননি সুইডিশ একাডেমিতে। তারপরও এ কথা ঠিক যে, বব ডিলানের সঙ্গীত সারা দুনিয়ার মানুষের মনে বিশেষ বিশেষ চেতনা বিস্তার করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত হলো ‘৪০তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা’। বইমেলার উদ্বোধন করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বলিভিয়ার নারী সাহিত্যিক ম্যাগেলা বাওদোইন। মেলা উদ্বোধন শেষে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন- ‘কলকাতা বইমেলার ঐতিহ্যটাই অন্যরকম। অনেক লেখক-লেখিকা অপেক্ষা করে থাকেন, কবে বইমেলা আসবে এবং তাদের সারা বছরের একটা লেখা এই বইমেলায় উদ্বোধন হবে। আমি মনে করি, বইয়ের কোনো বিকল্প হয় না। যতই আমরা ইন্টারনেট দেখি না কেন, হাতে নিয়ে বই পড়ার যে আনন্দ, কিংবা বইয়ের পাতা খুলে দেখা, বইয়ের পাতার গন্ধ শোঁকা- এগুলো চিরদিন থাকবে। যা কোনো দিন হারিয়ে যাবে না।’ চে গুয়েভারার সংগ্রামের অর্ধশতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে এবারের বইমেলার থিম কান্ট্রি হয়েছে বলিভিয়া। অন্য দিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ সম্মানীয় অথিতির দেশের মর্যাদা পেয়েছে ভিয়েতনাম। জাপানে ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর ‘টোকিও বিগ সাইট’ নামে পরিচিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হলো ২৩তম ‘টোকিও ইন্টারন্যাশনাল বুক ফেয়ার’। জাপান ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাহিত্যের ব্যাপারে পাঠকদের আগ্রহে এ মেলা হয়ে থাকে। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ম্যানিলা বইমেলা, ম্যানিলা লিটারেরি ফেস্টিভ্যাল এবং তাইওয়ান আন্তর্জাতিক বইমেলা আগ্রহী পাঠকের মনোযোগ কেড়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ও দ্বি-ভাষিক সাহিত্য উৎসব ‘সান মিগুয়েল ইন্টারন্যাশনাল রাইটার্স কনফারেন্স অ্যান্ড লিটারেরি ফেস্টিভ্যাল’ এবার ১২ বছরে পা রাখল। ঢাকার বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত ‘লিট ফেস্ট’ প্রতিবারের মতো এবারো জমকালো আয়োজনের ভেতর দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। লন্ডনে বসেছিল ‘ইউরোপিয়ান লিটারেরি ফেস্টিভ্যাল’-এর আসর। বসনিয়া হারজেগোভিনার রাজধানী সারায়েভোতে বসেছিল শীতকালীন বইমেলা। যুদ্ধবিধ্বস্ত বসনিয়া ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং সব উন্নয়ন ও পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতিরও চর্চা চলছে- এই বইমেলা তারই প্রমাণ। তুরস্কে অনুষ্ঠিত হলো ‘ইস্তাম্বুল ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ভেস্টিভাল’- ২০১৬। ‘ইস্তাম্বুল ফাউন্ডেশন ফর কালচার অ্যান্ড আর্টস’ দুই বছর পরপর এই আয়োজন করে থাকে। গুল সোয়েংকা এবং চিনুয়া আচেবের দেশ নাইজেরিয়ায় এবার অনুষ্ঠিত হলো আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বইয়ের মেলা। ‘নাইজেরিয়া ইন্টারন্যাশনাল বুক ফেয়ার’-এর ছিল ১৫তম আয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেস আয়োজন করেছিল ‘ন্যাশনাল বুক ফেস্টিভ্যাল’। এটি ছিল জাতীয় কর্মসূচি। জনপ্রিয় মার্কিন লেখক স্টিফেন কিং এবার বইমেলার উদ্বোধন করেছেন এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম বিষয়ে ভাষণ দিয়েছেন। ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর অ্যারাবিয়ান ফিকশন’ প্রদানের জন্য জর্ডানে বসেছিল লেখকদের কর্মশালা। আবুধাবি-ভিত্তিক সে দেশের পর্যটন ও সংস্কৃতি কর্তৃপক্ষ ব্রিটেনের বুকার প্রাইজ ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এ পুরস্কার প্রদান করে থাকে। মিশরে লুক্সরে শহরে সম্প্রতি বসেছিল অ্যারাবিক পোয়েট্রি ফেন্টিভ্যাল। আয়োজক ছিলেন আরব আমিরাতের শারজাহর শাসক ও সুপ্রিম কাউন্সিলর।
৯২ বছর বয়সে মারা গেলেন উর্দু ভাষার জনপ্রিয় কবি ও কথাশিল্পী ইনতিজার হুসাইন। ইনতিজার জন্মসূত্রে পাকিস্তানি নন, দাঙ্গার সময়ে অনেকের মতোই ভারত ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল তাঁকে। ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন উর্দু ভাষার সেরা এক সাহিত্যিক হিসেবে। এ ছাড়া পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন ইংরেজিতে। দেশ বিভাগের কষ্ট প্রায়ই ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়। তিনি প্রথম পাকিস্তানি এবং উর্দু ভাষার লেখক, যিনি কোনো আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৩ সালের ‘ম্যান বুকার পুরস্কার’-এর জন্য মনোনীত চূড়ান্ত ১০ জনের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি। তাঁর কিছু কাজ উর্দু থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তরিত হয়েছে। তিনি নিজেও নিয়মিত অনুবাদের কাজ করেছেন। ১৯২৩ সালের ৭ ডিসেম্বর ভারতের বুলন্দ শহরে জন্ম তাঁর। ইনতিজার হুসাইন সেসব উর্দু সাহিত্যিকের একজন, যিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশে যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল, নিজের লেখার মাধ্যমে সে সবের প্রতিবাদ করেছিলেন। ‘দ্য নেম অব দ্য রোজ’ খ্যাত ইতালির ঔপন্যাসিক ও দার্শনিক উমবের্তো ইকো ৮৪ বছর বয়সে মারা গেছেন। উমবের্তো ১৯৩২ সালের ৫ জানুয়ারি ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় শহর আলেসান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার ইচ্ছে ছিল আইনশাস্ত্রে পড়াশুনা করার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য তিনি বেছে নেন মধ্যযুগের দর্শন ও সাহিত্যকে। ‘চিহ্নবিজ্ঞান’-এ ইকো নতুন ধ্যান-ধারণা যুক্ত করেন। ১৯৭০ সালে তিনি বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘চিহ্নশাস্ত্র’-এর অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ১৯৮০ সালে তার লেখা উপন্যাস ‘দ্য নেম অব দ্য রোজ’ এ পর্যন্ত ৪৩টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। গত বছর গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন- ‘পাঠকরা কি চায় তা আমি জানি না। কিন্তু আমি মনে করি, পাঠকরা যা প্রত্যাশা করে না একজন লেখকের তাই লেখা উচিত। পাঠকরা কি চায় তা জিজ্ঞেস না করে উচিত তাদেরকে বদলে দেয়া।’ ফ্রান্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় সমকালীন কবি ইভেস বোনেফয় মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। তার লেখা শতাধিক বই ৩০টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয়ের ব্যাপারে তার নামটি প্রায়ই উচ্চারিত হতো। শেকসপিয়ারের নাটক অনুবাদের জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। বোনেফয় ১৯২৩ সালে ফ্রান্সের মধ্যাঞ্চলীয় টুর্সে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা রেলওয়েতে কাজ করতেন এবং মা একজন স্কুলশিক্ষিকা ছিলেন। শক্তিশালী ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক ও মানবাধিকার আন্দোলন কর্মী মহাশ্বেতা দেবী আর নেই। ‘হাজার চুরাশির মা’ খ্যাত এ লেখক অনেকদিন ধরেই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তিনি একটি মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে ১৪ জানুয়ারি, ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মনীশ ঘটক কল্লোল যুগের প্রখ্যাত সাহিত্যিক এবং কাকা বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটক। মহাশ্বেতা কর্মজীবনের প্রথমদিকে সাংবাদিক এবং লেখিকা হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীকালে বিখ্যাত হন মূলত পশ্চিমবাংলার উপজাতি এবং নারীদের ওপর কাজের জন্য। বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে বিভিন্ন উপজাতি এবং মেয়েদের ওপর শোষণ ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিককালে মহাশ্বেতা দেবী পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিল্পনীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। সরকার কর্তৃক বিপুল পরিমাণে কৃষিজমি অধিগ্রহণ এবং স্বল্পমূল্যে তা শিল্পপতিদের কাছে বিতরণের নীতির তিনি কড়া সমালোচক। মহাশ্বেতা দেবী শুধু প্রতিবাদী লেখক ছিলেন তাই নয়, তিনি সবসময় প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমনকি জীবনের শেষ বছরগুলোতেও ছিলেন প্রান্তিক মানুষদের পাশে। চলে গেলেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয়ী হাঙ্গেরিয়ান লেখক ইমরে কারতেজ। ২০০২ সালে নোবেল পান তিনি। হাঙ্গেরিয়ান সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী প্রথম লেখক কারতেজ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। নোবেল পুরস্কারে কারতেজকে বিবেচনা করা প্রসঙ্গে বিচারকেরা বলেছেন- তার লেখায় মানুষ কত নির্মম হতে পারে, সেই ‘চূড়ান্ত সত্যই’ চিত্রায়িত হয়েছে। তার প্রথম উপন্যাস ফেটলেস-এ বর্ণিতে হয়েছে পোল্যান্ডের জার্মানির নাৎসি বাহিনীর বন্দিশিবির আউশভিতজের কাহিনি। ওই শিবিরটিতে ১০ লাখেরও বেশি ইহুদি এবং অন্যান্যদের হত্যা করা হয়। বন্দী শিবিরে কিভাবে একটি বালক টিকে থাকে তাই উঠে এসেছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিনির্মাণ হিসেবে। মারা গেছেন বাংলাদেশের প্রবীণ কবি কায়সুল হক। কায়সুল হকের জন্ম ১৯৩৩ সালের ২৯ মার্চ ভারতের পশ্চিমবাংলার মালদায়। একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও মুক্তিযোদ্ধা রফিক আজাদকেও আমরা হারিয়েছি ২০১৬ সালে। হারিয়েছি পঞ্চাশের বিশিষ্ট কবি শহীদ কাদরীকে। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আমাদেরকে ছেড়ে গেছেন। তাঁর সাহিত্যের আনন্দ ও আলোড়ন বাঙালিকে বেশ কিছুদিন প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত রেখেছে। বিশেষ করে তাঁর কাব্যনাট্য আমাদের প্রেরণা হয়ে থাকবে। যদিও পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কিংবা নূরলদীনের সারাজীবন প্রভৃতি গ্রন্থে কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণা কাব্যের নাট্যধর্মিতার প্রভাব রয়েছে, তবু সৈয়দ হক নতুন ধারা ও ধারণা প্রকাশে নিজস্বতার সাক্ষর রেখেছেন। আর পথে-প্রান্তরে, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতির ময়দানে হক ছিলেন সর্বদা সরব। আমরা তাঁর সেই সরবতাকে হয়তো আরো কিছুকাল অনুভব করব।
চাওয়া-পাওয়ার কখনো কোনো সমাপ্তি হয় না। সাহিত্যের ভুবনে চাওয়া ও পাওয়ার হিসেব করা কঠিন। তবে, এখানে বড় করে দেখা যায়- উপলব্ধির গাঢ়তা আর নতুনের সন্ধান। কী পেয়েছি আর কী হারিয়েছি- এই প্রশ্নমালার ভেতরে ঘুরপাক খেয়েও শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে আমরা পার করতে পারি অশেষ সময়। সাহিত্যের ’১৬ লেখাটা বোধকরি এখানটায় শেষ করতে পারি, সাহিত্যের সাত-’১৭-র দিকে চোখ মেলে- নতুনের আবাহনে পুরাতনকে বিদায় জানানোর চিরপুরাতন রীতিতে আস্থা রেখে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫