ঢাকা, শনিবার,২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

আলোচনা

অদ্বৈত মল্লবর্মণ : তিতাস একটি নদীর নাম

রবিউল ইসলাম

২৯ ডিসেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৬:৫৬


প্রিন্ট

তিতাস একটি নদীর নাম, তার কূলজোড়া জল।
বুক ভরা ঢেউ, প্রাণ ভরা উচ্ছ্বাস
স্বপ্নের সন্দেশে বহিয়া যায়।
ভোরের হাওয়া তার তন্দ্রা ভাঙে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়
রাতের চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়ে ঘুম পাড়াইতে বসে কিন্তু পারে না।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের কালজয়ী উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম এই কয়টি বাক্য নিয়ে শুরু হয়েছে।
ব্র্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার গোকর্ন গ্রামে এক দরিদ্র জেলে পরিবারে তার জন্ম। ছোটবেলায় পিতা-মাতাকে হারিয়ে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে অতিবাহিত হয়।
জেলেদের অর্থ সাহায্যেই গ্রামের এক মাইনর স্কুলে পড়াশোনা শুরু হয়। ব্রাক্ষণবাড়িয়া অন্নদা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৩০ সালে এসএসসি পাস করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩৪ সালে কলকাতায় যান। সেখানে মাসিক ত্রিপুরা পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি মোহাম্মাদী, আজাদ, নবযুগ, কৃষক, যুগান্তর প্রভৃতি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। বিখ্যাত দেশ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন। স্কুলে ছাত্র থাকা অবস্থায় অদ্বৈত লিখতে শুরু করেন। তার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, এ সময় সুধীসমাজের প্রশংসা অর্জন করে। তার বিখ্যাত উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম, মাসিক মোহাম্মাদীতে প্রথম ধারাবাহিকভাবে (১৯৪৫-৪৭) প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের জন্য তিনি ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন।
এতে তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও গভীর অন্তরদৃষ্টি দিয়ে জেলেদের সংগ্রামী জীবনকথা বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরেন। উপন্যাসের শুরুতেই অদ্বৈত তিতাসের বিবরণ দিচ্ছেন- এইভাবে তার তীরে বড় বড় নগরী বসানো নেই। সওদাগরের নৌকারা পাল তুলিয়া তার বুকে বিচরণ করতে আসে না। ভূগোলের পাতায় তার নাম নেই। পল্লীবাংলার মতোই সাধারণ্যে, স্নিগ্ধতায় ও কল্যাণে ভরা ছিল তিতাস। সে কোনো পাহাড় থেকে ঝর্ণা হয়ে নামেনি। মেশেনি কোনো সাগরে। মেঘনার শাখা নদী সে। মিশেছে মেঘনায়। পল্লী রমণীর কাঁকনের দুই মুখের মধ্যে যেমন একটি ফাঁক থাকে, তিতাসের দুই মুখের মধ্যে রয়েছে তেমনি একটু খানি ফাঁক, কিন্তু কাঁকনের মতোই তার বলয়াকৃতি। মালোদের জীবন ও জীবিকা নিয়েছিল এই নদী। একদিন তার বুকে চর জেগে উঠল। ছিন্ন-বিছিন্ন মালো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল প্রায়।
নদীমাতৃক এই বাংলা। নদীর ভাঙা-গড়ার সঙ্গে, খেয়ালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার জীবন। তাকে রূপসী করেছে, শস্য শ্যামলা করেছে এই নদীমাতৃক। ছেড়ে আসা ভিটের টানেই অদ্বৈত বর্মণ লেখেন তিতাস একটি নদীর নাম।
প্রকৃতির ও মহাজনি শোষণের শিকার গ্রামবাংলার শ্রমজীবী কৃষক-জেলেসহ সাধারণ মানুষ। মহাজন ও মালিক শ্রেণী অন্ত্যজ শ্রেণীর মালোদের তাদের কৃতদাসে পরিণত করার হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ততার বিরুদ্ধে এই অঞ্চলে সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর আমৃত্যু লড়াইয়ের এক মৃত্যুঞ্জয়ী জীবনালেখ্য তিতাস একটি নদীর নাম। অদ্বৈত মল্লবর্মণ মেকি রোমান্টিকতার রঙ দিয়ে নি¤œবর্গের জীবনযাপনকে শিল্পায়িত করার চেষ্টা করেননি, প্রাকৃত জীবনের গভীরে প্রোথিত ছিল মল্লবর্মণের শিল্প-চৈতন্যের শিকড়, স্বপ্নবিলাস বা জীবনবিলাস তাঁর লেখার আচ্ছন্ন হতে পারেনি, প্রতি মুহূর্তে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, যে জীবন জীবনের সর্বসাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে, তারপরও একটা জীবন পেয়েছে। প্রাকৃতিক উপায়ে এটাই এদের কাছে বড় পাওয়া। পশ্চাৎপদ এবং অশিক্ষিত একটা সম্প্রদায়ের কাছে এর চেয়ে আর কি বা চাওয়ার আছে।
অদ্বৈত তার লেখনীর মাধ্যমে তাদের ভেতরের জীবনটাকে আলোর সামনে তুলে ধরেছেন, হয়তো এখানেই তার কৃতিত্ব। সূর্যের আলো ওই চন্দ্রের কিরণ প্রতিটি মাখলুক সমভাবে ভোগ করে। আল্লাহর দেয়া অফুরন্ত নেয়ামত নদী, পানি প্রাকৃতিক সম্পদ সমভাবে ভোগ করার প্রত্যেকের অধিকার আছে। কিন্তু ভুঁইফোড় মহাজন ও জোদ্দারদের শোষণ প্রক্রিয়ায় তিতাসের তীরবর্তী এলাকার জেলে, কৃষক, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছে এবং সারা বছর উপোস-কাপোসে তাদের দিন কাটাতে হয়। অন্য দিকে, মহামারীর মতো মৃত্যু এসে মালোদের নিঃস্ব করে দেয়, সব প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে কোনোরকম টিকে থাকে বাসন্তী আর কিশোরের বৃদ্ধা বাবা রামকেশব, অনন্ত কুমিল্লার মতো শাহরিক পরিবেশে শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠলেও গোকর্ন ঘাটের মালো সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক অবিচল। অনন্তবালা চলে যায় আসামে।
কিন্তু তিতাস পাড়ের জেলে কৃষক যারা ডাঙ্গায় ও জলের প্রকৃত মালিক বংশানুক্রমিক দারিদ্র্য ও বৈরী সমাজব্যবস্থা তাদের এই মালিক সহজে প্রতিষ্ঠিত হতে দেয়। মহাজন জমিদারদের কাছে তারা বংশপরম্পরায় বন্দী হয়ে আছে। তাদের কারোর কাছে নিজেদের জাল নেই। পরের জাল বেয়ে সারাজীবন মাছ ধরে। আবার জমি নেই, পরের জমিতে কামলা খাটে। বলদ ও ষাড়ের মতো এই শ্রমজীবী মানুষ শ্রম বিক্রি করে। অধিকার বা মালিকানা লাভের কোনো সুযোগ নেই। আবার তারা জেলে, শুধু জাল থাকলেও চলে না, নাও থাকতে হয়, প্রয়োজন মতো পুঁজি বিনিয়োগ।

পাঠক জানে, এ উপন্যাসে প্রধান চরিত্র বা কেন্দ্রীয় চরিত্র বলে কোনো চরিত্র নেই, তিতাসকে কেন্দ্র করেই তিতাসের বুকের প্রতিটি চরিত্র আবর্তিত, নদীর সঙ্গে নদীপ্রেমিক বা জনপদের যে সম্পর্ক ফুটে উঠেছে, তা অদ্বৈতের মতো সাহিত্যিকের পক্ষেই সম্ভব।
একদিন মুনিব কালাচাঁদ ব্যাপারীর আদেশে ঝড় থেকে নৌকা বাঁচাতে গিয়ে পানির অতল তলে তলিয়ে যায় মাখন মালো। কাঁদতে কাঁদতে তার স্ত্রীর চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। অর্থনৈতিক অধিকার বঞ্চিত জেলে সম্প্রদায় শেষ পর্যন্ত বৈরী শক্তি ও প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। তিতাস নদীর তীরবর্তী উপকূলীয় অসহায় বাঙালিদের করুণ আত্মস্বর বেজে ওঠে। মালোরা মানুষ হতে পারেনি। তিতাসকে ঘিরে এখানেও আছে গান ও কবিতা। কোথাও একটা কষ্ট, কোথাও একটা যন্ত্রণা কুরে কুরে খেয়েছে। তারা মুখ ফুটে বলতে পারেনি। কৃষক যেমন ভূমিচ্যুত হয়েছে। মালোরা হয়েছে সর্বস্বান্ত। ভূমি দখল হওয়া, নদী দখল হওয়ায় মালোরা বাঁচে কিভাবে? অভাব তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। কষ্ট হাহাকার ছড়ায়। অধিকারহারা মানুষগুলো বাঁচতে চায়। তাদের জীবন হয়েছে বিবর্ণ ও স্তম্ভিত। অদ্বৈত মল্লবর্মণ বলেন, বাস্তব অভিজ্ঞতার ছাঁকুনিতে ফেলে নিপুণ কলমের আঁচড়ে মমতার রস ঢেলে সেই চিত্র চিত্রায়ন করেছেন।
অদ্বৈত উপস্থাপন করেছেন একজন যোগ্য শিল্পীর মতো। আর সময়ের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে আজও বাংলা সাহিত্যে চিরসবুজ একটি নাম অদ্বৈত মল্লবর্মণ এবং তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তিতাস একটি নদীর নাম। অন্তরেতে শোনা যায়, বনমালির মৃত্যুর পর জেলেদের জন্য আব্দুল কাদিরের অন্তগর্ত সুর। শোনা যায় মানবতার অবিনাশী নিঃশ্বাসের ধ্বনি। ধান কাটা শেষ হয়েছে। চরে একটিও ধান গাছ নেই। সেখানে বর্ষার সাঁতার পানি, সেই পানি থৈ থৈ করছে। যতদূর চোখ যায়, পানি আর পানি। দক্ষিণের সুদূর থেকে সেই ঢেউ এসে মালোপাড়ার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এখন আর সেই মালোপাড়া নেই।
শূন্য ভিটাগুলোতে গাছ-গাছড়া হয়েছে। তাতে বাতাস লেগে শোঁ শোঁ শব্দ হয়। এখানে পড়ে যারা মারা গেছে, সেই শব্দই তারা বুঝি নিঃশ্বাস ফেলে। একজন নিপুণ শিল্পীর মতো অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে তাঁর সাহিত্যের ক্যানভাসে সেই চিত্র তুলে ধরেছেন।
কথাশিল্পী অদ্বৈত মল্লবর্মণ মাত্র ৩৭ বছর বয়সে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে কলকাতার নিজ বাড়িতে ১৯৫১ সালে ১৬ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫