ঢাকা, বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭

আলোচনা

জসীমউদ্দীনের রাখালী

সুহৃদ আকবর

২৯ ডিসেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৬:৫২


প্রিন্ট

‘এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে/ তিরিশ বছর ভিজিয়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে/এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ/ পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক’।

জসীমউদ্দীনের ‘রাখালী’ কাব্যগ্রন্থের কবর কবিতার দু’টি লাইন। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করার পূর্বেই তিনি তার বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতাটি রচনা করেন এবং তা ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২১ সালে জসীমউদ্দীন দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। জসীমউদ্দীন যখন বিএ ক্লাসের ছাত্র, তখনই দীনেশচন্দ্র সেন ‘কবর’ কবিতাটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যাট্রিকে পাঠ্য করেন। কবিতাটি পাঠে আমাদের হৃদয় বিগলিত হয়। চোখের কোনায় অশ্রু চিকচিক করে। শরীরজুড়ে আবেগ, অনুভূতি আর শিহরণের একটা ঢেউ খেলে যায়। ‘রাখালী’ কাব্যগ্রন্থটি ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়।
কবি জসীমউদ্দীন। একটি নাম। একটি ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ তিনি ঢাকায় মারা যান। পল্লীকবি নামেই তিনি বাংলা সাহিত্যে পরিচিতি লাভ করেছেন। পল্লী অন্তপ্রাণ জসীমউদ্দীন সর্বমোট ২০টি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। কাব্যগ্রন্থগুলো হলো- রাখালী ১৯২৭, নকশী কাঁথার মাঠ ১৯২৯, বালুচর ১৯৩০, ধানক্ষেত ১৯৩২, সোজনবাদিয়ার ঘাট ১৯৩৩, রঙিলা নায়ের মাঝি ১৯৩৫, হাসু ১৯৩৮, রূপতরণী ১৯৪৬, এক পয়সার বাঁশী ১৯৪৯, পদ্মাপার ১৯৫০, মাটির কান্না ১৯৫১, গাঙের পার ১৯৫৪, মকিনা ১৯৫৯, সুচয়নী ১৯৬১, মা যে জননী কান্দে ১৯৬৩, হলুদবরণী ১৯৬৬, জলের লেখন ১৯৬৯, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে ১৯৭২ ও মাগো জ্বালিয়ে রাখিস আলো ১৯৭৬।
রাখালী কাব্যের কবিতাগুলো হলো- ‘রাখালী’, ‘রাখাল ছেলে’, ‘মেনা শেখ’, ‘বৈরাগী আর বোষ্টমী যায়’, ‘বৈদেশী বন্ধু’, ‘পল্লী জননী’, ‘তরুণ কিশোর’, ‘জেলে গাঙে মাছ ধরিতে যায়’, ‘কবর’ ইত্যাদি। বলা যায় ‘রাখালী’ কাব্যগ্রন্থই কবিকে ভূয়সী প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা দান করেছে। তাই এ কাব্য সম্পর্কে দীনেশচন্দ্রের ব্যাকুল উচ্চারণ : ‘তাঁর কবিতা আমার কাছে শেলী, কীটস, বায়রণ এমনকি ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার চেয়েও ভালো লাগে। তার কবিতায় আম-কাঁঠালের ছায়ায় ঘেরা সেই পল্লীমায়ের শীতল স্পর্শ পাই। মায়ের চেয়ে আপন বলতে আমি আর কাউকে জানিনে। তার পদ্ম-শালুক ফোটা খাল-বিল, ভাটিয়ালি গানে মুখর পদ্মা-যমুনা নদী, অতসী-অপরাজিতা, টগর-চামেলি ফুলের সুবাস-ভরা আঙ্গিনায় মায়ের এই অপরূপ মূর্তি আমি পাই জসীমের কবিতায়।’
কবি তার কবিতার মধ্য দিয়ে পল্লী-বাংলার চিত্র অঙ্কন করেছেন। যে ছবিতে আমাদের পল্লী প্রকৃতির অপরূপ মনলোভা দৃষ্টিনন্দন রূপ, স্ব-মহিমায় ধরা দিয়েছে। যেখানে ‘রাখাল ছেলে’ এবং ‘রাখালী’ আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়েছে। কবি কাহিনীকে কাব্যে প্রকাশ করেছেন। কাহিনীর সঙ্গে ভাবের সংমিশ্রণ ঘটলে কাহিনী আরো জীবন্ত হয়ে ওঠে। ‘রাখালী’ কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকার, প্রেম ও দৈহিক সৌন্দর্য বর্ণনা করা হয়েছে। যেখানে অতিশয়োক্তির কোনোই স্থান নেই। কবি, প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে মিল রেখে এ কাব্যের নায়িকার রূপ বর্ণনা করেছেন। এ যেন আমাদের বাড়ির পাশের কোনো মেয়ে। পল্লী জননীর আদরের দুলালী। তার রূপ যেন চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ে।
গাঙেরি জল ছল্ ছল্ বাহুর বাঁধন সে কি মানে/ কলম ঘিরি উঠছে দুলি গেঁয়ো-বালার রূপের টানে।
এই কবিতায় আমাদের পল্লী কবি বিয়ের শোভাযাত্রার দৃশ্য অঙ্কন করেছেন। বিয়ের কনের স্বামীর বাড়িতে যাওয়ার দৃশ্য অঙ্কিত হয়েছে ‘রাখালী’তে।
বিয়ের কনে চলছে আজি শ্বশুরবাড়ি পালকি চড়ে/ চলছে সাথে গাঁয়ের মোড়ল বন্ধু ভাইয়ের কাঁধটি ধরে।
ছেলেমেয়ের বাপের আলোচনা-সমালোচনা ও বিয়ের পর মেয়ে ও জামাইয়ের প্রশংসার মধ্যে গ্রামবাসীর সহজ-সরল গ্রামীণ মানুষের পরিচয় পাওয়া যায়। মানুষের আচার-ব্যবহার জসীমউদ্দীনের ‘রাখালী’ কবিতায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে ওঠেছে। সবুজ রঙ যেভাবে গাছের সবুজ পাতার সাথে নিবিড়ভাবে মিশে থাকে। যা কেবল জসীমউদ্দীনের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে।
রাখালী কবিতায় গ্রামীণ প্রকৃতি ও জীবনের যে রূপ, রস, গন্দ, স্পর্শ আমাদের মনকে দোলা দেয়, তাতে কৃত্রিমতা, লৌকিকতার কোনো স্পর্শ নেই। ‘রাখালী’ কাব্যের আরেকটি কবিতার নাম ‘বৈদেশী বন্ধু’ এ কবিতায় পল্লীর বারমাসীর সুরে ও গানে কৃষাণীর প্রেমের যে ব্যথাভরা ছবি এঁকেছেন, তা আমাদের সবার হৃদয়কে আদ্র করে তোলে।
কৃষাণী মেয়ের কথায় কতগুলো সার্বজনীন সত্য ফুটে ওঠে। এই সার্বজনীন সত্যে সবাই বিশ্বাসী। মায়ের আদর, বোনের স্নেহ ও তাদের দাবি সার্বজনীন স্বীকৃত। কিন্তু সে কৃষাণী মেয়ে। বিদেশী কৃষককে ভালোবাসল সত্যি। কিন্তু সে ভালোবাসার মূল্য নেই- তাই সে বলেছে, ‘আমি যে বেগানা নারী কোনো দাবি নাই, সেই দুঃখে মরিবে বন্ধু! কূল নাহি পাই।’ রোমন্টিক ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই। সে ভালোবাসাকে কেউ স্থান দেয় না। ক্লাসিক্যাল ভালোবাসারই মূল্য আছে। সেখানে আবেগের কোনো দাম নেই। বাস্তবের কাছে সব আবেগ নিরুপায়। সেই সত্যটিই কৃষাণী মেয়ের মনের কথায় ব্যক্ত হয়েছে-
আমার দেশে ধান কাটিতে মন কাটিয়া গেলে/ ধানের দামই নিয়ে গেলে মনের দামটা ফেলে।
বস্তুনিষ্ঠ প্রেম ও নিঃস্বার্থ প্রেমের দু’টি দিক কবি তার সুন্দর উপমা ও অলঙ্কারের মাধ্যমে প্রতিভাত করেছেন। জসীমউদ্দীন পল্লী প্রকৃতির সাথে গ্রামীণ জীবনধারার নিবিড় সম্পর্ক আবিষ্কার করেছেন। ‘রাখাল ছেলে’ কবিতায় গ্রামের চঞ্চল বালকের ছবি কবি অঙ্কন করেছেন। সত্যিই তা অনন্য ও অনবদ্য হয়েছে। তা অবশ্য বলাবাহুল্য। শহরের ছেলেরা যে বয়সে স্কুলে যায়, রাখাল বালক সে বয়সে লাঙল নিয়ে মাঠে যায়। মাঠেই তার বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত হয়। অতএব তার ক্ষুদ্র হৃদয়ের ভালোবাসা মাঠের শস্যক্ষেত্রজুড়ে বিরাজ করে। রাখাল ছেলের কথায়- ‘কাজের কথা না জানি ভাই লাঙল দিয়া খেলি/ নিড়িয়ে দেই ধানের ক্ষেতের সবুজ রঙের চেলি।’ শস্যক্ষেত্রের মধ্যেও কবি মানবীয় প্রেম ও ভালোবাসা আবিষ্কার করেছেন। এটা একমাত্র জসীমউদ্দীনের দক্ষ হাতের গুণেই সম্ভব হয়েছে।
‘সরষে বালা নুইয়ে গলা হলদে হাওয়ার সুখে মটর বোনের ঘোমটা খুলে চুম দিয়ে যায় মুখে।’ ইট পাথুরে শহরের কৃত্রিম ও মেকি সভ্যতার বাইরে কবি গ্রামের স্বভাবসুলভ সৌন্দর্যের রূপে মুগ্ধ। যেখানে পাখির কিচিরমিচির, নদীর কুলুকুলু বয়ে চলা, নদীতে ছুটে চলা পালতোলা নৌকা, কলসী কাখে রূপসী মেয়েদের হেঁটে চলার নিপুণ দৃশ্য ভোলার মতো নয়। তাই সেখানে কবি বারবার ছুটে গেছেন। ‘রাখাল ছেলে’ কবিতার ছন্দ পাকা ধানের মাদকতাময় গন্ধের মতো আমাদেরকে অমৃত বর্ষণ করে।
ওই যে দেখ নীল-নোয়ান সবুজ ঘেরা গাঁ/ কলারপাতা দোলায় চামর শিশির ধোয়ায় পা।
কবি রাখালের মুখে মায়াময় গ্রামের বর্ণনা দিয়েছেন। রাখাল বালকের ছোট্ট বাসস্থান প্রকৃতির সবুজ নিকুঞ্জের মধ্যখানে অবস্থিত। সেই সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে কলাপাতার চামর দোলানোর মধুর দৃশ্যের কথা আছে। রাখাল বালকের নিকট তার নিজ গ্রাম কত পবিত্র ও প্রিয় তা কবির বর্ণনায় অত্যন্ত প্রাণবস্তু হয়ে উঠেছে। সে কুটির হতে মায়ের আহ্বান শোনা যায়; যা কবিতাটিকে বাড়তি স্নেহ ও ভালোবাসার মহিমা দান করেছেন। এই কবিতার ছন্দে রাখাল বালকের চঞ্চল প্রকৃতির হিল্লোল আছে। এককথায় কবির ‘রাখালী’ কাব্যগ্রন্থের গ্রাম বাংলার রূপ-সৌন্দর্য স্ব-মহিমায় ধরা দিয়েছে। পল্লী প্রকৃতির রূপ, রসের এবং পল্লীর সহজ-সরল মানুষের যে পরিচয় জসীমউদ্দীন দিয়েছেন তা সত্যিই অনন্য। যা পাঠ করে আমরা আরো নিবিড়ভাবে পল্লী গ্রামকে ভালোবাসতে শিখেছি। পল্লীর জন্য আমাদের আবেগ শুধু নয়, সাথে দায়িত্ববোধও বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানেই জসীমউদ্দীনের ‘রাখালী’ কাব্যটি শ্রেষ্ঠত্বের আসন অলঙ্কিত করে আছে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫