ঢাকা, শনিবার,২১ জানুয়ারি ২০১৭

গল্প

রজব বৃত্তান্ত

আশরাফ উদ্দীন আহ্মদ

২৯ ডিসেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৬:৪৫


প্রিন্ট

রজবের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা ছিল অনেক গভীর, তার জীবনের অনেক কিছুই শেয়ার করত আমার সাথে, ওর চোখে-মুখে অন্যরকম দীপ্তি দেখতাম, অনেক-অনেক গল্প ছিল ওর ঝুড়িতে, পারিবারিক-সামাজিক বিভিন্ন গল্প প্রায়ই বলত বেশ রসিয়ে-রসিয়ে, কিন্তু সে গল্পগুলোর একটা ছাদ সে দিত, যদিও আঙ্গিকগত বিষয় সে সেভাবে বুঝত না, তারপরও পরিণতি থাকত, মানুষের ভেতরের অনেক গল্প সে প্রকৃতগতভাবে অস্থি-মজ্জায় ধারণ করত, তাই একদিন বললাম, তোমার এই কথাগুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে গল্পে রূপ দিলেই তো পার...
কথা শুনে হাসত, হবে না আমার দ্বারা ওসব কিছু হবে না!
রজব আলী আমার দিকে তাকিয়ে থাকত, ওর চোখ দুটো ছিল কাজলাদিঘিতে অবহেলায় ফুটে থাকা পদ্মফুল, সে ফুল দেখে কেউ করে ভুল, কেউ বা কুড়োয় গোবরেফুল, রজব আলী আমার জীবনের অনেকটা সময় কেড়ে নিয়েছিল সেই ভুল চোখের চাহনীতে।
রজব আলীর একটা সমস্যা, কথা বলতে গেলে অতিরিক্ত তোঁতলামি, শেষঅবধি লেখাপড়া শেষ করেও একটা চাকরি জোটাতে পারেনি, নিজের অনেক আত্মীয়স্বজন কর্তা-ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও হয়নি, রিটেনে পাস করেও ইন্টারভিউ বোর্ডে গিয়ে সেই তোতলামি, বিশেষ করে নতুন পরিবেশে এবং অপরিচিত মানুষের সামনে ওর ওই স্বভাব মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যেত, কোনোভাবেই সংবরণ করতে পারত না নিজেকে।
রজব আলী মাঝে কিছু গল্পও লিখেছিল, উত্তম পুরুষে, আগে নাকি কবিতা লিখত শুনেছি, কিন্তু কোনো দিন সেগুলো আমাকে দেখায়নি, বললে, লজ্জিত হতো এবং বলত, ওসব কিছু না, সময় কাটানোর জন্য একটা কিছু করা আর কী! কিন্তু তার গল্প, নিজের জীবনের গল্প, আত্মকথা স্টাইলের গল্প, আমার কাছে প্রায়ই আসত, পড়ত বেশ উপভোগ্য করে, উৎসাহ দিয়েছি দ্বিগুণ, শহরের অনেক সাহিত্য আসরে গেছে, কেউ-কেউ বাঁকা চোখে দেখে মুচকি হেসেছে, কথার ভেতর ওই তোঁতলামি শুনে বাজে ইঙ্গিত করেছে, আমার কাছে তাও বলত, কেউ বা আবার পণ্ডিতি ভাব দেখিয়ে, রবীন্দ্রনাথ বা কমলকুমারের ভাবধারায় দুটো উপদেশ বয়ান করেছে, অথচ আমার কাছে গল্প পড়তে বেশি উৎসাহবোধ করত, হতে পারে আমি তাদের মতো অত বোদ্ধা নয় বলে, সাহস বেশি দেখাতে পারত। প্রথম-প্রথম বেশ লজ্জাও পেত, না কিচ্ছু হয় না গো! হবে না ওসব আমার দ্বারা...
আমি বলতাম, সব গল্প-কবিতা বিলাস-বসন দিয়েই হয় না, জীবন থেকেও তো নিতে হয়, আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসত, ওর চোখটা ভারী কমনীয়, টলটল করত দিঘির জলে ফোটা পদ্মফুলের মতো, আমি ওদের সফুরার বখতিয়ারপুরের বাড়িতে কখনো-সখনো যেতাম, আতিথিয়েতার শেষ নেই, পকেটে পয়সা নেই, ঘরে দীনতা, বাড়িতে হাহাকার কিন্তু মুখে ওর সদাসর্বদা হাসি, ভালোবাসাও ছিল, কিন্তু কেউই তা নেয়নি। হয়তো দেখেনি বুকের ভেতর একটা অন্যরকম মানবিক মানুষ আছে, তা দেখার সময়ই বা কার কোথায়। রজব আলী গল্প লিখেছে হয়ত তা শুধু আমাকে খুশি করতে, তার গল্পে প্রাণের প্রাচুর্য যথেষ্ট, জীবনবোধের যে জিজ্ঞাসা, অভাব-অভিযোগের এবং সামাজিক অবক্ষয়ের দাগগুলো সুষ্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, ওর বেশ কয়েকটা গল্প ঢাকার কাগজে ছাপানোর ব্যবস্থাও করেছিলাম, কয়েকবার সম্মানী এনে দিয়েছিলাম ওকে। ওর সব কষ্টের গল্প আমাকে বলত, জীবন প্রকৃত অর্থে জটিল, সমাজের সব মানুষ মূলত দানব, ওরা একেকজন প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসার... আমার স্মরণে আছে, রজব আলী আমাকে সর্বপ্রথম কিছু সমাজতন্ত্রের বই-দর্শনের বই পড়তে দেয়, সেগুলো সে কোনো পুরানো লাইব্রেরি থেকে আনত জানি না, তবে বেশ পুরনো এবং বইয়ের পাতারা বিবর্ণ-বাঁধাই ছাড়া অনেকটা দুষ্টু শিশুর মতো।
একদিন বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় পদ্মা নদীর শানবাঁধানো কনক্রিটের বেঞ্চে বসে আছি আমরা দু’জন। মাথার ওপর ছিল দু’জনের দুটো ছাতা, বৃষ্টির পানি টিপটিপিয়ে নদীর পানিতে পড়ছে, ধূসর পরিবেশ চারদিকে, গাছদের শরীর থেকে বৃষ্টিধোয়া পানি গড়িয়ে নামছে, দূরে-দূরে জোড়া-জোড়া বেঁধে যুবক-যুবতী বসে গল্পে মেতে আছে, কত যে গল্প, সে গল্পের আর শেষ নেই যেন। রজব বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিল না, সংস্কৃতি বা কালচার বোঝার সময় তার হয়নি, জীবনযুদ্ধের একজন পরাজিত সৈনিক ছিল, বাড়িতে অসুস্থ মা, তিন তিনটে মুখের সংস্থান করতে জীবন যার ওষ্ঠাগত, সে কিভাবে সাহিত্যকে ভালোবেসে জীবন উৎসর্গ করবে, দিনরাত্রি অঙ্কের মতো টানটান তার জীবনপ্রণালি, কমার্সের ছাত্র সে, রেজাল্ট সর্বদা ভালো, কৈশোর থেকেই প্রাইভেট পড়ানো পেশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে এসেও অনেক ছাত্র-ছাত্রী তার হয়েছিল কলেজে অধ্যয়নরত, সে টাকা দিয়ে দু’কাঠার বাড়িতে দু’টো কামরা করেছিল, আমাকে বলত মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই না হলে কি গল্প আসে!
-কেনো আসবে না, চাঁদের দিকে তাকিয়ে কবিরা কতো পদ্য লেখে, নদীর দিকে তাকিয়ে, সুন্দরী প্রিয়তমার দিকে তাকিয়ে...
-ওসব তো কল্পনায় রেসের ঘোড়া দৌড়ানো, বাস্তবে আবার হয় নাকি?
-হয়-হয় মানুষই তো পথে-ঘাটে পড়ে থাকে, কেউ মরে, কেউ মরেই না শুধু অতৃপ্তি নিয়ে কেঁদে যায় জীবনভর।
-চমৎকার কথা বললে তো, অতৃপ্তি নিয়ে কেঁদে মরে, ঠিক আমারই মতো কিছুই হতে পারলাম না, অন্ধকার কালো ছোপ-ছোপ...
-তুমি তো লাকি মানুষ হে যুবক, জীবনযুদ্ধের সেনা, যাকে কেউ পরাজিত করতে পারেনি।
-কেমন কথা হলো এটা, মানতে পারলাম না, একটু বেশি তোয়াজ করা যেন!
-যে যেমনভাবে নিতে পারে একটা কথা, মূলত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই একটা কথাকে বিভিন্ন সাইজে বাঁক বদল করে।
আমার কথা শুনে রজব হাসতো, ওর হাসি যেন হাসি নয়, অন্যরকম কিছু, সত্যসত্যিই রজবের হাসির কোনো অর্থ খুঁজে পাইনি। একদিন গল্পে সে জানায়, আশা নামের এক মেয়ের প্রতি সে খানিকটা দুর্বল, মেয়েটি আবার ওর ছাত্রী, ধনীর মেয়ে, সপ্তাহে তিন দিন ওদের বাড়ি পড়াতে যেতে হয়, মূলত অংক, আশাকে নিয়ে রজবের কৌতুকের অন্ত নেই, ওর সম্পর্কে অনেক গল্প অনেক তথ্য ছিল ঝুড়িতে, সুন্দরী মেয়েদের হাসিতে ঝর্ণা ঝরে, জোনাকির মতো আলো দেয় মিটিমিটি, টোলপড়া গালের ওই হাসি দেখে মানুষ কবি হয়, এসব বস্তাপচা সেকেলে কথা রজব বেশ ইনিয়ে-বিনিয়ে বলত, শেষের দিকে ওর ওসব ফালতু প্যাঁচাল আর ভালো লাগত না, কেমন একঘেঁয়েমি মনে হতো। ক্রমেই আমি মনের অজান্তে অনেকটা দূরে সরে যাই, ব্যস্ততা-চাকরি এবং নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চা আমাকে বড় বেশি এককেন্দ্রিক করে তোলে, আমি নিজের খোলসে হারিয়ে যাই তারপর।
রজবের সঙ্গে সম্পর্কটা থিতু হয়, কেনো যে আর এগোতে পারেনি, জানি না। মাঝে আরো দু’ একটা গল্প পড়ি কাগজে, প্রেমকাহিনীমূলক বলা অপেক্ষা রাখে না। কবি যেন দুঃখের সমুদ্র থেকে স্নান করে প্রেমের সিন্ধুতে ডুবছে, ভাবতে ভালো লাগে, মানুষের কামনা-বাসনা থাকতে পারে, রজবের মধ্যে কেনো থাকবে না, থাকতেই পারে, জীবন মানে তো রুব্ধ কোনো চাতাল নয়, অবারিত সবুজ মাঠ, উদার ধান ক্ষেতের মতো মাতাল বাতাসে ভেসে যাওয়া স্বপ্ন, বিশাল আকাশ, যে আকাশের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, রজবের জন্য আমার বুকের ভেতর অনেক ভালোবাসা প্রতিনিয়ত, সাহিত্যাঙ্গনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি জাগ্রত কিন্তু বাঁকা চোখের চাহনি, সবজান্তাদের হেঁয়ালিপনা কথা বড় কাঁটা দিত তার গায়ে, কারণ সে ছিল নির্ভেজাল সত্য মানুষ।
শেষাবধি একটা চাকরি জোটাতে পারেনি রজব। তার শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো মূল্য হয়নি, হয়তো একটা চাকরি তার জীবনের মোড় অনেকটা ঘুরিয়ে দিতে পারত, মসৃণ পথের অংশটা রজব শেখেনি বা জানতে পারেনি। ওর বুকের ভেতরের হাহাকারের গল্প ধূসর পাণ্ডুলিপি হয়ে রয়ে গেছে। রজব সাহিত্য পড়েনি, কিন্তু সাহিত্যকে ভালোবেসেছিল, জীবনের কোনো কঠিন অংক তার কাছে কোনো কঠিন মনে হয়নি, কিন্তু জীবনটা কঠিন হয়ে গেল, রজবের বাপের ছিল তিনটি বিয়ে, বিহার রাজ্যের মানুষ ছিল ওরা, রজবের মা ছিল ছোট বৌ, আগের বউয়ের পক্ষের ছেলে-মেয়েরা রজবদের সঙ্গে কোনোপ্রকার যোগাযোগ রাখেনি, বরং ওদের আলুপট্টির পদ্মাপাড়ের যে পৈত্রিক বাড়ি আছে, সেখান থেকেও একটা সময় রজবদের তাড়িয়ে দেয় আগের পক্ষের ছেলে-মেয়েরা। রজবের গল্পগুলো তার জীবনেরই গল্প, আঙ্গিক যতোটা পেরেছে নিজের মতো করে সাজিয়ে নির্মিত করেছে গল্পের বীজ, হয়তো তা নেহায়েতই তার জীবনাখ্যান।
শান্ত-স্থির চোখ দুটো শেষপ্রহরের শুকতারাটির মতো জ্বলজ্বল করত, ওর জীবনের অনেক না বলা কথা যেন ওই চোখে স্পষ্ট প্রতীয়মান ছিল, রজব আলী একটা চাকরি পায়নি বলে হয়তো সেভাবে তার জীবনটাকে সাজাতে পারেনি, সাহিত্যকে নির্ভেজাল জীবনের অংক করতে চেয়েছিল, মেঘবালিকার সন্ধান পায়নি, আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু আকাশ দেখেছে, নদীর দিকে তাকিয়ে নদী দেখেছে, কিন্তু ওর ভেতরের কথাগুলো কেউ পড়তে পারেনি, পাঠ্যবইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলে শিশুরা নৌকা-উড়োজাহাজ করে, আর রজব জীবনটাকে কাগজের মতো কুটিকুটি করে ছিঁড়ে নদী এবং আকাশের স্বপ্ন দেখেছে, ভালোবাসার গল্প লিখতে চেয়েছিল- তা কি শুধুই ভালোবাসা, একটা সময় বেশ কিছু কবিতাও লিখেছিল, কবিতা, সবাই কবি না হতে পারলেও জীবনের কিছু না বলা কথা সাজিয়ে রাখাও তো একটা কবিতা, রজব অনেক দূরে হেঁটে চলে গেছে, নদীর দেশ থেকে, আকাশের দ্রাঘিমা থেকে, কবিতার অনুপ্রাস থেকে অনেক-অনেক দূর, বনটিয়ার দেশে, বনতুলসীর গন্ধ মেখে রজব চলে গেছে ভোর না হওয়া শেষপ্রহরে পাখি যেমন উড়ে যায় নীড় থেকে অসীম আকাশ পেরিয়ে অনেক-অনেক দূরে, সবুজ গাঁয়ের পর গাঁ ছাড়িয়ে--- রজব সেই অজানা গাঁয়ের মেঠো পথের বাঁকে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চেয়েছিল, শহুরে বিলাসের তকমা তার শরীরে লাগেনি, সে একজন ধোপদুরস্ত মানুষ হতে চেয়েছিল, কিন্তু সময় তাকে মানুষ হওয়ার আগেই ছবির দেশে, কবির দেশে চিনিয়ে নিয়ে গেল।
রজবের সেই পৈতৃকবাড়িটা এখনো সেভাবেই ভাঙাচোরা শরীর দেখিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ওর সৎভাইয়েরা বাস করে, পদ্মানদীর তীর ঘেঁষে কতদিন আমরা বেড়িয়েছি, কতো কথা কতো গল্প নদীর স্রোতরাশির সঙ্গে মিলেমিশে আছে।
সেদিন নদীর কাছাকাছি এসে ভড়কে যাই, অনেক দূর থেকে ভেসে আসে সেই হাসি, সেই হাসির কলকল ধ্বনি, অনেকটা রজবের হাসির মতো, এভাবেই তো রজব কতোদিন হাসত নদীর কাছে এসে, উদার আকাশ আর নদীর কাছে আসলে মানুষ নাকি প্রকৃতির মতো উদার হয়।
রজব বলত, মানুষ প্রকৃতির কাছে প্রথম পাঠ্যগ্রহণ করে, আমি ওর কথা শুনে হতবাক হয়ে ভাবতাম, প্রকৃতি সত্যিই মানুষকে ওমন উদার করে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫