ঢাকা, শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবেন কিভাবে

জাফর আহমাদ

২৯ ডিসেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৫:২৪


প্রিন্ট

আল্লাহর শোকর গুজার করবেন নয়তো কুফরে লিপ্ত হবেন, এ দুয়ের মাঝে তৃতীয় কোনো অবস্থান কারো জন্য তৈয়ার করা হয় নাই। শোকর গুজার অর্থ হলো আল্লাহর প্রভুত্বের স্বীকৃতি, আল্লাহর অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি, আল্ল্াহর মহানত্বের স্বীকৃতি, আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি ও আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের স্বীকৃতি সর্বোপরি আল্লাহর অস্তিত্বের স্বীকৃতি। কেউ যদি শোকর গুজার না করে তাহলে বুঝতে হবে সে মূলত আল্লাহকেই অস্বীকার করছে। সে তার মহান প্রভু সম্পর্কে মারাত্মক ধোঁকায় পড়ে আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ, কোন জিনিস তোমাকে তোমার মহান রবের ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাকে সুঠাম ও সুসামঞ্জস্য করে গড়েছেন এবং যে আকৃতিতে চেয়েছেন তোমাকে গঠন করেছেন। কখনো না বরং তোমরা শাস্তি ও পুরস্কার প্রদানের দিবসকে (আখেরাতকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করছো।’ (সুরা ইনফিতার : ৬-৯) আসলে আমাদের অস্তিত্ব নিজেই ঘোষণা করছে যে আমরা নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়ে যায়নি। আমাদের পিতামাতাও আমাদের সৃষ্টি করেননি বা আমাদের মধ্যে যেসব উপাদান আছে সেগুলো নিজে নিজে একত্র হয়ে যাওয়ার ফলেও ঘটনাক্রমে মানুষ হিসেবে তৈয়ার হয়ে যায়নি বরং এক মহাজ্ঞানী ও মহাশক্তিধর আল্লাহ এই পূর্ণাঙ্গ মানবিক আকৃতি দান করেছেন। আমাদের সামনে অসংখ্য ধরনের প্রাণী রয়েছে তাদের মোকাবেলায় সবচেয়ে সুন্দর শারীরিক কাঠামো এবং শ্রেষ্ঠ ও উন্নত শক্তি একেবারেই সুস্পষ্ট। সুতরাং বুদ্ধির দাবি তো এই ছিল, এসব কিছু দেখে কৃতজ্ঞতায় আমাদের মাথা নত হয়ে যাবে এবং মহান রবের মোকাবেলায় কখনো নাফরমানি করার দুঃসাহস করবে না। আমরা এও তো জানি যে আমাদের প্রভু রহিম ও করিম করুণাময় ও অনুগ্রহশীলই নন, তিনি জাব্বার ও কাহহার মহাপরাক্রমশালী এবং কঠোর শাস্তি দানকারীও বটেন। এত কিছু জেনেও যখন কৃতজ্ঞতার মাথা নত হয়নি, তাহলে ধরে নিতে হবে যে সে কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে।
তিনি দয়া করে আমাদের মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেক নামক অমূল্য সম্পদ দান করেছেন, তারপর তিনি আমাদের সরল সঠিক পথে চলার জন্য পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি তাকে রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছি। এরপর হয় সে শোকর গুজার হবে নয়তো হবে কুফরের পথ অনুসরণকারী।’ (সুরা আদ দাহর : ৩) আল্লাহ মানুষকে শুধু জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধি দিয়েই ছেড়ে দেননি বরং এগুলো দেয়ার সাথে সাথে তাকে পথও দেখিয়েছেন যাতে তারা জানতে পারে শোকরিয়ার পথ কোনটি এবং কুফরির পথ কোনটি। এরপর যে পথই অবলম্বন করুক না কেন তার জন্য সে নিজেই দায়ী। এ বিষয়টিই সুরা বালাদে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে- ‘আমি তাকে দু’টি পথ (অর্থাৎ ভালো ও মন্দ) স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছি।’
প্রত্যেক মানুষকে জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধির যোগ্যতা দেয়ার সাথে তাকে একটি নৈতিক বোধ ও অনুভূতি দেয়া হয়েছে যার সাহায্যে সে প্রাকৃতিকভাবেই ভালো ও মন্দের পার্থক্য করতে পারে। ফলে কিছু কাজ-কর্ম ও বৈশিষ্ট্যকে খারাপ বলে জানে যদিও সে নিজেই তাতে লিপ্ত। আবার কিছু কাজ-কর্ম ও গুণাবলিকে ভালো জানে যদিও সে নিজে তা থেকে দূরে অবস্থান করে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা বিবেক বলে একটি জিনিস রেখে দিয়েছেন। যখন সে কোনো মন্দ কাজ করতে উদ্যত হয় অথবা করতে থাকে অথবা করে ফেলে তখন এ বিবেকই তাকে দংশন করে। যতই হাত বুলিয়ে বা আদর-সোহাগ করে বিবেককে ঘুম পারিয়ে দিক, তাকে অনুভূতিহীন বানানোর যত চেষ্টাই সে করুক সে তাকে একদম নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম নয়। হঠকারী হয়ে দুনিয়ায় সে নিজেকে চরম বিবেকহীন প্রমাণ করতে পারে, সে সুন্দর সুন্দর অজুহাত খাড়া করতে দুনিয়াকে ধোঁকা দেয়ার সব রকম প্রচেষ্টা চালাতে পারে, সে নিজের বিবেককে প্রতারিত করার জন্য নিজের কর্মকাণ্ডের সপক্ষে অসংখ্য ওজর পেশ করতে পারে, কিন্তু এসব সত্ত্বেও আল্লাহ তার স্বভাব-প্রকৃতিতে যে হিসাব পরীক্ষককে নিয়োজিত রেখেছেন সে এত সজাগ যে, সে নিজে প্রকৃতপক্ষে কি তা কোনো অসৎ মানুষের কাছেও গোপন থাকে না।
মানুষের নিজের সত্তায় এবং তার চারপাশে জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত গোটা বিশ্বজাহানের সর্বত্র এমন অসংখ্য নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যা আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে যে এমন সব জিনিস আল্লাহ ছাড়া হতে পারে না কিংবা বহু সংখ্যক খোদা এ বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা বা পরিচালক হতে পারে না। বিশ্ব চরাচরের সর্বত্র এবং মানুষের আপন সত্তার অভ্যন্তরে বিদ্যমান এ নিদর্শনাবলীই কিয়ামত ও আখেরাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ করেছে। মানুষ যদি এসব থেকে চোখ বন্ধ করে থাকে অথবা বুদ্ধি-বিবেক কাজে লাগিয়ে সব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা না করে অথবা যেসব সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করছে তা মেনে নিতে টালবাহানা ও গড়িমসি করে তাহলে তা তার নিজেরই অপরাধ।
মানুষকে হেদায়াত ও পথপ্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে নবী পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাজিল করেছেন। এসব কিতাবে পরিষ্কার ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে, শোকরের পথ কোনটি এবং কুফরের পথ কোনটি এবং এ দুটি পথে চলার পরিণামই বা কি। নবী-রসূল এবং তাঁদের আনীত কিতাবের শিক্ষা জানা-অজানা, দৃশ্য-অদৃশ্য অসংখ্য উপায় ও পন্থায় এত ব্যাপকভাবে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে যে কোনো জনপদই আল্লাহ ও আখেরাতের ধারণা, সৎ ও অসৎ কাজের পার্থক্য বোধ এবং তাঁদের পেশকৃত নৈতিক নীতিমালা ও আইন-বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ নয়, নবী রাসূলের আনীত কিতাবের শিক্ষা থেকেই তারা এ জ্ঞান লাভ করেছে তা তাদের জানা থাক বা না থাক। বর্তমান যেসব লোক নবী-রসূল এবং আসমানি কিতাব অস্বীকার করে অথবা তাদের সম্পর্কে কোনো খবরই রাখে না তারাও এমন অনেক জিনিস অনুসরণ করে থাকে যা মূলত ওই সব শিক্ষা থেকে উৎসারিত ও উৎপন্ন হয়ে তাদের কাছে পৌঁছেছে। অথচ মূল উৎস কি সে সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না।
কৃতজ্ঞতার বাস্তবরূপ হলো, আল্লাহর বান্দা হিসেবে নিজেকে বাস্তবে রূপদান করা। অর্থাৎ মৌখিক শুকরিয়া ‘আল হামদুলিল্লাহ’-এর সাথে আমলে সালেহের মাধ্যমে আল্লাহর বাস্তব শুকরিয়া আদায় করা। উদাহরণস্বরূপ, ধন-সম্পদের মূল মালিক আল্লাহ তায়ালা। তিনি দয়া করে আমাকে এগুলো দান করেছেন। তাঁর এ দানের কৃতজ্ঞতা আদায়ের নিমিত্তে কালিমাতুস শোকর ‘আল হামদুলিল্লাহ’ এর বাস্তব শোকরিয়া হলো এ ধন-সম্পদ নিজের প্রয়োজন পূরণের পর সমাজের বঞ্চিত অসহায় মানবতার প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট হবো। কুরআনের অসংখ্য স্থানে নির্দেশ করা হয়েছে যে তোমাদের সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো। অথচ তখন যদি কেউ নিজের হাতকে গলদেশে তুলে রাখে তবে বুঝতে হবে যে তার মৌখিক কৃতজ্ঞতা ‘আল হামদুলিল্লাহ’ কথাটি ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়। কাজেই আল্লাহরই দেয়া ধনদৌলত আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে করে তার বাস্তব শুকরিয়া আদায় করতে হবে।
আল্লাহর শোকর গুজার বান্দা হবো, নয়তো কুফর। অর্থাৎ যে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, তার আর নতুন করে ঘোষণা দেয়ার দরকার হয় না যে সে কুফরে লিপ্ত হয়েছে বরং কোনো ঘোষণা ছাড়াই সে আল্লাহকে অস্বীকারকারী হিসেবে চিহ্নিত হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমরা আমাকে স্মরণ রাখো, আমি তোমাদেরকে স্মরণ রাখবো আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং আমার নিয়ামত অস্বীকার করো না।’ (সুরা বাকারা : ১৫২)
লেখক : ব্যাংকার

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫