ঢাকা, শুক্রবার,২৮ এপ্রিল ২০১৭

অবকাশ

অনুশোচনা

এস আর শানু খান

২৫ ডিসেম্বর ২০১৬,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

গভীর রাতে হঠাৎ বাবার ফোন। মার স্ট্রোক হয়েছে। বাবার কথা শুনে রাহাত মেসের থেকে বের হয়েই দৌড় শুরু করে। রাত তখন ১টা। একটি অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করেই রওনা হলো গ্রামের দিকে। শহর থেকে মাইল পাঁচেকের রাস্তা রাহাতের বাড়ি। মধ্যবিত্ত একটি পরিবার। কৃষিকাজই সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস। বাবা-মায়ের একমাত্র ও আদরের সন্তান বলে শহরে রেখে পড়াচ্ছেন। হাসপাতালে গিয়ে ইমারজেন্সিতে ভর্তি করল মাকে। অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়াটা মিটিয়ে দিলো বাবা। ডাক্তার জানালো তেমন সমস্যা নয়। প্রেশারের জন্যই এমন হয়েছে। প্রেসক্রিপশন করে দিলো এবং বলল একটা স্যালাইন দিয়েছি আর দুইটা ইনজেকশন। সবই বিদেশী, দাম একটু বেশি নিতে পারে।
বাবা ১২০০ টাকার মতো রাহাতের হাতের ভেতর গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল আরো টাকা লাগলে তোর কাছ থেকে দিয়ে ওষুধ নিয়ে আয়। বাড়ি ফিরে তোকে আবার অনেকগুলো টাকা পাঠিয়ে দেবো।
গত সপ্তাহেই বাড়ি থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে ফরম ফিলআপ করার কথা বলে। সেই টাকা সবই হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছে কয়েক দিনে। বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে সিনেমা দেখে। বিরানির পার্টি দিয়ে, আর গার্লফ্রেন্ড সুমনাকে গিফট দিয়েছে ছয় হাজার টাকা দিয়ে একটি স্মার্ট ফোন। প্রতিটা ঘটনা বিষাক্ত সাপের মতো বারবার দংশন করতে লাগল রাহাতের বিবেকে।
নিচে নেমে হাসপাতালের গেটের সামনে একটি ফার্মেসিতে গিয়ে দাঁড়াল রাহাত। প্রেসক্রিপশন দোকানে দিতেই মুহূর্তের মধ্যে ওষুধগুলো একটি জালিতে ঢুকিয়ে রাখলো রাহাতের সামনে। দাম জিজ্ঞেস করতেই দোকানদার জানিয়ে দিলো, দাম হয়েছে দুই হাজর ২৫০ টাকা। পকেট থেকে বাবার দেয়া ১২ শ’ টাকা আর নিজের কাছে থাকা তিন শ’ টাকা দিয়ে মোট ১৫ শ’ টাকা দিয়ে বলল বাকি টাকা সকালে দিলে হয় না?
দোকানদার ওষুধের জালিটা ভেতরে নিয়ে জানিয়ে দিলেন বাকিতে ওষুধ বিক্রি করেন না।
রাহাত অনুনয়ের সাথে বলল ভাই আমরা চার তলার ১৮৬ নম্বর বেডে আছি।আমার মা খুব অসুস্থ। ওষুধগুলো খুবই দরকার। হঠাৎ চলে আসতে হয়েছে তো তাই টাকা পয়সা গোজগাজ করে আনতে পারিনি। বেশি দূরে নয় শহর থেকে মাত্র পাঁচ মাইল দূরের একটা গ্রামের বাসিন্দা আমরা। দোকানদার কোনো কথাতেই কান দিচ্ছিল না। বরং এটা ওটা করছিলেন। খপ করে হাত ধরে বসলেন রাহাত। কিন্তু কোনো কাজ দিলো না।
দোকানদারও একটু নরম গলায় বলল ভাই আমার কিছু করার ক্ষমতা নেই। মালিকের কড়া নির্দেশ এক পয়সাও বাকি দেয়া যাবে না। সে দিনও একজন তিন হাজার টাকার মতো ফাঁকি দিয়ে রোগী নিয়ে পালিয়ে গেছে। বিশ্বাস করার মতো আর কিছু নেই। আমি তো মালিকের গোলাম ভাই। কিছু করার নেই।
একবারে কঠিন অসহায়ত্বের রোলটা এসে পড়ল রাহাতের ঘাড়ে। নিরুপায় রাহাত একের পর এক বন্ধু-বান্ধবীদের ফোন দিতে লাগলেন। এক একজনকে কয়েক শ’বার কল দেয়ার পর রিসিভ করে এটা ওটা বলে কাটিয়ে দিচ্ছে। টাকা দিতে কেউই রাজি হচ্ছে না।
যাদের পেছনে এত টাকা উড়িয়েছে এই কয়েক বছরে, তাদের মুখের এমন কথা খুব ভাবিয়ে তুলল রাহাতকে।
অবশেষে রাহাত বিশ্বাস নিয়েই ফোন দিল পরানের পরান ভালোবাসার কাছে। রাহাত জানে সুমনার কাছে টাকা আছে কেননা দুই দিন আগেই টিউশনির টাকা পেয়েছে হাতে।
ভালোবাসার কাছে ফোন দিতেই বলে উঠল। এত রাতে কী মতলবে। এটাই ছিল তার প্রথম কথা।
মায়ের অসুস্থতার কথা জানাল সুমনাকে। এবং কিছু টাকা যে লাগবে সেটা বলতেই সুমনা পাল্টা জানিয়ে দিলোÑ এ চার বছর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একটা ফোন কিনে দিয়েছ সেটার টাকা উঠিয়ে নিতে আবার কত নাটক করছ।তুমি পারোও বটে।
কয়েকটি ছি: ছি: ছুড়ে দিয়ে বলল ছি: রাহাত তুমি এতটা নীচু মনের মানুষ আমি বুঝতে পারিনি। এত ছোট লোক তুমি।
রাহাত আসল ঘটনা বোঝাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। সুমনা বরং উল্টো বলে ফেলল, তোমার ফোনের আমার দরকার নেই। সকালেই তোমার ফোন তোমার কাছে পৌঁছে যাবে। এত রাতে আমাকে ডিস্টার্ব করো না। বলেই ফোনটা কেটে দিলো। রাহাত আবার ফোন দিতেই সুমনা ফোন বন্ধ করে দিলো।
সবার কথা শুনে কেমন লাগছিল ঠিক মনে নেই রাহাতের কিন্তু সুমনার মুখের কথা শুনে পাথর হয়ে গেল রাহাত।
শুধু একটি কথাই বারবার মাথায় এলো রাহাতের। এত দিন জান-পরান উজাড় করে কাদের সাথে মিশলাম। এত দিন কী করলাম।
অবশেষে নিজের স্মার্ট ফোনটা বিক্রির চিন্তা মাথায় এলো।
এদিক ওদিক না তাকিয়ে সোজা দৌড় শুরু করল রেল বাজারের দিকে। রাহাতের জানা আছে রেলবাজারে পুরনো ফোন বেচাকেনা হয়। সেখানে গিয়ে পড়ল আর এক মহা ফ্যাসাদে।
অবশেষে ষোল হাজার টাকার ফোনটা মাত্র তিন হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করে দিতে হলো। ফোনের কথা ভাবার সময় নেই। ফার্মেসিতে গিয়ে টাকা দিয়ে ওষুধ নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে পৌঁছাল চারতলার ১৮৬ নম্বর বেডে।
নাইট ডিউটিতে থাকা সিস্টারকে ডেকে স্যালাইনটা পুষ করাল এবং সাথে ইনজেকশনও। কিছু সময় পর মা একটু নড়াচড়া দিয়ে রাহাত বলে ডাকতে থাকলেন। রাহাত পাশেই ছিল। হাত ধরে মা বলে ডাক দিলো। মায়ের মুখের কথা শুনে জানে পানি এলো। সকালে ডাক্তার রাউন্ডে এসে জানিয়ে দিলেন তেমন কোনো সমস্যা নেই আর। আশঙ্কা মুক্ত। রাহাত দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাল।
অতীতে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ, অনুশোচনার আগুনে জ্বলেপুড়ে একবারে খাঁটি মানুষে পরিণত হয়ে উঠল রাহাত। সারা জীবন মুখে মুখে শুনেছে, গল্পে পড়েছে সিনেমার সংলাপে দেখেছে বিপদে না পড়লে মানুষ চেনা যায় না। ঠিক তার বাস্তবতার শিকার রাহাত সব আড্ডাবাজি, বন্ধু-বান্ধব সাথে সুমনাকেও ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলো।
শালিখা, মাগুরা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫