ঢাকা, বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

বিজয় দিবসের কিছু ভাবনা

আলমগীর মহিউদ্দিন

২২ ডিসেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ২০:১৬


আলমগীর মহিউদ্দিন

আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রিন্ট

বিজয়ের ৪৫তম দিবসে স্বাভাবিকভাবেই পুরনো স্মৃতিগুলো একসাথে জড়ো হয়ে নানা ভাবনার সৃষ্টি করে। যারা বিজয় দেখেছে এবং যারা বিজয়ের কাহিনী শুনেছে, তাদের অনুভূতি একরকম হওয়ার কথা নয়। আবার যারা বিজয় দেখেছে এবং বিজয়ের সাথে জড়িত তাদের অনুভূতিও পৃথক হতে বাধ্য। কারণ, অত্যন্ত সহজ। কেননা, যেকোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সীমিত থাকে সে ব্যক্তির পরিব্যক্তির মাঝে। তবে একটি প্রশ্ন সাধারণ সবার জন্য। কেন বিজয় হয়েছিল এবং সেই লক্ষ্য কি পূরণ হয়েছে?
জবাব কখনোই এক হবে না। তবে একটি লক্ষ্য সাধারণ। তা হলো, সবাই চেয়েছিল স্বাধীনতা। তবে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, তখন কি স্বাধীনতা ছিল না? আবার কেউ প্রশ্ন করেন, বিজয়ের পর কি নতুন এলাকার সৃষ্টি হয়েছে? জীবনব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে? চাওয়া-পাওয়ার আকাক্সক্ষার পরিবর্তন ঘটেছে? আবার কেউ প্রশ্ন করবেন গত সাড়ে চার দশকে কি লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্য সঠিক চেষ্টা হয়েছে? এমন হাজারো প্রশ্নের জবাব হাজার রকম হতে পারে। তবে একটি জবাব সম্ভবত একরকম হবে। বিজয়ের লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। স্বাধীনতা, সত্যিকারের অর্থে।
আসলে স্বাধীনতা বিষয়টি একটি বহুমাত্রিক, নৈর্ব্যক্তিক এবং খাকিটা সবেদনশীল। যে কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এর আলোচনা হয়েছে এবং সূত্র নির্মাণের চেষ্টা চলেছে। এই আলোচনা, আন্দোলন ও সব কর্মকাণ্ডে ব্যয় হয়েছে লক্ষ জীবন, অপরিমিত সম্পদ এবং শৃঙ্খলিত হয়েছে মানুষ নতুন করে।
প্রথম বিজয় দিবস ছিল সত্যই অভূতপূর্ব। এখানে ছোট্ট একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। বরিশালের জোবারপাড়ে অবস্থান করছিলাম। রেডিওতে আহ্বান এলো, তোমাদের অস্ত্র জমা দিয়ে দেশের কাজে লেগে যাও। পাশের এক অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলো, বাড়ি ফিরে যাবে বাবা-মায়ের খবর নেয়ার জন্য। দলে দলে যখন তারা ফিরে যাচ্ছিল, পথে পথে পানি, খাবার নিয়ে মানুষেরা তাদের অর্ভ্যথনা জানাচ্ছিল। অনেকেই জিজ্ঞেস করছিল, ‘তোমাদের অস্ত্র কই?’ মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই সবাই একই জবাব দিচ্ছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে, অস্ত্র জমা দিয়েছি।’ এতেই সবাই উদ্বেলিত। হঠাৎ একজন জিজ্ঞেস করল, ‘স্বাধীন হয়েছি, মানে কি? তাহলে কি দারোগা সাহেব আর থাকবে না?’ বরিশালের সুদূর সেই গ্রামে দফাদারকে সবাই ক্ষমতার অঙ্গ মনে করত। দারোগা ছিল ভয়ের কেন্দ্রবিন্দু। যখন জবাব পেল, ‘না দারোগা সাহেব থাকবেন’ তখন তাদের সামনে নতুন প্রশ্ন হলো, ‘তাহলে স্বাধীনতা কী?’
আসলে স্বাধীনতা যদি মুক্ত বিহঙ্গের মতো চলাফেরার অধিকার হয়, তাহলে আকাশটাও মুক্ত হতে হবে। নির্বিঘ্ন হতে হবে। জীবনটা কি তাই? এর জবাব পাওয়া যাবে বিখ্যাত রাদারফোর্ড ইনস্টিউটের প্রেসিডেন্ট ড. জন ডাবলু হোয়াইটহেডের ‘সত্যিকারের স্বাধীনতা কি’? নিবন্ধে তিনি বলেছেন ‘বহুদের গঠিত সরকারই হচ্ছে স্বাধীনতার বড় শত্রু। মার্কিন সরকার তাদের জনগণের সবচেয়ে বড় হুমকি ও বিপদ (There is nothing more dangerous than a government of the many. The US government remains the greatest threat to our freedoms.) এই সাথে তিনি আরো কঠিন চিত্র তুলে ধরেছেন। (‘The systemic violence being perpetrated by agents of the government has done more collective harm to the American people and our liberties than any single act of terror. More than terrorism, more than domestic extremism, more than the gun violence and organized crime, the US government has become a greater menace to life, liberty and property of its citizens than any of the so-called dangers from which the government claims to protect.’) ড. হোয়াইটহেড যেন সারা বিশ্বের সব দেশের চিত্র এই এক প্যারাগ্রাফে তুলে ধরেছেন। যখনই কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়, তা যদি এই বক্তব্যের আলোকে যাচাই করা যায় তবে দেখা যাবে, স্বাধীনতা হরণকারীদের সুবিধার জন্যই তা করা হচ্ছে। যেমন একজন বিখ্যাত লেখক বলেছিলেন, রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া সন্ত্রাস সম্ভব নয়। কারণ এর জন্য যে সংগঠন, বাহন, যোগাযোগ তা পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এমনকি এটা নিয়ে প্রচার, আলোচনা ও জনমত গঠনের নিয়ন্ত্রণও সরকারের হাতে। অর্থাৎ আধুনিক সরকারব্যবস্থা জনগণের মূল অধিকার বা স্বাধীনতা প্রথমেই হরণ করে।
গণতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল এই অধিকার হরণের প্রতিবাদে এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকের শ্রমের অধিকার ছিল সামন্ততান্ত্রিক প্রভুদের। পরিশ্রম দিয়ে যা কিছুই করা হোক না, তার অংশ দিতে হতো এই প্রভুদের। তাই এর প্রতিবাদে জন্ম হলো গণতন্ত্রের, যেখানে প্রত্যেকে তার শ্রমকে নিজের জন্য ব্যয় করবে।
স্বাধীনতার সংজ্ঞা অত্যন্ত চমৎকারভাবে নির্ধারণ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডিলানো রুজভেল্ট তার ৬ জানুয়ারি ১৯৪১ স্টেট অব ইউনিয়নের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক বিশ্বের আকাক্সক্ষায় যেখানে মানুষের চারটি স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে।’ তিনি এই চারটি স্বাধীনতার প্রথমটিকে বক্তব্যের স্বাধীনতা (Freedom of speech and expression), দ্বিতীয়টিকে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা (Freedom of worship), তৃতীয়টি সব অভাব থেকে স্বাধীনতা (Freedom of want) এবং চতুর্থটিকে ভীতি থেকে স্বাধীনতা (Freedom of fear) বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, এগুলো নিশ্চিত হলে সুস্থ ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের (Healthy and strong democracy) উদ্ভব ঘটে, কেননা এ অবস্থায় ০১. সবার সব সুযোগে সমান অধিকার থাকবে, ০২. সবার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, ০৩. সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, ০৪. কিছু মানুষের বিশেষ অধিকার ব্যবস্থার লোপ পাবে, ০৫. সবার নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা হবে (Civil liberties) এবং ০৬. সবাই বৈজ্ঞানিকসহ সব উন্নতির ভাগিদার হবে।
সারা বিশ্ব রুজভেল্টের এই সংজ্ঞা মেনে নেয়। এমনকি বিশ্ব সংস্থাও এর ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করে। সব দেশকে এগুলো অনুসরণের পরামর্শ দেয়। প্রশ্ন তাই উঠতে পারে, সবাই কি মানছে এসব পরামর্শ? এক কথায় জবাব হতে পারে, ‘না’। কেউ মানছে না, বরং এগুলোকে কেমনভাবে গোষ্ঠী এবং শক্তিমানদের সেবায় নিয়োজিত করা যায় তার কর্মকাণ্ড চলছে অবিরাম। প্রথম বিশ্বে যেমন নিপুণভাবে প্রচার ও পরিচালনা চলছে, তেমনটি হয়তো তৃতীয় বিশ্বে নেই। এখানে গণতন্ত্রের নামে অতীতের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটছে। নানা আইন, বিধি-বিধান নির্মাণ করে রুজভেল্ট প্রস্তাবিত এবং বিশ্বব্যাপী গৃহীত স্বাধীনতার সংজ্ঞাকে রঞ্জিত করছে।
এর প্রতিবাদে বিজ্ঞজনেরা বিশ্বব্যাপী আন্দোলন করছে। কারণ নানা অজুহাতে সরকার ও নানা গোষ্ঠী এখন এই চার অধিকারকে প্রকাশ্যেই অবহেলা অথবা স্তব্ধ করে দিচ্ছে। যেমন প্রতিবাদী সংস্থা বা রাজনৈতিক দলের এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ বা শক্তি ব্যবহার করে বানচাল করে দেয়া, বা বিভিন্ন অজুহাতে প্রতিবাদী বা ভিন্ন মতাবলম্বীদের গ্রেফতার করা এখন সাধারণ ঘটনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে এক বিরাট সংখ্যক মানুষ এমনভাবে আটক। তৃতীয় বিশ্বে এ বিষয়টি শুধু কল্পনাই করা যায়। অর্থাৎ গণতন্ত্রের আবহাওয়াতেও স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত।
অন্য কথায় সামন্ততান্ত্রিক দখল-অনাচার-অবস্থার শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন ঘটেছে। মানুষের সত্যিকারের স্বাধীনতার দেখা মেলেনি। কেউই এখন নিজের শ্রমের ফসল নিজে ভোগ করতে পারে না। আগে সামন্ত্রতান্ত্রিক প্রভুরা ভাগ বসাত, এখন তা রাষ্ট্র ভোগ করে। ড. হোয়াইটহেড যেমন বলেছেন, ক্ষমতাবান বা সরকার জনগণকে নিরাপত্তা দেবার নামে তাদের স্বাধীনতাই ছিনতাই করে। কারণ প্রত্যেক নাগরিক যদি এই চার রকমের স্বাধীনতা ভোগ করে তবে ক্ষুদ্র ক্ষমতাবান গোষ্ঠীকে তাদের কর্মকাণ্ডের হিসাব দিতে হবে। সেটা তাদের জন্য মারাত্মক। সেজন্য তারা সর্বদাই ভয়, প্রচার এবং অপ্রয়োজনীয় চমৎকারিত্বের আশ্রয় নিয়ে জনগণের মন ও কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেয়।
জনগণ স্বাধীনতা ভোগ করছে কিনা, তার দশ দফা নির্দেশিকা বাতলেছেন প্রখ্যাত লেখক ব্রান্ডন স্মিথ তার ‘দি এসেনশিয়াল রুল অব লিবার্টি’ নামক বিধানতত্ত্বে। তা হলো ০১. কোনো কিছুই স্থির নিশ্চিত বলে গ্রহণ করবে না, ০২. নিজেকে শিক্ষিত করো এবং সর্বদা সত্যের সন্ধান করো। সাবধান অজ্ঞদের সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, ০৩. দুর্বলচিত্তের হয়ো না, কারণ মানসিক সাহস স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রতিবাদ, অমান্য সবকিছুতেই তাল মিলিয়ে চলার প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ০৪. কে কী বলবে তার জন্য অপেক্ষা না করে, নিজের সুচিন্তিত কাজটি সমাপন করো, ০৫. অপ্রয়োজনীয় জিনিস ত্যাগ করো। শুধু ফলপ্রসূ বিষয়গুলো গ্রহণ করো। এ বিষয়টি বিশেষ করে সরকারের জন্য প্রযোজ্য, কারণ অধিকাংশ সরকার জনগণের কল্যাণকামী ফলপ্রসূ বিষয়কে অবহেলা করে, গোষ্ঠী বিচারে কর্মকাণ্ড চালায়, ০৬. প্রাতিষ্ঠানিক লেবেলগুলো সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। প্রায়ই সরকার বা শক্তিমানেরা প্রতিপক্ষ ও প্রতিবাদীদের ‘সন্ত্রাসী, ষড়যন্ত্রকারী, ধ্বংসকারী, মৌলবাদ’ ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে তাদের নির্মূল করতে চায় অথবা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এই লেবেলের ব্যবহার এখন বিশ্বব্যাপী। স্বৈরাচারী ও দখলদারি ক্ষমতা এর ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি, তাদের অপকর্ম ও দুষ্কর্ম ঢাকার জন্য। ০৭. সব কিছুর নিন্দা, পরাজয়ের পথ নির্মাণ করে। প্রতিটি বিষয় সমালোচনা করা ভালো, তবে বিশ্ব নিন্দুকের পর্যায়ে নয়। স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন যা সবার জন্য কল্যাণকর, ০৮. সত্যিকারের ক্ষমতা ভালোবাসার মাধ্যমে আসে, তা দখলদারিত্বের মাঝে আসে না। যেমন কোনো পোশাকধারী সরকারি কর্মচারী সাংবিধানিক শর্ত না মেনে যখন তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তা জনগণের সমর্থন পায় না। তারা গোপনে তাকে ঘৃণা করে। তাই সব কাজ সবার সমর্থনে করতে হবে। বিশেষ করে সবার কল্যাণে এবং এটাই সর্বজনীন স্বাধীনতা, ০৯. সব ঘটনাকে নিজের দৃষ্টি দিয়ে প্রথমে বিচার করো। বিশেষ করে ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডগুলো। প্রয়োজনে ক্রুদ্ধ হতে হবে। যেমন সরকার যদি অধিকারগুলো নানা অজুহাতে কেড়ে নেয়, তার জোরালো ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ হতে হবে, ১০. তুমিই তোমার প্রথম এবং শেষ প্রতিরক্ষা বাঁধ। আমাদের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র আমাদের দিয়ে গঠিত। সবার সমান অধিকার। কেউ অথবা কোনো গোষ্ঠী যদি এগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়, তবে তা অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। সবার উপরে স্বাধীনতার মূলভিত্তি আইনের শাসন।
ব্রান্ডন ডনের এই ১০ নির্দেশিকা স্বাধীনতা রক্ষা ও ভোগের চমৎকার পন্থা। প্রশ্ন হলো সাধারণ মানুষ কি সেই স্বাধীনতা ভোগ করছে অথবা ভোগ করতে দেয়া হচ্ছে? যদি না হয়, অবশ্যই তার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে হবে, তবে ঐক্যবদ্ধভাবে। নতুবা স্বাধীনতা অলীক থেকে যাবে। স্বাধীনতাহীনতা জীবন, পশুর জীবন। মানুষের জন্য নয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫