ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

রকমারি

মুক্তিযোদ্ধা লোকমানের ফটোগ্যালারি

আব্দুর রাজ্জাক ঘিওর (মানিকগঞ্জ)

১৭ ডিসেম্বর ২০১৬,শনিবার, ১৭:৫৫


প্রিন্ট

মানিকগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরের এক অবহেলিত নিভৃত পল্লীগ্রাম ঘিওরের আশাপুর। গ্রামের ভাঙাচোরা মেঠোপথ ধরেই যেতে হয় মুক্তিযোদ্ধা লোকমানের বাড়িতে। কালিগঙ্গার পাড়ঘেঁষা সেই বাড়িটিই এখন মানিকগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের ছবির জাদুঘর। যুদ্ধকালীন যারা শহীদ হয়েছেন এবং যারা এখনো জীবিত আছেন, তাদের বেশির ভাগ ছবিই লোকমান হোসেনের এই ফটোগ্যালারিতে শোভা পাচ্ছে। বাড়ির ছোট একটি ঘরে লোকমান হোসেনের বসবাস। ঘরের ভেতরের টিনশেডের বেড়ার চার দিকে চোখ বোলালেই শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আর ছবি। গুনে শেষ করার মতো নয়। আর এই ছবি ঘরের ভেতর ধারণ করেই লোকমান হোসেনের দিনরাত কেটে যাচ্ছে। তার এই ছবির গ্যালারি দেখতে জেলার দূর-দূরান্তের স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ছুটে যান। বিজয়ের মাসে প্রায়ই মুক্তিযোদ্ধা লোকমান হোসেনকে ব্যস্ত সময় কাটাতে হয় নিজ বাড়িতে স্থাপিত মুক্তিযোদ্ধাদের ফটোগ্যালারিতে। এক মেয়ে, এক ছেলে, স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের ঘরের ছয় নাতি-নাতনী নিয়েই লোকমান হোসেনের পরিবার।

৬০০-এর ওপরে মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি দিয়ে শোয়ার ঘরেই প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘মুক্তিযোদ্ধা ফটো গ্যালারি’। নিজে যুদ্ধ করেছেন আর সহযোদ্ধাদের স্মৃতি ধরে রাখতেই মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার আশাপুর গ্রামের হতদরিদ্র সাহসী মুক্তিযোদ্ধা টাইগার লোকমান হোসেনের অসাধারণ এই উদ্যোগ। মুক্তিযুদ্ধের সম্মানী ভাতার অর্ধেকেরও বেশি টাকা তিনি ফটোগ্যালারির কাজে খরচ করে থাকেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা লোকমান হোসেন বললেন মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি সংগ্রহের গল্প। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, তাদের অনেকে মারা গেছেন, আমরা যারা বেঁচে আছি তারাও যেন কবে চলে যাই। তাই ২০০৯ সালে উদ্যোগ নেই মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি সংগ্রহের কাজে। সে সময় কিছু ছবি যখন হাতে পেলাম তখন সেই ছবিগুলো আমার শোয়ার ঘরের টালাই বাঁশের বেড়ায় সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলাম। এর পর চিন্তা করলাম মুক্তিযোদ্ধারের স্মৃতি সংরক্ষণ কিভাবে করা যায়। নেমে পড়লাম মানিকগঞ্জে জীবিত ও মৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি সংগ্রহের কাজে। উদ্দেশ্য একটাই, মুক্তিযোদ্ধাদের ফটোগ্যালারি প্রতিষ্ঠা করব। পরিচিত সব মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিলাম। অনেকে আগবাড়িয়ে ছবি দিলেও আবার অনেকে এই দিচ্ছি করে মাসের পর মাস এমনকি বছর ঘুরিয়েছেন। বিশেষ করে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি সংগ্রহ করতে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু পিছু ছাড়িনি। বিশ-ত্রিশ মাইল হেঁটেও ছবি সংগ্রহ করতে হয়েছে। ছবি সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজের অর্থ খরচ করতে হয়েছে। পাসপোর্ট সাইজের ছবি এনে নিজের টাকায় টেন-টুয়েলভ সাইজ বানিয়ে তাতে লেমিনেটিং করেছি। একেকটি ছবির পেছনে ২০০ টাকার মতো খরচ হয়েছে। বর্তমানে ৬০০ ছবির প্রায় অর্ধেকই আমার নিজের টাকায় করা।
লোকমান হোসেন বলেন, মানিকগঞ্জের প্রায় বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধার ছবি আমার মুক্তিযোদ্ধা ফটোগ্যালারিতে রয়েছে। এখনো যেসব মুক্তিযোদ্ধার ছবি সংগ্রহ করতে পারিনি, তাদের ছবি সংগ্রহের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো বলেন, জীবনে সচ্ছলতা কাকে বলে জানি না। তার পরও আমার জীবদ্দশায় আমি মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি অম্লান করে রেখে যেতে চাই আমার মুক্তিযোদ্ধা ফটোগ্যালারিতে। কোনো এক সময় এই গ্যালারিতে আমি ছবি হয়ে থাকব। বর্তমানে আমার নিজের শোয়ার ঘরের ছোট্ট একটি কক্ষে স্থাপিত ছবির এই গ্যালারি স্থানান্তর করে নিতে চাই আমার নিজের এক খণ্ড জমির ওপর। সে জন্য চাই সরকারি সহযোগিতা। সরকারিভাবে যদি আমাকে একটি ঘর তৈরি করে দেয়া হয়, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি জন্ম-জন্মান্তর থেকে যাবে আমার ফটোগ্যালারিতে।
মুক্তিযোদ্ধাদের ফটোগ্যালারির গল্প শেষে তিনি স্মৃতিচারণ করলেন, সেই ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর তার জীবনে স্মরণীয় যুদ্ধের ঘটনার। মানিকগঞ্জ জেলার সবচেয়ে সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই তিনি সবার কাছে পরিচিত। মানিকগঞ্জের ঐতিহাসিক সিঙ্গাইর উপজেলার গোলাইডাঙ্গা যুদ্ধের অন্যতম মহানায়ক টাইগার লোকমান হোসেন বলেন, ছোট ছোট অনেক যুদ্ধ করেছি, কিন্তু মনের ক্ষুধা মিটছিল না। রক্ত টগবগিয়ে উঠত। সাতটি বড় বড় নৌকাভর্তি পাক সেনা নদীপথে সিঙ্গাইরের দিকে আসছে। হাঁপাতে হাঁপাতে এ খবর দেন আমাদের এক সোর্স কিসমত মুন্সি। তোবারক হোসেন লুডুর নেতৃত্বে আমরা কেউ একবারের জন্যও সরে যাওয়ার কথা ভাবিনি। শত্রুর সংখ্যা এবং অস্ত্রশক্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য অগ্রবর্তী দল পাঠাই দ্রুততার সাথে। খবরও পাই যথাসময়ে। মর্টার-মেশিনগান সজ্জিত কয়েক শ’ পাক সেনা আমাদের ক্যাম্পের দিকে আসছে। এ খবরে কৌশল পাল্টে গেরিলা কায়দায় হামলার প্রস্তুতি নেই। ধলেশ্বরী নদী থেকে গোলাইডাঙ্গা খাল হয়ে পাকসেনারা পৌঁছে যায় আমাদের গোলাইডাঙ্গা স্কুলের ক্যাম্পে। তারা আমাদের ক্যাম্পে আসার আগেই আমরা সেখান থেকে বের হয়ে যাই। এ সময় গোলাইডাঙ্গা নূর আলী খালের কুম এলাকায়, সেখানে খালের দুই পাড়ে অস্ত্রসহ বসে আছি আমিসহ নবাবগঞ্জের মনছুরের মতো সাহসী যোদ্ধারা। শত্রুসেনাদের নৌকা আসা মাত্র গর্জে ওঠে আমাদের আগ্নেয়াস্ত্রসহ গোলাবারুদ। আমাদের অস্ত্রের বিস্ফোরণে শত্রুদের ছয়টি নৌকা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডুবে যায়। এ সময় একটি নৌকার শত্রুরা প্রাণে বেঁচে গেলেও ছয়টি নৌকার ৮৩ জন পাকসেনা মারা যায়। মুক্তিবাহিনীর সাথে এই লড়াইয়ে একসাথে এতগুলো পাকসেনার মৃত্যুর ঘটনা মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসে খুব বেশি নেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫