ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব

'জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছি'

১০ ডিসেম্বর ২০১৬,শনিবার, ১৬:৫৮


প্রিন্ট
মুুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক

মুুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক

১৯৭১ সালে লাখ লাখ তরুণ দেশ স্বাধীন করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধে। তাদের অনেকেই আর কোনো দিনও ফিরে আসেননি। যারা ফিরে এসেছিলেন, তারা সবাই কি প্রাপ্য সম্মান পেয়েছেন? অনেকেই পাননি। তেমনি অচেনা একজন মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শওকত আলী রতন

১৯৭১ সাল। ৩০ বছরের টগবগে যুবক ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার সমসাবাদ এলাকার আবদুল খালেক। যুদ্ধ চলাকালে বাড়ির সামনে মুদি দোকান করতেন। সেই সময় ঘর আলোকিত করা এক পুত্রসন্তানের জনক হন। দিনগুলো ভালোই কাটছিল। সেই সংসারে আঘাত হানে পাক হানাদার বাহিনী। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের কোনো একদিন দোকানে হানা দেয় পাকিস্তানি দোসরেরা। আবদুল খালেকসহ কয়েকজন যুবককে ধরে নবাবগঞ্জ পাইলট স্কুলে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে বন্দী করে রাখা হয়। সেই বন্দিজীবন থেকে কৌশলে পালিয়ে এসে নাম লেখান মুক্তিবাহিনীতে। এভাবে এক মুদি দোকানদার হয়ে যান মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও তিনি পাননি সঠিক মর্যাদা।
তিনি জানান স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি না পাওয়ার দুঃখের কথা। সেদিনের সেই স্মৃতি আজো হাতড়ে বেড়ান। মনে পড়ে জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর কিছু স্মৃতির কথা। সে কথা মনে পড়তেই আঁতকে ওঠেন হঠাৎ। তার পরও সব দুঃখ ভুলে থাকতে চান দেশ স্বাধীন হয়েছে, এ কথা মনে করে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী আমাকে দোকান থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানিদের স্থানীয় ক্যাম্প নবাবগঞ্জ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখানে দেখা হয় রাজ্জাক ও সিরাজের সাথে। তাদেরও পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে এসেছিল। আমাদের শর্ত দেয়া হয়, তাদের সাথে কাজ করতে হবে। তারা নবাবগঞ্জ ক্যাম্পে আমাদের তিন-চার দিন রাখার পর লঞ্চে নিয়ে যায় মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ ক্যাম্পে। সেখানে আমাদের বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং দেয়া হয়। ১৪ দিন ট্রেনিং শেষে আমাদের আবারো নবাবগঞ্জ ক্যাম্পে আনা হয়। এই সময় আমরা প্রতিজ্ঞা করি, পাকিস্তানিদের কাছে থেকেই মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতা করতে হবে। সেই মোতাবেক আমরা পাক বাহিনীর বিভিন্ন খোঁজখবর কলাকোপার আন্ধারকোটা মুক্তিবাহিনীর ২ নম্বর সেক্টরের ক্যাম্পে পৌঁছে দিতাম। তখন ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন শওকত হোসেন আঙ্গুর ও সহকারী কমান্ডার শাহজাহান মোল্লা। কিছু দিন পর মুক্তিবাহিনীর সাথে গোপনে কাজ করার বিষয়টি পাক সেনারা জানতে পারে। তখন কৌশলে পাক বাহিনীর হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করলে তাদের সাথে আমাদের সম্মুখযুদ্ধ হয়।
আমরা নদী পার হয়ে ওপার নবাবগঞ্জে চলে যাই। এরপর আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে যুদ্ধ করি।
থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে মুক্তিবাহিনীর সাথে বন্ধনপাড়া, আগলাসহ বিভিন্ন জায়গায় সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আমাদের সাথে নবাবগঞ্জের বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবু ভাই ছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশকে ভালোবেসে পাক বাহিনীর হাত থেকে মাতৃভূমি রক্ষার জন্য চার মাসের একমাত্র সন্তানকে ফেলে জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম; কিন্তু আমার ন্যায্য অধিকার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি এখনো পেলাম না। যারা আমাদের খাবার নিয়ে আসত, তারাও আজ বড় বড় মুক্তিযোদ্ধা। আর আমরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেও স্বীকৃতি পেলাম না। তিনি আরো জানান, মুক্তিযোদ্ধের বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর অধিনায়ক মো: আতাউল গনি উসমানী ও ঢাকা পশ্চিমাঞ্চলের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন এ টি এস এ হালিম চৌধুরীর কাছ থেকে সনদ পেয়েছিলাম। সনদ নিয়ে অনেক জায়গায় ঘুরেছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। হঠাৎ একদিন পকেট থেকে সার্টিফিকেটগুলো রাস্তায় পড়ে গেল। সেগুলো আর খুঁজে পাইনি। সার্টিফিকেটগুলো হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আমার স্বপ্নও হারিয়ে গেছে। তিনি আরো জানান, কয়েক বছর আগে কলাকোপা ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা একটি সমিতি করেছিলেন। আমি কয়েক মাস টাকা দিয়েছিলাম। কিন্তু দু-তিন মাস পর কোনো অজ্ঞাত কারণে আমার টাকা ফেরত দেয়া হয়। কিসের জন্য টাকা ফেরত দিলো তা বলেনি।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা সম্মুখযুদ্ধ করেও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেলাম না। আর অনেকে যুদ্ধ না করেও আজ মুক্তিযোদ্ধা। এরা দেশের সাথে তামাশা করছে। যুদ্ধাপরাধীদের মতো এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারও ফাঁসি হওয়া উচিত।
আবদুল খালেকের পরিবারের সদস্যরা জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও আমরা বাড়িতে ছিলাম।
কিন্তু যখন তাকে পাক বাহিনী ধরে নিয়ে যায়, তখন আমরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাই। পালিয়ে শেরপুর, শিকারীপাড়া ও কিরঞ্চিতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমাদের সাথে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। ভেবেছিলাম হয়তো মারা গেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের সাথে তার যোগাযোগ হয়। অনেক কষ্ট করেছি। কষ্ট করেও লোকটি স্বীকৃতি পেলেন না।
আবদুল খালেক শেষ বয়সে ফিরে গেছেন তার পুরনো পেশায়। রাস্তার পাশে একটি ছোট ওষুধের দোকান দিয়ে কোনো মতে সংসার চালাচ্ছেন। হারিয়ে গেছে তার মুক্তিযুদ্ধের সনদগুলো, কিন্তু মন থেকে হারিয়ে যায়নি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতার চেতনা। এখনো আশায় আছেন- মৃত্যুর আগে দেখে যেতে পারবেন গেজেটে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম।
আবদুল খালেক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জানি না, মরার আগে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবো কি না! কেউ না দেখুক, আল্লাহ আমাকে দেখবেন’ বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন ৭৩ বছরের আবদুল খালেক।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫