ঢাকা, রবিবার,২২ জানুয়ারি ২০১৭

গল্প

তুমি মুক্তিযোদ্ধার কন্যা

জোবায়ের রাজু

১০ ডিসেম্বর ২০১৬,শনিবার, ১৬:৫০


প্রিন্ট

সজলের কাছ থেকে প্রথম যেদিন প্রেমপত্র পেল মিতা, সেদিন শাকিলকে আবার মনে পড়ে গেল। এই ছেলেটা দিনের পর দিন মিতার পেছনে সময় নষ্ট করেছে। অবশেষে একদিন শাকিল তার কাছের বন্ধু জাহাঙ্গীরকে দিয়ে মিতার হাতে পৌঁছে দিয়েছে মনের সব আবেগ মেশানো সেই প্রেমপত্র। সেটি পড়ে মিতা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করল শাকিলের হৃদয়নিংড়ানো ভালোবাসা। সেই সাথে ভয়ও। ভয়টা হচ্ছে মিতার আসল পরিচয় জেনে শাকিল যদি তাকে প্রত্যাখ্যান করে। এত গভীরভাবে চিন্তা না করে শাকিলকে একদিন মিতা জানিয়ে দেয়, সে একজন নর্তকী। যাত্রাদলে নিয়মিত নাচ করার পাশাপাশি কোনো সাংস্কৃতিক জলসায় তার নাচের ডাক পড়লে চঞ্চলা দু’টি ঘুঙুর বাঁধানো পায়ের নৃত্যমুদ্রায় দর্শককে মাতিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করে।
এসব খবর শাকিলকে জানাতেই সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। হয়তো শাকিল ভেবেছে একজন নর্তকীকে কোনোভাবেই জীবনের সাথে জড়ানো যায় না। আর তাতে মিতা বুঝে নেয়Ñ শাকিল তাকে ভালোবাসেনি, ভালোবেসেছে তার রূপের কমনীয়তাকে। যদি সত্যি ভালোবাসত, তবে মিতার পরিচয় জেনেও তার পাশেই থাকত।
আজ আবার সজল এসেছে তার জীবনে। সজলও শাকিলের মতো মিতার পরিচয় জেনে অবহেলায় দূরে সরে দাঁড়াবে না তো!
রূপলাবণ্য দিয়ে অন্যকে জাদু করার ক্ষমতা মিতার আছে বলেই তো শাকিল-সজলরা মিতাকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে এগিয়ে আসে। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নময়ী প্রেয়সী একজন পেশাদার নাচিয়ে, এমন একটি ঘটনা কি শাকিল বা সজলরা মেনে নেবে? এসব ভেবে ভেবে চিন্তার মহাসাগরে তলিয়ে যায় মিতা।
সজলকে অবশ্য ভালোই লেগেছে তার। বেশ সুপুরুষ সে। শিক্ষিতও। শিক্ষিত বলেই মিতার আরো বেশি ভয়। কারণ শিক্ষিত কোনো ছেলেই জেনেশুনে একজন নর্তকীর প্রেমে পাগল হবে না। সজল মিতার প্রেমে পাগলই হয়েছে। তা না হলে রাত জেগে ভালোবাসার লম্বা চিঠিটি সে মিতাকে কেনই বা লিখে মোমিনের মাধ্যমে পাঠাবে।
চৌধুরী বাড়ির সামনে দিয়ে যে মেঠোপথটি চলে গেছে পশ্চিম দিকে, তার মোড়েই আচমকা সজলের সাথে দেখা হলো মিতার। মিতার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকার আগেই সজল বলল, ‘আমার আহ্বানে হ্যাঁ-না কিন্তু কিছুই বলনি।’ লজ্জায় রক্তিম না হয়ে মিতা অকপটে বলল, ‘আমার পরিচয় জানলে আপনি দূরে সরে যাবেন। কেননা আমি একজন নর্তকী। হাজারজনের সামনে নাচার ইতিহাস আছে আমার। এ যে আমার এক খারাপ পরিচয়।’ সজল তীক্ষ্ণস্বরে বলল, ‘তুমি নাচ করো এটা আমি জানি। কিন্তু তোমার যে আরো একটি বড় পরিচয় আছে, সেটাও আমি জানি। সেজন্যই তো তোমাকে আমি মন থেকে চাই।’ অবাক হয়ে মিতা প্রশ্ন করে- ‘আরো একটি পরিচয়? কী?’ সজল ম্লান হেসে বলল, ‘তুমি একজন মুক্তিযোদ্ধার কন্যা। এ পরিচয় ক’জনের আছে?’ নীরব হয়ে গেল মিতা। সজল তার সম্পর্কে তাহলে সব খবর জানে?
- তুমি মুক্তিযোদ্ধার কন্যা বলে তোমাকে ভালোবেসে আমি ভাগ্যবান হতে চাই। তোমার নর্তকী পরিচয় আমার কোনো সমস্যা না।
- তবুও যে আমি নর্তকী। আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবার চিকিৎসার খরচ চালাতে আমি নেচে পয়সা আয় করি। বাবা ’৭১ সালে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। পাক বাহিনীর হাত থেকে দেশকে রক্ষায় বাবারও ভূমিকা ছিল। অথচ আজ বাবার কত দুর্দিন যাচ্ছে। বাবার মতো অনেক মুক্তিযোদ্ধা আজ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কেউ তাদের খবর রাখছেন না। আমি নাচ শিখেছি। ভালো ভালো অনুষ্ঠানে আমাকে নাচতে ডাকা হয়। অনেক সম্মানীও দেয়। সেটা দিয়ে বাবার চিকিৎসার খরচ বহন করি। কিন্তু আড়ালে-অবডালে লোকে আমাকে ‘নর্তকী’ বলে অপবাদ দেয়। এবার আপনিই বলুন, আমার মতো নর্তকীকে ভালোবেসে নিজের সম্মান নষ্ট করবেন?
- না মিতা, নিজেকে এত ছোট ভাবছো কেন? আমি যেকোনো ভালো পেশাকে সম্মান করি। তুমি নেচে বাবার জন্য টাকা আয় করো। তুমি তো মহৎ কন্যা। আমি এই মহৎ কন্যাকে সারা জীবনের জন্য পেতে চাই। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই মিতা। প্লিজ না বলো না।
সজলের কথা শুনে হাঁ করে তাকিয়ে রইল মিতা। তার চোখে পানি চলে এলো। কেবল দুঃখে নয়, সুখেও মানুষ কাঁদে। মিতা আজ বড় সুখে কাঁদছে।

আমিশাপাড়া, রাজু ফার্মেসি, নোয়াখালী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫