ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

রকমারি

বিজয়ের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন

১০ ডিসেম্বর ২০১৬,শনিবার, ১৬:৪৭


প্রিন্ট

আমাদের মহান বিজয়ের চেতনা চিরজাগরূক রাখার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত কিছু ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত প্রথম ভাস্কর্য ‘জাগ্রত চৌরঙ্গি’। শিল্পী আব্দুর রাজ্জাক এটি নির্মাণ করেন। তার আরেকটি ভাস্কর্য ‘মুক্তিযোদ্ধা’। গাজীপুর জয়দেবপুর উন্মুক্ত স্থানে স্থাপিত। এ ছাড়া ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ও দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আর নানা স্থাপনা। তাহলে জেনে নিই মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত কিছু স্মৃতিচিহ্নের কথা। গ্রন্থনা : হাসান মাহমুদ রিপন

অপরাজেয় বাংলা
মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ঐতিহ্যের প্রতীক বলা হয় অপরাজেয় বাংলাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে এ ভাস্কর্যটির অবস্থান। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলার নারী-পুরুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বিজয়ের প্রতীক এই ভাস্কর্য। এর নির্মাতা মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ। অপরাজেয় বাংলার তিনটি মূর্তির সর্বডানে প্রত্যয়ী এক যোদ্ধা নারীর মূর্তি। এর পাশে কাঁধে রাইফেল, ডান হাতে দৃঢ় প্রত্যয়ে রাইফেলের বেল্ট ধরা এক যুবক যোদ্ধা। অন্যটির চোখেমুখে স্বাধীনতার চেতনা, হাতে রাইফেল। ১৯৭২-৭৩ সালে ডাকসুর উদ্যোগে অপরাজেয় বাংলার কাজ শুরু হয়। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এর নির্মাণকাজ বন্ধ থাকে। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসে পুনরায় আবার কাজ শুরু হয়। নির্মাণ শেষে একই বছর ১৬ ডিসেম্বর ভাস্কর্যটির উদ্বোধন হয়। ৬ ফুট বেদির ওপরে নির্মিত এ ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট আর প্রস্থ ৮ ফুট।

স্বাধীনতার সংগ্রাম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে ব্রিটিশ কাউন্সিল ছাড়িয়ে সামান্য দক্ষিণে সড়কদ্বীপে ছড়ানো অনেক ভাস্কর্য। এখানে ২৫ ফুট উঁচু বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের প্রতিকৃতি ছাড়াও আছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বাউল সম্রাট লালন শাহ, মরমী কবি হাছন রাজার মতো অনেক বরেণ্য ব্যক্তির ছোট ছোট ভাস্কর্য। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনেরও একটি ভাস্কর্য আছে এখানে। এগুলোরও শিল্পী ভাস্কর শামীম সিকদার। ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্যটি প্রায় ৭০ ফুট উঁচু।

সোপার্জিত স্বাধীনতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পশ্চিম পাশে সড়ক দ্বীপে ডাসের পেছনে এ ভাস্কর্যটির অবস্থান। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এ ভাস্কর্যের মাধ্যমে। ’৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার আর নিপীড়নের চিত্রও ফুটে উঠেছে এ ভাস্কর্যে। এটি নির্মাণ করেন ভাস্কর শামীম সিকদার। এতে তার সহকর্মী ছিলেন শিল্পী হিমাংশু রায়। ১৯৮৭ সালে কাজ শুরু হয় এ ভাস্কর্যের। এক বছর পরে ১৯৮৮ সালের ২৫ মার্চে এটির উদ্বোধন হয়। চার কোনাকৃতির একটি বেদির ওপর মূল ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে। পুরো ভাস্কর্যজুড়ে খচিত আছে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনার চিত্র।

স্বাধীনতাস্তম্ভ
১৯৬৯ সালে বাঙালির অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলনরত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্তি পেলে তাকে এখানেই সংবর্ধনা দেয়া হয়। রমনা মাঠের এ সমাবেশেই ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় তাকে। আবার ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনার এই রেসকোর্সের মহাসমাবেশেই বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটি দেন। নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী এখানেই নতি স্বীকার করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ এ মাঠের এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভাষণ দেন। বর্তমানে এ এলাকাটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের পর এক বিনোদনের উদ্যানে রূপ দেয়া হয়। পার্কের একাংশে স্থাপন করা হয় ঢাকা শিশুপার্ক। পরে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি স্মরণীয় করে রাখতে এখানে স্থাপন করা হয় ‘শিখা চিরন্তন’। পাকবাহিনী ১৯৭১ সালে যে জায়গাটিতে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেছিল সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘স্বাধীনতাস্তম্ভ’।

বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ
ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। মিরপুর ১ নম্বরের মাজার থেকে গাবতলী সড়কে সামান্য এগোলেই পশ্চিম পাশে বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে এটি অবস্থিত। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনী রাজাকার আলবদরদের সহায়তায় এ দেশের সূর্য সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নির্বিচারে হত্যা করে। তাদের স্মরণে ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর মিরপুরে এ স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়াও বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এলাকায় রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান এবং বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের সমাধি। কেন্দ্রীয় স্মৃতিসৌধের আদলে এখানে ৪ স্তম্ভের সাহায্যে একটি স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হয়েছে। এ স্মৃতিস্তম্ভের মাঝে বসানো হয়েছে শ্বেতপাথরের তৈরি একটি ফলক। এ স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ সৌধটির স্থপতি মোস্তফা হারুন কুদ্দুস।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে সাভারের নবীনগরে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এটি নির্মিত হয়। ঢাকা থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। এর স্থপতি সৈয়দ মঈনুল হোসেন। স্মৃতিসৌধের উচ্চতা ১৫০ ফুট। সাতটি সমদ্বিবাহু ত্রিভুজাকৃতি সমন্বয়ে স্মৃতিসৌধ গঠিত হলেও স্তম্ভগুলোর উচ্চতা ও ভূমির ক্ষেত্রফলে রয়েছে ভিন্নতা। সৌধের স্তম্ভ¢গুলো মাঝখান থেকে মোড়ানো এবং ধারাবাহিকভাবে সাজানো। স্থাপত্যটি পুরোপুরি কংক্রিটের তৈরি। স্মৃতিসৌধের দিকে তাকালেই যেন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ১৯৭১ সালে আমাদের বিজয়ের গৌরবগাথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেয়া লাখো শহীদের মুখ।

শাবাশ বাংলাদেশ
‘শাবাশ বাংলাদেশ’ ভাস্কর্য মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশ দ্বারের পাশে এবং সিনেট ভবনসংলগ্ন দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ছাত্র-শিক্ষকদের স্মৃতি ধরে রাখতে তৈরি হয় ‘শাবাশ বাংলাদেশ’ ভাস্কর্য।

ঐতিহাসিক মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে লড়াইয়ের এক অবিস্মরণীয় সাক্ষী। ১৯৭১-এর অস্থায়ী সরকারের শপথগ্রহণসহ মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে মেহেরপুর জেলা শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে মুজিবনগরে নির্মিত হয়েছে ঐতিহাসিক ‘মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ’। প্রথম মন্ত্রিপরিষদ যেখানে শপথ গ্রহণ করেছিল স্মৃতিসৌধটি সেখানে নির্মিত হয়েছে। ১৬০ ফুট ব্যাসের গোলাকার স্তম্ভের ওপর ২৩টি কংক্রিটের দেয়ালের সমন্বয়ে এ সৌধটি তৈরি। এ স্মৃতিসৌধটি নকশা করেন স্থপতি তানভীর করিম। সৌধটির পাশেই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য। একটি বিরাট মানচিত্রে ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় বেনাপোল, বনগাঁও, নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতের উদ্দেশে শরণার্থীদের স্রোতের দৃশ্য।

অঙ্গীকার
চাঁদপুর জেলার মুক্তিযোদ্ধা সড়কের পাশের লেকে হাসান আলী সরকারি হাইস্কুল মাঠের সামনে একাত্তরে শহীদ স্মরণে নির্মিত হয়েছে অঙ্গীকার। অপারেজয় বাংলার শিল্পী সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ ভাস্কর্যটির স্থপতি।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানেও অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। আমরা কতটুকু জানি, কতটুকু চিনি সোনার বাংলাকে, প্রাণের বাংলাদেশকে। কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম আমরা ভুলে যাচ্ছি, অপরিচিত হয়ে যাচ্ছি দেশে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে। বিজয়ের মাসে একটু সময় বের করে আমরা ঘুরে আসি বাংলাদেশের স্মৃতিবিজড়িত নানা স্থান থেকে। দেখে আসি নিজের চোখে, জেনে আসি ইতিহাস। আর আসুন বিজয়ের এ দিনে সবার অঙ্গীকার সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার। যেসব বৈষম্য থেকে স্বাধীনতার জন্ম সেই বৈষম্যগুলো থেকে এ জাতি বেরিয়ে আসতে আবার দৃঢ় প্রত্যয় নেবে আজ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫