ঢাকা, শনিবার,২১ জানুয়ারি ২০১৭

প্রিয়জন

মিঠালো স্বাদের হালুয়া

ইয়াছিন খন্দকার লোভা

১০ ডিসেম্বর ২০১৬,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

অনেক আগের কথা। ক্লাস সেভেনের ছাত্র আমি। আমরা তখন পুরনো বাড়িতে থাকতাম। যে ঘটনাটা আজ বলছি সেটা একটা উৎসবকে ঘিরে। আমাদের দেশের মুসলমানেরা সাধারণত এ উৎসবটি পালন করে থাকেন। উৎসবটির নাম শবেবরাত। ওই দিন সব মুসলিম পরিবারের সদস্যরা রাতে ইবাদত-বন্দেগিরত থাকেন, আর দিনে করেন হালুয়া-রুটির আয়োজন। ঠিক তেমনি আয়োজনকে সামনে রেখে সেদিন বিকেল বেলা বাড়িতে হালুয়া-রুটি তৈরি করার পর আম্মা বললেন, মাগরিবের নামাজের পর যেন সব ভাইবোনেরা একসাথে বসে খাই। 
আম্মার কথাটা আমিও শুনেছি। কিন্তু মন মানছিল না কিছুতেই। আম্মা রান্নাঘর থেকে হালুয়ার পাতিল ঘরে এনে একটি কাঠের শেলফের ওপর রাখলেন। পুরো ঘর হালুয়ার ঘ্রাণে ভরে গেল। আম্মাকে ফাঁকি দিয়ে কিভাবে হালুয়া খাওয়া যায়, সে পথ খুঁজছিলাম। আম্মা আমাকেসহ সব ভাইবোনদের ঘর থেকে বের করে বাইরে খেলতে যেতে বললেন। তারপর আম্মা ঘরের দরজা ভেতর দিয়ে ছিটকানি লাগিয়ে সামনের দরজা টেনে দিয়ে ছোট চাচীর সাথে দেখা করতে গেলেন। 
আমি ছাড়া বাকি ভাইবোনেরা খেলতে চলে গেছে বাড়ির বাইরে। আর আমি! আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি কিভাবে চুরি করে হালুয়া খাওয়া যায়। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরে পেছন দিয়ে পরে বাড়ি ফিরে এলাম। দেখলাম ঘরের আশেপাশে কেউ নেই। সামনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকতে গেলে নিশ্চিত ধরা পড়ে যাব। তাই বুদ্ধি করে পেছনের দরজা খুলে অনেক কষ্টে ভেতরে প্রবেশ করলাম। ঘরে ঢুকে খুঁজে পেলাম হালুয়ার পাতিল। বিড়ালে খাওয়ার ভয়ে হালুয়ার পাতিল আম্মা একটা কাঠের শেলফের ওপরে রেখেছেন। কাঠের শেলফটি আমার উচ্চতা থেকে আরেকটু ওপরে। তাই কসরত শুরু করে দিলাম পাতিলটাকে নিচে নামাতে। সে বেশ মজার ঘটনা। পাতিলটা একবার ছুঁতে পারি তো আরেকবার ছুঁতে পারি না। এ অবস্থায় পড়ে মনে খুব ভয় হচ্ছিল। আম্মা যদি ঘরে ফিরে আমাকে এ অবস্থায় দেখে ফেলেন তাহলে আর রক্ষা নেই। তাই শেষবারের মতো দু’পায়ের বৃদ্ধ আঙুলে ভর করে দাঁড়িয়ে পাতিলের মাথার দিকটায় ছুঁতে পারলাম। মনে বেশ আনন্দ ফিরে পেলাম। 
কিন্তু বিধিবাম হয়ে দাঁড়াল। হালুয়ার পাতিলটা নিচে নামল ঠিকই তবে উপুর হয়ে! নামাল আমার মাথার ওপর দিয়ে বেয়ে বেয়ে মুখ হয়ে পুরো শরীরে। আহ! কি গরম হালুয়া। হালুয়া খাওয়ার অনুভূতিটা মুখে না নিতে পারলেও তখন মাথাসহ পুরো শরীরে অনুভব করতে লাগলাম। পুরো শরীরে গরম হালুয়ার ছ্যাঁকা লাগল। এদিক-সেদিক না তাকিয়ে মুহূর্তেই হালুয়া খাওয়ার কথা ভুলে গিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে দৌড়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম ছোট পুকুরে। পুকুরের পানিও তখন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ছিল। একে তো গায়ে গরম হালুয়া, অন্য দিকে পুকুরের পানিটাও ভীষণ ঠাণ্ডা। আহ! হালুয়া খাওয়ার স্বাদই আলাদা! গরম- মিঠিলো হালুয়া। তারপর চটজলদি গোসল সেরে পরনের ভেজা লুঙ্গিটাকে ঘর থেকে একটু দূরে লুকিয়ে শুকাতে দিলাম। ঘরে ফিরে শুকনো লুঙ্গি পরে হালুয়াগুলো যেভাবে পড়ে আছে সেভাবে রাখলাম। পেছন দরজাটাকে অনেক কষ্টে বন্ধ করে সোজা মাঠে খেলতে চলে গেলাম। 
খেলা মাথায় উঠলো। ভাবতে লাগলাম হালুয়ার অবস্থা টাইট দেখে আম্মা না জানি কতখানি চেচাঁমেচি করছেন। তারপর মাগরিবের সময় আমি ঘরে ফিরলাম। সেদিন কারো ভাগ্যে আর হালুয়া খাওয়া জুটলো না। আমি যে নিজেই চোর সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে ঘুরঘুর করছিলাম। কিন্তু আম্মা দোষী করলেন বিড়ালকে। রাগ করে আম্মা আর হালুয়া রাঁধলেন না সেদিন। আম্মা বললেন, বিড়ালের জন্য আজ আমরা হালুয়া খেতে পারিনি। অথচ কাজটা যে আমি ঘটিয়ে ছিলাম সে কথা আম্মা জানলে সেদিন পিঠে পাটের বস্তা বেঁধে নেয়া লাগত। আজ আম্মা নেই। কিন্তু সে দিনের ঘটনাটা আজো মনে আছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫