ঢাকা, রবিবার,২২ জানুয়ারি ২০১৭

আলোচনা

আগাথা ক্রিস্টি : যার বই বিক্রি হয়েছে দু শ’ কোটি কপির বেশি

ড. আবু এন এম ওয়াহিদ

০৮ ডিসেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ০৩:২২


প্রিন্ট

ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে গিয়ে হঠাৎ নজর কাড়ল আগাথা ক্রিস্টির ওপর একটি লিঙ্ক। আগাথা ক্রিস্টির নাম শুনেছি, কিন্তু কেন তিনি এত বিখ্যাত, সেটা আমার অজানা; কোনো দিন জানার চেষ্টাও করিনি। ভাবলাম, দেখি তো আগাথা ক্রিস্টি কে ছিলেন? কোন জগতের মানুষ ছিলেন তিনি? কী এমন মহৎ কাজ করে অমর হয়ে আছেন আজো? লিঙ্কটি ক্লিক করে তার জীবনীর ওপর মাত্র দুই মিনিট চোখ বুলিয়েই আমি বিস্মিত ও অভিভূত না হয়ে পারলাম না। কতক্ষণ চোখ বুজে ভাবলাম, এক জীবনে একজন মানুষের পক্ষে এ-ও কি সম্ভব? কী করে?
তিনি সাহিত্য জগতের একজন অসাধারণ সৃষ্টিশীল, জনপ্রিয়, সার্থক ও খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। তিনি লিখেছেন ৬৬টি গোয়েন্দা উপন্যাস, ১৪টি ছোটগল্প সঙ্কলন, একটি কাব্যগ্রন্থ, ১৬টি নাটক ও একটি সম্পাদিত বই। এ ছাড়াও মেরি ওয়েস্টম্যাকট ছদ্মনামে তিনি রচনা করেছেন আরো ছয়টি রোমান্টিক উপন্যাস, দু’টি করে কবিতা ও আত্মজীবনীমূলক বই। হয়তো বলতে পারেন, এতে আবার অবাক হওয়ার কী আছে? এর চেয়ে বড় লেখক তো দেশ-বিদেশে আরো অনেকেই আছেন। এমনকি বাংলা সাহিত্যেও এমন একাধিক লেখক আছেন, যাদের বই সংখ্যার দিক থেকে আগাথা ক্রিস্টিকে ছাড়িয়ে গেছে।
অন্যান্য সফল লেখকের সাথে আগাথা ক্রিস্টির পার্থক্য ও কৃতিত্ব কেবল তার লিখিত ও প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দিয়ে মাপা যাবে না। তাকে মূল্যায়ন করতে হলে জানতে হবে পাঠকদের কাছে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা কতখানি ছিল। এ পর্যন্ত আগাথা ক্রিস্টির বই বিক্রি হয়েছে ২০০ কোটি কপির ওপরে। কোনো কোনো জরিপ অনুযায়ী, কাটতির হিসেবে বাইবেল ও শেক্সপিয়ারের বইয়ের পরই আগাথা ক্রিস্টির স্থান। আবার কারো কারো মতে, গুণে মানে শেক্সপিয়ারের সাহিত্যকর্ম যত উঁচুতেই থাকুক না কেন, তার বই আগাথা ক্রিস্টির মতো বাজারে এতটা চলেনি। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, বাইবেল এ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৪০০ কোটি কপির মতো। আগাথা ক্রিস্টির সবচেয়ে জনপ্রিয় বই অহফ ঞযবহ ঞযবৎব ডবৎব ঘড়হব বিক্রি হয়েছে ১০ কোটি কপি। পৃথিবীর অন্য কোনো লেখকের কোনো একটি বই এত কপি বাজারে বেচাকেনার কোনো নজির নেই।
এখানেই শেষ নয়, ‘দি মাউসট্র্যাপ’ শিরোনামে আগাথা ক্রিস্টির একটি নাটক লন্ডনের বিখ্যাত অসনধংংধফড়ৎ’ং ঞযবধঃৎব ঐধষষ-এ প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৫২ সালে এবং বিরতিহীনভাবে এর শো এখনো চলছে। ২০০৯ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে ২৫ হাজার বারেরও বেশি। শেক্সপিয়ার বাদে দুনিয়ায় অন্য কোনো নাট্যকারের নাটক, দর্শকেরা দর্শনীর বিনিময়ে এভাবে পাগল হয়ে দেখছে বলে জানা নেই। তার বিভিন্ন বই ১০৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ ব্যাপারেও তার রেকর্ড এখনো কেউ ভাঙতে পারেননি।
১৮৯০ সালে ইংল্যান্ডের টর্কিতে অবস্থিত অ্যাশফিল্ড ম্যানশনে এক ধনাঢ্য পরিবারে আগাথা ক্রিস্টির জন্ম হয়। তার মা ক্ল্যারা বোহমার ছিলেন আইরিশ বংশোদ্ভূত, বাবা ফ্রেডরিক বোহমার জন্মসূত্রে আমেরিকান; যিনি যথেষ্ট টাকা-পয়সার মালিক একজন সফল স্টক ব্রোকার ছিলেন। বিত্তশালী বাবার সন্তান হিসেবে আগাথা ক্রিস্টি প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হয়েছেন। গৃহশিক্ষকের কাছে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। ইংরেজি ও অঙ্কের সাথে সাথে বাবা-মা তাকে মাস্টার রেখে সঙ্গীতও শিখিয়েছেন। তিনি পিয়ানো ও ম্যান্ডেলিন বাজাতে পারতেন। ছোটবেলা থেকে পড়ালেখার পরিবেশে একজন বইপাগল মানুষ হিসেবেই তার বেড়ে ওঠা। তিনি হাতের কাছে যা পেতেন তাই পড়তেন। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালেও বাল্যকালের সুখের জীবন তার বেশি দিন টেকেনি। কারণ তার বাবা ছিলেন হার্টের রোগী। একাধিকবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। এমনই এক প্রাণঘাতী আক্রমণে ১৯০১ সালে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তখন আগাথা ক্রিস্টির বয়স মাত্র ১১।
পরবর্তী কয়েক বছর আগাথা ক্রিস্টির মা, বোন ও তার খুব খারাপ সময় কেটেছে। সঙ্কট কাটিয়ে তার মা যখন সব কিছু গুছিয়ে আনেন, তখন তিনি (আগাথার মা) অসুস্থ হয়ে পড়েন। সময়টা ১৯১০ সাল। এ অবস্থায় হাওয়া বদলের উদ্দেশ্যে পুরো পরিবার, অর্থাৎ মা ও দুই মেয়ে মিসরের রাজধানী কায়রোতে চলে যান এবং তিন মাস কায়রোর ‘গেরিজা প্যালেস হোটেল’-এ অবকাশ যাপন করেন। কায়রোতে থাকার সুবাদে তিনি গিজা অঞ্চলে গিয়ে কাছ থেকে পিরামিড দেখার সুযোগ পেয়েছেন। এ থেকেই হয়তো বা প্রতœতত্ত্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর তার বিশেষ আগ্রহ ও কৌতূহল জন্মে।
কায়রো থেকে ফিরে এসে তিনি তার লেখালেখির জগৎকে কবিতা ও সঙ্গীতে বিস্তৃত করেন এবং অপেশাদার শিল্পী হিসেবে থিয়েটারে অভিনয় করতে শুরু করেন। নিজের লেখা কবিতা ও উপন্যাস ছাপানোরও চেষ্টা করেন। এ কাজে প্রথম দিকে সফলতার চেয়ে তার ব্যর্থতার পাল্লাই বেশি ভারী। তবে তিনি নিরাশ হননি। চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এর মাঝে আগাথা ক্রিস্টি বিয়ের জন্য মনের মানুষও খুঁজতে থাকেন এবং একজনকে পেয়েও যান। ১৯১৪ সালে আগাথা ক্রিস্টি বিয়ে করেন আর্চিবল্ড ক্রিস্টি নামে ‘রয়েল ফ্লায়িং কোর’-এর এক বৈমানিককে। আর্চিবল্ডের জন্ম ব্রিটিশ ভারতে, তার বাবা তখন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের অধীনে জজ ছিলেন। ফ্লায়িং কোরে যোগ দেয়ার আগে আর্চিবল্ড ব্রিটিশ আর্মিতে ছিলেন।
তাদের বিয়ের কিছু দিন পরই প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মিত্রশক্তির হয়ে জার্মানদের বিরুদ্ধে লড়তে আর্চিবল্ড ফ্রান্সে চলে যান। এ দিকে আগাথা ক্রিস্টিও স্বদেশের মাটিতে থেকে যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। সম্মুখ সমরে নার্স ও ফার্মাসিস্ট হিসেবে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে যুদ্ধাহত সৈনিকদের সেবাযতœ করতে শুরু করেন। আগাথা ক্রিস্টি তার জীবনের ওই সময় ও স্বেচ্ছাশ্রমকে বহুবার গর্বভরে স্মরণ করেছেন। বিনে পয়সায় মানুষের সেবা করে কোনো মানুষকে আফসোস করতে শুনিনি। ‘মানুষের জন্যই মানুষ’ কথাটি বারবার প্রমাণিত হওয়ার পরও ‘আমরা সবাই মানুষ হতে পারি না!’ খুব আগ্রহ নিয়ে বিয়ে করলেও আর্চিবল্ড-আগাথার বিবাহিত জীবন বেশি দিন টেকেনি। বিয়ের বারো-তেরো বছরের মাথায় আর্চিবল্ডের পরকীয়ার কথা জানাজানি হওয়ার পর ১৯২৮ সালে আগাথা ক্রিস্টি এ বিয়ে ভেঙে দেন।
যুদ্ধ চলাকালে আগাথা ক্রিস্টির বোন তার প্রতি গোয়েন্দা উপন্যাস লেখার এক অভিনব চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। আগাথা ক্রিস্টি সাহসের সাথে বোনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং লিখেন, ঞযব গুংঃবৎরড়ঁং অভভধরৎ ধঃ ঝঃুষবং। এটা তার প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাস। বইটি পর পর দুই প্রকাশক নাকচ করে দেয়ার পর, তৃতীয় জনের অনুগ্রহে ১৯২০ সালে ছাপা হয়। কিন্তু বাজারে খুব একটা সফলতার মুখ দেখেনি। হতাশায় তিনি দমে যাওয়ার পাত্র নন। একের পর এক লিখে যেতে থাকেন।
লেখালেখির ব্যস্ততার মাঝে আগাথা ক্রিস্টি ১৯৩০ সালে মেসোপটেমিয়ার (বর্তমানে ইরাকের অন্তর্গত) ‘ঊর’ অঞ্চলে প্রতœতাত্ত্বিক খননকার্য দেখতে যান। সেখানে তার সাথে ম্যাক্স ম্যালোওয়ান নামে এক তরুণ প্রতœতত্ত্ববিদের পরিচয় হয়। সে পরিচয় থেকে তাদের র্পাস্পরিক ভালো লাগা এবং অল্প দিনেই সেই ভালো লাগা বিয়েতে গিয়ে পরিণতি পায়। জীবনীকারকদের মতে, তাদের এ বিয়ে সুখের হয়েছিল। আগাথা ক্রিস্টির একমাত্র মেয়েসন্তান রোজালিন্ড হিক্সের জন্ম হয়েছিল তার প্রথম স্বামী আর্চিবল্ড ক্রিস্টির ঔরসে। ‘ঊর’ থেকে আগাথা ক্রিস্টি তার গঁৎফবৎ রহ গবংড়ঢ়ড়ঃধসরধ (১৯৩৬) ধহফ উবধঃয ড়হ ঃযব ঘরষব (১৯৩৭) বইগুলোর প্লট পান। ওই সময় তিনি সিরিয়া সফর করেন। তার সিরিয়া অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে তিনি লিখেছেন ঈড়সব, ঞবষষ গব ঐড়ি ণড়ঁ খরাব (১৯৪৬)। তারপর আগাথা ক্রিস্টি তুরস্কেও গিয়েছেন। সেখানে তিনি ইস্তাম্বুলের ‘পেরা প্যালেস হোটেল’কক্ষে বসেই লিখেছেন তার বিখ্যাত উপন্যাস গঁৎফবৎ ড়হ ঃযব ঙৎরবহঃ ঊীঢ়ৎবংং (১৯৩৪)।
আগাথা ক্রিস্টির সৃষ্ট বিপরীতধর্মী দু’টি চরিত্র জনপ্রিয়তায় সব যুগের সব রেকর্ড ভাঙতে সফল হয়। এর মধ্যে প্রথমটি হলো ‘হারকিউল পয়ওয়ারো’- যুদ্ধতাড়িত এক বেলজিয়ান শরণার্থী এবং দ্বিতীয়টি, ‘মিস জেইন মার্পল’- ঐতিহ্যবাহী এক গেঁয়ো ব্রিটিশ নারী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আগাথা ক্রিস্টি লন্ডন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করেন। এতে করে তিনি বিভিন্ন ধরনের বিষ জাতীয় রাসায়নিক বস্তুর সাথে পরিচিত হন। পরে গোয়েন্দা উপন্যাস লিখতে তিনি তার এ বিজ্ঞান সফলতার সাথে প্রয়োগ করেন।
১৯৭১ থেকে আগাথা ক্রিস্টির শরীর ভেঙে পড়তে শুরু করে। তিনি বুঝতে পারেন তার হাতে আর বেশি সময় নেই। অবনতিশীল শরীর নিয়েই লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকেন। কারো কারো মতে, ওই সময় তিনি আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ায় ভুগছিলেন। ১৯৭৬ সালের ১২ জানুয়ারি ৮৫ বছর বয়সে আগাথা ক্রিস্টি মারা যান। এই কীর্তিমান মানুষটি দীর্ঘ দিন বর্ণাঢ্য জীবন যাপন করেছেন। সাফল্য আর সার্থকতা জীবনভর দু’হাতে কুড়িয়েছেন। মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও প্রশংসায় সিক্ত হয়েছেন বারবার। কিন্তু দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন নীরবে-নিস্তব্ধে, অত্যন্ত সাদামাটাভাবে। তার শব শোভাযাত্রায় লাখ-কোটি ভক্ত ও অনুরাগীর কেউই ছিলেন না। মাত্র ২০ জন সাংবাদিকের উপস্থিতিতে এত বড়মাপের একজন মানুষের কফিন কবরে নামানো হয়। নিশ্চয়ই এ ছিল তার অন্তিম ও ঐকান্তিক ইচ্ছা। আগাথা ক্রিস্টি কেন এমন অনাড়ম্বর শেষ বিদায় বেছে নিলেন, সে রহস্য সবার কাছে অজানাই রেখে গেলেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫