ঢাকা, রবিবার,২২ জানুয়ারি ২০১৭

প্যারেন্টিং

প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা ও তার চিকিৎসা

ডা: জিল্লুর কামাল

০৬ ডিসেম্বর ২০১৬,মঙ্গলবার, ১৬:২৩ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৬,মঙ্গলবার, ১৬:৪১


প্রিন্ট

সন্তান প্রসবের পর মা (অথবা বাবা) বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলে তাকে প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা বলে। কোনো কোনো সময় বিষণ্ণতাগ্রস্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ থাকে বা বিষণ্ণতার মাত্রা থাকে মৃদু। এসব ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের পরামর্শ ও সাপোর্ট পেলে মা সুস্থ হয়ে ওঠেন। অনেক ক্ষেত্রে বিষণ্ণতার মাত্রা থাকে তীব্র ধরনের, দীর্ঘদিন ধরে তা স্থায়ী হয় এবং অন্যদের সাপোর্ট পেলেও তা কেটে যায় না। এসব ক্ষেত্রে বুঝতে হবে মা প্রসবোত্তর বিষণ্ণতায় ভুগছেন। তাদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা প্রয়োজন।

প্রসবোত্তর বিষণ্ণতার প্রকোপ কেমন?
কম না। ১০ জন মায়ের মধ্যে একজন এ অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে মা মাসের পর মাস এ অসুস্থতায় ভুগতে থাকেন।
সাধারণত সন্তান জন্মের এক মাসের মধ্যে এ সমস্যা শুরু হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের ছয় মাসের মধ্যে যেকোনো সময় রোগটি দেখা দিতে পারে।

কী করে বুঝবেন মা প্রসবোত্তর বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়েছে?
মায়ের আচার-আচরণে কিছু পরিবর্তন থেকে তার রোগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জানা যাবে।
এসবের মধ্যে-

বিষণ্ণ বোধ করা : মা দিনের অধিকাংশ সময় মনমরা ও বিষণ্ণ বোধ করেন। এ বোধ দিনের নির্দিষ্ট সময়ে (সকাল বা বিকেলে) কম-বেশি হতে পারে। কখনো কখনো কয়েক দিনের জন্য একটু ভালো বোধ করলেও আবার বিষণ্ণতা জেঁকে বসে। অনেক সময় মায়ের মনে হয় এ বেঁচে থাকার কোনো অর্থ হয় না।

খিটমিটে ভাব : মা খুব বদমেজাজি হয়ে পড়েন। সামান্য বিষয়ে খিটমিটিয়ে ওঠেন। ছেলেমেয়ে এমনকি ছোট শিশুটির প্রতিও তার বিরক্তির শেষ থাকে না। অন্যরা তার বিরক্তি দেখে হতভম্ব হয়ে যান।

ক্লান্ত বোধ করা : মা অস্বাভাবিক পরিমাণে ক্লান্ত বোধ করেন। নিজেকে বিপন্ন-বিধ্বস্ত মনে হয়।

অনিদ্রা : ঘুমানোর উপযুক্ত পরিবেশ থাকলেও মা ঘুমাতে পারেন না, তার ঘুম আসে না। তিনি রাতের পর রাত জেগে থাকেন।

ক্ষুধামন্দা : মায়ের ক্ষুধা-তৃষ্ণা বোধ কমে যায়। তিনি খাবার খেতে আগ্রহবোধ করেন না। না খেয়ে থাকাটা তার খিটখিটে মেজাজের একটা কারণ হতে পারে।

উপভোগ না করতে পারা : আগে ভালো লাগত এমন বিষয়গুলোও মা আর উপভোগ করতে পারেন না। এটি বিশেষত দেখা যায় যৌনক্রিয়ার ক্ষেত্রে। সব কিছু ঠিক থাকার পরও তিনি যৌনক্রিয়ায় কোনো আগ্রহ বোধ করেন না।

নিয়ন্ত্রণহীনতা : সময়, কাজ কোনো কিছুর ওপরই যেন মায়ের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এত কাজ কখন করব বা কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারব কি-না, এমন সন্দেহে মা অস্থির হয়ে ওঠেন।

অপরাধ বোধ : মায়ের চোখে সবকিছুই নেগেটিভ অর্থে ধরা দেয়। কাজ করতে না পারা, সন্তানের যত্ন নিতে না পারা, নিজের অসুস্থতা- সব বিষয়ে মা নিজেকে দায়ী মনে করে অপরাধ বোধে ভুগতে থাকেন।

দুশ্চিন্তা বোধ করা : শিশু লালন-পালনের সাথে সতর্কতার প্রশ্ন জড়িত। কিন্তু এ অসুস্থতায় আক্রান্ত মা অতি সতর্কতায় ভোগেন। শিশু ঠিকমতো খাচ্ছে তো, শিশু শ্বাস নিচ্ছে তো, শিশুর মুখটা এমন কুচকালো কেন ইত্যাদি অহেতুক দুশ্চিন্তায় মা অস্থির থাকেন সবসময়। অনেক সময় তিনি শিশুটির সঠিক যত্ন নিতে পারবেন কি-না, হঠাৎ হাত থেকে ফেলে দেবেন কি-না, শিশুটি মেরেই ফেলেন কি-না ভুলভাবে কিছু করে এ ভয়ে তিনি কাঁটা হয়ে থাকেন।

এ রোগ কী কারণে হয়?
এ রোগের উৎপত্তির পেছনে কোনো একটিমাত্র কারণ বিদ্যমান বলে মনে হয় না। অনেক কারণের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় এ রোগের উৎপত্তি।
সন্তান প্রসবের পর মায়ের শরীরে হঠাৎ করে হরমোনের যে তারতম্য ঘটে তা এ রোগ সৃষ্টির একটি অন্যতম কারণ। এ ছাড়া আরো যেসব বিষয় এ রোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে সেসব হচ্ছে পূর্ববর্তী সন্তান জন্মের পর এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস, স্বামী যথেষ্ট সাপোর্টিভ না হওয়া, সদ্যোজাত সন্তান অসুস্থ থাকা, বিভিন্ন মানসিক চাপে থাকা, স্বামী অথবা রোগিণীর নিজের চাকরি ক্ষেত্রে সমস্যা, আর্থিক সমস্যা, লোকসানের সম্মুখীন হওয়া ইত্যাদি। এ রোগের চিকিৎসা না করলে কোনো সমস্যা আছে?
প্রথমত যেহেতু এ রোগের কারণে মায়ের কর্মক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা কমে যায়, তাই সন্তান প্রয়োজনীয় যত্ন পায় না। ফলে সন্তানের স্বাস্থ্যহানির সম্ভাবনা থাকে। সংসারের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। অনেক সময় মায়ের বিষণ্ণতা এত গভীর হয় যে, তিনি আত্মহত্যার কথা চিন্তা করেন। সে ক্ষেত্রে মা প্রথমে শিশুকে হত্যা করে পরে নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারেন।

এ রোগের চিকিৎসা কী?
রোগটি ধরতে পারাই চিকিৎসার প্রথম শর্ত। কাক্সিক্ষত সন্তান জন্মের পরও একজন মায়ের মনে বিষণ্ণতা বাসা বাঁধতে পারে, এ বিষয়টি কারো মাথায়ই আসে না। মা নিজেও তার অনুভূতির এ পরিবর্তনের জন্য সংকোচবোধ করেন। ফলে তিনিও বিষয়টি প্রকাশ করতে চান না। ফলে অধিকাংশ মা মাসের পর মাস এ অসুস্থতায় কষ্ট পেতে থাকেন। সুতরাং শিশু জন্মের পর মায়ের আচার-আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সাধারণ সাইকোথেরাপি ও ওষুধের যৌথ প্রয়োগের মাধ্যমে এ রোগের চিকিৎসা করা হয়। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির মাধ্যমে রোগীর ভ্রান্ত ধারণাকে চিহ্নিত করা হয় ও তার বদলে সুস্থ ও বাস্তবসম্মত ধারণা গঠনে সাহায্য করা হয়। বিভিন্ন ধরনের বিষণ্নতাবিরোধী ওষুধ যেমন- অ্যামিট্রিপটাইলিন, ফ্লুক্সেটিন, সারট্রালিন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।

চেম্বার : মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, সুখীমন, সোনারগাঁও রোড, হাতিরপুল

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫