ঢাকা, শুক্রবার,২৩ জুন ২০১৭

ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব

শাহজাহান বিশ্বাসের সবুজ বিপ্লব

আব্দুর রাজ্জাক ঘিওর, মানিকগঞ্জ

০৩ ডিসেম্বর ২০১৬,শনিবার, ১৫:১৯


প্রিন্ট

মানবকল্যাণে কিছু করার মধ্যে যে প্রশান্তি তা কোটি টাকা দিয়ে পাওয়া সম্ভব না। যখন গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে যাই তখন দেখি গাছের ছায়ার নিচে বসে অনেক কৃষক বিশ্রাম নিচ্ছে, তখন মনে হয় আমি সফল। আমার নতুন প্রজন্মের প্রতি একটাই আহব্বান- সোনার বাংলাদেশ গড়তে গেলে সবুজের বাংলাদেশ গড়তে হবে

ছায়া ঢাকা পাখিডাকা গ্রাম মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের কৌড়ি গ্রাম। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই সুশৃঙ্খল বৃক্ষরাজি। গাঁয়ের আঁকাবাঁকা পথের দু’পাশে ফলদ, বনজ ও ঔষধী বৃক্ষে পূর্ণ সবুজের সমাহার। যেন শিল্পীর পটে আঁকা এক ছবি। এমন নজরকাড়া বৃক্ষের সাজে সজ্জিত দৃশ্য, যে কোন মানুষের মনে তৈরি হবে গভীর ভালোবাসার। নয়নাভিরাম এই সবুজ বৃক্ষরাজির রচয়িতা এ গ্রামের সন্তান শাহজাহান বিশ্বাস।
শাহজাহান বিশ্বাসের বৃক্ষের প্রতি শখ্যতা শুরু ১৯৭৯ সালের দিকে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত সড়ক, খালেরপাড়, গ্রামের কাঁচা পথের দু’ধারে গোরস্থান, শ্মশান, বাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে এবং অন্যের পতিত জমিতে ৬০ হাজারের অধিক গাছের চারা রোপণ করছেন। শুধু চারা রোপণ করেই তার কাজের সমাপ্তি হয় না। চারা পরিচর্যা, পানি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, বেড়া দেয়া থেকে শুরু করে পরিপূর্ণ বৃক্ষে পরিণত করা পর্যন্ত যাবতীয় কাজগুলো তিনি ৩৭ বছর ধরে নিয়মিতভাবেই করে যাচ্ছেন অতি যতেœর সাথে।
সুন্দর পরিবেশ রক্ষায় মানিকগঞ্জের এই বৃক্ষপ্রেমিক ‘শাহজাহান বিশ্বাস’ তার নিজ কর্মগুণে হয়ে উঠেছেন অন্যন্য, পেয়েছেন খ্যাতি আর মানুষের ভালোবাসা।
সরজমিন ঝিটকার কৌড়ি এলাকার গিয়ে দেখা গেছে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও মসজিদসহ রাস্তার দু’পাশে বিভিন্ন প্রকারের গাছ রোপণ করছেন তিনি। তার দেখাদেখি কৌড়িসহ আশপাশের গ্রামের প্রায় সবাই তাদের বাড়ির আঙিনায় গাছ রোপণ করছেন।
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার কৌড়ি এলাকার মৃত ওবায়দুদ বিশ্বাসের ছোট ছেলে ৬২ বছর বয়সী শাহজাহান বিশ্বাস। সবার কাছে যিনি ‘গাছ শাহজাহান’ নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের জন্য পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশকে স্বাধীন করেন। এরপর ১৯৭৬ সালে চলে যান দেশের বাইরে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। এরপর দীর্ঘ দিন বিদেশ ভ্রমণ শেষে ১৯৭৯ সালে আবার চলে আসেন নিজ গ্রাম কৌড়িতে। এসে তিনি নিজ অর্থে প্রথমে গ্রামের স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা এরপর রাস্তার দু’পাশে শুরু করেন গাছ রোপণ। প্রথম দিকে কিছু প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে হয় তাকে। শুরুর দিকে শাহজাহানের পরিবার ও সমাজের কেউ ভালোভাবে নেয়নি এ কাজটি। গাছপ্রেমী শাহজাহান তবুও থেমে যায়নি, সে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যায়। আজও তিনি নিঃস্বার্থভাবে একের পর এক গাছ রোপণ করছেন। এ পর্যন্ত ৬০ হাজারের অধিক গাছ রোপণ করেছেনতিনি। এদিকে বৃক্ষপ্রেমী শাহজাহান বিশ্বাসকে অনুসরণ করে হরিরামপুর উপজেলার কৌড়িসহ আশপাশের গ্রামের ছোট বড় সবাই তাদের বাড়ির আঙিনায় রোপণ করছে আম, জাম, লিচু, লেবু ও মালটাসহ নানা রকমের ফলের গাছ। আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষ প্রায় ২০ লক্ষের বেশি গাছ রোপণ করেছে।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য গাছ রোপণ করতে হয়, জীবনের নানা প্রয়োজনে, নানা সঙ্কটে এই গাছই যে কতভাবে উপকারে আসে মানুষের তা বোঝাতে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। কৌড়ি এলাকার গ্রামজুড়ে রাস্তার দু’পাশে গাছ লাগানোর কারণে মানিকগঞ্জসহ আশপাশের জেলার মানুষের কাছে এই স্থানটি দর্শনীয় হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। এ কারণে চলচ্চিত্র পরিচালক এবং টিভি নাট্যকাররা তাদের চলচ্চিত্র ও নাটকের শুটিং করতে আসছেন এই সবুজ গ্রামে। এই গ্রামের সোন্দর্য্য বর্ধনের জন্য সেগুন, মেহগনি, আকাশমনি, নিম, হরতকী ও কাঠবাদামসহ বিভিন্ন প্রকারের বৃক্ষ রোপণ করা হচ্ছে কৌড়ি গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথে।
সোনাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মফিজুল ইসলাম বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন স্কুলের মাঠে খেলতে নামতে পারতাম না রোদের কারণে। শাহজাহান ভাই নিজ উদ্যোগে স্কুলের চার পাশে বিভিন্ন প্রকার গাছ রোপণের কারণে ছায়া পড়ছে স্কুলমাঠে। ফলে স্কুলের শিশুরা ছায়ায় খেলাধুলা করতে পারছে।
কৌড়ি গ্রামের তাহেজ মিয়া বলেন, রাস্তার পাড়ে আমার ১১ শতাংশ জায়গা আছে। আর সেই রাস্তার পাশে শাহজাহান ভাই ১০ বছর আগে ১৪টি গাছ রোপণ করছিল। গত বছর সেই ১৪টি গাছ বিক্রি করে আমি একটি জায়গা ক্রয় করে বাড়ি করেছি। মেয়ের বিয়ে দিছি। আমার মতো আরো অনেকে শাহজাহান ভাইয়ের রোপণ করা গাছ বিক্রয় করে নিজেদের অনেক প্রয়োজন মিটিয়েছেন।
বৃক্ষপ্রেমিক ‘গাছ শাহজাহান’ বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি আর সেই স্বাধীনতা আনছি ঠিক আছে। স্বাধিকার অর্জন করতে গেলে তো অনেক পরিশ্রম করা প্রয়োজন। উদ্ভিদ আর প্রাণী এমনভাবে জড়িত ওরা ছাড়া আমরা নিরুপায়। আমরা ছাড়া ওরা নিরুপায়। মানুষতো প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমাদের বেঁচে থাকার জন্য যে পরিমাণ উদ্ভিত প্রয়োজন সেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না তাহলে তো এই দেশ একসময় মরুভূমি হয়ে যাবে। আমরা প্রাণীকুলের যারা তারা তো ধ্বংসের কুলে গিয়ে দাঁড়িয়ে যাবো। আর আমি যেভাবে গাছ রোপণ করছি বাংলাদেশের প্রত্যেকটি শাহজাহানরা এভাবে গাছ রোপণ করত তা হলে তো আমরা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হয়ে যেতাম। সোনার বাংলাদেশ চাইতে গেলে, ডিজিটাল, সমৃদ্ধশালী দেশ করতে গেলে তো ইন্ডাস্ট্রিজ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, গাছও একটা ইন্ডাস্ট্রিজ, সারা দেশে যদি এভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী গাছ রোপণ করা যায় তা হলে কোনো অভাব থাকবে না। এই দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য কখনো নষ্ট হতো না। শাহজাহান বিশ্বাস আপ্লুত হয়ে আরো বলেন, মানবকল্যাণে কিছু করার মধ্যে যে প্রশান্তি তা কোটি টাকা দিয়ে পাওয়া সম্ভব না। যখন গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে যাই তখন দেখি গাছের ছায়ার নিচে বসে অনেক কৃষক বিশ্রাম নিচ্ছে, তখন মনে হয় আমি সফল। আমার নতুন প্রজন্মের প্রতি একটাই আহব্বান- সোনার বাংলাদেশ গড়তে গেলে সবুজের বাংলাদেশ গড়তে হবে।
এই বিষয়ে জেলা বন কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, শাহজাহান বিশ্বাসের গাছ লাগানোর খবর আমরা জানতে পেরেছি। তার এই মহৎ উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। শাহজাহানের মতো দেশের মানুষ যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী গাছ রোপণ করত তাহলে সবুজে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে আমাদের তেমন সময় লাগত না। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য শাহজাহান বিশ্বাসের এমন মহৎ কাজের কথা সরকারকে জানানো হবে। এই কাজ আরো গতিশীল করতে শাহজাহান বিশ্বাসকে সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিলেন এই বন কর্মকর্তা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫