ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

ভ্রমণ

সবুজে ঘেরা হাজাছড়া

মো. জাভেদ হাকিম

০৩ ডিসেম্বর ২০১৬,শনিবার, ১৫:১৭


প্রিন্ট

পাহাড়-ঝরনা দুটোর আলিঙ্গন এক সাথে পেতেই এক দিন রাতের গাড়িতে চড়ে ছুটি খাগড়াছড়ির দিঘিনালা। জ্যাম মুক্ত সড়ক থাকায়- পৌঁছাই ভোর পাঁচটায়। গেস্ট হাউসে সাফসুতর হয়ে, সকাল সকালেই অটোতে চড়ে চলে যাই বোয়াল খালি ইউনিয়নের পাহাড়ের কোলে সদা জাগ্রত হাজাছড়া ঝরনার প্রান্তরে।
মূল সড়ক হতে হতে মাত্র বিশ মিনিটের ঝিরি-জংলী পথে ট্রেইল। পনের মিনিট হাঁটার পরই হাজাছড়া ঝরনা দৃষ্টির সীমায় ধরা পড়ে। ওয়াও! বিমুগ্ধ নয়নে- উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে উঠি তবে সেই আওয়াজের স্বায়িত্ব ছিল সাময়িক। প্রকৃতির অসম্ভব সৌন্দর্যের মাঝেও নিজেকে সামলে নিতে হবে নতুবা প্রকৃতি বিনষ্টকারী হিসেবেই নিজেকে চিহ্নিত হতে হবে।
রোমাঞ্চকর পথ শেষে ঝরনার সম্মুখে পৌঁছতেই এক অন্যরকম অনুভূতি মনের গহিনে দোলা দেয়। ঝরনার শীতল পানি প্রায় ৮০-৮৫ ফিট ওপর থেকে রিনিঝিনি শব্দ তুলে ঝরে পরে। শেষ রাতে বৃষ্টি হওয়ায় হাজাছড়ার যৌবনও ছিল বেশ উতালা। ভাবি- ইস আরো আগে কেন হাজাছড়ায় আসিনি। কতকাল এর পাশ দিয়ে কত জায়গায় ঘুরেছি। অথচ এখানে এলাম কত পরে। ভালোবাসার হৃদয় দিয়ে ঝরনার আশপাশ ঘুরে দেখি। হাজাছড়া ঝরনার পুরো পরিবেশটাই যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা সবুজ ক্যানভ্যাস। অনেক পর্যটকের ভিড়েও কেমন যেন একটা নিঝুম ভাব। অচেনা-অজানা দুর্গমের অনেক ঝরনাতেই ভিজেছি তাই প্রথমে ইচ্ছে ছিল না এখানে ভিজব কিন্তু গর্জন তুলে বাষ্প ছড়ানো হাজাছড়ার শুভ্র পানির কাছে না হেরে আর পারিনি। বিলিয়ে দেই নিজেদের। হাজাছড়া ঝরনাও পরম মমতায় আমাদের আলিঙ্গন করে নেয়। ইচ্ছে মতো ঝরনার পানিতে ভিজি। ভেজার স্বাদ যেন আর মেটে না।
হাজাছড়া লোকালয়ের কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও ঝরনার পরিবেশ এখনো অনেকটাই রয়েছে বুনো। পাহাড়ের ওপর প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছগুলোর আকৃতি দেখে মনে হবে এই যেন পড়বে উপুর হয়ে মাথার ওপর। যা অন্যরকম এক অ্যাডভেঞ্চারের ঢেউ খেলবে মনে। ঝরনার পানি পড়ার প্রচণ্ড ক্ষীপ্রতায় বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ছোট্ট প্রাকৃতিক জলাধার। সেই অগভীর জলাধারে সঙ্গীদের সাথে ডুবু ডুবু খেলা জমেছিল বেশ। হাজাছড়া ঝরনার রিমঝিম ছন্দ তোলা গান-হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত- জীবন থেকে পালাতে চাওয়া মানুষটাও নতুন করে বাঁচতে শিখবে। এক কথায় অসাধারণ সব ভাললাগার মুহূর্ত।
এত কাছে হাজাছড়া অথচ দেখা হয় নাই দীর্ঘ কাল। না দেখার কারণও যথেষ্ট। আমি বরাবর গহিনের সৌন্দর্যই দেখতে পছন্দ করি। যেখানে থাকে না কোনো উটকো হকার, অতি উৎসাহী ভ্রমণপ্রেমী কিংবা অবাঞ্ছিত মানুষের জটলা- সেখানেই ছুটে যায় দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের উদ্যমী দামালেরা। তাই বলে নোংরাদের প্রতি অভিমান করে দূরে সরে থাকার মানুষও নই আমি। যতটা সম্ভব চেষ্টা করি পরিবেশ-প্রকৃতির প্রতি নিজে সচেতন থাকার পাশাপাশি অন্যদেরও সচেতন করে তোলার বিষয়ে আলোচনা করি। সেই প্রচেষ্টা এখানেও অব্যাহত ছিল। সীমিত সাধ্যের মধ্যেও ছড়ানো ছিটানো চিপ্সের প্যাকেট ও খালি বোতল পরিষ্কারের পাশাপাশি ঘুরতে আসা পর্যটকদের বুঝানোর চেষ্টা করি- যত্রতত্র বর্জ্য ফেলায় কতটা ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয় আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের। পরিশেষে ভ্রমণ পিপাসুদের মাঝে স্লোগান তুলি ‘এসো ভাই শপথ করি’ - প্রকৃতি মোরা ধ্বংস না করি।
কিভাবে যাবেন : ঢাকার গাবতলী-ফকিরাপুল-সায়েদাবাদ থেকে দিনে রাতে প্রতিদিন খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালা বিভিন্ন পরিবহনের এসি/নন এসি বাস ছেড়ে যায়। দীঘিনালা হতে অটোবাইকে হাজাছড়া। সময় ২০-৪০ মিনিট।
থাকবেন-খাবেন কোথায় : দীঘিনালা বাজারে বেশ কিছু গেস্টহাউজ রয়েছে। বাজারের দক্ষিণ পাশটায় কয়েকটা খাবারের হোটেল রয়েছে।
উল্লেখ্য, হাজাছড়া ঝরনার পানিপ্রবাহ সারা বছরই কম-বেশি থাকে। সুতরাং বন্ধুদের পাশাপাশি পরিবারের সব সদস্যদের নিয়েও ঘুরে আসা যাবে।
সতর্কতা : সঙ্গে চটের ব্যাগ রাখুন, সেখানেই আবর্জনা ফেলুন।
টিপ্স : আমি ঘুরছি - আমি দেখছি, আগামী প্রজন্মও যেন আমার কারণে দেখার সুযোগ পেয়ে বুকভরা নিঃশ্বাস নিয়ে বলতে পারে বিশ্ব দরবারে, দেখো দেখো আমাদের দেশটা কত সুন্দর। তার চেয়ে সুন্দর আমাদের উদার করে দেয়া নির্মল প্রকৃতি।

javed.hakim.98@facebook.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫