ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

ট্রাম্প সমাচার, বিশ্বে তোলপাড়

হারুন-আর-রশিদ

২৯ নভেম্বর ২০১৬,মঙ্গলবার, ১৮:৪৪


হারুন-আর-রশিদ

হারুন-আর-রশিদ

প্রিন্ট

একটি ছড়ার কথা মনে পড়ল, যা এবারের যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের সাথে হুবহু মিলে যায়। প্রবাদবাক্যটি- ‘দুষ্টের শিরোমণি লঙ্কার রাজা; চুপে চুপে খাও তুমি চানাচুর ভাজা’। ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেকটা সে রকম। বুঝতে দেননি যে, তিনি দুষ্টের শিরোমণি। ফল ঘোষণার পরই পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পেরেছিল ধুরন্ধর ও চতুর এ মানুষটির আসল উদ্দেশ্য। গত ১১ নভেম্বর, এক মসজিদের ইমামের একটি ছোট বক্তব্য এখানে তুলে ধরা প্রয়োজন মনে করছি। তিনি বলেছিলেন, স্বয়ং আমেরিকাবাসীই বলছে- ট্রাম্প নয়, টেম্পো বা প্রগাগান্ডার তোড়জোড় জিতেছে। একজন মার্কিন প্রবাসী বাঙালি ইমাম সাহেবকে ফোন করে এ কথা বলেছিলেন। ট্রাম্প খোদ আমেরিকার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারেন। তার নির্বাচনপূর্ব বেশির ভাগ বক্তব্য ছিল কীর্তিনাশা, যা আমেরিকার অবদানকে ওলটপালট করে দিতে পারে। ১০ নভেম্বর আমেরিকার বেশির ভাগ অঙ্গরাজ্যে মানুষ তুমুল বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। অসংখ্য মানুষ হোয়াইট হাউজের সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান দেয়- আমরা তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মানি না। ভোটের ফলাফলে তিনি জেতেননি। জিতেছেন ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতিতে, যার নিয়ন্ত্রণ ইহুদিদের হাতে। মার্কিনিরাই বলছেন- এ ক্ষেত্রে ইলেকশন নয়, হয়েছে সিলেকশন। ইহুদি ও বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ এবং উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী লোকদের প্রভাবে ট্রাম্প জিতেছেন। মিডিয়ার কল্যাণে এসব বক্তব্য গোটা বিশ্বে চাউর হয়ে গেছে। রেসলিংয়ের কায়দায় তার বক্তব্যগুলো যদি বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইমেজ আর অবশিষ্ট থাকবে না।
আমেরিকার ইতিহাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন ২০ জানুয়ারি। ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ অর্থনীতির অঞ্চল, যা ফ্রান্সের চেয়েও শক্তিশালী। জনসংখ্যা পোল্যান্ডের চেয়ে বেশি। এ অঞ্চলে হিলারি ক্লিনটন ৫৫টি ইলেক্টোরাল ভোটের জয় পেয়েছেন। তারা স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। গণভোটের দাবিও তুলেছেন। নির্বাচনের শেষ প্রান্তে ওবামা হিলারির পক্ষে কয়েকটি মেসেজ দিয়েছিলেন- তার মধ্যে যেটি প্রধান, সেটি এখন ঘটছে। তিনি বলেছিলেন- মার্কিনিরা জেগে উঠুন, ভোট দিন যোগ্য মানুষটিকে, যদি আমেরিকাকে সম্মানের সাথে বাঁচাতে চান। ট্রাম্প সম্পর্কে বলেছিলেন, তিনি একজন ভয়ঙ্কর মানুষ এবং বিপজ্জনক আমেরিকার জন্য; গোটা বিশ্ববাসী ভোগান্তির কবলে পড়বে। রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ এই ব্যক্তি অঢেল অর্থবিত্তের মালিক। ব্যবসাই ভালো বোঝেন, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় অঘটন ঘটিয়ে ফেলবেন হয়তো। মার্কিন ইতিহাসে নির্বাচন-পরবর্তী পর্যায়ে স্বাধীনতার ডাক দেয়া হয়েছে কোনো অঙ্গরাজ্য থেকে, এমন নজির আর জানা নেই। এত সহিংসতা, গোলাগুলিও হয়নি। আহতও হয়নি এত মানুষ। বারাক ওবামা ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার অযোগ্য বলেও মন্তব্য করেন। অন্য দিকে ট্রাম্প ওবামাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নিকৃষ্টতম প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। বেশি ভোট পেয়েও হারলেন হিলারি। একে বলা যায়, বিশ্বের সর্ববৃহৎ নির্বাচনী যুদ্ধ। ট্রাম্পের জয় ইউরোপের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। চীনাসামগ্রী আমদানির ওপর ট্রাম্প নতুন করে কর চাপাবেন। এতে করে বাণিজ্য যুদ্ধ পুরোমাত্রায় আরম্ভ হয়ে যেতে পারে। নিজ দেশেও আমেরিকা সঙ্কটে পড়বে। কারণ ট্রাম্প এর মধ্যেই প্রমাণ করেছেন, তিনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। তিনি বলেছিলেন- তিনি যদি হেরে যান তাহলে ফলাফল মেনে নেবেন না। প্রতিদ্বন্দ্বীকে জেলে ঢুকাবেন, এই হুমকিও দিয়েছিলেন।
নির্বাচনের জরিপ কেমন ছিল? রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প শ্বেতাঙ্গদের ভোট পেয়েছেন ৫৮ শতাংশ, কৃষ্ণাঙ্গদের ৮ শতাংশ, হিসপানিক ২৯ শতাংশ, এশীয় ২৯ শতাংশ এবং অন্যান্য ৩৭ শতাংশ। ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন শ্বেতাঙ্গদের ভোট পেয়েছেন ৩৭ শতাংশ, কৃষ্ণাঙ্গ ৮৮ শতাংশ, হিসপানিক ৬৫ শতাংশ, এশীয় ৬৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ৫৬ শতাংশ। অন্য প্রার্থীরা মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। পুরুষদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ ভোট ট্রাম্প এবং ৪১ শতাংশ ভোট হিলারি পেয়েছেন। শ্বেতাঙ্গ নারীদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন। অন্য দিকে ৪৩ শতাংশ নারী হিলারিকে বেছে নিয়েছেন। বছরে ৫০ হাজার ডলারের নিচে আয় করেন, এমন ভোটারদের ৫২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন হিলারি আর ট্রাম্প পেয়েছেন ৪১ শতাংশ। তরুণদের মধ্যে হিলারির জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। অন্য দিকে ৪৫ বা তার বেশি বয়সী মানুষের ভোট বেশি পেয়েছেন ট্রাম্প। রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে ৭ শতাংশ ভোটার এবার হিলারিকে ভোট দিয়েছেন। আর ডেমোক্র্যাটিক হয়েও ৯ শতাংশ ভোটারের রায় ট্রাম্পের পক্ষে গেছে। সরাসরি পপুলার ভোটে এগিয়ে ছিলেন হিলারি। ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতিতে হেরে গেলেও নির্বাচনে নাগরিকদের বেশি ভোট হিলারিই পেয়েছেন। ৯২ শতাংশ ভোট গণনায় দেখা গেছে, পপুলার ভোট প্রতিপক্ষের চেয়ে এগিয়ে ছিল- যদিও ব্যবধান ছিল অতি সামান্য। হিলারির পক্ষে ছিল মোট ভোটের ৪৭.৭ শতাংশ। ট্রাম্পের পক্ষে ৪৭.৫ শতাংশ। ভোট পড়েছে প্রায় ১২ কোটি। সিএনএনের হিসাব মতে, হিলারি পেয়েছেন পাঁচ কোটি ৯৭ লাখ ৫৫ হাজার ২৮৪টি ভোট। আর ট্রাম্প পেয়েছেন পাঁচ কোটি ৯৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫২২টি ভোট। হিলারি সরাসরি (পপুলার ভোট) ট্রাম্পের চেয়ে দুই লাখ ১৯ হাজার ৭৬২টি ভোট বেশি পেয়েছেন।
সিএনএন জরিপে দেখা যায়, শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল সমর্থক। অন্য দিকে হিলারি স্বল্প আয়ের ভোটারদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয়। বিশ্বনেতারা কে কী বলেছেন, সেদিকে নজর দেয়া যাক। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ প্রকাশ করেছেন এভাবে- গোটা বিশ্বে অনিশ্চয়তার যুগ শুরু হলো। মেক্সিকোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্লাউদিয়া রুইস মাসিয়ের উক্তি : ট্রাম্প বলেছেন, সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করা হবে এবং অর্থ দেবে মেক্সিকো। কিন্তু আমাদের চিন্তা-ভাবনায় দেয়ালের জন্য অর্থ প্রদান বাতিলযোগ্য। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির মন্তব্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের প্রতিফলন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেছেন, আমি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে একযোগে কাজ করতে আগ্রহী। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য- এ নির্বাচনের ফল জার্মানির বেশির ভাগ মানুষ যা আশা করেছিল, তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কিন্তু আমরা তা মেনে নিচ্ছি। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তে বলেছেন, স্বাগত জানাই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে, কারণ বেফাঁস শব্দচয়নের জন্য আমরা দু’জনই সুপরিচিত। আমরা দু’জনই গালমন্দ করি। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে চরম অশিষ্ট ভাষায় গাল দিয়েছেন তিনি। গত সেপ্টেম্বর মাসে ওবামাকে ‘কুত্তার...’ বলেছিলেন দুতের্তে। সেই থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু। যৌথ সামরিক মহড়া বাতিল হয়ে গেছে। গণমাধ্যম সংগঠন সিপিজের বিবেচনায় প্রেসিডেন্ট সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি। এ ছাড়া ভোটারদের অর্থনৈতিক হতাশা, অভিবাসন-বিরোধিতা, বাণিজ্য উদারীকরণের কারণে বেকারত্ব, নারীবিদ্বেষী সঙ্কীর্ণতা, এফবিআইয়ের ভূমিকা কিংবা বিশ্বরাজনীতি প্রসঙ্গগুলো ছিল সমালোচনামুখর। গণমাধ্যমকে ধোলাই দিয়েছেন ডোনান্ড ট্রাম্প।
১১ নভেম্বর ফেসবুকে দেখলাম ট্রাম্পের ছবিসহ, তিনি বলছেন, মুসলমানদের মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়ে দেয়া হবে।’ চতুর এ মানুষটি হোয়াইট হাউজে বসার দিন কয়েক পর যে কাজগুলো দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করবেন, তার মধ্যে প্রধান বিষয় হলো- ওবামার সব সাফল্য মুছে ফেলবেন। ওবামার প্রধান কৃতিত্ব জলবায়ু চুক্তি ও আন্তঃপ্রশান্ত মহাসাগরীয় সহযোগিতা চুক্তি বাতিল করতে পারেন ট্রাম্প। তা ছাড়া প্রায় সাড়ে সাত লাখ বৈধ কাগজপত্র নেই, এমন অভিবাসীর স্বল্পকালীন স্বস্তির যে ব্যবস্থা করেছিলেন ওবামা, তাও বাতিল হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের এই অভিমত যে সত্য হতে পারে, তা বোঝা যায় ওভাল অফিসে মুখোমুখি ট্রাম্প ও ওবামার অঙ্গভঙ্গি- মুখে বেদনার ছাপ, ট্রাম্পের রাশভারী চেহারা; সব কিছুতেই অনিশ্চয়তার ছাপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীর সহাবস্থান মেনে নিতে চাইছেন না অতি উগ্রবাদী রক্ষণশীল নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওবামা প্রশাসনের প্রধান অর্জন ওবামা কেয়ার; সবার স্বাস্থ্যসেবার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও কাটছাঁট করার পক্ষপাতী ট্রাম্প। এ কারণে আমেরিকার ৩৫টি অঙ্গরাজ্যে চলছে প্রতিবাদের ঝড়। ট্রাম্পের আমলে সোয়া কোটি অভিবাসীর সুযোগ সুবিধা কতটুকু থাকবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এ পর্যন্ত ট্রাম্প যতগুলো কথা বলেছেন, তার মধ্যে সন্দেহপ্রবণতার মাত্রাই ছিল বেশি। অনেকটা মানসিক ব্যাধি ও অবসাদগ্রস্ত রোগীর মতো তাকে মনে হচ্ছিল। ১০ নভেম্বর হোয়াইট হাউজে দুই প্রেসিডেন্টের দেড় ঘণ্টার আলাপচারিতায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দু’জনের কেউই স্বাভাবিক মুডে ছিলেন না- সিএনএন ও বিবিসিতে তা পরিলক্ষিত হয়। বিশেষজ্ঞরা ভাবছেন- রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক, দল দু’টির মধ্যে যদি ঐক্য বিরাজ না করে, তাহলে জাতির কপালে বড় ধরনের দুঃখ অপেক্ষা করছে। গণতন্ত্র তখনই অটুট থাকে যখন গণতান্ত্রিক কোনো রাষ্ট্রে সরকারি দল ও বিরোধী দল জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে কাজ করে। সর্ববৃহৎ এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বড় দু’টি দলের মধ্যে এই প্রথম ফাটল সৃষ্টি হলো বিগত ২০ বছরের মধ্যে। একগুঁয়ে ট্রাম্প তার বিগত ১৮ মাসের বক্তব্য থেকে ফিরে না এলে বিশ্বের আকাশে দুর্যোগের অমানিশা অন্ধকারে ছেয়ে যাবে। এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
ইংরেজিতে একটি শব্দচয়ন আছে- 'Appearance indicates the mind'- ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেহারা দেখলে এবং তার অঙ্গভঙ্গি বা বডি ল্যাংগুয়েজে ভেতরটা নিজের অজান্তেই জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়ে।
ট্রাম্পকে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ১৮ মাসের বিগত সময়ের বক্তব্যের চেয়ে তার বর্তমানে সুর নরম হলেও হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিস দখলে নেয়ার পর আগের চেহারায় যে তিনি আবির্ভূত হবেন না তার নিশ্চয়তা কে দেবে? জিতলে ক্ষমতা নেয়ার পর হিলারিকে জেলে ঢোকাব- এই বক্তব্যটি চরম আক্রমণাত্মক। আরেকটি বক্তব্য : মুসলমানদের মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়ে দেয়া হবে। আরো বলেন, আলাস্কা মসজিদ এলাকা পুরোটাই ইহুদিদের। ট্রাম্প বলেছেন, ইসরাইলিদের জন্য আমি অনেক কিছু করব, তা এখন বলব না। পুতিন ও মোদি হবেন প্রকৃত বন্ধু। গালফ রাষ্ট্রে অর্থ ব্যয় করা অপাত্রে অর্থ ব্যয়ের শামিল। চীনের পণ্য আমেরিকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করব। এই রাষ্ট্র শ্বেতাঙ্গদের, অভিবাসীদের নয়। তাদের ব্যাপারে কঠোর হবো। শেতাঙ্গদের ব্যবসা-বাণিজ্য তারা কেড়ে নিয়েছে। মুসলমানেরাই হলো জঙ্গি সম্প্রদায়ের মানুষ। মুক্তবাজার অর্থনীতি- এই ডায়ালগ তার পছন্দ নয়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জিএসপি নিয়ে কোনো নমনীয়তা প্রদর্শন করবেন না। আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোটার ওপর মার্কিনিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান। উদার বাণিজ্যনীতি ট্রাম্পের অপছন্দনীয়। সর্বাবস্থায় উগ্রনীতি ও কঠোরপন্থায় বিশ্বাসী এই অনভিজ্ঞ রাজনীতিক দ্বারা বিশ্বের উপকার তো নয়ই, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বসম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। আন্দোলনকারীরা যা বলতে চাইছেন, তার মধ্যে প্রথমটি হলো ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা হোক। দ্বিতীয়, ট্রাম্পকে জানিয়ে দেবো যে, আমরা বিভেদের বদলে বিশ্বে ও স্বদেশে সব সম্প্রদায়ের (অভিবাসীসহ) মৈত্রীর সেতুবন্ধ তৈরি করব। তৃতীয়, ট্রাম্পের ১০০ দিনের কর্মসূচি কখনোই বাস্তবায়ন হবে না- এ বার্তা জানিয়ে দেয়া দরকার। চতুর্থ, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গরা ট্রাম্পের জয়ে উদ্বিগ্ন। পঞ্চম, বিগত সময়ের বিভক্তিমূলক বক্তব্য প্রত্যাহার করে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে ট্রাম্পকে।
নিউ ইয়র্ক সিটিতে ট্রাম্পের বাসভবন ট্রাম্প টাওয়ারের সামনেও হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সড়ক অবরোধ করে। আন্দোলনে বিগত এক সপ্তাহে ৩৫টি অঙ্গরাজ্যে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হওয়া ছাড়াও আহতের সংখ্যা প্রায় শতাধিক। বিভিন্ন শহরে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। জনতা যানচলাচল বন্ধ করে দেয়। মহাসড়ক অবরোধ করে।
নারীসঙ্গ আবার নারীবিদ্বেষ দুই ক্ষেত্রেই চমক সৃষ্টি করেছেন ধনকুবের ব্যবসায়ী ও টিভি রিয়েলিটি শো তারকা, হালের গর্জে ওঠা রাজনীতিক ট্রাম্প। তাকে সমর্থন দেন অতি উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো এবং কট্টর রাজনীতিবিদেরা। যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকান-আমেরিকান নাগরিক অধিকার বিষয়ক সংগঠন ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালারড পিপলের (এনএএসিপি) প্রধান, কর্নেল উইলিয়াম ব্রুক বলেছেন, নির্বাচনী প্রচারের হট ইস্যু ছিল বর্ণবাদ ও নারীবিদ্বেষ। জরিপে এ তথ্যও বেরিয়েছে, বিগত ২০ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। মাত্র ৫২ শতাংশ ভোটার যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প পাবলিক সেন্টিমেন্টকে ভোটব্যাংক হিসেবে নিজের পক্ষে আনতে সক্ষম হয়েছেন। স্বদেশী চেতনা ও তাদের মৌলিক স্বার্থের কথা অঙ্গুলি প্রদর্শনের মাধ্যমে জোরালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। অভিবাসীর ভোটব্যাংক মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ, সে কারণে এ বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো সংখ্যাগরিষ্ঠদের বুঝিয়ে দিয়েছেন- তোমরা যেন বেকার না থাকো, হতদরিদ্র না থাকো। ভারতের মোদি ভোটের আগে এক রকম, নির্বাচনে জেতার পরে ভিন্নরূপ- ট্রাম্পও সেরকম বদলে যেতে পারেন। কারো কারো পরিবর্তন হয় ক্ষমতায় যাওয়ার পর। আবার ভয়ানক কাজও করতে পারেন। ব্লেয়ার ও বুশ তাই করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বালিয়েছে রিপাবলিকানরাই। ২০ লাখ মানুষের হত্যাযজ্ঞ তারাই ঘটিয়েছে। সেই দলেরই সদস্য আজকের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তাই ওয়েট অ্যান্ড সি।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
ই-মেইল : harunrashidar@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫