ঢাকা, রবিবার,২৩ এপ্রিল ২০১৭

আলোচনা

হেমন্ত ছাতিমের গন্ধে নিমগ্ন সময়

ড. শাহনাজ পারভীন

২৪ নভেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৬:১৪


প্রিন্ট

‘আজিকের হেমন্তের সকালে আমার
কুয়াশার মিহিভাঁজে দু’পা ভেজে আর-
ছাতিমের গন্ধ শুধু কাছে আনে তার
তাহার জন্য মন করে হাহাকার।’
হেমন্তের সকালটা খুব নীরবেই আসে। সে নিভৃতে শুধুই অনুভবে জানিয়ে যায় আমি এসেছি, আমি আছি। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে তিনটি ঋতু আসে সরবে, যায় গরবে। আর তিনটি আসে নীরবে, যায় নিভৃতে। তার মধ্যে হেমন্ত অনুভবের, নস্টালজিয়ার। গ্রীষ্মের খরতাপে কালবৈশাখীর মাতম হাওয়ায় সবাই তাকে স্মরণ রাখে। বর্ষার ঝুমবৃষ্টি অঝোর ঝরিয়ে মাঠঘাট ভিজিয়ে দিয়ে তাকে বরণ করে নিতে প্রকৃতি সরব। থোকায় থোকায় ফোটে জুঁই, নান্দনিক কদম আর কেয়া তেমনি শীতের কনকনে হাওয়া প্রকৃতির রূপ-বৈশিষ্ট্যে আনে ভিন্নতা। তাকে বরণ করতে ফুল, ফল, সবজি, রোদ, খেজুর রস, পিঠাপুলি একসাথে মাতে।
সেই অর্থে শরৎ, হেমন্ত ও বসন্ত প্রকৃতির অন্তর্গত পরিবর্তন সাধিত করে। বাহিরে তারা থাকে চুপ, নীরব, নিভৃত। কিন্তু ভেতরের আমিতে তারা বর্ণাঢ্য, ঝলমলে। হেমন্ত হলো ষড়ঋতুর চতুর্থ ঋতু, যা কার্তিক ও অগ্রহায়ণের সমন্বয়ে। ‘কৃত্তিকা’ ও ‘আর্দ্রা’ এ দু’টি তারার নাম অনুসারে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের নাম রাখা হয়েছে। ‘মরা’ কার্তিকের পর আসে সার্বজনীন লৌকিক উৎসব নবান্ন। শরতের নীল আকাশ, সাদা কাশবন, বসন্তের ফুলে ফুলে ছাওয়া প্রকৃতি আর হেমন্ত আসে মায়াবী পরশ মেখে, অনুভবে। তাদের না আছে ঝঙ্কার, না আছে ক্রোধ। তারা বড় বেশি শান্ত, সুনির্মল। নিরিবিলি থাকে। ঘাঁটায় না কাউকেই, ঘাঁটে না নিজে। সবুজ খামে ভরা হলুদ চিঠি যেমন মানুষকে আন্দোলিত করে, রোমাঞ্চিত করে, হেমন্তও তদ্রুপ। প্রকৃতিতে অন্য এক ভাষার সৌন্দর্য বিরাজ করে। এই একটু খানি মিষ্টি রোদ, এই তার ছায়া। কী অপরূপ মায়াঘেরা। আমরা জানি, প্রতিটি সৃষ্টিরই একটি ভাষা আছে। যেমন- নদীর কুলকুল ধ্বনি, সমুদ্রের গর্জন, ঝরনাধারার আছে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, হালকা সবুজ কচিপাতার মিষ্টি আওয়াজ, গাঢ় সবুজ বয়সী পাতার ছটফটানি ও শুকনো পাতার মর্মর আওয়াজ, বাতাসের শনশন। আমরা পাখির ভাষা চিনেছি, চিনেছি বাঘের হুঙ্কার ও সিংহের গর্জন। আমরা বৃষ্টির মিষ্টি আওয়াজকে অনুভব করি আনন্দে, ঝড়ের শনশনে বিচলিত হই আবার ভূমিকম্পের ভয়ে চোখের নিমিষেই হাইরাইজ ভবন থেকে আমাদের দুই পা মাটি ছোঁয়। সবারই নিজ নিজ ভাষা আছে। আমাদের শরীরেরও একটি ভাষা আছে। আছে চোখের। এই চোখের চাহনিতে ফুটে ওঠে ঘৃণা, ক্রোধ আর ভালোবাসার মিষ্টি আমেজ। আমরা দলবেঁধে ভেসে চলা সুশৃঙ্খল হাঁসের সাঁতার আর মোরগের দুরন্ত লড়াই উপভোগ করি। আবার পাখির কিচিরমিচিরে আন্দোলিত হই। ঠিক তেমনি হেমন্তের ঝিরিঝিরি ঠাণ্ডা বাতাসে শিহরিত হই। হেমন্তের নিজস্ব ভাষায় তাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
‘হিমের রাতে ঐ গগনের দীপগুলিরে
হেমন্তিকা করল গোপন আঁচল ঘিরে।
ঘরে ঘরে ডাক পাঠালো দীপালিকায় জ্বালাও আলো
জ্বালাও আলো, আপন আলো সাজাও আলো ধরিত্রীরে।’

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন হেমন্তের অন্য রূপ নিয়ে-
‘ঋতুর খাঞ্জা ভরিয়া এলো কি ধরণীর সওগাত
নবীন ধানের অঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হলো মাৎ
বিন্নী পলাশ চালের ফিরনি, তশতরী ভরে নবীনা গিন্নী
হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশিতে কাঁপিছে হাত
শিন্নী রাঁধেন বড় বিবি বাড়ি গন্ধে তেলেসমাত।’

কবি জীবনানন্দ দাশ তার ‘অবসরের গান’ কবিতায় লিখেছেন-
‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে
অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে
মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার- চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,
তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান।’
মাঠ ভরে পেকে ওঠে ধান। রঙ তার ছড়ানো সোনার। হেমন্তের নবান্ন উৎসবে হেসে ওঠে গ্রাম। পিঠাপুলি পায়েসের ঘ্রাণে মানুষের মনে সুখ আনে। আশপাশে প্রতিবেশী যত সবাইকে আপ্যায়নে মেতে ওঠে পাড়া। দিনমান সারা। কার্তিকের চিলের ডানায় ভেসে ওঠে পাখির কূজন। দেশ-বিদেশের শীতের পাখিরা উড়ে আসে ডানায় তাদের। বিলঝিলে ফুটে ওঠে শাপলা-শালুক। কলমির মায়ামাখা দোল বাতাস কাঁপায়। ছাতিমের গন্ধে সন্ধ্যার বাতাসে ভাসে মায়া। ভেসে ওঠে প্রিয়জনের কায়া। আহা মন কেমন করে! মন কেমন করে! কবির কলমে ওঠে কবিতা :
‘সবুজ পাতার খামের ভেতর
হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে
কোন্ পাথারের ওপার থেকে
আনল ডেকে হেমন্তকে?’
(হেমন্ত : সুফিয়া কামাল)
হলুদ গাঁদার কুঁড়ি মুখে নিয়ে হলুদের ঘ্রাণ হেসে ওঠে হেমন্তে আবার। পলাশের লাল ডালে ডালে আগুনের ফুলকি ছড়ায়। হেমন্তের পরশে তারা মিহিদানা রোদ হয়ে ওঠে। প্রকৃতিতে দিন ছোট হয়ে আসে। পাখির ডানায় তারা ভাসে। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই বিকেলের তড়িঘড়ি যেন। তারপর ছোট্ট বিকেলের তাড়া খেয়ে সন্ধ্যার আনন্দে হেসে ওঠে চার দিক ঝলমল করে। কার্তিকের পেঁচা জেগে ওঠে প্রথম প্রহরে রাতের। ডেকে ওঠে ঘন অন্ধকার গাছের শাখার ফাঁকে ফাঁকে। রাতের কুয়াশা চাদর চাঁদের কণায় ভেসে থাকে সারা রাত হেসে। তারা ভরা আকাশের থালা ঝিকিমিকি করে। তারা সারা রাত জেগে থাকে কী এক নেশায়! নক্ষত্র আকাশের মেঠোপথে হাঁটে এলোমেলো। যেন প্রেমিকের লুকোচুরি খেলা। এই দেয় ধরা, এই যায় পালিয়ে আবার। আহা হেমন্ত! ভোরের শিউলি ফুলে ঝরে যায় জেগে থাকা রাতের বেদনা যত। সাদা আর কমলার রঙে হেমন্ত তখন কেমন ম্রিয়মাণ হয়ে ওঠে। তার সাথে টকটকে লাল জবা ভাব করে নেয়।
কার্তিকের ভোর শুধু ভোর নয়, অন্য এক মনোভূমির গল্প সেখানে। যেখানে শিউলি আর ছাতিম ভরে রাখে মোহাবিষ্ট সকাল। হেমন্তকালের প্রকৃতিতে আষাঢ়-শ্রাবণ বা ভাদ্র মাসের মতো বৃষ্টির স্যাঁতসেঁতে দুপুর থাকে না। হেমন্তের দুপুরে ফসলে ফসলে মাঠ-বনবাদাড় ভরে থাকে, সৃষ্টির সব শাখায় থাকে এক অনাবিল চঞ্চলতা। সখা-সখীদের কলকাকলীতে মুখরিত থাকে বিকেল। শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষার মতো প্রখর নয় বলে হেমন্তের বিকেলে এক মায়াভরা নান্দনিক সৌন্দর্য ভরে রাখে প্রকৃতি। মন কারে চায়! পায়! তাহারে হারায়!
আহা হেমন্ত, তুমি শুধু মায়ার বিকেল। চার দিকে মায়া যেন ছায়া হয়ে ওঠে। ম্লান ধূসরিত আর অস্পষ্ট হেমন্ত সন্ধ্যা শুধু অনুভবের। হেমন্তের সন্ধ্যা আমি আজীবন উপভোগ করি নিতান্তই আমার মতন। অতল নৈঃশব্দ্যে আমি হারিয়ে যাই। হেমন্তের এই শান্ত, শব্দহীন নীরব দিগন্ত ছাতিমের গন্ধে এক অপূর্ব মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করে। মন হয়ে যায় নস্টালজিক। ফিরে যাই কলকাকলীর কৈশোরে, দুরন্ত যৌবনে। অনুভব মধ্যবয়সে এসে থামে। আহা! সৃষ্টি, কী তোমার লুকোচুরি, কী তোমার বৈশিষ্ট্য? বুঝিবারে পারি না তা। এই শান্ত তো এই ঊর্মিমাখা ¯্রােত! এই ¯্রােত তো এই অনাবিল প্রশান্তি! তোমার প্রসারিত অব্যক্ত রূপের কথা আমি এক ক্ষুদ্র মানসকন্যা কী বলি তার?
হেমন্তের ব্যাপ্তিকাল সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায় না। কার্তিক-অগ্রহায়ণ এই দুই মাস হেমন্তকাল ধরা হলেও হেমন্ত মিশে থাকে শরৎ আর শীতের মধুময় পরশে। শরতের সাদা মেঘের সাথে মিশে যেতে যেতে কখন নিজের অজান্তেই হেমন্তে ধূসর হয়ে ওঠে মেঘ। আবার তেমনি হেমন্তের সকালে শিশিরের হালকা মিহিভাঁজে পা ভেজাতে ভেজাতে কখন যেন প্রবল শীতে পায়ে মোজা পরে নিতে বাধ্য করে দেয়। বুঝি না তা। অনায়াসেই হেমন্ত হারিয়ে ফেলে, শীতের কুয়াশায় মুড়ে ফেলে নিজেকে। শিশির কখন কুয়াশায় জমে বোঝা যায় না তেমনি সাদা মেঘ কখন ধূসর হয়ে যায়! প্রকৃতি বড় বেশি লুকোচুরি করে। হেমন্তের সরব উপস্থিতি বোঝা যায় নবান্ন উৎসবে। কৃষকের ঘরে সোনার মতো চকচকে রঙ আর ম ম গন্ধ মেখে নতুন ধান ওঠে। কৃষাণের মুখে ফোটে হাসি। নতুন ধানের চালে ভাপ ওঠা ভাত, ক্ষীর, পায়েস, পিঠাপুলি মিঠাগন্ধে ভাসে রাশি রাশি। সবুজ মাঠের বিছানায় হলুদ সরিষার ফুল আলগোছে শুয়ে থাকে যেন। আয়েশি ভঙ্গিতে তারা ক্লান্তির রোদ পোহায়। মাঠ ভরে যায় নতুন নতুন সবজির গন্ধে। আল ভেঙে কৃষকের হাঁক শোনা যায় দূর দিগন্তে। শিশির স্নাত সকাল, কাঁচা সোনা রোদ বড় বেশি আহ্লাদি হয়। তারপর মেঘমুক্ত আকাশে জোছনা ডোবা রাতে হেমন্ত আরো বেশি রহস্যময় হয়। সম্রাট আকবরের সময় থেকেই অগ্রহায়ণ দিয়ে তারা প্রবর্তিত বাংলা সন শুরু করেছিলেন। কবি রায় গুণাকর লিখেছিলেন- ‘অগ্রহায়ণ এ দেশে বড় সুখের সময়।’ সব সুখকে এক সুতোয় গেঁথে প্রকৃতিকে ফুলে-ফলে ফুটতে দিয়ে বিদায় নেয় হেমন্ত।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫