ঢাকা, রবিবার,২০ আগস্ট ২০১৭

প্যারেন্টিং

স্বল্প ওজনের শিশুর যত্নে ‘ক্যাঙ্গারু মা’ পদ্ধতি

২২ নভেম্বর ২০১৬,মঙ্গলবার, ১৭:০৯


প্রিন্ট

প্রকৃতির কাছে শেখা ক্যাঙ্গারুর মা কিভাবে তার নবজাতকের যত্ন নেয়, সেই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বল্প ওজনের মানব শিশুর অথবা অপরিণত বয়সে জন্মানো শিশুর যত্নের ব্যবস্থা শুরু হয়েছে।
ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাটি মায়ের থলের ভেতর থেকে মায়ের শরীরের উষ্ণতা নেয়। বার বার সে মায়ের দুধ পান করে এবং মা সার্বক্ষণিক শিশুটির যত্নে নিয়োজিত থাকে এবং সেই সাথে ক্যাঙ্গারুর মা তার নিত্যদিনের কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। লিখেছেন- ডা: শাহীন আরা আনওয়ারী

‘ক্যাঙ্গারু মা’, যত্ন শুরু হয় দক্ষিণ আমেরিকায়। ১৯৮৩ সালে দুজন নবজাতক বিশেষজ্ঞ এডগার রে এবং হেক্টর মার্টিনেজ গবেষণা করে প্রথম এই পদ্ধতি চালু করেন কলোম্বিয়ায়। এই পদ্ধতিতে অপরিণত বয়সের কিংবা স্বল্প ওজনের নবজাতককে শুধু ন্যাপি পরিয়ে মায়ের খালি বুকের মাঝখানে শিশুর বুক পেট লাগিয়ে রাখা হয়, যাতে মায়ের শরীরের চামড়ার সাথে শিশুর শরীরের চামড়া লেগে থাকে। শিশুর মাথাটি একটু ঘুরিয়ে রাখা হয় যাতে কানটি মায়ের হার্টের ওপর থাকে এবং গলা ও ঘাড় বেঁকে না গিয়ে সোজা থাকে। এই পদ্ধতি চালু করার পর দেখা গেল, যেসব জায়গায় ইনকিউবেটরের সাহায্যে অথবা অন্য কোনোভাবে নবজাতককে উষ্ণ রাখার ব্যবস্থা নেই সেসব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত উষ্ণতার অভাবে নবজাতকের মৃত্যুর হার বহুলাংশে কমে এসেছে। এ ছাড়া বেশির ভাগ গবেষণায় দেখা গেছে, ‘ক্যাঙ্গারু মা’ যত্নে পদ্ধতিটি নবজাতক ও তার পিতা-মাতার ওপর ইতিবাচক ফল রেখেছে। যদিও দু-একটি গবেষণায় বিশেষ কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি। তবে এই পদ্ধতিটি কারো কোনো ক্ষতি করে না। কাজেই যেসব উন্নয়নশীল দেশে নবজাতকের যত্নের জন্য আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবস্থা নেই, সেসব দেশে এই পদ্ধতিটি চালু করা বিশেষ প্রয়োজন।
মাতৃগর্ভে একটি শিশু চমৎকার উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে থাকে এবং গর্ভফুলের মাধ্যমে মায়ের শরীর থেকে সে খাদ্য আহরণ করে বেড়ে ওঠে। ঠিক যখন সে ভূমিষ্ঠ হয় তখনো তার জন্য মায়ের শারীরিক উষ্ণতার প্রয়োজন হয়। একজন নবজাতকের জন্য নতুন পৃথিবীতে এসে শারীরিকভাবে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য উষ্ণতা অপরিহার্য আর এই সত্যটি আরো বেশি করে প্রযোজ্য যদি শিশুটি স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মায় অথবা অপরিণত বয়সে জন্ম নেয়। স্বল্প ওজনের শিশুটির নিজের শরীরের তাপ উৎপাদনের ক্ষমতা কম থাকে, যে কারণে হাসপাতালগুলোতে ইনকিউবেটর ব্যবহার করা হয়। ইনকিউবেটরের সাহায্যে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়, যার ভেতরে শিশুকে রেখে পরিচর্যা করা হয়। প্রয়োজনে অক্সিজেন ব্যবহার করা হয় এবং শিশুর পুষ্টির দিকে খেয়াল রাখা হয়। এই ইনকিউবেটর অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি যন্ত্র, যা শুধু বড় বড় হাসপাতালে আছে এবং যার সুযোগ খুব কমসংখ্যক শিশু পেয়ে থাকে। অর্থাৎ গ্রামগঞ্জের কথা বাদই দিলাম, বেশির ভাগ সদর হাসপাতালেও এ ব্যবস্থা নেই।
এ ছাড়া এই ইনকিউবেটর সচল রাখা, সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা আমাদের মতো দেশে একটি দুরূহ ব্যাপার। প্রয়োজনীয় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা না থাকলে ইনকিউবেটর থেকে মারাত্মক সংক্রমণ রোগটি ‘সেপটিসেমিক’ হতে পারে। বাংলাদেশে দিনাজপুরের ল্যাম্ব হাসপাতালে ক্যাঙ্গারু মা পদ্ধতিতে শিশুর যত্ন বিগত কয়েক বছর ধরে চালু হয়েছে। কাজেই আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ‘প্রাকৃতিক ইনকিউবেটর’ অর্থাৎ ‘ক্যাঙ্গারু মা’ পদ্ধতি চালু করা উচিত।

‘ক্যাঙ্গারু মা’ পদ্ধতি কী?
ক্যাঙ্গারুর মায়ের মতো মানুষের শিশুটিকেও মায়ের শরীরের সার্বক্ষণিক স্পর্শে রাখা হয়।
অর্থাৎ মায়ের বুকের চামড়ার সাথে শিশুটির শরীর লেগে থাকে এবং শরীরের উষ্ণতা গ্রহণ করে। শিশুটি পুষ্টির জন্য মায়ের বুকের দুধ বার বার পান করে।

‘কাঙ্গারু মা’ কিভাবে করা হয়
• প্রথমে মাকে পুরো প্রক্রিয়াটিকে বুঝিয়ে বলতে হয়। এই পদ্ধতির সুবিধাগুলো কী এবং এতে শিশুর কী উপকার হয় সেগুলো বুঝিয়ে বলা হয়। শিশুর কল্যাণের জন্য যা কিছু বলা বা করা হয় তা প্রায় সব মা-ই সহজে গ্রহণ করে।
• শিশুটিকে পাতলা কাঁথা কাপড় ভাঁজ করে দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে জাঙ্গিয়ার মতো করে পরিয়ে খালি গায়ে রাখতে হয়।
• মায়ের ব্লাউজের বোতাম খুলে বাচ্চাকে মায়ের বুকের দুই স্তনের মাঝামাঝি জায়গায় ওপর করে অর্থাৎ শিশুর বুক ও পেট লাগিয়ে এবং মাথা সোজা করে রাখা হয়।
• এ অবস্থায় একটা পাতলা ওড়না বা গামছা দিয়ে মায়ের এক কাঁধের ওপর দিয়ে মায়ের পিঠের দিকে গিঁট দিয়ে অনেকটা ঝোলার মতো বাঁধতে পারেন। খেয়াল করতে হবে যে শিশুটি আরামে আছে কিনা এবং নিঃশ্বাস নিতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা।
বার বার মায়ের দুধ টানতে হয়। যদি না টানতে পারে তবে মায়ের দুধ গেলে বের করে ড্রপার বা চামচ দিয়ে খাওয়াতে হয়।
• এ অবস্থায়ও ড্রপার বা চামচ দিয়ে খাওয়ানোতে কোনো অসুবিধা হয় না।
• তিন চার ঘণ্টা পরপর শিশুর কাঁথা বদলাতে পারেন।
• মা রাতে শোয়া অবস্থাতেও এই পদ্ধতিতে বুকে বেঁধে রাখতে পারেন, এমনকি টয়লেটে যাওয়ার সময়ও সাথে রাখতে পারেন যদি অসুবিধা বোধ না করেন।
• এ অবস্থায় মা ঘরের সাধারণ কাজগুলো অর্থাৎ কাপড় পরা, ঘর গোছানো এগুলো করতে পারবেন।
• গোছলের সময় শিশুকে একই পদ্ধতিতে বাবা অথবা দাদী-নানী একইভাবে তাকে বুকে ধরে রাখতে পারেন। এভাবেই শিশুটি মায়ের বুকের মধ্যে আস্তে আস্তে মায়ের সার্বক্ষণিক যত্নে বেড়ে ওঠে।
• যখন দেখা যায়, শিশুটি নড়াচড়া করে বেরিয়ে আসতে চাইছে তখন বুঝবেন শিশুটিকে এখন বাইরে আনা যাবে। সাধারণত দেখা যায় যখন শিশুটির বয়স সর্বমোট ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হয়েছে অথবা ওজন ২০০০ গ্রাম হয়েছে তখন শিশুটিকে বাইরে বের করা যায়।

ক্যাঙ্গারু মা পদ্ধতির সুবিধা কী?
• শিশু মৃত্যু কমায়।
• শিশুর অসুস্থতা কমায়।
• পদ্ধতিটি বেশ সহজ।
• স্বাভাবিক শারীরিক তাপমাত্রা পাওয়া যায়।
• শুধু মায়ের দুধ পান করানোর জন্য শিশুটির সব ধরনের পুষ্টির চাহিদা মেটানো সম্ভব।
• সার্বক্ষণিক যত্ন পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়।
• যদি শিশুকে হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে নেয়ার দরকার হয় তাহলে এই পদ্ধতিতে পাঠানো শিশুর জন্য ভালো।
• মা ও শিশুর সম্পর্ক খুব জোরালো হয়।
• শিশুর মা ও বাবার মনে সন্তুষ্টি ও স্বস্তি আনে।
• স্বল্প ওজন ও অপরিণত শিশুকে দীর্ঘ দিন হাসপাতালে অবস্থান করতে হয় না।
• হাসপাতাল ও পারিবারিক খরচ কমায়।
খরচ নাই বললেই চলে।

মূলবার্তা : শিশুর যত্নে ‘ক্যাঙ্গারু মা’ যত্ন পদ্ধতি শিশুর শরীরের তাপমাত্রা নাড়ির গতি ও শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। শিশুর পুষ্টি ও সার্বক্ষণিক যত্ন নিশ্চিত করে। এই পদ্ধতিটি সর্বসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য এবং এর বহুল ব্যবহারের জন্য তথ্যভিত্তিক ব্যাপক প্রচারণা দরকার।

লেখিকা: সহকারী অধ্যাপিকা, গাইনি ও প্রসূতি, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি:, শান্তিনগর, ঢাকা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫