ঢাকা, রবিবার,২৩ এপ্রিল ২০১৭

গল্প

দ্বিতীয় জীবন

আহমেদ আববাস

১৭ নভেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৬:১২


প্রিন্ট

অংক এবং ইংরেজি এ দু’টি বিষয় তার মাথায় না ঢুকলেও অল্প বয়সেই সে কলাগাছের মতো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং বাঙালিরর গড় উচ্চতা অতিক্রম করে। সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক অনায়সলভ্য এই যোগ্যতাপ্রাপ্তির ফলে দুনিয়াতে সে সহজেই পুরস্কৃত হয়। অর্থাৎ শারীরিক যোগ্যতাবলে চাকরি।
অবয়বে উচ্চগড় হলেও কার্যকলাপ এবং বিদ্যাবুদ্ধিতে সে ছিল বলতে গেলে একেবারেই নিম্নগড়। ক্রমাগত পরীক্ষায় অকৃতকার্যতার কারণে এবং কার্যকরি ফলাফলের আশায় পরপর তিন বছর ক্লাস টেনে পাঠ গ্রহণ করে। তবু সে এসএসসি পাসের রহস্যভেদ করতে পারেনি। এমনকি বারবার ফেল করায় তার মুখ কখনো মলিন দেখা যায়নি। সে ছিল সহজ, সরল, সদালাপি এবং প্রাণোচ্ছল। তার গায়ের রঙ ফর্সা, চোখ দু’টি সাধারণের চাইতে উজ্জ্বল আর উচ্চতায় ক্লাসের মাঝে তালগাছ। প্রায় পাঁচ ফিট দশ।
দশম শ্রেণীতে প্রথম বর্ষ অধ্যয়নকাল থেকেই সহপাঠী বন্ধুরা তাকে লম্বু বলে ডাকত আর সুযোগ পেলেই মেয়েরা বলত গোল আলু। যদিও সে দৈহিক কাঠামোয় দীর্ঘাকার ছিল কিন্তু তার সৌন্দর্যের কারণে সহপাঠিনীর নিকট ওই নামের লেবেল সেঁটে গেলি। একদিন স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি ফিরতে নির্জন পথে সহপাঠী এক মেয়ে তাকে বাগে পেয়ে এটা-ওটা এবং যাচ্ছেতাই জিজ্ঞেস করে। সে প্রতিক্রিয়াহীন থাকায় মেয়েটি তাকে কাতুকুতু দেয়। এতে সে ক্ষিপ্ত হয় কিন্তু মনে মনে বাড়ি এসে মাকে বলে। ‘মা, লাইলি আমার বগলে কাতুকুতু দিছে।’ মা ছেলের বোধ জাগাতে বলে, ‘হারামজাদা তোর হাত নাই।’
পরদিন মাতৃআজ্ঞা পালনের উদ্দেশ্যে ব্রেকের সময় একটু ফাঁক পেয়ে ক্লাসের ভেতর লাইলির বগলে হাত দেয়ার অপরাধে তার বিরুদ্ধে শ্রেণিশিক্ষক কর্তৃক বেত্রাঘাতসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
ফরিদ আলি প্রথমবার, দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বার এসএসসি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়। উত্তীর্ণ হতে না পেরে জীবনের গতি ফেরাতে যখনি হোমিওপ্যাথি বিদ্যা শিখতে মনোনিবেশ করে, সে সময়ই খোদাপ্রদত্ত শরীরটা কাজে লেগে যায়।
চাকরিতে যোগদানের পর প্রথমেই তার চুলকাটার ব্যবস্থা গৃহীত হয়। আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পূর্বে চাকরিপ্রাপ্তি সহজ হলেও সুযোগ সুবিধা ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে তাকে ছোট টুলে বসে চুল কাটাতে হয়। টুলে বসার পরও তার মাথা ইউক্যালিপটাসের মতো উদ্ধত থাকে। দূর্বাঘাসের ওপরে গাছের নিচে হালকা বাতাসে দাঁড়িয়ে নাপিত তার চুল কাটতে থাকে।
সবার সাথে চলতে গিয়ে, সবকিছু নিয়মমাফিক করতে গিয়ে পরবর্তী অনেক ঘটনাই তার মন থেকে বিস্মৃত হয়। মা কাকবন্ধ্যা, তাই পরিবারটি ছিল ছোট এবং সচ্ছল। পিতামহ কর্তৃক প্রাপ্ত এক একর জমি নিয়েই কর্মঠ পিতা সংসারের ভারসাম্য রক্ষা করেন।
ভালোই চলছিল। ছন্দে ছন্দে বাঁধা জীবন। বন্ধুরা বলত, ‘শালা তুই বাপমায়ের এক ছেলে, এখানে আসছিস কেন? তোর কিসের অভাব?’ এই বলে, এভাবে তোষামোদ করে বন্ধুরা তার মাইনের উপার্জিত সিংহভাগ টাকা ক্যান্টিনে শেষ করে দিত। তবু তার দুঃখ নেই। ছুটিতে বাড়ি যেতে বাবা-মার জন্য দু-একটা কাপড় নিলেই তারা খুশি। এতে ফরিদ আলির মনও সন্তোষে ভরে যেত। আশা-নিরাশার দোলাচলে চাকরিতে সময় পার হয়ে যায়। এখন তার চাকরির বয়স তিন বছর। নির্বুদ্ধিতার জন্য চাকরিতে উঠতে বসতে ধমক-গালি খেয়ে ইতোমধ্যেই তার ভেতরে অনেক বোধশক্তি জাগ্রত হয়েছে এবং বুঝতে পেরেছে জীবনটা ফুলের বিছানা নয়।
কিছু দিন যাবত ফরিদ আলির রাতে জ্বর জ্বর অনভূত হয়। প্রতিক্রিয়ায় দিনে শরীর দুর্বল লাগে। একদিন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। ডাক্তার ভাবল, ভাইরাল ফিভার। প্যারাসিটামল দিয়ে বিদায় করল। লাগাতার ক’দিন প্যারাসিটামল খেল। ওষুধে কোনো কাজই হয় না। শরীরে শুধু ঝিমঝিম ভাব আসে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই অপ্রত্যাশীভাবে একদিন ভীষণ জ্বর হলো। নেভাকুইন, ক্লোরোকুইন কোনো কিছুতেই কাজ হলো না। পরদিন হাসপাতালে পাঠানো হলো। পরীক্ষায় টাইফয়েড ধরা পড়ল। আবার পরীক্ষা। আবার ধরা পড়ল টাইফয়েড ফিভার থেকে অন্ত্র ফুটো হয়ে যাওয়ার চিত্র। টাইফয়েড ফিভার থেকে অন্ত্র বা ক্ষুদ্রান্ত্র ফুটো হয়ে গেলে তাকে টাইফয়েড আলসার পারফোরেশন বলে। অন্ত্রনালির ফুটো নিরাময়ের জন্য তাকে অপারেশন করতে হয়। অপারেশনের পর হাসপাতালের বেডেই কেটে গেলো পনের দিন। এরপর সাময়িককভাবে একটু সুস্থ হলো। কুড়ি দিনের মাথায় আবার জ্বর। ফরিদ আলির জ্বর আর নিরাময় হয় না।
ব্যক্তিজীবনে ফরিদ আলি অমায়িক এবং অকপট ছিল বিধায় সবাই তাকে পছন্দ করত। এমনকি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও প্রায়ই তার খবর নেন। একসময় সে যার মেসেঞ্জার হিসেবে নিয়োজিত ছিল।
ওষুধ অব্যাহত রাখলেও এই ফিভার ডায়াগনসিস করা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। জ্বর, জ্বর এবং জ্বর। এই জ্বর সম্পর্কে চিকিৎসকেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফরিদ আলির পরপারে ডাক এসে যায়। একদিন রাতে তীব্র জ্বরের পর আচানক হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
ফরিদ আলির মৃতদেহ রাতে তার কর্মস্থলে কিংবা বাড়িতে পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় প্রধান স্বাস্থ্য প্রশাসক তার লাশ হাসপাতালের মর্গে রাখার নির্দেশ দেন।
ঘটনাচক্রে সেদিন মর্গ এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় বৈদ্যুতিক লাইনে ক্রটি দেখা দেয়। বড় ধরনের ক্রটি দেখা দেয়ায় ‘লাইন মেরামত সময়ের ব্যাপার’ বলে ইলেকট্রিশিয়ান জানায়। ফরিদ আলির লাশ রাত ১২টায় কোথায় রাখা যায়? এ নিয়ে সবাই যখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, তখন একজন জানায়, স্যার, এ লাশ দোতলার ছাদে স্ট্রেচারেই রাখা যেতে পারে। ডাক্তারসহ সবাই তাতে সায় দেয় এবং দোতলার ছাদে শীতের কুয়াশার ভেতর চাদরে মুড়িয়ে দিয়ে রেখে দেয়া হয়। পরদিন সকালে তার কর্মস্থলের লোকজন আসে। সাথে আসেন সেই উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যিনি ফরিদ আলিকে স্নেহ করতেন।
সেই কর্মকর্তার সাথে প্রধান চিকিৎসকসহ অনেকেই লাশের কাছে যান। প্রথমেই তিনি চাদর সরিয়ে কী মনে করে আবেগে ফরিদ আলির মাথায় হাত রাখেন। হাত ঈষৎ গরম অনুভূত হওয়ায় তা নাকের সামনে আনেন, মৃদু নিঃশ্বাসের অস্তিত্ব অনুভব করেন, হাতটা বুকের দিকে নেন। এবার অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যান এবং তিনি প্রধান চিকিৎসকের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘ডাক্তার, সম্ভবত ছেলেটি এখনো আছে।’
‘কী বলেন স্যার, চিকিৎসক অবাক বিস্ময়ে চমকে ওঠেন।’
চিকিৎসক তখন মৃতব্যক্তির নাকে গায়ে এবং অন্যান্য স্থানে হাত দিয়ে বলেন, ‘স্যার একটু আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ও কিছু না। একটা চেতনানাশক কিংবা পয়জনাস ইনজেকশন দিয়ে দিই, এখনই সব শেষ হয়ে যাবে।’
‘ইমপসিবল, হোয়াট দি হেল আর ইউ টকিং।’ ঊর্ধ্বতন অফিসার যেন চিৎকার করে উঠলেন।
‘এক্সিউজ মি স্যার, বলতে চাইছিলাম, সবজায়গায় তার মৃতের খবর জানান দেয়া হয়েছে তো তাই।’
‘দেন হোয়াট, তাই বলে আমরা একজন মানুষকে হত্যা করব।’
অবশেষে সেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চাপে তাকে বাঁচানোর জন্য ডাক্তার তৎপর হলেন। ফরিদ আলির পুনঃচিকিৎসা শুরু হলো। একটু চেতনা ফিরলে তাকে আরো বড় হাসপাতালে পাঠানো হলো। তারপর ঢাকায়।
ফরিদ আলি সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর তার কর্মস্থলে ফিরে যায় এবং দশ দিনের নৈমিত্তিক ছুটিতে বাড়ি ফেরে।
আজ তার আনন্দের দিন। জীবন পুনঃপ্রাপ্তির জন্য আজ মিলাদ মাহফিল এবং গ্রামবাসীর জন্য প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়েছে। আর এই আনন্দঘন মুহূর্তে তার মনেপড়ে সেই লাইলিকে, যার শরীরে সুড়সুড়ি দিতে এখন আর তার ভয় নেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫