ঢাকা, মঙ্গলবার,২৮ মার্চ ২০১৭

বিবিধ

আড্ডা : অন্যরকম মুহূর্ত

ড. আবু এন এম ওয়াহিদ

১৭ নভেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৬:১০


প্রিন্ট

আড্ডা দিয়ে অবসর সময় কাটাতে বাঙালির জুড়ি নেই। কী দেশে, কী বিদেশে, ছোট, বড় ও মাঝবয়সী নারী-পুরুষ সব বাঙালির মধ্যেই কম বেশি আড্ডাপ্রবণতা দেখা যায়। শুধু ‘দেখা যায়’ বললে বরং একটু কমই বলা হয়; বলা উচিত, অতি মাত্রায় দেখা যায়। অবাঙালিদের মধ্যেও যে আড্ডা একেবারে নেই তা বলা যায় না। কারণ বাংলা ছাড়াও হিন্দি ভাষায় আড্ডা শব্দের প্রচলন আছে। হিন্দিতে আড্ডার প্রয়োগ হয় বিশেষ্য (নাউন) অর্থে। বাংলায় কিন্তু আড্ডা ক্রিয়া (ভার্ব) এবং বিশেষ্য (নাউন) দুই পদেই ব্যবহৃত হয়। আড্ডার সংজ্ঞায়ন একটু কঠিন বৈকি। ইংরেজি শব্দ ‘গসিপ’ দিয়ে আড্ডাকে ঠিক বোঝানো যায় না। ‘গসিপ’ প্রধানত একটি নেতিবাচক শব্দ। বাঙালির আড্ডার কিছু খারাপ দিক থাকলেও একে পুরোপুরি ‘গসিপ’-এর সমার্থক বলা যায় না।
আড্ডা সাধারণত একটি নির্মল ও নির্ভেজাল আনন্দের বিষয়, তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। আড্ডা দিয়ে শুধু সময়ই কাটানো হয় না, আড্ডা থেকে অনেক সময় অনেক কিছু জানা যায়, শেখাও যায়। সহজ কথায় আড্ডা বলতে আমরা বুঝে থাকি, খোশ-গল্প, কথাবার্তা, গপ্প-সপ্প ইত্যাদি। আড্ডা সরাসরি কারো বিরুদ্ধে হয় না এবং আপাত দৃষ্টিতে এতে কারো কোনো ক্ষতি হওয়ারও কথা নয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা থেকে শুরু করে ভ্রমণগল্প, দুঃসাহসিক অভিযান, প্রেমকাহিনী, ধর্ম, রাজনীতি, সমসাময়িক প্রসঙ্গ, সমাজ, শিল্প-সাহিত্য এর যেকোনো কিছুই হতে পারে আড্ডার উপাদান। গুরুতর এবং হালকা বিষয় সবই আলোচিত হয় আড্ডার আসরে। কেউ কেউ আবার রাশভারী কথাকে হালকাভাবে রসিয়ে রসিয়ে আকর্ষণীয় করে আড্ডায় উপস্থাপন করতে পারেন। এ প্রসঙ্গে উদাহরণস্বরূপ কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা না বললেই নয়। এমনও লোক আছেন, যারা একাধারে একের পর এক কৌতুক এবং চুট্কি বলে আড্ডাকে জমিয়ে রাখতে পারঙ্গম।
যদি কেউ প্রশ্ন করেন, ‘আড্ডা কোথায় হয়?’ উত্তরে বলতে পারি, কোথায় হয় না আড্ডা? আড্ডার জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান-কাল দরকার পড়ে না। আড্ডা বসতে পারে যেকোনো জায়গায়- খোলা আকাশের নিচে, যেমন খেলার মাঠে, পুকুরঘাটে, নদীর ধারে, লেকের পাড়ে কিংবা পার্কে, গাছের ছায়ায় বসার বেঞ্চে। আবার আড্ডা হতে পারে ঘরে, ছাদের নিচে চার দেয়ালের ভেতরে, অফিসের কমন রুমে বা খাওয়ার ঘরে, হোটেলের লবিতে, রেস্টুরেন্টে, চায়ের দোকানে, কফিশপে। কফিশপে আড্ডা বলতেই আমার কানে ভেসে আসছে মান্না দে’র বিখ্যাত ও জনপ্রিয় সেই গান ও তার সুরের মূর্ছনা- ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই...।’
বাঙালির মধ্যে আড্ডা পছন্দ করে না এমন লোক খুব কমই আছে। সামাজিক, রাজনৈতিক, পেশাগত, এমনকি ধর্মীয় কারণেও এক জায়গায় জড়ো হলে আমরা কোনো এক ফাঁকে আড্ডা জমাতে চাই। সুযোগ পেলে আমরা আড্ডার আসর বসাবই বসাব। আর না পেলে অন্তত সাইড লাইনে ছোট করে হলেও একটু আড্ডা মারতে আমরা কসুর করি না। যে জমায়েতে একেবারেই আড্ডা হয় না, তাকে অনেকের কাছে নিতান্তই নিরস ও নিরামিষ মনে হয়। সামাজিক দাওয়াত পার্টিতে গল্প-স্বল্প না হলে আড্ডাবিলাসী মানুষের কাছে মনে হয় যেন পার্টিই হলো না। ওই সব অনুষ্ঠানে সাধারণত তিনটি পর্ব থাকে- দেখাসাক্ষাৎ, খাওয়া-দাওয়া এবং গল্পগুজব ও আড্ডা। কারো কাছে দেখাসাক্ষাৎটাই মুখ্য, কেউ আবার নিতান্তই ভোজনবিলাসী, তবে বেশির ভাগ বাঙালির কাছে এ তিনপর্বের মধ্যে শেষেরটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য।
নির্ভেজাল আড্ডার খাতিরে বাঙালি দশ-বিশ মাইল দূরে বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতজনের বাড়িতে উৎসাহভরে হর হামেশাই যায়, এক কাপ চা-কফি খায়, রাজা-উজির মারা আড্ডা দেয়, গল্প করে, প্রাণখুলে হাসে, উপভোগ করে এবং তারপর নিজ ঘরে ফিরে আসে। বিদেশ বিভূঁইয়ে যেখানে বাঙালি বসতির ঘনত্ব কম সেখানে বিশ, তিরিশ, পঞ্চাশ, এমনকি এক শ’ মাইল ড্রাইভ করতেও অনেক আড্ডাপ্রিয় বাঙালি আপত্তি করে না। আজকাল লং ডিস্ট্যান্স টেলিফোন কল অনেক সস্তা হয়ে গেছে, তাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ম্যারাথন আড্ডা টেলিফোনেই সেরে ফেলা যায়। কেউ কেউ একাধিক লাইনে অনেক বন্ধুর সঙ্গেও একত্রে আড্ডা জমায়। প্রযুক্তি প্রসারের সাথে সাথে এখন ই-মেল, ‘ফেসবুক’ এবং টুইটারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিসরে আড্ডার গণ্ডি হয়ে গেছে সীমাহীন। আড্ডা বাঙালির এক জাতীয় নেশা, রীতিমতো অ্যাডিক্শন বলা চলে। আমি এখানে বাঙালি বলতে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে দুই বঙ্গের সব মানুষকেই বোঝাচ্ছি। অন্য সব ক্ষেত্রে আর যাই হোক না কেন, আড্ডার ব্যাপারে আমরা দুই বঙ্গ একেবারে এক ও অভিন্ন।
ইদানীং কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের বদৌলতে বাঙালির আড্ডায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আজকাল ইন্টারনেটে প্রচুর আড্ডা হচ্ছে। আবিষ্কার করলাম বাঙালির আড্ডার অনেক ওয়েবসাইট। কারো উৎসাহ থাকলে ওইসব সাইটে গিয়ে যখন তখন আড্ডা জমাতে পারেন। সাইটগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা- ‘আমাদের আড্ডা’, ‘বাংলা আড্ডাঘর’, ‘বাংলা আড্ডা’, ‘বাংলা গল্প বাংলা আড্ডা’, ‘আড্ডাবাজের বাংলাব্লগ’, ‘দেশি আড্ডা’, ‘বেঙলি আড্ডা’, ‘বাংলা আড্ডা পেপেরোনিটি’ আরো কত কিছু। এ ছাড়া ইউটিউবে আছে ‘আড্ডা বাংলা ফ্রেন্ডস’ লিঙ্ক ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রাচ্যের কথা বলতে পারব না, তবে পাশ্চাত্য জগতে অর্থাৎ ইউরোপ এবং আমেরিকার লোকজন বাঙালির মতোন আড্ডা দেয় না এবং তার প্রশ্নই ওঠে না। এ দেশে জন্ম নিয়ে বড় হওয়া আমার বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া মেয়ে আমাকে সেদিন বলল, আব্বু, আমেরিকার লোকজন বাঙালির মতো আড্ডা দেয় না, দিতে চায়ও না। কারণ তারা কথাবার্তার ব্যাপারে আসলে খুবই ফর্মাল, কনজার্ভেটিভ এবং বলতে গেলে অতিরিক্ত সাবধান। অপরিচিত অথবা অল্প পরিচিত লোকজনের সাথে দেখা হলে তারা ‘সফ্ট টক’ করে। ‘হার্ড টকে’ যায় না। ‘সফ্ট টক’ বলতে বোঝায় সেসব আলাপ আলোচনা যাতে তর্ক-বিতর্কের অবকাশ থাকে না। পক্ষান্তরে ‘হার্ড টক’ অবধারিতভাবে বিতর্কের জন্ম দেয়। আমার মেয়ে আরো বলল, এ দেশের লোক নতুন কারো সাথে অন্য কিছু ছাড়া, ‘সফ্ট টক’- মানে খেলাধুলা, দিনের আবহাওয়া ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এতে কথাও হলো, আবার তিক্ততা সৃষ্টিরও কোনো ঝুঁকি থাকল না।
একই প্রসঙ্গে বন্ধু মাহবুবের কাছে পেলাম আরো কিছু তথ্য-উপাত্ত। তার মতে, ‘ইউরোপ আমেরিকার লোকজন কারোরই ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করে না। তারা ধর্মবিশ্বাস ও তার চর্চা এবং রাজনৈতিক মতামত বা মতাদর্শ ইত্যাদি ইস্যুকেও মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত বিষয় মনে করে। এ ছাড়া মানুষের বিয়ে-সাদী, ছেলেমেয়ে, পেশা- বিশেষ করে বেতন, আর্থিক অবস্থা, গাড়ি-বাড়ি কিনলে তার দাম ইত্যাদি কখনোই জানতে চায় না।’ ‘পশ্চিমারা মৃত্যু, কাপড়চোপড়, সাজগোজ, বেশ-ভূষা, ইত্যাদি নিয়েও কথা বলে না। অনেক সময় অনেক নারী-পুরুষ গায়ে ট্যাটু করে, অদ্ভুত রকমের জামাকাপড় পরে এতে করে কেউ কিছুই বলতে চায় না। কোনো কোনো পুরুষ হাতে বালা, কানে দুল, গলায় মালা পরে। অনেকে মাথায় মেয়েদের মতো লম্বা চুল রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে রাখে। এগুলোও সব তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ সব নিয়ে কোনো পরিবেশেই কোনো কথা চলে না। জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে কে কাকে ভোট দিলো এটাও আলোচনার বাইরে। মোট কথা এত বিষয় আলোচনার তালিকা থেকে খারিজ হয়ে যাওয়ার কারণে বাঙালির সাথে তাল মিলিয়ে তাদের আড্ডা দেয়ার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ রসালো উপাদান অবশিষ্ট থাকে না। তাই তাদের আড্ডাও ওইভাবে জমে না, জমার কথাও নয়। আর সে কারণেই হয়তো তারা বাঙালির মতো এত আড্ডাপ্রবণ নয়।’
বাঙালির আড্ডা সব সময় যে নির্ভেজাল এবং নির্মল থাকে তেমনটি কিন্তু নয়। আড্ডা দিতে গিয়ে এবং আড্ডায় রঙ-তামাশা করতে গিয়ে বাঙালি অহরহ ঝামেলার মধ্যেও পড়ে। অনেক সময় কৌতুক করতে গিয়ে অনেক আড্ডাবাজ নিজের অজান্তেই বন্ধুবান্ধব কিংবা আত্মীয়স্বজনদের মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ান এবং এতে করে দীর্ঘ দিনের গভীর সম্পর্ক স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া বিশেষ করে ধর্ম এবং রাজনীতি বিষয়ে আড্ডা দিতে গিয়ে অনেককে অহরহ বিড়ম্বনার মধ্যেও পড়তে দেখা যায়। এ রকম অবস্থায় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, কথা কাটাকাটি, ঝগড়া-ফ্যাসাদ, এমনকি গালাগালি, হাতাহাতি, মারামারিও হতে পারে। সেজন্য আড্ডার যেমন ভালো দিক আছে তেমনি আছে খারাপ দিকও।
আড্ডার আসরে কথা বলতে এবং কথা শুনতে অনেকেরই ভালো লাগে, কারণ আড্ডায় থাকে উত্তেজনা এবং এর মাঝে ব্যথা-বেদনা ও স্ট্রেস-টেনশন ভুলে কিছুক্ষণের জন্য হাসিঠাট্টার মাধ্যমে মজে থাকা সম্ভব। তবে এখানে একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন, আড্ডা কিন্তু একেবারেই ঝুঁকিমুক্ত নয়। আড্ডায় বিভোর হয়ে পড়লে যেকোনো দুর্বল মুহূর্তে একটি বেফাঁস কথা আড্ডাবাজের মুখ থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। আর তেমনটি ঘটলে রাইফেল থেকে শট হওয়া বুলেটের মতো মুখের কথা ফিরিয়ে আনা যায় না। ক্ষতি যা হওয়ার তা মুহূর্তেই হয়ে যায়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫