ঢাকা, রবিবার,২২ জানুয়ারি ২০১৭

বিবিধ

ডাকঘর সিল : কালের দলিল ৩

কে জি মোস্তফা

১০ নভেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৭:০১


প্রিন্ট

পুনরাবৃত্তি : বিজ্ঞান আমাদের কী না দিয়েছে! ইতোমধ্যেই আমাদের জীবনকে পাল্টে দিয়েছে বিজ্ঞান। প্রযুক্তি এনে দিয়েছে এমন অনেক সম্ভার যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা কল্পনাও করতে পারতেন না। নতুন নতুন যন্ত্রপাতি যেমনÑ সেলফোন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার ছাড়া আধুনিক জীবন তো অচল! টরে টক্কা (টেলিগ্রাম) কবেই অক্কা পেয়েছে। গ্রামোফোন পড়ে আছে জাদুঘরের এক কোণে। নীল খাম রঙিন চিঠির দিন শেষ। পত্রমিতালির গীতালি আর নেই। ডাকঘর অনেকটা হা-ঘর।
সে যাই হোক, দুঃসহ বর্তমান আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ঘেরাটোপে পড়ে অতীতের স্মৃতিচারণ ছাড়া আজ আমাদের আর কোন পথই বা খোলা আছে।

আকাশ ভরা সূর্য বিশ্ব ভরা প্রাণ
নৈঃশব্দের এক দেশ জাপান। নিঃশব্দে যেখানে চলে যাবতীয় কর্মপ্রবাহ। ঘরে-বাইরে ব্যস্ত শহরে কিংবা শহরতলীতে সর্বত্রই এক শান্ত সমাহিত ভাব। আকাশে আলোর বাঁশি, বাগানে ফুলের হাসি।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল একগুচ্ছ ফুলের কথা। ফুল নয়, কুসুমিত ক’টি তরুণী। তারা জাপানি অষ্টাদশী। নামগুলোÑ মিস হিসায়ো নাসু, মিস ইয়োকো শিবা, মিস তোশিয়ে মিকামি, মিস ইয়োমিকো মিনামি ও মিস কায়ো নাকাতসুকাসা। ফুলের মতো যেমন কোমল, ডালের মতো তেমনি শক্ত ও সবল।
৯০-এর গোড়ার দিকে। আমি তখন ডিএফপিতে সচিত্র বাংলাদেশের সিনিয়র সম্পাদক। কেমন করে মনে নেই, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) থেকে অনুরোধ এলো, আমি যেন সদ্য আগত একজন জাপানি তরুণীকে কয়েক সপ্তাহের জন্য আবাসিক আতিথিয়তা দেই। উদ্দেশ্য স্পোকেন বাংলা শেখা এবং বাংলাদেশী লাইফস্টাইলে অভ্যস্ত হওয়া। বাংলাদেশে জাপানি প্রকল্পগুলোতে সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালনই এদের কর্ম।
সেই সময় আমি আজিমপুর কলোনির বাসিন্দা। আমার মনে এক দিকে কৌতূহল, অপর দিকে উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কা। জাপান পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী দেশ। সেই সময় জাপানের মাথাপিছু আয় বার্ষিক ৩৭০০ মার্কিন ডলার, আর আমাদের মাত্র ৬০০ ডলার। অনেক ভেবে-চিন্তে অবশেষে রাজি হয়ে গেলাম। বাসায় আলাদা একটি রুম যথাসাধ্য পরিপাটি করে রাখলাম। অধীর অপেক্ষার মধ্যে নির্দিষ্ট এক বিকেলে ‘জাইকা’র লোক পৌঁছে দিয়ে গেল কথিত মেয়েটিকে। সদা-হাস্যময়ী ফুটফুটে মেয়েটি অচিরেই সবার মন কেড়ে নিলো। সতর্ক ছিলাম যেন সে কিছুতেই আমাদের অগোছালো রান্নাঘর বা অন্য রুমে ঢুকে না পড়ে। কিন্তু কী আশ্চর্য, মেয়েটি এসেই প্রজাপতির মতো ঘুরঘুর করতে লাগলো। এ-ঘর ও-ঘর, যেন সে আমাদের কত কালের চেনা!
কয়েক দিনের মধ্যে সে জিন্স ছেড়ে সালোয়ার-কামিজ, এমনকি শাড়ি পরা শিখে ফেললো। তার কাছে অচেনা-অজানা আমাদের খাবার-দাবার, কোনো কিছুতেই তার অনিচ্ছা বা অনীহা নেই। সব কিছুতেই তার অফুরন্ত কৌতূহল। আমাদের যাবতীয় শাকসবজি, মাছের নামগুলো জেনে নিচ্ছে অতি আগ্রহে। যা কিছু শুনছে বা দেখছে তোতাপাখির মতো আওড়াচ্ছে। সর্বক্ষণ তার মুখে হাসি, হাতে কিন্তু খাতাকলম। অ-আ-ই-ঈ লিখছে অথবা পড়ছে। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত শিখছে এবং বারবার গাইতে চেষ্টা করছে। গালগল্পের মধ্যেও যা কিছু তার কাছে নতুন ঠেকছে, টুকে নিচ্ছে।
ইতোমধ্যে কৌতূহলী পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন তাকে দেখতে আসছে। কোনো প্রকার দ্বিধা বা অহেতুক সঙ্কোচ তার নেই। সবার সাথে আপনজনের মতো আধো-আধো বাংলায় কথা বলছে। অচিরেই পরিবারের একজন সদস্যের মতো আমরা হয়ে গেলাম তার চাচা-চাচী, খালা-খালু। কেউ আপা, কেউবা ভাই। স্বল্প সময়ের মধ্যে স্নেহ আর মায়া-মমতায় সবাইকে সে আপন করে ফেললো।
প্রসঙ্গত, আমাদের এতদ্দেশে মেয়েলোক মানে সহানুভূতি। কিন্তু জাপানিদের ধাতে এটা নেই। বাইরে হোক ভেতরে হোক তারা নিজেই নিজের কাজ সামলাবে।
অহেতুক সময় নষ্ট করা ওদের ধাতে নেই। কী অদ্ভুত! নিষ্ঠা আর নিরন্তর পরিশ্রমে মাত্র তিন মাসের মধ্যে মেয়েটি চলনে-বলনে হয়ে গেল অচেনা এক বাংলাদেশী। দেখতে দেখতে সময় শেষ হয়ে এলো। এবার তার বিদায়ের পালা। নির্দিষ্ট দিনে কাঁধে ব্যাগ, হাতে ঝোলা নিয়ে সে বেরিয়ে গেল। পেছন ফিরে একবারো তাকালো না। এক অন্তর্মুখী কর্মপ্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে চলে গেল।
সে যাই হোক, আমাকে পরপর পাঁচ বছর পাঁচটি জাপানি তরুণীকে আবাসিক আতিথেয়তা দিতে হলো। এদের নামগুলো বেশ মজার। যেমন- নাসু, শিবা, তোশিয়ে, মিনামি, সর্বশেষ কায়ো। চেহারা, আচার-আচরণ এবং হাবভাবে সবাই যেন এক ও অভিন্ন। থোকা থোকা এক গুচ্ছ ফুল। ফুলের মতো ফুটফুটে, সুন্দর ও সদা হাস্যময়। আকাশভরা সূর্য আর বিশ্বভরা প্রাণ ওদের!
কী আশ্চর্য, পৃথিবীর অন্যতম উন্নত ও ধনী দেশের মেয়েরা কী অনায়াসে আমাদের পরিবারের একজন হয়ে যেত। বাঁধনবিহীন যে বাঁধন তাতে অতি অল্প সময়ে আপন করে নিতো সবাইকে। মাসখানেকের মধ্যেই ওরা বাংলাভাষা মোটামুটি আয়ত্ত করে ফেলতো এবং পোশাক আশাকে বাংলাদেশী বনে যেত। গভীর গভীরতর মায়ায় সীমিত খাদ্য ও বাসস্থানের বাধা অতিক্রম করে কেমন করে যেন সবচেয়ে বেশি অপত্য সৃষ্টি করে ফেলতো। কবেকার সেইসব স্মৃতি! মনে হয় এইতো সেদিন।
বাংলাদেশে প্রত্যেকের অবস্থান ছিল মাত্র এক বছর। দেশে ফিরে গিয়ে এদের কেউ কেউ আমাকে চিঠি লিখতো। চিঠির ভাষা ও বক্তব্য যেমনি আন্তরিক, তেমনি মায়াময়। কয়েকটি উদ্ধৃতি...।
কথায় বলে, যে বসে থাকে তার ভাগ্যও বসে থাকে। যে শুয়ে থাকে তার ভাগ্যও শুয়ে থাকে। যে উঠে দাঁড়ায় তার ভাগ্য উঠে দাঁড়ায়। আর যে চরে বেড়ায়, তার ভাগ্যও বিচরণ করে। বিচরণ করতে করতে ভাগ্য একসময় সুপ্রসন্ন হয়। ‘চরৈবেতি’ শব্দটার অর্থ- বসে থেকো না, চলতে থাকো, যাত্রা করো। জাপানিদের প্রাণমনে এটাই যেন মূলমন্ত্র।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫