ঢাকা, রবিবার,২০ আগস্ট ২০১৭

গল্প

সেই নিরালায়

শওকত নূর

১০ নভেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৬:৪১


প্রিন্ট

নদী উত্তাল! ঢেউ আছড়ে পড়ছিল কিনারে। ওপারের খোলা প্রান্তর বহুদূর বিস্তৃত। কান্নাভেজা আকাশ নেমেছে মাঠ শেষের সবুজ গাঁয়ের মাথায়। দলে দলে মেঘ ছুটছে দিগন্তের পথে। ঝাঁকেঝাঁকে পাখি উড়ছে তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে। এপারে উঁচু কাছার থেকে হাত কয়েক দূরেই এক বাংলো-মতো ছাউনি। তারই নিচে বসেছিলেন তিনি। উদাস। নিশ্চুপ। দৃষ্টি ওপারের আকাশে। তাকে নজরে পড়া মাত্র আমরা ঘোড়া থেকে নেমে হাঁটা ধরি। পায়ে বেশ গতি সঞ্চার হতে লাগল আমাদের! হঠাৎ আমের খোসায় পিছলে গেলাম আমি। তখনই সঙ্গী মেহেরাব মিঞা চেঁচিয়ে বলল- ভাই সাহেব, ওই যে সেই বিশিষ্ট লোক! দেখেন হাতে পিতলের ছড়ি! কী অবাক বিস্ময়কর! আমি চাপা গলায় বললাম- আহা মেহেরাব, এত চেঁচিও না! আস্তে কথা বলো! আগে টেনে তোলো আমাকে! কোমর গেছে আমার!
মেহেরাব মিঞার হাত ধরে ওঠার ফাঁকে লক্ষ করলাম তাঁর মাথা-মুখমণ্ডল ঘন সাদা চুল দাড়িতে একাকার। ভ্রু জোড়ার অস্বাভাবিক বড়ত্ব দূর থেকেও দৃষ্টি কাড়ছে। আমি উঠে দাঁড়ালে মেহেরাব মিঞা হন্ হন্ করে সেদিকে হাঁটা ধরে। যেন তার পেছনে কেউ নেই। কিন্তু ক’কদম গিয়েই সে আবারো চেঁচায়- ভাইসাহেব, দৌড় দেন, দৌড়। বৃষ্টি নামছে! বললাম- দৌড়াব? কেমন হয় ব্যাপার?
ব্যাপার কিছু না, ভাইসাহেব। তিনি তো উদাস। বুঝবেন না কিছু। আকাশে মেঘ দেখতেছেন।
আমি দৌড়ালাম না। ছুটন্ত মেহেরাব মিঞার পেছনে অতি দ্রুত হেঁটে কথিত ওই ছাউনিতে গিয়ে উঠি। আশ্চর্য হলাম! আমাদের সশব্দ উপস্থিতি বিন্দুমাত্র বিচলিত করেনি তাকে। তখন দৃষ্টি তার নদীপৃষ্ঠের সাদা ধোঁয়াটে বৃষ্টিতে। বেশ বড় ফোঁটায় ঝম ঝম বৃষ্টি পড়ছে। ঘাড় কাৎ করে শব্দে কেমন নিবিষ্ট হয়ে আছেন তিনি! হাতের ছড়িটা দেখে মনে মনে ভাবলাম- এই তাহলে সেই ছড়ি, যা থেকে তাকে শনাক্তের কথা শুনে আসছি অনেক দিন। মেহেরাব মিঞা ফিস্ফিস্ করে বলল- ভাইসাহেব, কিছু জিজ্ঞাসা করেন ওনাকে।
তাকে হাত ইশারায় চুপ হতে বলে মাথা নোয়ালাম আমি। ভদ্রলোকের কানের কাছে মুখ নিয়ে অতি পরিচিতের মতো করে বললাম- আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন? সাড়াশব্দহীন মৃদু মাথা নাড়লেন তিনি। বললামÑ আমরা বেশ দূর থেকে এসেছি। অনুমতি পেলে কিছু কথা বলতাম আপনার সাথে। খুব একটা সময় নেবো না আমরা। বলা যাবে কি?
জ্বি, বলুন। অস্ফুট বললেন তিনি।
আপনি তো জনাব আহনাফ আলী?
ইঞ্জিনিয়ার আহনাফ আলী। খুব দুর্বল শোনালো তার কণ্ঠ।
মাফ্ করবেন। ব্যক্তিগত প্রশ্নে আপত্তি থাকবে কি?
জ্বি-না। অদ্ভুত চোখে চাইলেন তিনি।
শুনেছি আপনি অনেক আগে শহরের চাকরি ছেড়ে চিরতরে গাঁয়ে চলে এসেছিলেন- সত্যি কি না কথাটা?
আপনি তা জানেন। জেনেও প্রশ্ন করছেন। দৃঢ় কণ্ঠ তার।
জ্বি... আসলে...।
দেখুন, স্বাধীন চেতনা কিংবা স্বেচ্ছাসিদ্ধান্ত যে কারো থাকতে পারে- রাজা রাজন্য থেকে সাধারণ মানুষ- একান্তই তা ব্যক্তিগত; ওতে অতটা কৌতূহলের কিছু নেই। পেশাগত শ্রেণিবিভাজনেরও কিছু নেই।
আমি তা করছি না। কিন্তু চলে আসার কারণ কী ছিল সেটা দয়া করে বলবেন কি?
তাও আপনার জানা। ভালোমত জেনেই আপনি এসেছেন। ভেবে দেখুন।
আমি যা জানি তাতে খুব একটা বিশ্বাস আমার নেই। জোর গলায় বললাম আমি।
আপনি কী জানেন? বিষণ্ন দৃষ্টিতে চাইলেন তিনি।
শুনেছি মাঝারি ভূমিকম্পে আপনার তদানীন্তন বাসস্থানের আংশিক ক্ষতির পর আপনি ভূমিকম্পের ভয়ে শহর ছেড়ে চলে এসেছিলেন। সত্যিই কি তাই? কতদূর তা সত্যি?
আংশিক। ভীষণ অদ্ভুত দৃষ্টি ছুড়লেন তিনি।
তবে নিশ্চয়ই আরো কোনো কারণ থেকে থাকবে। জানতে চাওয়া সমীচীন হবে কি?
আপনি সমীচীন অসমীচীনের ধার খুব বেশি ধারছেন না। আবারো অদ্ভুত চোখে চাইলেন তিনি।
দুঃখিত, মাফ্ করবেন। ভুল গণ্য হতে পারে। তবে আপনাকে বিব্রত করা উদ্দেশ্য নয়। সম্মান রেখেই বলছি।
এতটা গভীরে আগে কেউ জানতে চায়নি। কী পেশা পরিচয় আপনার?
জ্বি, আমি আহমেদুল গনি। চাকরি খোঁজার ফাঁকে টুকটাক লিখছি। অসদভিপ্রায় নেই। সাক্ষাৎ আর আলাপচারিতাই লক্ষ্য।
তাই সঙ্গত।
যদি দয়া করে বিষয়টা খুলে বলতেন তো কৃতার্থ হতাম। বেশ দূর থেকে এখানে এসেছি আমরা।
কোন্ গাঁ আপনার?
হোতাপাড়া।
বেশ ভালো গাঁ।
আপনি চেনেন?
নিশ্চয়ই। যৌবনে প্রায়ই যেতাম সেখানে। কাবাডি খেলতাম। এমনই এক নদী, বালুচর, সবুজ মাঠ, হাটখোলা, বেশ বড় ক’টা ঝাউগাছ। অনেক স্মৃতি! আজও অম্লান! হায় সময়!
তাহলে জনাব, আমাদের সব খুইলা বলেন। পাক্কা সাত কিলো দূর ভাইঙ্গা এখানে আগমন হয়েছে। বড় কষ্টের জার্নি গেছে। চেঁচাল মেহেরাব মিঞা।
আহা মেহেরাব, তুমি নিশ্চুপ থাক। বললাম আমি। আচ্ছা আপনি দয়া করে বলুন।

আবারো আকাশে তাকালেন তিনি। লক্ষ করলাম, মেঘগুলো তখন সাদাটে হয়ে এখানে ওখানে বুনো জন্তুর রূপ নিয়েছে। বিচলিত চোখে তিনি তা দেখছিলেন।
হয়তোবা। আমি বিমর্ষ হয়ে বললাম। ভাবছিলাম রহস্যটি এড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। অথবা, রহস্যাবরণে সত্যিটিই বলে যাচ্ছেন।

আসলে যে জীবনই আপনি যাপন করুন- শহরে কী, গাঁয়ে, দালানে কিংবা কুঁড়েঘরে, একাকী কিংবা সাংসারিক- আপনাকে ঘিরে আনন্দ বেদনা দুটোরই উপস্থিতি পালাক্রমে থাকে। যদিও ব্যক্তিআকাক্সক্ষা শুধু সুখ ঘিরেই আবর্তিত। সুখ চাই; নিরঙ্কুশ সুখ; এক চিলতে দুঃখ নয়- এমন ভাবনায় মানুষ অবিরত ডোবে। খুব সাধারণ কথাগুলো। একেবারে সাদামাটা। সবাই বোঝে।
জ্বি, বলুন।
ওই আবর্তনটা, নিমজ্জনটা শহুরে উচ্চবিত্তের মনে যেমন- ঘুরকুনো অতি দরিদ্র গেঁয়ো মুচি কিংবা সচ্ছলাসচ্ছল কৃষকের মনেও তেমন। আর ব্যবসায়িক হিসাব, আফিসে কলম পেষা, ফসল বোনা বা তোলা কিংবা জুতো সেলাই; যা-ই বলুন, সবখানে কখনো না কখনো দৈব থাকে। নিরঙ্কুশ আনন্দ যেটুকু তার রঙ একই, হোক তা আলো ঝলমলে নাগরিক কমিউনিটি সেন্টারে, বস্তি অথবা উন্মুক্ত ফুটপাতে কিংবা গেঁয়ো হ্যাজাক বাতির নিচেকার তেল চিটচিটে শতরঞ্চিতে। অনাবৃত প্রাকৃতিক হাসিমুখগুলোর কী পার্থক্য আপনি নিরূপণ করবেন? অশ্রুগুলোকেও আপনি খোলা চোখে আলাদা করতে পারবেন না। অভিন্নতা আপনাকে ধাঁধাঁয় ফেলবে, যদিও কৃত্রিম পোশাকের ভিন্নতা আপনাকে তা থেকে সাময়িক রেহাই দেবে।
আপনি বলুন।
এই যে এত হর্ষ-বেদনা, অশ্রু-বিনোদনের পালাক্রম- সব কিছুর যোজন বিয়োজনে প্রত্যেকের প্রত্যাশায় থাকে নিরবচ্ছিন্ন এক চিলতে ঘুম। ওই জগতটিতে সবাই সমান। প্রত্যেকে সমান আত্মভোলা। জীবন আসলে একই-শুধু খোলসগুলোই ভিন্ন। গভীর করে ভেবে দেখুন। আপনি বুঝবেন যদিও ছিটেফোঁটা ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক।
আচ্ছা কোনো কর্তব্য কি বোধ করেন? জানা নেই সঠিক; তাই বলছি।
কীসে কর্তব্য?
জগত সংসারের প্রতি, মানুষের প্রতি?
নিশ্চয়ই। না হলে এখানকার জনকল্যাণ, উন্নত চাষাবাদ, শিক্ষাপ্রসার, যান্ত্রিক উৎকর্ষ- ওসবে সংকোচন উল্লেখ করার মতো হতো। নৌপথে যেসব উঠতি তরুণ ছাউনিতে আঙুল তোলে তাদের জ্ঞান ওটুকুতেই সীমাবদ্ধ। ওরা অবুঝ।
জ্বি ধন্যবাদ। এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে আসতে চাই।
জ্বি আসুন। প্রসঙ্গের ভিন্নতা আমার কাছে কমই থাকবে। তবুও বলুন।
কথা বলছেন, অথচ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকছেন। বিষণ্ন! কী এমন তাৎপর্য?
ও সেই কথা! কান্নায় মিশে থাকার প্রাকৃতিক প্রবণতা- ওই আর কী।
বুঝিয়ে বলবেন? আপনি বলেছেন সুখ আপেক্ষিক, তাহলে...?

মুখে যে যাই বলি, ভেতরে আসলে আমরা প্রত্যেকেই কান্নাপ্রবণ, যদিও সুখটাকে আমরা ঘটা করে উপভোগ করি।
দয়া করে খুলে বলবেন?
দুঃখ কিংবা সুখ উভয়েরই চরম পরিণতির কথা ভাবুন, আমরা সেসবে কাঁদি কি-না? শহুরে কিংবা গাঁয়ের সদাহাস্য তরুণ, ছিচকাঁদুনে গৃহবধূ কিংবা হাটখোলার চোয়াল দৃঢ় অতি রাশভারী কসাই- ওই সব প্রেক্ষিতে প্রত্যেকে এক। কারো হাসিকান্নাগুলো সহজ দৃশ্যমান, কারোগুলো অদৃশ্য। একান্ত নিভৃতের!
জ্বি, আমরা আকাশ নিয়ে কথা বলছিলাম।
মনে আছে। কী নিঃসীম উদার ওই সূর্যালোকিত আকাশ! তার আলোয় আমরা চলি- উদ্ভাসিত হই। অথচ তার পরম উৎকর্ষ যেন ওই ভেজা মেঘের কান্নায়। অশান্ত অগ্নিতাপগুলো নির্মল নিস্তেজ হয়ে নেমে আসে ধূলির পৃথিবীতে। দেখুন না কী নির্মল করুণ বর্ষণ! সাগর দেখেছেন নিশ্চয়ই?
জ্বি।
তারও উদার বিশাল বুকজুড়ে কেবল অশ্র“ আর অশ্রু- প্রতিদিনের সৌরতাপ বর্ষণ দিগি¦দিক বিস্ফারিত করে সে অশ্র“কে। অশ্র“তেই তার পরম উৎকর্ষ। একটু গভীর করে ভাবুন।
জ্বি, শেষ প্রশ্ন।
রাখুন।
ন্যায় অন্যায়, পাপপুণ্যে অভিমত?
বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা জানতে চাইছেন? অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতোই তা। তবে যখন লক্ষ করি অন্যায়ে ভ্রু কুঞ্চন ব্যক্তিকে বিচিত্র ধারার কষাঘাতে জর্জরিত করে; অথচ ব্যক্তির পাপপুণ্যের জাগতিক হিসাবের চাবুকটি প্রায়শ ওইসব ব্যক্তিদের হাতে ন্যস্ত, যাদের প্রতিক্ষণের অশুভ্রতা ব্যক্তির গোটা জীবনের অশুভ্রতাকে অতিক্রম করে যায়- আর হাতগুলো পরাক্রমশালী, নিবিড় সুখস্বাচ্ছন্দ্যের অধিকারী- তখন খটকা জাগে। তবুও বিশ্বাসে অনড়তা থাকে, কারণ জানি সত্যিকার হিসাবটি এখানকার নয়।
জ্বি ধন্যবাদ! শুভ প্রত্যাশা থাকছে! বিদায়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫