ঢাকা, বুধবার,২৬ এপ্রিল ২০১৭

রকমারি

বড়লেখার ঐতিহ্যবাহী শিল্প আগর

জালাল আহমদ

০৫ নভেম্বর ২০১৬,শনিবার, ১৭:৫৬ | আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০১৬,শনিবার, ১৯:১২


প্রিন্ট

টিলায় টিলায় সারি বেঁধে লাগানো হয়েছে গাছের চারা। নাম তার আগর। সবুজ অরণ্যে একাধারে চলছে পূর্ণ হওয়া গাছগুলো কর্তন ও নতুন চারা রোপণের কাজ। সুনিপুণ হাতে এ কাজটি করছেন কয়েক হাজার দক্ষ শ্রমিক। সবার প্রচেষ্টায়ই গড়ে উঠেছে প্রকৃতি-নির্ভর আগর শিল্প। বিশ্বের প্রাচীন শিল্প হওয়া সত্ত্বেও বড়লেখার আগর শিল্পটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে না। প্রায় ৬০০ বছর ধরে চালু রয়েছে এ শিল্প। আগর শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন দেড় লক্ষাধিক নারী ও পুরুষ।

আগর শিল্প : পরিত্যক্ত ঝোপঝাড়-বেষ্টিত টিলা ও উঁচু সমতল ভূমি এক সময় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল থাকলেও আজ তা শিল্পকারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ দুই ইউনিয়নের এমন বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে বাড়ির লোকজন আগর শিল্পের সাথে জড়িত নন। এ শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা আগাম গাছ কিনে রাখেন। অভাব-অনটনে পড়ে দরিদ্র এলাকাবাসী দু-এক বছরের চারাগাছও হাজার টাকায় বিক্রি করে থাকেন। অনেকটা ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার মতো। গাছের বয়স তিন বছর হলেই সুনিপুণ হাতে লোহা ঢুকানো হয়। কচি গাছে আগর ধরাতে এ পদ্ধতির জন্য আলাদা শ্রমিক রয়েছেন। এদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। গাছপ্রতি লোহাসহ ৩০০-৪০০ টাকা তাদের দিতে হয়। অনেক সময় গাছের মালিক নিজেই এ কাজ করে থাকেন। পাঁচ বছরের একটি আগরগাছ পাঁচ-ছয় হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। পূর্ণবয়স্ক আগরগাছের মূল্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে লক্ষাধিক টাকাও ছাড়িয়ে যায়।

আগর উত্তোলন পদ্ধতি : গাছ থেকে নির্দিষ্ট মাপে আগর আলাদা করতে হয়। এসব কাজ নারীশ্রমিকেরা করে থাকেন। তবে এখন পুরুষেরাও এ কাজ করছেন। এ পদ্ধতির নাম ‘ধুম’। কয়েক পদ্ধতিতে ধুম করার পর কচি কাঠের টুকরো ঢেঁকি দিয়ে গুঁড়ো করা হয়। এরপর পানিভর্তি চৌবাচ্চায় ২০ দিন ভেজানোর পর ছায়ায় শুকাতে হয়। শুকনো কাঠের গুঁড়ো আবার সাত-আট দিন চৌবাচ্চায় ভিজিয়ে রাখার পর চুলায় রাখা পানিভর্তি গরম পাত্রে কাঠ ঢালা হয়। এভাবে ১৫ দিন আগুনের তাপে সিদ্ধ দেয়ার পর একটি পাত্র থেকে প্রায় পাঁচ তোলা আতর উৎপন্ন হয়। এ রকম দু’টি পাত্র প্রতিবার বসাতে খরচ পড়ে ৫০ হাজার টাকা।

আগর থেকে আতর : নির্দিষ্ট দিন শেষে পাত্রের ফুটন্ত পানির ওপর দুধের সরের মতো তৈলাক্ত পদার্থ ভাসতে থাকে। আলতো হাতের ছোঁয়ায় ভেসে থাকা তেল ঝিনুক দিয়ে উত্তোলন করা হয়। অনেকেই এ সময় ফোম ব্যবহার করেন। উত্তোলিত এ পদার্থের নামই আতর। কাঠের ফুটন্ত পানি থেকে আতর উত্তোলনের পর আবারো এ পানিতেই নতুন কাঠ সিদ্ধ দেয়ার কাজ শুরু হয়। এভাবেই আতর উৎপাদনের কাজ চলে সারা বছর।
আগর প্রস্তুতের বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনছারুল হক। তিনি জানান, প্রথমে বাগান থেকে গাছ সংগ্রহ করা হয়। পরে লোহাগুলো সরিয়ে লাকড়ির মতো কেটে তা কুচি কুচি করে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। ন্যূনতম ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত ভিজিয়ে এগুলো নির্দিষ্ট পাত্রে জ্বাল দেয়া হয়। এরপর প্ল্যান্টের চুল্লিতে দিয়ে একই তাপমাত্রায় জ্বাল দেয়া হয় আরো অন্তত ৮ থেকে ১২ দিন। এ কাজের পর সংযোগ দেয়া হয় আরেকটি সিলিন্ডারে। সিলিন্ডারটিকে আরেকটি বড় প্রবহমান পানিভর্তি পিপার মধ্যে রাখা হয়। এখানে আগর তেলমিশ্রিত বাষ্পপানি অন্য পাত্রে গিয়ে পড়ে। আর পানি থেকে আগর তেল আলাদা হয়ে পানির ওপর ভেসে থাকে। অপর একটি পাইপ দিয়ে অতিরিক্ত পানি বের করে দেয়া হয়। প্ল্যান্টটিতে জ্বাল দেয়া শেষ হলে ওই পিপা থেকে সংগ্রহ করা হয় আতর।


বিজ্ঞান বলছে, অ্যাকুইলারিয়া ম্যালানেসিস গোত্রের সুগন্ধি প্রদায়ক উদ্ভিদ আগরগাছ। চিরসবুজ দ্রুতবর্ধনশীল এ গাছ সাধারণত ১৫ থেকে ৪০ মিটার পর্যন্ত লম্বা ও ০.৬-২.৫ মিটার ব্যাসের হয়। এর ফুলটি সাদা রঙের। ফলও হয় গুটির মতো।
এ গাছ থেকে সংগৃহীত জাইলেম বা কাস্টল ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে পতঙ্গের সহায়তায় ছত্রাকের সংক্রমণের ফলে গাছ রেজিনযুক্ত গাঢ় বর্ণ হয়, যা কেটে কুচি কুচি করে রাখা হয়। এটিই অতি মূল্যবান আগর উড।
আগরচাষি ও ব্যবসায়ী আনছারুল হক বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটিই গাছের ভেতরে হয়। ফলে আগর উডের উপস্থিতি বাইরে থেকে অনেক সময় বোঝা যায় না। তবে গাছের এ জিনিসটিই সবচেয়ে দামি। এক কেজি আগর উড দেড় থেকে দুই লাখ টাকায় বিক্রি হয়। বাইরে এর দাম ১০ হাজার মার্কিন ডলার। আমাদের এখানে তাড়াতাড়ি ফল পেতে পেরেক পদ্ধতি ব্যবহার করেন চাষিরা। তবে পেরেক মারা ‘উড’ গুণসম্পন্ন নয়। তিনি বলেন, আগরগাছের ডাস্টটিও (ছোট টুকরা) বিদেশে রফতানি করা হয়। এটি প্রসেসিং করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ আরো ২০-২২টি আইটেম তৈরি করে।
রফতানি প্রসঙ্গে এই ব্যবসায়ী জানান, এক তোলা ভালোমানের আতরের দাম ৮-১০ হাজার টাকা। তবে স্থানীয় বাজারে তা সর্বোচ্চ ছয় হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়। এর সর্বনিম্ন দাম পড়ে সাড়ে তিন হাজার টাকা। আতরের উৎপাদন বিষয়ে আনছারুল হক বলেন, এক ডেকচির (জ্বাল দেয়ার পাত্র) প্রতিটি প্ল্যান্ট থেকে এক থেকে দেড় তোলা আতর আসে। আর এ ধরনের ৩০টি প্ল্যান্টে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ১০০ তোলা আতর পাওয়া যায়। আগর খাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে অদূর ভবিষ্যতেই সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে রফতানির মাধ্যমে। সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতার জোর দাবি জানিয়েছেন সুজানগর আগর-আতর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনছার আহমদ। এ ব্যবসার প্রসারে প্রশাসনিক সার্বিক সহযোগিতা, কাস্টমস সহজীকরণ ও শিল্পের বিকাশে অভিভাবকদের এগিয়ে আসার কথা বললেন সুজানগরের রহিম বক্ত মুসা।
আগর শিল্পের উন্নয়নে সরকারকে প্রশাসনিক ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুকরণ, বন কর্মকর্তা কর্তৃক হয়রানি দূরীকরণ, শিল্পের নীতিমালা নির্ধারণ, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দেয়ার কথা বললেন তরুণ ব্যবসায়ী আরেফ আহমদ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫