ঢাকা, শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭

বিবিধ

ডাকঘর সীল : কালের দলিল ২

কে জি মোস্তফা

০৩ নভেম্বর ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৬:৩৭


প্রিন্ট

[পুনরাবৃত্তি : বিজ্ঞান আমাদের কী না দিয়েছে! ইতোমধ্যেই আমাদের জীবনকে পাল্টে দিয়েছে বিজ্ঞান। প্রযুক্তি এনে দিয়েছে এমন অনেক সম্ভার, যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা কল্পনাও করতে পারতেন না। নতুন নতুন যন্ত্রপাতি, যেমন- সেলফোন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার ছাড়া আধুনিক জীবন তো অচল। টরেটক্কা (টেলিগ্রাম) কবেই অক্কা পেয়েছে। গ্রামোফোন পড়ে আছে জাদুঘরের এক কোণে। নীল খাম, রঙিন চিঠির দিন শেষ। পত্রমিতালির গীতালি আর নেই। ডাকঘর অনেকটা হা-ঘর।
সে যা হোক, দুঃসহ বর্তমান আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ঘেরাটোপে পড়ে অতীতের স্মৃতিচারণ ছাড়া আজ আমাদের আর কোন পথই বা খোলা আছে।

জীবন মানেই তো যাত্রা
বাৎসল্য এক মর্মান্তিক টান। জীবন মন্থনজাত এক প্রগাঢ় অনুভূতি। বলছি আমার জ্যেষ্ঠ সন্তান খোন্দকার সানাউল হাসান (লিটন) সম্পর্কে। ১৯৮৪ সালে সে উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বর্ষের ছাত্র। মেধাবী ছাত্র হিসেবে তার সুনাম ছিল। কেমন করে সে জানতে পেরেছে, বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী সমিতির পক্ষ থেকে বেশ কিছু ছেলেমেয়েকে উচ্চশিক্ষার্থে বৃত্তি প্রদান করে রাশিয়ায় পাঠানো হবে। তার ছিল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার উচ্চাশা। জানা শোনা আমার তেমন কেউ আছে কি না খবর নিতে অনুরোধ করল। ওই সময় বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী সমিতির সভাপতি ছিলেন কবির চৌধুরী। আমি তখন ডিএফপিতে সচিত্র বাংলাদেশের সম্পাদক। মাঝে মধ্যে তিনি আমাকে লেখা দিতেন। সেই সুবাদে তাঁর কাছে কিছুটা প্রশ্রয় ছিল। আমার ছেলেকে নিয়ে একদিন সরাসরি তাঁর বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। সাথে ছিলেন কথাসাহিত্যিক বন্ধুবর মরহুম আবুল হাসানাত। প্রথমটায় তিনি কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলেন। অবশেষে তাঁরই আনুকূল্যে আমার ছেলে নির্বাচিত হলো। এ ব্যাপারে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের সহযোগিতা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি। তখন তিনি বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতার’ সম্পাদক ছিলেন।
যথারীতি মাস তিনেক বাংলাদেশ-সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির কার্যালয়ে নির্বাচিতদের রুশভাষায় প্রাথমিক কথোপকথন ও সেখানকার জীবনযাপন সম্পর্কে ট্রেনিং দেয়া হলো।
অবশেষে ১৯৮৪ সালের ২১ আগস্ট মস্কোর উদ্দেশে তাদের শুভযাত্রা। সন্ধ্যায় বিমানবন্দরে সপরিবারে গিয়ে বিদায় জানিয়ে এলাম। আগেই বলেছি, বাৎসল্য ভয়ঙ্কর এক টান। বাসায় ফিরে কেমন এক অস্থিরতায় ভেঙে পড়লাম। এ যে এতটা মর্মান্তিক টান আগে বুঝতে পারিনি। তখন ছেলের বয়সও বা কী! এতটুকুন ছেলে অজানা-অচেনা সুদূর এক দেশে চলে গেল। সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলাম। আসলে সন্তান গৃহজীবনের সবচেয়ে বড় বাঁধন।
অবশ্য কয়েক দিন পরই তার চিঠি পেয়ে অনেকটা আশ্বস্ত হলাম।
প্রথম চিঠি
মস্কো-২৯-৮-৮৪
আব্বা,
সালাম নিবেন। আজ ২১ আগস্ট বাংলাদেশ সময় পৌনে ১টা (দুপুর)। আমরা মস্কোতে এসে পৌঁছেছি...।
সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া তখন বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ার। আমার ছেলের কাছে সে দেশ যেন এক স্বর্গরাজ্য। যা হোক, কিছুদিন পর মস্কো থেকে তাদের দলের সবাইকে যার যার বিষয় অনুযায়ী বিভিন্ন শহরে পাঠানো হলো। আমার ছেলের বিষয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। তাকে পাঠানো হলো লেনিনগ্রাদ, যার পূর্বনাম সেন্ট পিটার্সবার্গ। লেনিনগ্রাদ ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বলে কথিত।
লেনিনগ্রাদ পৌঁছে দীর্ঘ এক চিঠি লিখল তার মাকে সম্বোধন করে।
দ্বিতীয় চিঠি
চিঠির কিয়দংশ- এখানে রান্না করে খেতে হবে। রান্নার সব কিনে দু’দিন রান্না করেছি। ...দোকানে প্রায় সব কিছু পাওয়া যয়। ফ্রিজে রাখা একেকটা মুরগি দুই টাকা। ফুলকপি/বাঁধাকপি ৫০ পয়সা, আলু ১০ পয়সা সের। দুধের বোতল ৩০ পয়সা। মাখন ৫০ পয়সা। টমেটো ৭০-৮০ পয়সা। গরুর গোশত ১.৫০ পয়সা। আপেলের সের ৩০ পয়সা। আঙ্গুর ১ টাকা সের। এ রকম সবই সস্তা।
বলাবাহুল্য রাশিয়ার মুদ্রা ‘রুবেল’, এখানে টাকার অঙ্কে হিসাব করে দেখানো হয়েছে।
দীর্ঘ সেই চিঠি সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া সম্পর্কে ছেলের আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। এরপর থেকে সে নিয়মিত চিঠি লিখত। সাথে থাকত বিচিত্র ধরনের ভিউকার্ড। ভিউকার্ডে রাশিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে সহপাঠী ও সমপাঠীদের ছবি।
দেখতে দেখতে দুই বছর কেটে গেল। এক সামার ভ্যাকেশনে ছেলে দেশে বেড়াতে এলো। তখন তার চেহারা ও ভাবভঙ্গিমায় অনেক পরিবর্তন। খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী তাকে দেখার জন্য আসতে লাগল। বেশ কিছুদিন আনন্দঘন পরিবেশে আমাদের দিন কাটল। সময় ফুরিয়ে এলো। অবশেষে একদিন ফিরে গেল সে লেনিনগ্রাদ।
প্রতি সামার ভ্যাকেশনে দেশে আসত না, বেড়াতে যেত অন্য দেশে। কখনো লন্ডন, বখনো বা ইউরোপের অন্যান্য দেশ ভ্রমণে যেত। যেমন- আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড, পূর্ব জার্মানি, পশ্চিম জার্মানি, হল্যান্ড এবং একবার সিঙ্গাপুর। যেখানেই যেত সেখান থেকে আমাদের চিঠি লিখত। উচ্ছ্বাসভরা সেসব চিঠি! অবশ্য একাধিকবার গিয়েছিল লন্ডন। উদ্দেশ্য পার্টটাইম জব করা।
যা হোক, সূর্যোদয় কারো সম্মতির অপেক্ষা করে না। সময়ের সূর্য সময়ে ওঠে। রাত হাঁটছে ভোরের দিকে। দেখতে দেখতে ছেলের শিক্ষাবর্ষ (১৯৮৪-১৯৯০) শেষ হয়ে এলো। আর ঠিক ওই সময় শুরু হলো সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ‘গ্লাসনস্ত’ (উদারতা) ও ‘পেরেস্ত্রইকা’র (নতুন কাঠামো) জয়ধ্বনি নিয়ে রাশিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের যাত্রা শুরু। সময় ১৫ মার্চ ১৯৯০ থেকে ২৫ ডিসেম্বর ১৯৯১। ‘ডাসক্যাপিটাল’, ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ এবং ডায়ালেকটিক্যাল ‘মেটেরিয়ালিজম’ বুঝি তামাদি হয়ে গেল। ইতিহাসের চাকা যে ঘূর্ণায়মান।
অকস্মাৎ সেকালের এক পরাশক্তি সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। প্রবল কর্মচঞ্চল জীবনে, সমাজে, সংস্কৃতিতে, পুঁজিবাদের দ্বন্দ¦ থেকে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ! সে এক মর্মস্পর্শী ছবি! বিত্তবৈভবে ধরাশায়ী সে যে এক উত্তাল সময়ের ইতিকথা। শুরু হলো কঠোর পরিশ্রমী জীবনযাত্রা। বেঁচে থাকার জন্য কোনো প্রকারে একেকটা দিন পার করা।
বলাবাহুল্য, জনগণের মন ও হৃদয়বনে দু’টি পদার্থ সর্বকালে সর্বদেশেই আছে। এ দু’টির ওপর চিরকাল আধিপত্য করা অসম্ভব। যুগ-যুগান্তর ধরে মানবপ্রবাহ যে ছন্দে এগিয়ে চলে, সেই ছন্দের সাথে পা মিলিয়ে না চললে কর্পূরের মতো উবে যাওয়া অনিবার্য। যা হোক, রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তন স্বাাগত হলেও আপাতত ছিল চরম বিপর্যয়।
এমন সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় আমার ছেলের ফাইনাল পরীক্ষা। কোনো প্রকারে পরীক্ষা শেষ হলো তার। সার্টিফিকেটটা হাতে পেয়ে অবশেষে এক মহাদুর্যোগের মধ্য দিয়ে সে রাশিয়া ছাড়ল। পাড়ি জমাল লন্ডনের উদ্দেশে। সীমান্ত প্রহরীদের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে অবশেষে লন্ডন গিয়ে পৌঁছল। সেখানে ছিল আমার এক পূর্বপরিচিতা। তাঁর কাছেই আপাতত আশ্রয় পেল সে। তাঁরই আদরযতেœ বেশ কিছুদিন লন্ডন অবস্থান করল।
সেখান থেকে সে লিখল এক চিঠি।
ইংল্যান্ডে আসার আগের দিন আমেরিকান ভিসা নিয়ে এসেছিলাম... ভবিষ্যৎ অন্তত কিছুটা সুগম হলো।
‘ক্যারিয়ার’ নামক সোনার হরিণের হাতছানিতে আমার জ্যেষ্ঠ সন্তান খোন্দকার সানাউল হাসান (লিটন) এবার নিউ ইয়কের্র পথে পাড়ি জমাল। জীবন মানেই তো যাত্রা। শৈশব থেকে যৌবনে, যৌবন থেকে বার্ধক্যে, স্থান থেকে স্থানান্তরে, কাল থেকে অন্য কালে!

নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে ছিল আমার এক চাচাতো শ্যালক। আপাতত তারই ঠিকানায় গিয়ে পৌঁছল। কিছু দিন পর নিজের কর্মসংস্থান জোগাড় করে স্বাধীন আস্তানা গাড়ল। প্রায় ৯ বছর ছিল আমেরিকায়। নিয়তিতে লেখা ছিল আরো কিছু টালমাটাল। হতাশা-প্রত্যাশার টানাপড়েনে বিধ্বস্ত হয়ে সেখান থেকে এক সময় সে চলে যায় কানাডায়। কানাডায় পাঁচ বছর অবস্থানের পর সর্বনাশা এক গোলকধাঁধা থেকে মুক্তি পেয়ে সম্প্রতি ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫