ঢাকা, শুক্রবার,২৮ জুলাই ২০১৭

নারী

বখাটেদের দৌরাত্ম্য বাড়ছেই

উম্মে ইয়াসমীন

৩০ অক্টোবর ২০১৬,রবিবার, ১৯:৩০


প্রিন্ট

১. ঝিনাইদহে স্কুলছাত্রীকে বখাটের ছুরিকাঘাত (দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৬ অক্টোবর)
খবরে প্রকাশ, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ঝিনাইদহে পূজা নামে নবম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে গত ২৪ অক্টোবর লিটু নামে এক বখাটে ছুরিকাঘাত করে। আহত পূজাকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
২. ধর্ষণের শিকার শিশু ঢাকা মেডিক্যালে
(দৈনিক প্রথম আলো- ২৬ অক্টোবর)
শিশুটির বয়স মাত্র পাঁচ বছর। মারাত্মক আহত অবস্থায় এখন শিশুটি ভর্তি আছে ঢাকা মেডিক্যালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে। শিশুটির অবস্থা দেখে চিকিৎসকেরা পর্যন্ত আঁতকে উঠছেন। অথচ মানুষ নামে সেই পশুর বিবেকে বাধেনি এতটুকু শিশুর ওপর এমন নির্যাতন করতে।
৩. চুল কেটে দেয়ায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ সেই কিশোরীর (দৈনিক মানবজমিন- ২৬ অক্টোবর)
গাইবান্ধার সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের নূরু মিয়ার মেয়ে নুরিনা আকতারকে নির্যাতন করে চুল কেটে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। আর এতে অপমানিত ও নিরাপত্তাহীনতায় মেয়েটি আর স্কুলে যেতে পারছে না।
৪. মুন্নির প্রাণ নিলো বখাটেরা
(দৈনিক কালের কণ্ঠ- ২৬ অক্টোবর)
২৫ অক্টোবর গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী মুন্নি আক্তারকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এক বখাটে। মুন্নির অপরাধ সে বখাটের প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হয়নি। আর তাতেই জীবন দিতে হলো তাকে।
ওপরের ঘটনাগুলো মাত্র এক দিনে প্রকাশিত পত্রপত্রিকার খবর। এক দিনেই বখাটের হামলার শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে মোট চারজনকে। এটা প্রকাশিত সংবাদ। আর অপ্রকাশিত সংবাদ যে এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হবে সে বিষয়ে বোধ হয় সন্দেহ নেই। কারণ এ জাতীয় ঘটনা কমই প্রকাশিত হয়। এ মাসেই বখাটেদের হামলায় মারাত্মক আহত খাদিজা এখনো স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সে আদৌ স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনে ফিরতে পারবে কি না সেটা বোঝা যাচ্ছে না এখনো। তবে যেভাবে আহত হয়েছিল তাতে যে এখনো জানে বেঁচে আছে সেই ঢের।
খাদিজার পরপরই ঢাকার কল্যাণপুরে একই সাথে দুই বোন বখাটেদের আক্রমণের শিকার হয়েছে। তারও কিছু দিন আগে উইলসলিটল স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী রিশা প্রাণ দিয়েছে বখাটের হামলায়। আক্রমণের শিকার হয়েছে মাদারীপুরের নিতু মণ্ডল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডালিয়া আক্তার বখাটেদের উত্ত্যক্তের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে। বখাটেদের দৌরাত্ম্য সবসময় ছিল। কিন্তু কয়েক মাসে তা যেন বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ক্রমানুসারে ৮০১ জন, ২০১৪ জন, ৬৪৫ জন, ৪৭০ জন, ৪৪৪ জন এবং ৩২৮ জন নারী ও শিশু উত্ত্যক্তের শিকার। এ ছাড়া পাঁচ বছরে উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১৩৭ জন নারী ও শিশু। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে উত্ত্যক্তের ঘটনা ঘটেছে ২০৮টি। উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করেছেন আটজন। অধিকারের রিপোর্ট অনুযায়ী চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মোট ২৫ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, ২০১০ সালে ৫৯৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হন ২০১১ সালে তা বেড়ে ৬৩৫ জন ২০১২ সালে কিছুটা কমে ৫০৮ জন হলেও পরের বছর ২০১৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয় ৬৯৬ জন। ২০১৪ সালে ৬৬৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হন। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৫ সালে ৮০৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হন। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এ পাঁচ বছরে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে মোট ৯৮৭ জন নারী ও শিশু। এ পাঁচ বছরে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫৪৬ জনকে এবং ধর্ষণের পর হত্যা চেষ্টা করা হয় ৭৩২ জনকে। বাড়ছে শ্লীলতাহানি ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাও। বিগত পাঁচ বছরে শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে ৯০৬টি এবং যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ৫১৭ জন নারী ও শিশু। ২০১০ সালে এক হাজার ১১৮ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ৮৮৬ জন, ৯০০ জন, ৮২৯ জন এবং ৭১৪ জন নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া এ পাঁচ বছরে মোট ৩১০ জন নারী ও শিশুকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ পরিসংখ্যান আমাদেরকে আতঙ্কিত করে তোলে। এ যদি হয় সমাজের অবস্থা তাহলে মেয়েদের নিরাপদে বেঁচে থাকাই কঠিন হবে।
কিছু দিন ধরে দেখা যাচ্ছে বখাটেদের দৌরাত্ম্য বাড়ছেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দোষীরা ধরাও পড়ে। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কি হয়?
মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের দেশে যথেষ্ট কঠিন আইন আছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ কি আছে? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকে।
বিচারহীনতার এ সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে আমাদের। শিক্ষক, অভিভাবকসহ সমাজের সব মানুষকেই সচেতন হতে হবে। নিতে হবে মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য সঠিক উদ্যোগ। যাতে প্রতিটি মেয়ে নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫