ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

ইতিহাস-ঐতিহ্য

প্রাচীন ঐতিহ্য পলো বাইচ

আব্দুর রাজ্জাক ঘিওর (মানিকগঞ্জ)

২৯ অক্টোবর ২০১৬,শনিবার, ১৭:০৬


প্রিন্ট
নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট স্থানে কম পানিতে হই চই করে পলো দিয়ে মাছ শিকার করাই পলোবাইচ। যদিও জলাশয় কিংবা মাছ কোনোটাই আগের মতো নেই। তার পরও এখনো গ্রামবাংলায় টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী পলোবাইচ।

নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট স্থানে কম পানিতে হই চই করে পলো দিয়ে মাছ শিকার করাই পলোবাইচ। যদিও জলাশয় কিংবা মাছ কোনোটাই আগের মতো নেই। তার পরও এখনো গ্রামবাংলায় টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী পলোবাইচ।

খাল নদী বিল হাওর-বাঁওড়ের দেশ বাংলাদেশ। আর পানিতে দেশী মাছ। যদিও বর্তমানে কমে যাচ্ছে জলাশয়। তারপরও অসংখ্য নদী-নালা এ দেশকে এখনো উর্বর রেখেছে। বর্ষায় যেমন জলাশয়ে পানি উপচে পড়ে তেমনি বর্ষার শেষে শীতের শুরুতে হেমন্ত আসে, ধীরে ধীরে কমে আসে পানি। তখন কম পানিতে মাছ ধরার উৎসবও শুরু হয় গ্রামবাংলায়। পলোবাইচ তেমনি উৎসব।
খাল বিল, চক ও নদী-নালায় দলবদ্ধ হয়ে পলো দিয়ে মাছ ধরা গ্রামবাংলার ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। বাঙালির সেই ঐতিহ্যেও রেশ ধরে সম্প্রতি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বিভিন্ন জলাশয়ে পলো বাওয়ার ধুম লেগেছে। মুখে-মুখে, হাটবাজারে ঢাকঢোল পিটিয়ে ও মাইকে ঘোষণা দিয়ে শৌখিন মৎস্য শিকারিরা পলো নিয়ে ছুটে চলেছেন কালীগঙ্গা নদী ঘেঁষা চরাঞ্চলে, বিভিন্ন বিলে ও চকের হাঁটু জলাশয়ে।
জানা যায়, চলতি শুষ্ক মওসুমে উপজেলার কালীগঙ্গা ও পুরনো ধলেশ্বরী নদীর ভাটি এলাকার কম পানির কুম, বানিয়াজুরীর তরা, নালী, শোলধারা, দিয়াইল, ঘিওরের মাইলাঘী ও বরটিয়া চকে রয়েছে হাঁটু থেকে কোমর অবধি পানি। আর এসব জলমহালে সাপ্তাহিক ছুটির দিনসহ প্রায় প্রতিদিনই চলছে পলো দিয়ে মাছ ধরার ধুম।
শনিবার বানিয়াজুরীর রাথুরা চকের জলাশয়ে সরেজমিন দেখা যায়, দেশী জাতের মাছের মধ্যে শোল, বোয়াল, রুই ও কাতলা মাছ পলোতে বেশি ধরা পড়ছে। কেউ কেউ আবার ছোট আকৃতির মাছও পাচ্ছেন। রাথুরা গ্রামের ইসলাম খান জানান, শখের বশে পলো বাইতে আসছি, একটি বোয়াল মাছ পাইছি। আরেক মাছ শিকারি নূরুল ইসলাম পেয়েছেন বড় আকৃতির একটি বোয়াল ও দুটি কার্ফু মাছ। পলোবাইচে অংশ নেয়া আকাশ আহমেদ রফিক, প্রবীণ আফসার আলী, চিত্ত দাস, মো: রবিনসহ আরো অনেকে জানান, পলোবাইচ দিয়ে মাছ শিকার করার মজাই আলাদা। কারো পলোর নিচে একটি মাছ পড়লে চিৎকার দিয়ে সেই মাছটি ধরতে সবাই সহযোগিতা করেন। পলোবাইচে আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়ন ছাপিয়ে অন্য জেলা থেকেও মানুষজন পূর্বঘোষিত দিনে অংশগ্রহণ করে। শত শত মানুষ পলো নিয়ে মাছ ধরার আনন্দে মেতে ওঠে।
এ দিকে বাইচে অংশ নিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ পলো কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। অন্য সময় সাধারণ একটি পলো ১৫০-২৫০ টাকা বিক্রি হয়ে থাকে। কিন্তু বাইচের সময় তিনগুণ বেশি দাম দিয়েও পলো কিনতে কাড়াকাড়ি লেগে যায়। ঘিওরের বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ডে পলো বিক্রেতা অনীল বাবু বলেন, বাইচের আগের দিন ১০০ পিচ পলো নিয়ে আসছি। এক ঘণ্টার মধ্যেই সব শেষ। দামও পেয়েছি ভালোই।
পলো ছাড়াও পাতিজাল, টানজাল, ধর্মজাল ইত্যাদি নিয়ে জড়ো হন সাধারণ মানুষ। এক সাথে সবাই নেমে পড়েন মাছ শিকারে। তবে আগের মতো দেশী মাছ এখন পাওয়া যায় না এমন অভিযোগ করলেন বাইচে অংশ নেয়া অনেকে। বহু বছর ধরে চলে আসা এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে চান স্থানীয় লোকজন।
স্থানীয় বানিয়াজুরী ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাসেম জানান, বহুদিন ধরে চলে আসা এ পলো বাইচকে ঘিরে আশপাশের গ্রামের লোকজনের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দেয়। এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫