ঢাকা, বৃহস্পতিবার,৩০ মার্চ ২০১৭

আন্তর্জাতিক সংস্থা

জাতিসঙ্ঘ নতুন মহাসচিবের ৫ চ্যালেঞ্জ

আহমেদ বায়েজীদ

১৯ অক্টোবর ২০১৬,বুধবার, ১৭:১২ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০১৬,বুধবার, ১৭:৪১


প্রিন্ট

জাতিসঙ্ঘের পরবর্তী মহাসচিব (নবম) নির্বাচিত হয়েছেন পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যান্তোনিও গুতারেস। আগামী ১ জানুয়ারি ২০১৭ বান কি মুনের উত্তরসূরি হিসেবে বিশ্ব সংস্থার দায়িত্ব নেবেন গুতারেস। বিশ্বব্যবস্থার চরম সঙ্কটময় এক মুহূর্তে জাতিসঙ্ঘের দায়িত্ব নিচ্ছেন তিনি, যে সংস্থাটির কাজ বিশ্বে শান্তি বজায় রাখা। তার হাতে কোনো সেনাবাহিনী নেই, কিন্তু বিশ্বব্যাপী সঙ্ঘাত বন্ধ ও মানুষের ভোগান্তি অবসানের গুরুদায়িত্ব তার কাঁধেই বর্তাবে। তাই গুতারেসের কাজটি যে সহজ হবে না, তা বোঝাই যাচ্ছে। যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা দুর্ভিক্ষ, জলবায়ু পরিবর্তন থেকে মানবাধিকার সঙ্কট সব দিক থেকেই বিশ্ব আজ চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যে। এ ছাড়া রয়েছে উদ্বাস্তু সঙ্কট, উগ্রবাদ, কূটনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়। এসব পরিস্থিতিকে সামলে গুতারেসকে এগোতে হবে বিশ্বশান্তির পথে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন অসংখ্য সমস্যার মধ্যেও প্রধানত পাঁচটি বিষয় গুতারেসের জন্য প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ
পাঁচ বছর ধরে চলা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে নিহত হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ বেসামরিক লোক। উদ্বাস্তু হয়েছে দেশটির অর্ধেকের বেশি মানুষ। বাশার আল আসাদের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জিদের বলি হয়েছে দেশটির নিরীহ জনগণ। প্রতিদিন বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বোমা হামলায় নিহত হচ্ছে নারী ও শিশু থেকে শুরু করে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ। হাসপাতাল, উদ্ধারকর্মীদের অফিস এমনকি জাতিসঙ্ঘের ত্রাণবহর রক্ষা পায়নি তাদের বিমান হামলা থেকে।
বাশারের প্রধান মিত্র রাশিয়া যেকোনো মূল্যে তাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধে নেমেছে। রাশিয়ার যুদ্ধবিমানও প্রতিদিন বোমা হামলা চালায় অবরুদ্ধ আলেপ্পোর ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর। অন্য দিকে সরাসরি যুদ্ধে না নামলেও দেশটির বিদ্রোহীদের সমর্থন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ। আর রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকেরা পরস্পরকে দোষারোপ করছেন যুদ্ধে ইন্ধনের জন্য। ইউরোপমুখী অভিবাসীদের বেশির ভাগই সিরিয়ার উদ্বাস্তু, যে কারণে এ গৃহযুদ্ধের সাথে জড়িয়ে আছে সারা বিশ্বের স্থিতিশীলতা। তাই এ বিষয়টির যথাযথ সমাধানে আসা নতুন জাতিসঙ্ঘে মহাসচিবের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

অন্যান্য সঙ্ঘাত
সিরিয়া ছাড়াও বিশ্বের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে চলছে রাজনৈতিক সঙ্ঘাত। কলম্বিয়া, দক্ষিণ সুদান, ইউক্রেন, ইথিওপিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিরাজ করছে অস্থিরতা। আবার ভেনিজুয়েলা, মিসর, ব্রাজিলের মতো দেশগুলোয় সরকারের প্রতি রয়েছে জনগণের চরম অসন্তোষ।
কলম্বিয়া সরকার মার্কসবাদী ফার্ক বিদ্রোহীদের সাথে দীর্ঘ ৫২ বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে শান্তিচুক্তি করলেও জনগণ গণভোটে সেই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। এ বিষয়টি বিশ্বসংস্থার নতুন প্রধানের বিশেষ মনোযোগ দাবি করবে বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন বেটার ওয়ার্ল্ড ক্যাম্পেইনের প্রধান পিটার ইয়ো। তার মতে, কলম্বিয়ার শান্তিচুক্তিতে জাতিসঙ্ঘে বড় ভূমিকা ছিল, তাই সেটি কার্যকর করাও সংস্থাটির পরবর্তী দায়িত্ব হবে।
তেলসমৃদ্ধ ভেনিজুয়েলায় বিরাজ করছে অর্থনৈতিক অস্থিরতা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ থাকার পরও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশটির অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ভেনিজুলেয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়লে তা বড় রকমের উদ্বাস্তু সঙ্কটের সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা ওয়াশিংটনের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর পল সুলিভানের। তার মতে, ‘রাজনীতিবিদেরা কিভাবে দেশ চালাবেন তা হয়তো গুতারেস বলে দেবেন না, তবে সঙ্ঘাত এড়িয়ে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে তাদের একসুতোয় গাঁথতে পারবেন তিনি।’

চরম দারিদ্র্য
বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের মোকাবেলা গুতারেসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। কূটনৈতিক টানাপড়েনে কারণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়া, সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা এবং চীন সাগর নিয়ে পূর্ব এশিয়ার কূটনৈতিক বিরোধÑ এসব বিষয় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বিশ্ববাণিজ্যের ওপর। আর বাণিজ্য ঘাটতি থেকে সৃষ্টি হচ্ছে অর্থনৈতিক সঙ্কট ও দারিদ্র্য। এর সাথে রয়েছে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব হিসেবে গুতারেসের জন্য কূটনৈতিক বিরোধকে পাশ কাটিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সচল রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা
সাম্প্রতিক বিশ্বের আরেকটি উদ্বেগের নাম বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে এটি সারা বিশ্বের জন্যই বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আর বিশ্ববাসীকে নিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নেতৃত্ব দিতে হবে জাতিসঙ্ঘকে। মিসর ও বাংলাদেশের মতো বদ্বীপগুলোর জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে অসংখ্য মানুষের গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পুরোপুরি তলিয়ে যেতে পারে মালদ্বীপের মতো দেশ। হিমালয়ের হিমবাহ অধ্যুষিত দেশগুলোও রয়েছে এই ঝুঁকিতে। এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। কিন্তু সেই চুক্তির বাস্তবায়ন করে আগামী দিনের পৃথিবীকে সুন্দর রাখা অ্যান্তোনিও গুতারেস ও তার সংস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

জাতিসঙ্ঘের সংস্কার
জাতিসঙ্ঘে সমালোচকরা বলছে, সংস্থাটির কাঠামোগত ত্রুটির কারণে এটি অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাই এটির সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে মানবাধিকার কাউন্সিলের সংস্কার খুবই জরুরি মনে করা হচ্ছে এ ক্ষেত্রে। সিরিয়ার জাতিসঙ্ঘের ত্রাণ কর্মসূচি বাশার সরকারের হয়ে কাজ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার আলেপ্পোয় রাশিয়া ও বাশার সরকার যুদ্ধাপরাধ করছে, কিন্তু রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতার কারণে হয়তো এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়াই সম্ভব হবে না। তাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে কোনো অভিযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে ভেটো ক্ষমতার ব্যবহার বন্ধ করা খুবই জরুরি। এ বিষয়টি দ্রুততার সাথে করার জন্য শীর্ষ দেশগুলোর প্রতি দাবিও জানানো হয়েছে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার-বিষয়ক কমিশনারের পক্ষ থেকে। বিশ্বের শান্তি রক্ষায় যে সংস্থাটি কাজ করবে, সেই জাতিসঙ্ঘে কাঠামোগত ত্রুটি দূর করা তাই গুতারেসের কার্যক্রমে অগ্রাধিকার পাবে বলেই অনেকের ধারণা। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও তাকে বিভিন্ন দেশের বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে। সেটি কিভাবে জয় করবেন তিনি তার ওপর নির্ভর করছে সংস্থাটির নির্বিঘ্নে কাজ করার বিষয়টি।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫