ঢাকা, সোমবার,২৯ মে ২০১৭

নারী

আজও উপেক্ষিত গ্রামীণ নারী

আবদুর রাজ্জাক ঘিওর, মানিকগঞ্জ

১৬ অক্টোবর ২০১৬,রবিবার, ১৮:১১


প্রিন্ট

পারভীন আক্তারের বাড়ি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার পাচুটিয়া গ্রামে। কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে উঠান ঝাড়ু ও থালাবাসন ধোয়ার কাজ দিয়েই শুরু হয় তার প্রাত্যহিক জীবনের রুটিন। রান্নাবান্না থেকে ঘরের কাজ, সব সদস্যের খাবার পরিবেশন, কাপড়চোপড় ধোয়া, হাঁস-মুরগির খাবার দেয়া, ছোট ছেলেকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি। আবার দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি। এর পর কৃষিকাজেও সহায়তা করেন পরিবারের পুরুষদের সাথে। একান্নবর্তী পরিবার, সদস্য সংখ্যা বেশি; তাই খাওয়াদাওয়া চলে বিকেল পর্যন্ত। খাওয়ার পর থালাবাসন পরিষ্কার ও হাঁড়িপাতিল ধোয়ার কাজ করতে হয়। কখন যে বেলা গড়িয়ে যায়, টের পান না পারভীন। এরপর চলে রাতের খাবার তৈরির পালা। রাতে সবার খাওয়া শেষ হলে তার খাওয়ার পালা। অনেক দিন তরকারিও জোটে না কপালে। ঘুমোতে ঘুমোতে রাতের অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। এভাবেই দিন কেটে যায় পারভীন আক্তারের। তারপরও স্বামী, ছেলেমেয়ে ও সংসার নিয়ে সুখে আছেন তিনি। শুধু একজন পারভীন আক্তারই নন, আমাদের দেশের প্রায় সব গ্রামীণ নারীই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু নারীর এ কাজের স্বীকৃতি নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের নারীরা জনসংখ্যার অর্ধেক; কিন্তু সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে পুরুষের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে।
বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় তিন সন্তানকে রেখে স্বামী মারা যাওয়ার পর মানিকগঞ্জের বরংগাইল গ্রামের রোকেয়া বেগম দু’বেলা খাবার জোটাতে নাম লেখান মহিলা শ্রমিকদের দলে। এরপর থেকে মাটি কাটা, ইটভাটার তপ্ত দহন ও কৃষিকাজসহ সব ধরনের কায়িক পরিশ্রম শুরু করেন তিনি। কিন্তু হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও নারী বলে পুরুষের সমান মজুরি পান না তিনি। শুধু রোকেয়া বেগম নন, তার মতো দেশের সব নারীশ্রমিকের অবস্থা একই। দিন-রাত পরিশ্রম করেও তারা ন্যায্য মজুরি পান না।
নারীরা আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে হাঁস, মুরগিসহ পশুপালন করে চেষ্টা করেন জীবনব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে। বিভিন্ন খাদ্য উৎপাদনসহ আবাদি জমিতে ফসল ফলিয়ে স্বাবলম্বী হতে আগ্রহী হন গ্রামীণ নারীরা। শহরের তুলনায় গ্রামীণ নারী উন্নতির সোপানে পৌঁছতে কঠোর পরিশ্রম করেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উঠানসহ বাড়ির চার দিকে কোথাও পতিত জমি খালি রাখেন না। নিজের ইচ্ছানুযায়ী সারা দিন পরিশ্রম করে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াচ্ছেন, পাশাপাশি সংসারের উন্নতির জন্য আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছেন স্বামীকে। মানবসভ্যতায় কৃষির সূচনা ও বিকাশ ঘটেছে নারীর হাত ধরেই।
কর্মজীবী নারীর হিসাব মতে, কৃষি খাতের ২০টি কাজের মধ্যে ১৭টি কাজে নারীর অংশগ্রহণ থাকলেও কৃষিতে নারীর স্বীকৃতি নেই। বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ফসল উৎপাদন, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে গ্রামীণ নারীর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ থাকলেও কৃষক হিসেবে তাদের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন হয় না। কৃষিঋণ ও কৃষকের জন্য দেয়া সরকারি সুযোগ-সুবিধাগুলো থেকেও গ্রামীণ নারীরা বঞ্চিত। ‘গ্রামীণ জীবনযাত্রায় স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচার অভিযান’-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের মোট নারী শ্রমশক্তির পরিমাণ এক কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী। যার ৬৮ শতাংশ কৃষিকাজে, পোলট্রি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের সাথে জড়িত। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি খাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া কর্মক্ষম নারীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত আছে ‘কৃষিকাজে’। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রামীণ ৪১ শতাংশ নারী আলু ও ৪৮ শতাংশ মাছ চাষে জড়িত।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিকের কর্মকর্তা শুকুফে ইসলাম বলেন, বহির্বিশ্বে দেশের খ্যাতি অর্জনের পেছনে আজকের গ্রামীণ নারীর ব্যাপক অর্জন থাকলেও তা স্বীকার করা হয় না। শুধু কৃষক হিসেবে নন, গার্মেন্ট সেক্টরে ও প্রবাসে নারীকর্মীরা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন। নারীর এসব অর্জন শুধু সাম্প্রতিককালেই নয়; আবহমানকাল ধরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। অথচ এই নারীরাই মজুরি-বৈষম্য ও কাজের স্বীকৃতি না পাওয়ায় বঞ্চনার শিকার।
গ্রামীণ নারীকে নিয়ে কাজ করা নারীনেত্রী নাহিদা জেনী এ প্রসঙ্গে বলেন, রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা মাটিকাটা ও পাথর ভাঙার মতো কঠিন কাজ করলেও মজুরি পান পুরুষের অর্ধেক। এসব শ্রমিক সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ করে দুপুরে খাওয়ার সময় পান মাত্র এক ঘণ্টা। বেশির ভাগ নারীশ্রমিকের কাজের জন্য কোনো সুষ্ঠু পরিবেশও নেই। তাদের জন্য নেই পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা। এমনকি নারীশ্রমিকের ছোট সন্তানের জন্য নেই মাতৃদুগ্ধপান বা ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা। কৃষিকাজ ও অন্যান্য কাজে নিয়োজিত নারীর দাবি, নারীকে শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এতে তারা কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় ব্যাংকঋণ ও কৃষিকার্ডসহ অন্যান্য সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
অশিক্ষা আর সচেতনতার অভাবেই গ্রামীণ নারীরা সব ক্ষেত্রে অধিকারবঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করে নারী সংগঠনগুলো। তাই শিক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারকে আরো উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ তাদের। সৃষ্টির সহজাত ধারায় নারী-পুরুষের মধ্যে মর্যাদাগত কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু তার পরও নারী বঞ্চিত হচ্ছে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে। তার ওপর চালিয়েছে অত্যাচারের খড়গ। ছিনিয়ে নিয়েছে তার স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা। বাংলাদেশের বারো হাত শাড়ির আঁচলে জড়ানো নারীরা এখনো অবহেলিত। শিক্ষাদীক্ষা ও নৈতিকতার বীজ রোপিত হয় গ্রামীণ নারীর হাতে। জাতীয় পর্যায়ে যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন তাদের শিকড় কোনো না কোনো গ্রামে। আর সেই শিকড় গড়ে উঠেছে কোনো মমতাময়ী নারীর যতœশীল ছোঁয়ায়। কখনো মা হিসেবে, কখনো বউ হিসেবে আবার কখনো বোন হিসেবে নারীই সমাজের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫