ঢাকা, রবিবার,২৬ মার্চ ২০১৭

নারী

প্রেম, বিয়ে অতঃপর হত্যায় সমাপ্তি

এম মাঈন উদ্দিন মিরসরাই, চট্টগ্রাম

১৬ অক্টোবর ২০১৬,রবিবার, ১৮:০৪


প্রিন্ট

অসহায় দরিদ্র কৃষক মো: জাহাঙ্গীর হোসেনের একমাত্র মেয়ে রিমা। ভালোবেসে পালিয়ে বিয়ে করেন নোমান নামে এক য্বুককে। প্রথমে বিয়ে মেনে নিতে না পারলেও একমাত্র মেয়ে হওয়ায় বিয়ে মেনে নিলেন জাহাঙ্গীর হোসেন। আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়েকে তুলে দিতে চাইলেন শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু মেয়ের জামাই, শ্বশুর-শাশুড়ি যৌতুক ছাড়া বউ ঘরে তুলতে রাজি নন। তাই ধারদেনা করে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে তুলে দিলেন। কিন্তু বিধিবাম, বেশি দিন শ্বশুরবাড়িতে থাকতে পারেননি রিমা। চলে যেতে হয়েছে অনেক দূরে... যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসে না।
জানা গেছে, মোবাইলে অপরিচিত একটি নম্বরে ফোনালাপের পর পরিচয় হয় মিরসরাইয়ের মেয়ে শারমিনা আক্তার রিমার (১৯) সাথে পাশের ফেনী জেলার আবদুল্লাহ-আল নোমানের (২২)। পরিচয় থেকে ভালোবাসা, এরপর বিয়ে; অতঃপর হত্যায় সমাপ্তি। রিমা উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের উত্তর ওয়াহেদপুর গ্রামের ছাবেদ আলী মোল্লাবাড়ির জাহাঙ্গীর হোসেনের একমাত্র মেয়ে। নোমান ফেনী পৌর সদরের কে এম হাট এলাকার সুলতানপুর গ্রামের মো: হানিফের ছেলে। দীর্ঘ দুই বছর প্রেমের সম্পর্ক শেষে চলতি বছরের ১১ মার্চ পরিবারের কাউকে না জানিয়ে ঢাকায় গিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করে দু’জন। মেয়েপক্ষ তাদের সম্পর্ক মেনে নিলেও ছেলেপক্ষ বিয়ে মেনে নেয়ার জন্য এক লাখ টাকা, দেড় ভরি স্বর্ণালঙ্কার, ৫০ হাজার টাকার ফার্নিচার, দুই শ’ জন বরযাত্রী খাওয়ানো দাবি করে। এ অবস্থায় মেয়েপক্ষ ধারদেনা করে ছেলেপক্ষের চাহিদা মিটিয়ে সামাজিকভাবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে। বিয়ের পরে আবার পাঁচ লাখ টাকা যৌতুকের জন্য রিমাকে নির্যাতন শুরু করে স্বামী আর শ্বশুর-শাশুড়ি। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রিমাকে হত্যার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় রিমার ভালোবাসার গল্প।
রিমার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বিয়ের ১০-১৫ দিন পর স্বামী নোমান ও তার মা-বাবা পুনরায় পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। দ্রুত বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য রিমার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। সর্বশেষ রিমা বাবার বাড়িতে স্বামীকে নিয়ে বেড়াতে আসেন। তিন-চার দিন বেড়ানোর পর গত ২৬ সেপ্টেম্বর স্বামী নোমান তার হাতখরচের জন্য রিমাকে তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে দেয়ার জন্য বলে। রিমা মা-বাবাকে টাকার বিষয়টি বলার পর সুদের ওপর পাঁচ হাজার টাকা জোগাড় করে নিয়ে আসেন তার বড় ভাই রেজাউল করিম। বাবার বাড়িতে আসার পর রিমা তার মাকে জানায় সে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর কাছে টাকা নেই বলে ডাক্তার দেখাতে পারছে না। এ কথা জানার পর মেয়ের চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা দেন মা। টাকা দেয়ার পর ওইদিন বিকেলে রিমাকে নিয়ে নোমান তার নিজ বাড়ি ফেনী সদরের সুলতানপুর গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। এ সময় চাহিদামতো ৩০ হাজার টাকা না দেয়ায় পথিমধ্যে রিমাকে তার স্বামী চড়-থাপ্পড় দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
২৬ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৭টার সময় ঠিকভাবে বাড়িতে গেছে কি না, মেয়েকে ডাক্তার দেখিয়েছে কি না জানার জন্য মেয়ের জামাইয়ের মোবাইলে কল দেন রিমার মা। মেয়ের জামাই নোমান কল রিসিভ করার পর বলে, তারা বাড়িতে পৌঁছেছে, ডাক্তার পরে দেখাবে। এ কথা বলে সংযোগ বিছিন্ন করে দেয়। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে নোমান শাশুড়ির মোবাইলে কল দিয়ে বলে, রিমা অনেকক্ষণ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, কিছুক্ষণ আগে মারা গেছে। আপনারা দ্রুত আসেন। এ কথা শোনার পর রিমার বাবা-মা, ভাই ও এলাকার ইউপি সদস্য রিমার শ্বশুরবাড়িতে যান। সেখানে যাওয়ার পর রিমার লাশ রাখা কক্ষে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। সবাইকে জিম্মি করে রাখা হয়। অনেক কাকুতি-মিনতি করেও মেয়ের লাশ দেখতে পারেননি রিমার বাবা-মা। লাশের সুরতহাল করার আগেই গোসল দেয়া হয়। তারা রিমাকে বাড়িতে এনে দেখেন তার গলায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন। রিমার নাকমুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। পরে বাবার বাড়িতে জানাজা শেষে দাফন করা হয়। তার জানাজা ও দাফনে স্বামী-শ্বশুর কেউ উপস্থিত হয়নি। তার স্বামীর পরিবার থানায় মামলা না করার হুমকি দেয়।
এ দিকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রিমাকে হত্যা করার অভিযোগে ফেনী জজ আদালতের অধীনে সিনিয়র জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও আমলি আদালতে রিমার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন বাদি হয়ে স্বামী আবদুল্লাহ আল নোমান, শ্বশুর মোহাম্মদ হানিফ ও শাশুড়ি দেলোয়ারা বেগমকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা (নম্বর ১৫৫-২০১৬) করেন।
রিমার বড় ভাই রেজাউল করিম বলেন, রিমা আমার একমাত্র বোন। বোনের সুখের কথা চিন্তা করে ছেলেপক্ষের চাহিদা পূরণ করার জন্য আট লাখ টাকা ঋণ নেই, যা এখনো পরিশোধ করতে পারিনি। কিন্তু বিয়ের পর তারা আবার পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। টাকা দিতে পারিনি বলে তারা আমার বোনকে নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে।
এ বিষয়ে ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফিরোজ কবির বলেন, রিমা মারা যাওয়ার খবর শুনে আমি বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য ফরহাদনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন টিপুর ব্যক্তিগত মোবাইলে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আদালতে মামলা হয়েছে। আশা করি, মামলার সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫