ঢাকা, সোমবার,২০ মে ২০১৯

মতামত

কেন রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা

ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম

২৩ আগস্ট ২০১৬,মঙ্গলবার, ২০:০৫


প্রিন্ট
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়বে

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়বে

পৃথিবীর পরিবেশসচেতন মানুষের কাছে এখন ‘রামপাল’ মানে সুন্দরবনবিধ্বংসী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে দেশে এবং বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেন এ বিতর্ক, সে দিকটি তুলে ধরার আগে ইতিবৃত্ত জানা দরকার।

২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানি (এনটিপিসি) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষর করে চট্টগ্রাম ও খুলনা ১৩০০ী২ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং খুলনার লবণচোরাকে বাছাই করা হয়। শুরুতেই চট্টগ্রামের রাজনীতিবিদ, সচেতন জনগণ, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণে বাতিল হয়ে যায় আনোয়ারা প্রকল্প। কয়লা পরিবহনসহ নানা সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে খুলনা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গা নির্ধারিত হয় সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে বাগেরহাট জেলার রামপাল থানার পশুর নদীর তীরবর্তী স্থান। স্থানীয় ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদের সহযোগিতায় সরকার সহজেই রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য, সুন্দরবনের কাছে রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমেই এর বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিল বন বিভাগ। প্রধান বন সংরক্ষক ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ সালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সচিবকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেন, সুন্দরবন ‘রামসার সাইট’ সুন্দরবনের অংশ যার লিগ্যাল কাস্টোডিয়ান বন অধিদফতর। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এবং ল্যান্ডস্কেপজোনে এমন কোনো শিল্পকারখানা স্থাপন করা যুক্তিযুক্ত হবে না, যা সুন্দরবন তথা এর রামসার সাইটের জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। কয়লাভিত্তিক পাওয়ারপ্ল্যান্ট স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার তথা সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে। প্রধান বন সংরক্ষক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রামপালে স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান চিঠিতে।
সরকার ২০১১ সালে রামপালে ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে। ২০১২ সালের ৪ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বিদ্যুৎ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করে এবং ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড’ নির্মাণের অনুমতি দেয়। ১২ এপ্রিল ২০১৩ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ)’ বিষয়ে জনমত পর্যালোচনা সভার আয়োজন করে পিডিবি। সেটা ছিল নিছক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। সরকার বিভিন্ন মহলের আপত্তি আমলে না নিয়ে, বরং কৌশলে সব আয়োজন সম্পন্ন করে পরিবেশ অধিদফতরকে বুঝিয়ে দেয় যে, সরকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। সুতরাং পরিবেশের ছাড়পত্রটি যেন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পক্ষেই দেয়া হয়। আলোচকদের সুপারিশ বা মতামত উপেক্ষা করে ৫ আগস্ট ২০১৩ সালে পরিবেশ অধিদফতর ৫৯টি শর্ত সাপেক্ষে ইআইএ অনুমোদন করেছে। অথচ সুন্দরবনের চার পাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘পরিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হলেও পরিবেশ অধিদফতর এই এলাকাতেই ১৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে অবস্থানগত ছাড়পত্র দিয়েছে (সূত্র : প্রথম আলো, ৯ আগস্ট ২০১৬)। অর্থাৎ সরকার চাইলে পরিবেশের তোয়াক্কা না করে সব ছাড়পত্র বা অনুমোদন কোনো বিষয় নয়।
৯ জুন সংসদে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জানান, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে এখনো পরিবেশ ছাড়পত্র দেয়া হয়নি। সাধারণ নাগরিকদের প্রশ্নÑ ‘পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়া সরকার চাইলে কি সব কিছুই করতে পারে? অর্থমন্ত্রী ১৫ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, সুন্দরবনের কাছে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের ওপর নেতিবাচক কিছু প্রভাব পড়লেও প্রকল্পটি না সরানোর পক্ষেই সরকার অটল থাকবে।’ কিন্তু কেন আমরা সুন্দরবনের ক্ষতি হবে, এমন প্রকল্প থেকে সরে আসব না? গত ১৩ জুলাই বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘রামপাল তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, তাই পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না।’ প্রশ্ন আসেÑ জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারত কেন ১৬০০০ মেগাওয়াট উন্নত প্রযুক্তির চারটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করল? ভারত কেন ‘উন্নত প্রযুক্তি’র নতুন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প না নিয়ে ২০২২ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে এক লাখ ৭৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে? জয় শার্দা (ভারতীয় বিনিয়োগ উপদেষ্টা ও বিশ্লেষক) বলেছেনÑ পরিহাস হলো, ভারত সরকার যখন নিজেই কয়লাভিত্তিক জ্বালানি থেকে সরে যাচ্ছে, তখন রামপালে কয়লা পোড়ানো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে ভারতের সহযোগিতায়। এ দিকে, আমাদের বিদ্যুৎ সচিব রামপাল প্রকল্প বিরোধীদের বড়পুকুরিয়া কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের জন্য বলেছেন। সেখানে ১২৫ মেগাওয়াটের দু’টি প্রকল্পে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। প্রথমত, ২৫০ মেগাওয়াট আর ১৩২০ মেগাওয়াট কখনো এক নয়। দ্বিতীয়ত, বড়পুকুরিয়ার কয়লা খুবই উন্নত মানের, যেটা রামপালের সাথে তুলনা করা যায় না। কারণ রামপাল প্রকল্পের জন্য এখনো কোনো দেশের সাথে কয়লা আমদানির চুক্তি হয়নি। সুতরাং রামপালে ভারতের নিম্নমানের কয়লা ব্যবহার করা হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।
পরিবেশগত সমীক্ষায় (ইআইএ) উল্লেখ আছে, প্রতিটি বড় জাহাজে ৮০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা আসবে। এই কয়লা নামিয়ে সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্ট থেকে ছোট ১০-১২টা জাহাজে (লাইটার ভেসেল) মংলায় আনা হবে। তাতে বছরে অতিরিক্ত কয়েক শ’ কয়লাবাহী জাহাজ সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে চলাচল করবে। সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলে নদীতে কয়লা, তেল-মবিল ও বর্জ্য পড়বে, হর্নের শব্দ, রাতে সার্চলাইটের আলো ইত্যাদি প্রাণিকুলের অভয়ারণ্য নষ্ট করবে। গত দুই বছরে অনেকগুলো জাহাজ (ক্লিংকার, জ্বালানি তেল, সার ও কয়লা) ডুবেছে সুন্দরবন এলাকায়। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে কয়লাবাহী জাহাজডুবির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে আমাদের আশ্বস্ত করা হচ্ছে, সুন্দরবন বা বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো প্রকল্প ভারত গ্রহণ করবে না। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে পারে, আসল ব্যাপারটা কী। ১৯৭৫ সালের ফারাক্কা চুক্তি অনুযায়ী ভারত পানি দিলে পদ্মাসহ আমাদের অসংখ্য নদনদী ভরাট হতো না। সুপেয় পানির অভাবে আমাদের সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হতো না। ২০১০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও তিস্তা চুক্তি এখনো পর্দার অন্তরালেই রয়ে গেছে। বিএসএফের সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। আমাদের বনমন্ত্রী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন যাতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি না হয়। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করবে কে? ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সুন্দরবনের ভেতর তেলবাহী জাহাজডুবির পর মংলা-ঘষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ-চ্যানেলের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সব সরকারি রেকর্ডভুক্ত খালের (চিংড়ি ঘেরের) বাঁধ অপসারণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সে নির্দেশ এখনো সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশের পরও বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ নদীকে দূষণ ও দখলমুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ। ট্যানারি ও ওয়াশিং কারখানার অপরিশোধিত কেমিক্যাল বর্জ্য নদীতে ছাড়ার ফলে দূষণের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সুন্দরবন নিয়ে সরকারের দায়িত্বহীনতার একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা জরুরি। ১৯ মার্চ ২০১৬ এমভি সি হর্স-ওয়ান নামের লাইটার জাহাজ ১২৩৫ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ডুবে যায়। বন বিভাগ জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করে একটি বয়া দিয়ে রেখেছে; শুনেছি মামলাও করা হয়েছে। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ এখনো জাহাজটি উদ্ধার করেনি। সুন্দরবনের ভেতর কয়লাবাহী জাহাজ নিশ্চয়ই পানিকে দূষিত করছে। ডলফিনসহ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে এতে। আমরা সর্বক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়ে কিভাবে আশা করব যে, রামপালে সব ঠিকঠাক থাকবে?
১৮ জুন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফ) আয়োজিত ‘ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক আলোচনায় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ভর্তুকি না থাকলে এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাংলাদেশের বর্তমান গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের তুলনায় ৬২ শতাংশ বেশি। সরকারের কোনো প্রতিনিধি এই উৎপাদন খরচের তথ্য-উপাত্তের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। অর্থাৎ ‘ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের সাথে সবাই একমত। তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেশি এবং সুন্দরবনের ক্ষতি করে কেন আমরা রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি, বোধগম্য নয়। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মানবাধিকার নেটওয়ার্ক ‘সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস’ রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র সংক্রান্ত তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারিভাবে যে পরিবেশগত সমীক্ষা (ইআইএ) করা হয়েছে, তার সাথে বাস্তবতার অনেক ক্ষেত্রে মিল নেই। পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার পর যেখানে প্রকল্পের কাজ শুরু করার কথা, সেখানে এ ছাড়পত্র প্রদানের দুই বছর আগেই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পে কয়লা আমদানির জন্য সরকার এখনো কোনো দেশের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়নি। সুতরাং কয়লার গুণগত মান, কার্বন ও অন্যান্য দূষণের পরিমাপ নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এসব কারণে ‘সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস’ নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নতুন পরিবেশগত ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখতে সরকারকে অনুরোধ করেছে।
এবার জলোচ্ছ্বাস নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে চাই। ২০১১ সালের মার্চ মাসের সুনামি বা জলোচ্ছ্বাসে জাপানের মতো উন্নত দেশে মৃত্যু হয়েছে ১৫ হাজার ৮৯১ জন, নিখোঁজ দুই হাজার ৫৮৪ জন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রবল বেগে ছুটে চলা পানির উচ্চতা ৪০ মিটার পর্যন্ত ছিল। তিন-চারতলা বিল্ডিংয়ের ছাদে জাহাজ উঠে গিয়েছিল। বিশ্বের অন্যতম সেরা উন্নত দেশ জাপান সেদিন কোনো প্রযুক্তি দিয়ে? এই দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পারেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর ১০ শতাংশ ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরে উৎপন্ন হয়। ১৮৮১ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে যত মানুষ মারা গেছে, তার ৪৯ শতাংশই বাংলাদেশে। ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে যথাক্রমে প্রায় পাঁচ লাখ এবং এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা যায় এখানে। (সূত্র : বাংলাদেশ রিসার্চ পাবলিকেশনস জার্নাল, আইএসএন : ১৯৯৮-২০০৩, ভলিউম : ৪, ইস্যু : ৩, পাতা ২২০)। ২০১৩ সালের ১৯ জুন বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে ভয়াবহ সিডরের আঘাতে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ লাখ বাড়িঘরে পানি উঠে গিয়েছিল। ২০৫০ সালের মধ্যে এ ধরনের কমপক্ষে ৫০টি ভয়াবহ ঝড় হতে পারে এবং প্রায় ৯৭ লাখ মানুষের বাড়িঘর ও কৃষিজমি তিন মিটারের বেশি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। (সূত্র : নয়া দিগন্ত, ২৩ মার্চ ২০১৪)।
কয়েক দিন আগে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, রামপাল প্রকল্পের বিরোধিতাকারীরা কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না। বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে মনে করি, প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য যত যুক্তি-প্রযুক্তি বা ব্যবস্থাপনার কথা বলা হোক না কেন, সুপার সাইক্লোন বা জলোচ্ছ্বাসের কাছে সব কিছুই ব্যর্থ। তাই এ প্রকল্প বাতিল করার জন্য বিপর্যয় থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা বা অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন আমাদের মায়ের মতো আগলে রাখে। সিডর বা আইলার মতো ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হলে পশুর নদীর জোয়ার-ভাটার স্রোতে হাজার হাজার টন ছাই বা কয়লাবর্জ্য সুন্দরবনসহ উপকূলের গোটা জনপদে ছড়িয়ে পড়বে। অনিশ্চিত ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচার জন্য উপকূলের এ ধরনের সঙ্কটাপন্ন এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অনুচিত। দেশের সত্যিকারের উন্নয়ন কখনো মানুষকে হুমকির মুখে ফেলে হতে পারে না। তাই সবার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই- বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প আছে; কিন্তু সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। দেশকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য করার জন্য বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনসহ সব বনভূমির সুরক্ষা করা খুবই জরুরি। বন্ধ হোক সুন্দরবনবিধ্বংসী রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র।

লেখক: চেয়ারম্যান, সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশন
Email: [email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫