ঢাকা, বুধবার,২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

জাতীয় ঐক্য ছাড়া জঙ্গিবাদের অবসান দুরূহ

ইকতেদার আহমেদ

১১ জুলাই ২০১৬,সোমবার, ১৮:৪৬


ইকতেদার আহমেদ

ইকতেদার আহমেদ

প্রিন্ট

জঙ্গিবাদ পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিকে বিপন্ন করে। জঙ্গিবাদের কমবেশি উপস্থিতি নেই- এরূপ রাষ্ট্র বিরল। জঙ্গিবাদ দুই ধরনের। এর একটি অভ্যন্তরীণ মদদে আর অপরটি আন্তর্জাতিক মদদের মাধ্যমে সৃষ্ট। উভয় জঙ্গিবাদ রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিক অথবা ধর্মীয় উদ্দেশ্যসংবলিত হয়ে থাকে। সামাজিক বৈষম্যের উপস্থিতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি জঙ্গিবাদ উত্থানের জন্য বহুলাংশে দায়ী।
সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সৃষ্ট বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি ভারতের প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে স্বল্পতম সময়ে আত্মপ্রকাশে সমর্থ হয়েছিল। যে লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয় তা হলো, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত থাকবে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি সৃষ্টির ২৩ বছর আগে ভারতবর্ষ বিভাজনের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণরূপে ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামের দু’টি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম। বাংলাদেশ তখন পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলো। পাকিস্তানের পার্লামেন্ট বা জাতীয় পরিষদের ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের কাছে দেশ শাসনের ভার ছেড়ে দেয়া হলে আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম আবশ্যক হতো না। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে বাঙালি জাতিসত্তায় বিশ্বাসীরা স্বাধীনতার পক্ষাবলম্বন করে। অপর দিকে ধর্মীয় জাতিসত্তায় বিশ্বাসীরা যে আদর্শের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভাজন হয়েছিল, সে আদর্শে অটুট থাকে। স্বাধীনতাযুদ্ধে ধর্মীয় জাতিসত্তায় বিশ্বাসীরা পরাভূত হলে তাদের রাজনীতি করার অধিকার খর্ব করা হয়। বাম রাজনীতিতে বিশ্বাসী পিকিংপন্থী হিসেবে খ্যাত মাওবাদীরা ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থনপুষ্ট স্বাধীনতাকে নিছক আধিপত্যের পরিবর্তন গণ্য করে এর বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করার কারণে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রতিকূল পরিবেশে তাদের অনেককে অনেকটা বাধ্য হয়ে অপ্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বের বিরুদ্ধাচরণে জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) নামক যে রাজনৈতিক দলটির জন্ম, এটি অচিরেই সশস্ত্র গণবাহিনী গঠনপূর্বক একধরনের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পরপর বিধ্বস্ত দেশ গঠনে যখন স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষের সব শক্তির ঐকান্তিক সহযোগিতা অত্যাবশ্যক ছিল, ঠিক তখন গণবাহিনী ও মাওবাদীদের সহিংসতায় লিপ্ত হয়ে বিরুদ্ধ রাজনৈতিক নেতাদের হত্যাসহ দেশকে অস্থিতিশীল করা অভ্যন্তরীণ নাকি আন্তর্জাতিক মদদে হয়েছিল, তা দেশবাসীর সামনে স্পষ্ট করা হলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে দেশকে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হতো না। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী মুসলিম লীগ ও জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় দল দু’টির সমর্থন তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল জাসদের অনুকূলে চলে যায় বলে মনে করা হয়।
তবে বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল জাসদ যে হারে দলটির ভোট প্রাপ্তি প্রত্যাশিত ছিল, নির্বাচনটির নিরপেক্ষতা বিঘ্নিত হওয়ায় ফলাফলে তা প্রতিফলিত হয়নি। জাসদের গণবাহিনী এবং পিকিংপন্থীদের অপ্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষমতাসীন দলের শাসন এবং দেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের প্রতি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা দিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অপর সব দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে একদলীয় ব্যবস্থা, তথা বাকশাল প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হন। এ সিদ্ধান্তটি তার নিজের ও দলের জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনে এবং সে বিপর্যয়ের সুদূরপ্রসারী প্রভাব অনুভূত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে বাংলাদেশ দুইবার সামরিক শাসনের কবলে পড়ে এবং সামরিক শাসকেরাই এ দেশে আবারো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের পথ সুগম করেন। তবে সে গণতন্ত্র কখনো স্বচ্ছতার মাপকাঠিতে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দলটিকে ক্ষমতা না দেয়ার কারণে পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে গেলেও তৎপরবর্তী এ দেশে দলীয় সরকারের অধীন কোনো নির্বাচন নিরপেক্ষতা, তথা গণতন্ত্র সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। আর তাই দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদেরই বিজয় ঘটেছে। অপর দিকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনে পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দল পরাভূত হয়েছে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন নিষিদ্ধ থাকায় স্বাধীনতার পর মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ সামরিক শাসনামলে দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ, ১৯৭৮ দ্বারা রোহিত হলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের পথে বাধা অপসারিত হয়। দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশটি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল। এরপর দেখা গেল, ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দল গঠিত হলেও এ দলগুলোর মধ্যে বিশেষত জামায়াত কখনো এ দেশের বড় দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ আবার কখনো বিএনপির সাথে অবস্থান গ্রহণ করেছে। নিজস্ব অবস্থান থেকে দলটি এভাবে বিচ্যুত হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ঘোষিত হলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যে সংশোধনী আনা হয় তাতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে ’৭২ সালের সংবিধানের পূর্বাবস্থান অনুসৃত হয়েছে। সংবিধানে এরূপ অবস্থান বিদ্যমান থাকলে ধর্মীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসংবলিত দল গঠন নিষিদ্ধ হলেও দেখা যায়, নানা অজানা হিসাব-নিকাশে তা কার্যকর নয়। এ কথাটি অনস্বীকার্য, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে হলে একই উদ্দেশ্যে গঠিত হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদকে নিষিদ্ধ করার অবকাশবহির্ভূত মনে করার সুযোগ নেই।
’৯০ পরবর্তী আমাদের দেশে গণতন্ত্রের নবযাত্রা সূচিত হলে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি আর আওয়ামী লীগের আবির্ভাব ঘটে। তাদের পাশাপাশি অপর যে দু’টি দলের সরব উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়, সে দল দু’টি হলো জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী। পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম সংসদ নির্বাচনকালে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর যে জনসমর্থন ছিল তা বর্তমানে জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে ব্যাপকহারে সঙ্কুচিত হলেও জামায়াতের ক্ষেত্রে অক্ষুণ্ন রয়েছে- এমনটিই পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত অষ্টম সংসদ নির্বাচন পর্যালোচনায় পরিলক্ষিত হয়, বিএনপির প্রতি জামায়াতের সমর্থন এবং বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ জোটটিকে নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত সাফল্য এনে দিয়ে আগেকার সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেয়। এরপর থেকে এ দেশে যেকোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হলে নির্বাচনে জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের সমর্থন বড় দুইটি দলের কাছে অত্যাবশ্যক বলে বিবেচিত হতে থাকে।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনমত সব সময় ওঠানামা করে। সচরাচর দেখা যায়, একটি নির্বাচনে যে দল বিজয়ী হয় পরবর্তী নির্বাচনে সে দলের বিজয়ের সম্ভাবনা সঙ্গত কারণেই লঘু হয়ে যায়। আমাদের দেশে বর্তমানে জনমতের যে অবস্থান তা বিবেচনায় নেয়া হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হবে, সে বিষয়টি এ দেশের সচেতন জনমানুষ অনুধাবন করতে সক্ষম। আর এ কারণেই আদালতের বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে, সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপসাধন করে একতরফা ও অপ্রত্যাশিতভাবে দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের দেশে ভবিষ্যতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তার ফলাফল কী হবে সেটি কারো কাছে অজানা নয়। আমাদের রাজনীতির আকাশে আজ প্রধান যে সমস্যা তা হলো, একটি সরকারের মেয়াদ অবসানে কী ব্যবস্থায় পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ প্রশ্নে আজ আর কারো মধ্যে ন্যূনতম সংশয় নেই যে, দলীয় সরকারবিহীন নির্বাচনে নির্বাচনের অব্যবহিত পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দল বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হবে। আমাদের দেশে বিভিন্ন দলের সরকার ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় দলীয় ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে সচেষ্ট ছিল। অষ্টম সংসদের মেয়াদ পরবর্তী দলীয় সরকারের ছত্রছায়ায় যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছিল, তা সংবিধান অনুসৃত পন্থায় না করার কারণে সেটি যে, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল সে বিষয়ে দেশবাসী সম্যক অবহিত।
পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের মতো আমাদের দশম সংসদ নির্বাচন ছিল একতরফা। উভয় নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্য পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের পরপর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংক্রান্ত বিল পাস করে সে সংসদের অবলুপ্তি ঘোষণা করা হয়েছিল। অপর দিকে দশম সংসদ নির্বাচন একতরফা ও ভোটারবিহীন হওয়া সত্ত্বেও সে সংসদ অদ্যাবধি বহাল রাখা হয়েছে। বিদেশী কোন শক্তির সমর্থন নিয়ে একতরফাভাবে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হয়েছিল, সে বিষয়ে দেশবাসীর স্পষ্ট ধারণা রয়েছে।
আমাদের দেশে বর্তমানে জঙ্গিবাদের যে উপস্থিতি পরিলক্ষিত হচ্ছে এ প্রেক্ষাপটে সংঘটিত ঘটনাগুলোর সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে তা দেশীয় নাকি আন্তর্জাতিক মদদে হচ্ছে, এ বিষয়টির সুরাহা হবে। আন্তর্জাতিক মদদপুষ্ট জঙ্গি সংগঠন তালেবান, আলকায়দা, আইএস প্রভৃতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম ফাইভ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও অর্থায়নে তাদেরই উদ্দেশ্য সাধনকল্পে সৃষ্ট। বাংলাদেশে দশম সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে আইএস জড়িত মর্মে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে। এসব দাবি আদৌ সঠিক কি না তা একমাত্র নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে নির্ণয় করা সম্ভব। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘ দিন ধরে দাবি করা হচ্ছে, দেশের অভ্যন্তরে সংগঠিত প্রতিটি জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডের সাথে বিএনপি জামায়াত জড়িত। এ অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী সন্ত্রাসীদের দ্বারা নিহত হওয়া পরে যে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল তাতে জঙ্গি গ্রেফতারের নামে বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মীদেরই অধিকহারে গ্রেফতার করা হয়েছে। সাঁড়াশি অভিযানে যেভাবে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাতে এখন এ দল দু’টির কোনোরূপ জঙ্গিবাদী কার্যক্রম পরিচালনার সামর্থ্য না থাকারই কথা; কিন্তু গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ এবং শোলাকিয়ার ঈদগাহে সংঘটিত সহিংস কার্যক্রমে দেখা যায়, ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান ও ইংরেজি মাধ্যমে পড়–য়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা উভয় ঘটনায় সম্পৃক্ত। প্রথমোক্ত ঘটনাটি পর দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে এ ধরনের ঘটনা নিরসনে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানানো হয়েছে। দলটির এ আহ্বানকে সরকারি দল প্রথমত, ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও পরে তারা সে অবস্থান থেকে সরে যান। আমাদের দেশে যত দিন পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা তদন্তাধীন থাকাবস্থায় রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য বিরুদ্ধ রাজনৈতিক মতাদর্শীদের দোষারোপ করা হবে, তত দিন এ ধরনের ঘটনা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া দুরূহ।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের প্রধান উন্নয়নসহযোগী জাপান। আমাদের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরী পোশাক ক্রয়ে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যে দেশের নাগরিকদের ভূমিকা অগ্রগণ্য, সে দেশটি হলো ইতালি। গুলশানের রেস্তোরাঁর ঘটনায় উভয় দেশের বেশ কয়েকজন নিরীহ নাগরিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। এ বিষয়ে উভয় দেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এভাবে আমাদের দেশে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখছে যেসব দেশ, তাদের নাগরিক নিহত হলে তা এক দিকে আমাদের অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনবে অপর দিকে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করবে। এ ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় হলে আমাদের প্রতিবেশী কারা লাভবান হবে, সেটি প্রণিধানযোগ্য। আর তাই আমাদের দেশে পরিচালিত জঙ্গিবাদী কার্যক্রম দেশীয় নাকি আন্তর্জাতিক মদদে, সেটি সুরাহার আগে আমাদের দেশের সব রাজনৈতিক দল এবং শ্রেণী ও পেশার মানুষ যদি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সহাবস্থান গ্রহণ করে তাতে একে অপরকে দোষারোপের রাজনীতির অবসান ঘটবে, যা প্রকারান্তরে জঙ্গিবাদ অবসানে দৃঢ়ভিত্তি রচনা করবে।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫