ঢাকা, মঙ্গলবার,২৮ মার্চ ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

উম্মাহর ঐক্য কেন জরুরি

এহসান বিন মুজাহির

৩১ মার্চ ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ১৭:০৫


প্রিন্ট

ঐক্য ও সংহতি মুসলিম জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সা:-এর প্রতি
ঈমানের অনিবার্য দাবি হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপন। তাওহিদের পরে মুমিনদের যে ব্যাপারে
সবচেয়ে বেশি তাগিদ দেয়া হয়েছে তা হলো ঐক্য। ইসলামে ঐক্যের গুরুত্ব অপরিসীম।
ঐক্যবদ্ধভাবে জীবনযাপন করা মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য। এককভাবে জীবনযাপন আল্লাহর
অপছন্দ। সংঘবদ্ধভাবে জীবন পরিচালনা করা ইসলামের নির্দেশনা। এ সর্ম্পকে মহান রাব্বুল
আলামিন ইরশাদ করেন, ‘ হে মুমিনগণ! তোমারা আল্লাহর রজ্জুকে (ইসলাম) আঁকড়ে ধর
(ঐক্যবদ্ধ হও) এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’। (সূরা ইমরান: ১০৩)
ঐক্য সম্পর্কে রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, তোমরা সেইসব লোকদের মতো হয়ো না,
যাদের কাছে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য নিদর্শন আসার পরও তারা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে
পড়েছে এবং নানা ধরনের মতানৈক্য সৃষ্টি করেছে, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি’। (সূরা
আল ইমরান : ১০৫) ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, সালাত কায়েম করো
এবং কখনো মুশরিকদের দলভুক্ত হয়ো না, যারা তাদের দ্বীনকে টুকরো করে দিয়েছে এবং
নিজেরা নানা দলে বিভক্ত হয়েছে এদের প্রত্যেকটি দলই নিজেদের যা আছে তা নিয়েই মত্ত’।
(সূরা তাওবাহ: ৩১-৩২)
মহান অল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই’। (সূরা
হুজরাত: ১০) মহান পালনকর্তা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তাদের বেশি ভালোবাসি যারা
আল্লাহর রাস্তায় এমনভাবে সারিবদ্ধ হয়ে লড়াই করে, ঠিক যেন সিসাঢালা এক সুদৃঢ়
প্রাচীর’। (সূরা সফ: ৬১) আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘এই যে তোমাদের জাতি, এ তো
একই জাতি, আর আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব তোমরা (ঐক্যবদ্ধভাবে) আমারই
দাসত্ব রো। (সূরা তাওবাহ: ৯২)
মুসলিম মিল্লাত এক প্রাণ, এক দেহ, এই চেতনাবোধ ক্ষীণতর হয়ে আসছে। ইসলামে
মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের। এ সম্পর্কের ভিত্তি ইসলামের একটি স্তম্ভের সাথে
সম্পৃক্ত যে কেউ তার স্বীকৃতি দেবে সেই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হবে। ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য বজায়
রাখার ব্যাপারে মহান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সা:-এর জোর তাগিদ দিয়েছেন।
হজরত হারিছ আল আশ'আরী রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, আমি
তোমাদের পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি, স্বয়ং রব আমাকে ঐগুলোর নির্দেশ দিয়েছেন।
বিষয়গুলো হচ্ছে, সংঘবদ্ধ, আমিরের নির্দেশ শ্রবণ, নির্দেশ পালন, হিজরত এবং আল্লাহর
পথে জিহাদ। যে ব্যক্তি সংঘবদ্ধতা ত্যাগ করে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে গেছে সে নিজের
গর্দান থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে ফেলেছে। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল,
সালাম কায়েম এবং সাওম পালন করা সত্ত্বেও? এর উত্তরে রাসূল সা: বলেন, নামাজ কায়েম
এবং রোজা পালন এবং মুসলমান বলে দাবি করা সত্ত্বেও (তিরমিজি, আস সুনান, কিতাবুল
আমছাল' হাদিস নং-২৭৯০)
হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি জান্নাতের সর্বোত্তম
অংশে বসবাস করে আনন্দিত হতে চায় সে যেন ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে
ধরে’।
(তিরমিজি, শাফিঈ, আল মুসনাদ, নং ১১২৬)
রাসূলে আকরাম সা: ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে জীবনযাপন করো, সংঘবদ্ধ থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনযাপন করো না, কারণ বিচ্ছিন্ন করলে শয়তানের কুপ্ররোচণায় আকৃষ্ট হয়ে
পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে’। (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)
রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘মুমিনগণ অপর মুমিনের জন্য একটি প্রাচীরের মতো, যার এক
অংশ অপর অংশকে মজবুত করে। এরপর তিনি এক হাতের আঙুল অপর হাতের আঙুলে
প্রবিষ্ট করেন’। (বুখারি ও মুসলিম)
হজরত ইবনু উমর রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি সংঘবদ্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন
অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু’। (মুসলিম, আল মুসনাদ,
৫২৯২)
আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেন, ‘তিনজন লোক কোনো নির্জন
প্রান্তরে থাকলেও একজনকে আমির না বানিয়ে থাকা জায়েজ নয়’ (আহমদ আল
মুসনাদ-৬৩৬০)
রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া, অনুগ্রহ, মায়া-মমতার দৃষ্টিকোণ
থেকে তুমি মুমিনদের দেখবে একটি দেহের মতো। যদি দেহের কোনো একট অংশ আহত
হয়ে পড়ে তবে অন্যান্য অংশও তা অনুভব করে’ (বুখারি ও মুসলিম)।
রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, "মুমিনগণ একজন মানুষের মতো, যার চোখ আক্রান্ত হলে
সমস্ত শরীর আক্রান্ত হয় আর তার মাথা আক্রান্ত হলে সমস্ত শরীর আহত হয়’। (মুসলিম ও
তিরমিজি)
ইসলামের অপরিহার্য বিধান উপেক্ষা করে মুসলিম মিল্লাত আজ শতধাবিভক্ত। অথচ মুসলিম
মিল্লাতকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিশ্বের সব তাগুতি শক্তিগুলো আজ একপ্লাটফর্মে কিন্তু মুসলিম
উম্মাহ আজও পরস্পর হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদের ঘৃণ্য স্লোগান ও কাদা ছোড়াছুড়িতে
লিপ্ত। ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতালিপ্সা পরিহার করেও ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে এক প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ
হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ একটি আদর্শ শক্তিশালী জাতি ইসলাম ও রাষ্ট্রের অনেক কল্যাণ সাধনে
সক্ষম। আসুন আমরা আমাদের ভেদাভেদ, অনৈক্য, ফেরকা ইত্যাদি ভুলে গিয়ে ইস্পাতকঠিন
ভ্রাতৃত্ব বন্ধন গড়ে তুলি।
লেখক: প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫