ঢাকা, শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

এ কে খান : জীবন ও কর্ম

হেলাল হুমায়ূন

৩১ মার্চ ২০১৬,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আবুল কাসেম খান, যিনি এ কে খান নামে সমধিক পরিচিত, বাংলাদেশের পথিকৃৎ শিল্পপতি, নির্ভীক বিচারক, প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ও সমাজসেবক হিসেবে খ্যাত ১৯০৫ সালের ৫ এপ্রিল চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছাত্রজীবনের প্রতি ধাপে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ফতেয়াবাদ হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পাস করেন। চট্টগ্রাম বিভাগে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯২৭ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণীতে এমএ পাস করেন। ১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ব্যাচেলর অব ল (বিএল) ডিগ্রি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী অর্জন করেন।
তিনি শিক্ষাজীবন শেষে প্রথমে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের জুনিয়র হিসেবে কাজ করেন। পরে বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় বাঙালি মুসলমান পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করে ১৯৩৫ সালে বেঙ্গল জুডিশিয়াল সার্ভিসে মুন্সেফ পদে যোগদান করেন। একজন বিচারক হিসেবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তিনি সবসময় সচেষ্ট ছিলেন। স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির জন্য কখনো তিনি ন্যায়বিচারে আপস করেননি।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ তপন রায় চৌধুরীর বাবা কংগ্রেস নেতা অমিয় রায় চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার ফৌজদারি মামলা দায়ের করলে বিচারক মামলাটি আইনসম্মত হয়নি বলে নাকচ করে দেন। তপন রায় চৌধুরী তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাঙ্গালনামায়’ এ ঘটনার উপসংহারে বলেন ‘যে দুঃসাহসী বিচারক সরকারের আনা অভিযোগ নাকচ করেন, তার নাম আবুল কাসেম খান’। অপর ঘটনায় এ কে খান কোট্টম নামে একজন ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার এক ভারতীয় রাজনীতিবিদকে প্রহার করার অভিযোগে শাস্তি প্রদান করেন। সেই আমলে শ্বেতাঙ্গ আসামির ন্যায্যবিচার করে শাস্তি বিধান করা দেশী বিচারকের কাছে সহজ কাজ ছিল না। এই দুরূহ কাজ সম্পন্ন করে এ কে খান নির্ভীক ন্যায়বিচারক হিসেবে নিজের উন্নত,বলিষ্ঠ চরিত্রের পরিচয় দান করেন। এসব ঘটনায় ব্রিটিশ সরকার তাকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘পানিশমেন্ট পোস্টে’ বদলি করে। সেখানে তাকে প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়।
এ কে খান উপলব্ধি করেন যে, ব্রিটিশ সরকারের আমলে ন্যায়বিচার করা তার জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাই ১৯৪৪ সালে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দেন। ১৯৪৫ সালে তিনি এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন এবং অতি দ্রুত সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেন। পাট, বস্ত্র, শিপিং ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান করেন।
তিনি ইস্টার্ন মাকেন্টাইল ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত করেন, যা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি উদ্যোক্তাদের সর্বপ্রথম ব্যাংক। এ কে খান এ দেশে প্রথম অগ্রণী বাঙালি শিল্পপতি। তার দৃষ্টান্ত তরুণ বাঙালি উদ্যোক্তাদের, যারা পাকিস্তানে অনেক বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে এবং তাদের কাছে তিনি কিংবদন্তিতে পরিণত হন। বাংলাদেশের শিল্পায়নের ব্যাপারে তিনি গভীর চিন্তাভাবনা করতেন এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে সে বিষয়ে অনেক প্রবন্ধ লিখে গেছেন। শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের প্রসঙ্গে তিনি এক প্রবন্ধে লিখেছিলেনÑ ‘আমাদের দেশের গরিব শ্রমিকদের প্রতি মালিকের সহানুভূতি ও একাত্মতা গড়ে তুলতে না পারলে আমরা দেশের শিল্পায়নে বড় রকমের সাফল্য অর্জন করতে পারব না। আমি মনে করি, প্রথম থেকে শিল্পের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা, সৌহার্দ্য ও দূরদর্শিতার মনোভাব নিয়ে আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত।’
শিল্পপতি হিসেবে তার কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি দেশের রাজনীতিতেও জড়িত ছিলেন। এ কে খান ১৯৪৬ সালে ভারতীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হন। শুরু থেকে পূর্ব বাংলার প্রতি পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির তিনি কঠোর সমালোচক ছিলেন। ১৯৪৮ সালেই গণপরিষদে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরকে উন্নত করার জন্য বক্তব্য রাখেন। তার মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নতি ছাড়া পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক উন্নতি হবে না। ১৯৫১ সালের বাজেট আলোচনায় বিস্তারিত পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি পূর্ব বাংলাকে কিভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে তা তুলে ধরে বলেন, ‘আগামী ছয় বছরের পরিকল্পনায় পূর্ব বাংলায় যেখানে ৫৬ শতাংশ জনগণ বাস করে, সেখানে আমাদের ভাগ্যে জুটেছে শতকরা ২৩ ভাগ বরাদ্দ।’
অথচ ‘পূর্ব বাংলা বৈদেশিক মুদ্রার শতকরা ৮০ ভাগ উপার্জন করেছে’। প্রথম থেকেই তিনি পূর্ব বাংলাকে যে দেশরক্ষা খাতে বঞ্চিত করা হচ্ছে সে বিষয়ে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, ভবিষ্যতে অস্ত্রের মুখে আমাদের শাসন করার চেষ্টা করা হবে। ১৯৫১ সালেই তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি বৎসরে দেশরক্ষা খাতে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় করিতেছি কিন্তু ইহার ২ কোটিও পূর্ব বাংলায় খরচ হয় না।’
তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের শিল্প, পূর্ত, সেচ, বিদ্যুৎ ও খনিজ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যখন পাকিস্তান সরকারের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন তখন তৎকালীন পূবর্ পাকিস্তানে শিল্পায়নের জন্য বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করেন। এখানে চট্টগ্রাম ইস্পাত কারখানা ও কর্ণফুলী রেয়ন মিল স্থাপন করেন। বাঙালি উদ্যোক্তাদের সীমিত মূলধনের কারণে এ দেশে ছোট ও মাঝারি শিল্প স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ঢাকায় পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপনের প্রস্তাবকরেন, যাতে সংসদের অধিবেশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রম পূর্ব বাংলা থেকেও পরিচালনা করা যায়। এরই ফলে শেরেবাংলা নগরে দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপিত হয়। বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবন তার সাক্ষ্য বহন করছে।
এ কে খান ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সাথে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে তিনি প্রেসিডেন্টকে বলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে একই অর্থনীতির অধীনে শাসন করা যাবে না। কারণ এই দুই অংশের অর্থনীতি ভিন্ন। তাই পররাষ্ট্র, দেশরক্ষা ও মুদ্রানীতি বাদে আর সব মন্ত্রণালয় প্রদেশের হাতে ন্যস্ত করা উচিত। তা ছাড়া সেনাবাহিনীতে সমতা আনতে হবে অথবা পূর্ব পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বাঙালিদের দিয়ে গঠন করতে হবে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এসব বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব না দেয়ার কারণে তিনি ১৯৬২ সালে ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ করেন। একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন `I have joined the Cabinet to serve the country and not to serve Ayub Khan, and I would stay as long as I was able to serve the country.’ তিনি ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান পার্লামেন্টে একজন বিরোধীদলীয় সদস্য হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন তার প্রধান লক্ষ্য ছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন এই লক্ষ্য অর্জন করতে আমাদের প্রগতিশীল, শিক্ষিত, আধুনিক, সহিষ্ণু ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। এই মূল্যবোধ তার নিজের জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে এ কে খান মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতি তার দ্যর্থহীন সমর্থন প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণার সংশোধিত ইংরেজি খসড়া তিনিই প্রণয়ন করেন, যা কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান পুনঃপাঠ করেন। পাকিস্তান সরকারের সাথে কোনো আপসে রাজি না হয়ে প্রথিতযশা এই শিল্পপতি নিজের বিপুল সম্পদসহ সবকিছু ত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে দেশের সীমানা অতিক্রম করে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা করেন। ব্যক্তিগতভাবেও তাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তার আপন ভাই ও তিন ভ্রাতুষ্পুত্র পাক বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান।
এ কে খান তার বিস্তীর্ণ কর্মজীবনেÑ বিচারক, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক হিসেবে সবসময় সততা, ন্যায়পরায়ণতা, কঠোর পরিশ্রম এবং কর্তব্যের প্রতি উৎসর্গিতÑ আমাদের ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন।
এ কে খান সমাজসেবার জন্য এ কে খান ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুর একদিন আগে ৩০ মার্চ, ১৯৯১ সালে তার নিজের হাতে একটি উইল লিখে যান, যাতে এ কে খান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির শতকরা ৩০ ভাগ লভ্যাংশ মানবকল্যাণ তথা জনশিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দান করেন। বর্তমানে তার উত্তরসূরি সুযোগ্য সন্তানরা এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে উপরিউক্ত খাতে বিশাল অবদান রাখছেন। তিনি ৩১ মার্চ ১৯৯১ সালে ইন্তেকাল করেন।
লেখক : সাংবাদিক; সম্পাদক, এ কে খান স্মৃতিসংসদ
hmhumayun@gmail.com

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫