১৭ নভেম্বর ২০১৯

সিরিয়া ট্রেন মিস করেছে ইউরোপ

-


তুরস্ক নিজেদের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তকে কুর্দিদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে নিরাপদ রাখার জন্য এবং বিপুলসংখ্যক সিরীয় শরণার্থীর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে যে অপারেশন ‘পিস ¯িপ্রং’ শুরু করেছিল বড় কোনো অঘটন ছাড়াই সেটা মোটামুটি সফল হয়েছে। এরপর গত সপ্তাহে ইস্তাম্বুলে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির আয়োজন করে।
গত বৃহস্পতিবার ষষ্ঠ ইস্তাম্বুল মিডিয়েশন কনফারেন্স তথা মধ্যস্থতা বা সালিসি সংক্রান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলন নীতিনির্ধারণ, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে (এনজিও) একত্রিত করেছিল। সম্মেলনে এসব সংস্থার কর্মকর্তারা মধ্যস্থতার অনুশীলন এবং উদীয়মান প্রযুক্তিবিদ্যার (ইমার্জিং টেকনোলজিস) মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভোসোগলু এবং জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন। এর পর দিন ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) মধ্যস্থতার ওপর তাদের তৃতীয় সদস্য দেশে সম্মেলনের আয়োজন করে।
যথাসময়ে আয়োজিত এই সম্মেলনগুলোতে বিশ্বে মধ্যস্থতা বা সালিসির গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করা হয়। উল্লেখ্য, বর্তমান বিরোধ, দ্বন্দ্ব ও সঙ্ঘাতের ৬০ শতাংশই ওআইসিভুক্ত দেশগুলোতে ঘটে থাকে। উভয় সম্মেলনে বিশেষভাবে সিরিয়া এবং ইরাক পরিস্থিতি আলোচনার অগ্রভাগে ছিল। আলোচনায় ইনস্টিটিউশনগুলো এবং মধ্যস্থতাকারীরা সঙ্ঘাত অবসান করে স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়। প্রথম সম্মেলনের সাইড লাইনে কাভোসোগলু তার ইরাকি প্রতিপক্ষের কাছে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রকম্পিত দেশটিতে শিগগিরই শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অন্য দিকে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বলেন, ‘অর্থহীন যুদ্ধ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’ গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে গত মঙ্গলবার জেনেভায় সিরিয়াবিষয়কে জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত সিয়ার পেদারসন এবং তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ। আস্তানা শান্তি প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত এসব নেতৃস্থানীয় কূটনীতিক সিরিয়ার সাংবিধানিক কমিটির বৈঠকের আগেই আলোচনায় মিলিত হন। উল্লেখ্য, যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লক্ষ্যেই সাংবিধানিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিরিয়ার সাংবিধানিক কমিটিতে সিরীয় সরকারের প্রতিনিধি এবং বিরোধী পক্ষ এবং সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে প্রথম বারের মতো এ কমিটির বৈঠক আহ্বান করা হয়। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাভোসোগ্লু এই উদ্বোধনী বৈঠককে ‘ঐতিহাসিক, এগিয়ে যাওয়ার একটি ভিত্তি এবং মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট সফলতা’ বলে বর্ণনা করেন।
সিরিয়া সঙ্কট নিরসনে মধ্যস্থতার অংশ হিসেবে কূটনীতিকদের জমায়েত হওয়ার প্রাক্কালে আইএস নেতা আবু বকর আল বাগদাদির নিহত হওয়ার খবর আসে। মার্কিন সৈন্যরা সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করার দাবি করে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাগদাদির মৃত্যুকে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বর্ণনা করেন। বাগদাদি হত্যাকাণ্ডের পর জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী এন্নিগ্রিট ক্যাম্প কারিন বাওয়ার সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি নিরাপত্তা অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। গত ২৪-২৫ অক্টোবর ব্রাসেলসে ন্যাটো প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের সভায় এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কাভোসোগ্লু এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেন। ন্যাটোর বৈঠকের পর জার্মান প্রতিপক্ষের সাথে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তুর্কি অভিযানের ব্যাপারে জার্মানির অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর কারণে জার্মানির ব্যাপারে তুরস্কের আস্থা ভেঙে গেছে। ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাজ্যসহ ইইউভুক্ত যে দেশগুলো তুরস্কে অস্ত্র বিক্রি ও রফতানির পরিকল্পনা স্থগিত করেছে তাদের মধ্যে জার্মানিও রয়েছে। জার্মানির একটি বার্তা সংস্থার মাধ্যমে ইউগোভ পরিচালিত এক মতামত জরিপে জার্মানির ৮ শতাংশ লোক সিরিয়ায় অভিযান চালানোর কারণে তুরস্ককে ন্যাটো থেকে বহিষ্কার করা উচিত বলে অভিমত প্রকাশ করেছে। এ ছাড়াও দেশটির বহু লোক মনে করে তুরস্কের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা উচিত। সিরিয়া সঙ্কটের মাধ্যমে তুরস্ক ও ইইউর মধ্যকার চলমান উত্তেজনা আবার সামনে এলো। তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন পারস্পরিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও অভিবাসন চুক্তির মাধ্যমে লাভবান হলেও এবং কাস্পিয়ান সাগরে তুরস্কের জ্বালানি সম্পদ সত্ত্বেও উভয়পক্ষের মধ্যকার সর্বশেষ উত্তেজনা একটি নেতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। জার্মান প্রস্তাবের একটি সমস্যা হলোÑ এটা কেবল অবাস্তব নয়, হাস্যকরও। সিরীয় সঙ্কট শুরু হওয়ার পর থেকে তুরস্ক কমপক্ষে তিনবার একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একত্রে এই কার্যক্রম পরিচালনা করার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই আহ্বানে কোনো কর্ণপাত করেনি।
ইউরোপ এখন যেটা চাচ্ছে সেটা হলোÑ ট্রেন স্টেশন ত্যাগ করার পর তারা ট্রেন ধরার চেষ্টা করছে। নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তুরস্ক যখন রাশিয়ার সাথে একত্রে কাজ করছে তখন ইইউ জাতিসঙ্ঘের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের সাথে সংযুক্ত হয়ে জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া ও তুরস্কের সাথে এক বছর আগে যে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল সে ধরনের একটি শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন করতে পারে।
রাশিয়া ও আমেরিকা উভয় পরাশক্তির ব্যাপারে তুরস্ককে আরো সচেতন ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ ওয়াশিংটন ও মস্কো উভয়ে কুর্দিদের একেবারে দুর্বল হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে চায়। সিরিয়ায় রাশিয়ার শক্তিশালী উপস্থিতির মাধ্যমে তারা কুর্দিদেরও রক্ষা করতে চায়। অন্য দিকে ওয়াশিংটন কুর্দিদের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কামনা করে। উভয় দেশই নিজ নিজ স্বার্থে কুর্দিদের বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে চায়। তুর্কি সাংবাদিক ফাহিম তাসতে কিন সম্প্রতি লিখেছেন, ওয়াশিংটন এবং মস্কো উভয়ে একত্রে কাজ করতে পারে কি না, সেটা পরীক্ষা করে দেখার জন্যই সিরিয়াকে বাছাই করেছে। তাই তুরস্ককে হয়তো সিরিয়ার সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হতে পারে। কারণ আমরা দেখেছি মানবিজ ও কোবানি থেকে যুক্তরাষ্ট্র যখন তার সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় তখন তারা এই দুই শহরের নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের হাতে নয়, রাশিয়ার কাছে দিয়ে এসেছে। তুরস্ককে মনে রাখতে হবে সেখানে আরো একটি শক্তিশালী খেলোয়াড় ইরান রয়েছে। বিদ্যমান জটিল পরিস্থিতিকে সামনে রেখে তুরস্ককে একটি ব্যাপক ও বাস্তবভিত্তিক সিরিয়া নীতি নিয়ে কাজ করতে হবে।

 


আরো সংবাদ