১৭ নভেম্বর ২০১৯

আবার গৃহযুদ্ধের মুখে ইথিওপিয়া

-


ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরের শহর আদামা। সেখানকার একটি কারখানার কাছে গিয়ে দেখা যায় তার সব জানালার কাচ ভেঙে গেছে। এক দেখাতেই বোঝা যাচ্ছিল ভেতরের অবস্থাও এ জানালার চেয়ে বিশেষ ভালো নেই। পাশের সড়কেই পড়ে আছে পুড়ে যাওয়া দুটি বাস-ট্রাক। সরকারবিরোধীদের ক্ষোভের শিকার হয়েছিল গাড়ি দু’টি। এ অবস্থা শহরটির অনেক স্থানেই। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের প্রমাণ দিচ্ছে এসব জিনিস।
ইথিওপিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের নেতৃত্বে গত বছর দেশটিতে এক গণতান্ত্রিক যাত্রার শুরু হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম ১০০ দিনে তিনি জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেন। নির্বাসনে থাকা বিরোধী নেতাকর্মীদের দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানান। তুলে নেন মিডিয়া সেন্সরশিপ ও বিরোধী দলের ওপর জারিকৃত নিষেধাজ্ঞা। এ ছাড়া ২০২০ সাল নাগাদ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনেরও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ইথিওপিয়ায় সহিংসতা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে অনেক পথ বাকি থাকলেও আবি আহমেদের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপে আশার আলো দেখেছিল দেশটির জনগণ।
এর পাশাপাশি প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সাথে চলে আসা কয়েক দশকব্যাপী সঙ্ঘাত নিরসনের কারণে গত মাসে আবি আহমেদকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়। নোবেল পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী তিনি প্রশংসিত হন তার শান্তি প্রচেষ্টা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। কিন্তু তার এ উদার দৃষ্টিভঙ্গির ধারাবাহিকতাতেই দেশটিতে এখন সূত্রপাত হয়েছে দেশব্যাপী গোষ্ঠীগত সঙ্ঘাতের। এ সঙ্ঘাতে ইতোমধ্যেই ৯০ জন নিহত হয়েছে।
গত মাসের ২৩ তারিখে জাওয়ার মোহাম্মদ নামের এক নেতার ডাকে দেশটিতে বিক্ষোভের সূচনা হয়। কিছু দিন আগে তিনি আবি আহমেদের আহ্বানেই দেশে ফেরেন। তারা উভয়েই দেশটির সর্ববৃহৎ নৃগোষ্ঠী ওরোমোর লোক। উভয়েই নিজ গোষ্ঠীতে সমানভাবে জনপ্রিয়।
প্রভাবশালী সমাজকর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব জাওয়ার মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, সরকারের পুলিশ বাহিনী তার ওপর হামলার ছক কষছে। তারা রাজধানী আদ্দিস আবাবায় তার বাড়ি ঘিরে রেখেছে এবং তার সরকারি নিরাপত্তা উঠিয়ে নিতে চাইছে। ফলে তার জীবন এখন হুমকির মুখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে এ কথা জানালে মুহূর্তেই তার এ পোস্ট পৌঁছে যায় তার সাড়ে ১৭ লাখ ফলোয়ারের কাছে। এরপর পরই বিপুল জনপ্রিয় জাওয়ারের সমর্থক ও তার জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা এর প্রতিবাদে রাজপথে নেমে পড়ে। তারা জ্বালাও-পোড়াও থেকে শুরু করে বিভিন্ন সহিংসতায় লিপ্ত হয়। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রথমে পুলিশ লাঠিচার্জ করে, জলকামান দাগে ও টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটায়। কিন্তু সহিংসতা আরো বেড়ে গেলে গুলি ছোড়ে পুলিশ। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ৭৪ জনের। গুরুতর জখম হন আরো অনেকে। যদিও পুলিশ বাহিনী ও সরকারের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। মূলত সে দিন থেকেই ইথিওপিয়ায় শুরু হয় নৈরাজ্যকর এ অবস্থার।
আবি আহমেদ এদের সমর্থনেই গত বছর ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু বছর না ঘুরতেই ওই সমর্থকরা আবি আহমেদের বিরুদ্ধেই বিক্ষোভে নেমে পড়েন। তারা রাস্তায় রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। রাজধানী অভিমুখে র্যালি করে। তাদের হাতে ছিল লাঠি। আর মুখে ছিল সরকারবিরোধী স্লোগান। আন্দোলনকারীরা দোকানপাটসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। এ সময় তারা প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের লেখা নতুন বইয়ের শত শত কপিতে অগ্নিসংযোগ করে। বইটিতে প্রধানমন্ত্রী জনগণকে ঐক্যের পথে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এ দিকে গত বৃহস্পতিবার অ্যাম্বো শহরে এক বৈঠকে অংশ নিতে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক আক্রোশের শিকার হন আবি। সে সময় বিক্ষোভকারীরা ‘আবির পতন চাই’, ‘জাওয়ার আমাদের নায়ক’ বলে স্লোগান দিতে থাকে। শেষমেশ আলোচনা অসমাপ্ত রেখেই সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন আবি। পরে কঠোর নিরাপত্তায় হেলিকপ্টারে ওই স্থান ত্যাগ করেন তিনি।
খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিক্ষোভটি অন্য দিকে মোড় নেয়। জাওয়ারের সমর্থকরা মূলত ‘কিরো’ নামে পরিচিত। তারা দেশটির সবচেয়ে বড় নৃগোষ্ঠী ওরোমোর অন্তর্গত। সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যেই তারা দেশটির দ্বিতীয় বৃহৎ নৃগোষ্ঠী আমহারা জনগোষ্ঠীর সাথে সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সেই সঙ্ঘাতের জেরে ওই শহরের যানবাহন, দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা পুড়িয়ে দেয়া হয়। মারা যায় অন্তত ১৬ জন লোক, যাদের বেশির ভাগ মারা যায় পাথরের আঘাতে। এর ফলে সেখানে গোষ্ঠীগত সঙ্ঘাতের সূত্রপাত আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইথিওপিয়ার মানবাধিকার কমিশনারই এ তথ্য দেন। এর মধ্যে অনেকে মসজিদ ও গির্জায় থাকাবস্থায় হামলার শিকার হয়ে নিহত হয়। ফলে গোষ্ঠীগত সঙ্ঘাতের পাশাপাশি দেশটিতে ধর্মীয় সঙ্ঘাতের শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
এসব পরিস্থিতির কারণে এ সঙ্ঘাত এখন দু’টি ধারায় চলে যাচ্ছে। প্রথমত, সঙ্ঘাতটি ওরোমোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, যা সৃষ্টি হয়েছে জাওয়ার ও আবি আহমেদের মধ্যে। গত বছর আবি আহমেদের দেশটির ক্ষমতায় আসার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল দেশের বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী ওরোমোর সংগঠক এবং মিডিয়া উদ্যোক্তা জাওয়ারের। আবি নিজেও একই জাতিগোষ্ঠীর নেতা। কিন্তু সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত কয়েকটি নীতির বিরোধিতা করার পাশাপাশি আবি আহমেদকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করতে আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতারও ঘোষণা দিয়েছেন জাওয়ার। তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে বর্তমান নৃগোষ্ঠীগুলোর যে জোট আছে, তার জায়গায় একটি জাতীয় দল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। জাওয়ার এর কড়া সমালোচনা করেন। তিনি আরো বলেন, শান্তিতে নোবেল জয়ী প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ স্বৈরাচারের মতো আচরণ করছেন। সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, আপনি শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন আর আপনার দেশেই গুলিতে মানুষ মারা যাচ্ছে। আপনার সমর্থকদের সতর্ক করুন। না হলে আরো বড় রক্তপাত সামনে অপেক্ষা করছে।
অন্য দিকে আবি আহমেদ জাওয়ারকে ইঙ্গিত করে বলেন, একজন মিডিয়াব্যক্তিত্ব জাতীয় ঐক্যের চেয়েও একটি জাতিগোষ্ঠীর স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যদি বিদেশী পাসপোর্টধারীরা (জাওয়ার মার্কিন পাসপোর্টধারী) মিডিয়া মালিকরা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চায় তা হলে তিনি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।
এ দিকে ওরোমো জনগোষ্ঠীর লোকজন অভিযোগ করেন, তাদের দেয়া অনেক প্রতিশ্রুতিই পূরণ করেননি আবি। ওরোমোর ভাষা আফান ওরোমোকে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও তিনি এখন পর্যন্ত পূরণ করেননি এমনটি উল্লেখ করে আদামার এক তরুণ বলেন, এ সরকার কিরোদের জন্য কিছুই করেনি। বিক্ষোভকারী ওই তরুণ আরো বলেন, জাওয়ারের সাথে খারাপ আচরণ করে প্রধানমন্ত্রী আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
আর দ্বিতীয় যে বিষয়টির দিকে সাম্প্রতিক সঙ্ঘাতটি ধাবিত হচ্ছে ওরোমো ও আমহারাদের মধ্যের প্রতিযোগিতা। ১৯৯৫ সালে যখন ইথিওপিয়ার বর্তমান সংবিধানটি ৯টি অঞ্চলে কার্যকর করা হচ্ছিল তখন থেকে দেশটির রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বী নৃগোষ্ঠীর একটি লড়াই ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে ওঠে। গত তিন দশকের বেশির ভাগ সময়েই চলেছে এ প্রতিযোগিতা দ্বন্দ্ব ও সঙ্ঘাত। এ অবস্থায় সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কেমন হবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই।
যখন একটি ভালোর দিকে যাচ্ছিল, তখনই ইথিওপিয়ার এ অবস্থায় আবারো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে দেশটির সাধারণ জনগণ। দীর্ঘ দিনের সঙ্ঘাতে ক্লান্ত মানুষজন আর সেই পুরনো অবস্থায় ফিরে যেতে চায় না। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের আন্দোলন দেশটিকে যেভাবে সে অন্ধকার দিকেই নিয়ে যাচ্ছে তাতে শুধু দেশবাসীই নয়, প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্ব সংস্থাগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। আপাতত শান্তিতে নোবেলজয়ীর দেশে আবার শুরু না হোক অশান্তিÑ এমনটাই কামনা সবার।

 


আরো সংবাদ