১৭ নভেম্বর ২০১৯

গণবিক্ষোভে উত্তাল লেবানন : সমাধান কোন পথে?

-

সরকারবিরোধী বিক্ষোভে লেবানন এখন উত্তাল। ১৭ অক্টোবর শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে দেশটি এখন অচল। হোয়াটসঅ্যাপ এবং একই ধরনের অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপসগুলোতে কর আরোপ প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। কর আরোপের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মানুষ বৈষম্য, অর্থনৈতিক সঙ্কট ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে। এখন শুধু লেবানন নয়, ইরাকেও বেকারত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। আলজেরিয়া এবং সুদানেও মানুষ দুর্নীতি এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। ২০১০ সালের পর থেকে আরব বিশ্বের কয়েকটি দেশে সহিংস প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রথম দিকে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেখা গেলেও সিরিয়া, ইয়েমেন ও লেবাননে তা শেষ পর্যন্ত রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়।
লেবানন ও ইরাকে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ইরাকে ইতোমধ্যে কয়েক শ’ লোক হতাহত হয়েছে। দেশের গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতেই এখন লেবানন ও ইরাকে বেশ কয়েক দিন ধরে টানা বিক্ষোভ চলছে। বেকারত্ব এবং শ্লথ বা ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি লেবানন, ইরাকসহ আরব বিশ্বের বেশ কিছু দেশে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। লেবাননে গণবিক্ষোভ দ্বিতীয় সপ্তাহে গিয়ে উপনীত হলেও পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী বিক্ষোভকারীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের প্রস্তাব দিলেও আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
লেবাননে চলমান গণবিক্ষোভের আট দিন পর দেশটির প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন জাতির উদ্দেশে দেয়া টেলিভিশন ভাষণে লেবাননকে রক্ষা করতে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে হারিরি সরকার পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক সঙ্কট দূর করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি সঙ্কট সমাধানে বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু আন্দোলনকারীরা প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সরকারের পতন ছাড়া কোনো সমঝোতা হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। বৈরুতে বিক্ষোভে অংশ নেয়া আবদুল্লাহ নামক এক ব্যক্তি বলেছেন, শুধু হোয়াটসআপের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আমরা এখানে আসিনি। আমরা এখানে সব কিছুর প্রতিবাদে এসেছি। জ্বালানি, খাদ্য, রুটি, সব কিছু। ৫০ বছর বয়সী লেবাননি নাগরিক রাবাব বলেন, ‘এমন দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার আমি লেবাননে কখনো দেখিনি’। এ দিকে সরকার জনগণের বিক্ষোভের মুখে একটি সংস্কার সপ্তাহ অনুমোদন করেছে। এই প্যাকেজের আওতায় মন্ত্রী এবং পর্লামেন্ট সদস্যদের বেতন ৫০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। লেবাননের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের বেতনই কেবল দায়ী নয়, সরকারের বড় প্রকল্পগুলোর দুর্নীতিই অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রকৃত কারণ। কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার অনুমোদনের ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে পকেট ভারী করেন এবং অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে দেশের ক্ষতি করেন। প্রধানমন্ত্রী হারিরির ভাষণের তিন দিন পর প্রেসিডেন্ট দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, সংস্কারের জন্য রাজপথ নয়Ñ আসুন আলোচনায় বসি। তার বক্তব্যের পর আগুনে ঘি ঢালার মতোই আন্দোলন আরো তীব্রতা লাভ করে। একজন বিক্ষোভকারী বলেন, ‘কিসের সংস্কার? আমরা প্রেসিডেন্টের তিন বছর মেয়াদে একটি গোষ্ঠীগত নির্বাচনী আইন ছাড়া কিছুই দেখিনি।’ লেবাননের জনগণ দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাস করে না। বিক্ষোভকারীরা হিজবুল্লাহর মহাসচিব হাসান নসরুল্লাহর হুমকিকেও পাত্তা দেয়নি। তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, ‘এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেশকে নতুন করে একটি গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।’
লেবাননের যে অবস্থা দেখা যায়, তার সাথে আঞ্চলিক খেলোয়াড়রা তাদের মর্জিমতো ব্যবহার করে। ইরান হিজবুল্লাহর মাধ্যমে লেবাননকে তাদের একই কর্তৃত্বে পরিচালনা করতে চায়। আবার ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রও লেবাননে তাদের তৎপরতা ও কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছে। ওয়াশিংটন, ল্যাটিন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকায় হিজবুল্লাহর অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি আরোপ জোরদার করেছে। এসব আর্থিক সম্পদ মাদক চোরাকারবারি, সিগারেট পাচার এবং এমনকি ভুয়া ভায়াগ্রা বিক্রির মাধ্যমে অর্জন করা হয়। গত দশকে তেহরান হিজবুল্লাহকে লেবানন সীমান্তের বাইরে নিয়ে গিয়েও বিভিন্ন মিশনে ব্যবহার করেছে। ইরান হিজবুল্লাহকে তাদের পক্ষে সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে সামরিক ব্যাটালিয়ন হিসেবে ব্যবহার করেছে। তেহরান লেবাননকে তাদের আইনগত, প্রপাগান্ডা, রাজনৈতিক ও আর্থিক সেন্টার হিসেবে রূপান্তরিত করেছে। এটা করার জন্য হিজবুল্লাহ দেশটির বিমানবন্দর, বন্দরগুলো, সীমান্ত ক্রসিং, টেলিফান নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা এবং মন্ত্রীদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নিয়ে নিয়েছে। হিজবুল্লাহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশটিকে একটি সাঙ্ঘাতিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়ায় বিক্ষোভকারীরা ক্ষুব্ধ।
ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সব ধরনের নাগরিকই বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা থেকে মুক্তি চায়। তারা পরিবর্তন চায়; কিন্তু কিভাবে পরিবর্তন আসবে?
তারা এই গণবিক্ষোভকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যা দিতে চায়। অবশ্য এই গণবিক্ষোভ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের চেয়েও বেশি। বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টের বিলুপ্তি ও নতুন নির্বাচন চায়। কিন্তু তারা চাইলেই কি লেবাননে পরিবর্তন আসবে? লেবাননে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তথা সরকারব্যবস্থা আগে থেকেই নির্ধারণ করা রয়েছে। লেবাননে আইন পরিবর্তন করা হলেও বিকল্প কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা নেতৃত্বকে বিকশিত হতে দেয়া হবে নাÑ এটাই সেখানকার ব্যবস্থা। তাই দেশটিতে সঠিকভাবে যথাযথ রাজনৈতিক পরিবর্তন দরকার, যাতে সেখানে জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাজনীতিতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য এই আন্দোলনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন। কোনো গোষ্ঠী নয়, জনগণের স্বার্থকে সমুন্নত করে তুলে ধরতে হলে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক চর্চা লেবাননকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। লেবাননিদের সর্বাগ্রে খ্রিষ্টান, সুন্নি, শিয়া অথবা দ্রুজের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের একজন লেবাননি হিসেবে মনে করতে হবে এবং সঠিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে। লেবাননের আন্দোলনকারীদের এখনো কোনো সঠিক কাঠামোগত অবস্থান ও নেতৃত্ব নেই। এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক অবস্থান ব্যতীত আন্দোলন সফল হওয়া কঠিন।
লেবাননের জনসংখ্যা ছয় কোটি। ২০১৬ সালের অক্টোবরে মিশেল আউন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০১৪ সাল থেকে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর ২০১৬ সালে আউন প্রেসিডেন্ট হন। তিনি মেরুনাইট ক্রিশ্চিয়ান রাজনৈতিক দল ফ্রি পেট্রিওটিক মুভমেন্টের নেতা। তিনি দেশটির সেনাপ্রধান ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি একজন সুন্নি মুসলিম নেতা। তিনি ব্যবসায়ী এবং একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। তার বাবা রফিক হারিরি লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছিলেন। লেবানন ১৯৭৫-১৯৯০ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়। এরপর ১৯৯২ সালে রফিক হারিরি দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালে তিনি গাড়িবোমা হামলায় নিহত হন। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি পদত্যাগ করেছেন।
লেবাননের বর্তমান সঙ্কট আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই নিরসন করতে হবে। সরকারকে আন্দোলনকারীদের দাবিদাওয়া গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে আলোচনার টেবিলে বসে সমাধানের পথ বের করতে হবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সঙ্কট দূর করার উদ্যোগ এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটনের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে লেবাননে সত্যিকারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। 


আরো সংবাদ