১৩ নভেম্বর ২০১৯

বেলজিয়ামে গণতন্ত্রের নতুন সমীক্ষা

-

উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের ছোট্ট দেশ বেলজিয়ামের এক নিভৃত কোণে গণতন্ত্রের নতুন এক ধারা প্রবর্তিত হতে চলেছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাংশের জার্মানভাষী অঞ্চলের সাধারণ নাগরিকদের মধ্য থেকে লটারির করে (রেন্ডোমলি) জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে। ইউরোপের অর্থনীতির এবং সামরিক দিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্র এই দেশটি ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটি আকারে ছোট হলেও বেলজিয়াম ‘জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতিগত ভিন্নতায়’ প্রায় স্বায়ত্তশাসিত তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত। উত্তর-পূর্বাংশে জার্মানিফোন, দক্ষিণ-পূর্বাংশে ফ্রান্সোফোন বা ওয়ালোনিয়া এবং উত্তর-পশ্চিমাংশে ফ্লেমিশ বা ওলন্দাজ অঞ্চল।
দেশটির উত্তর-পূর্ব কোণের অধিবাসী যাদের জার্মানিফোন সম্প্রদায় হিসেবে ধরা হয়, তারা গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২৪ জন প্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন। সাধারণ নাগরিকদের মধ্য থেকে সম্পূর্ণ লটারির (রেন্ডমলি সিলেক্টেড) মাধ্যমে এই জনপ্রতিনিধিরা একটি নাগরিক পরিষদ (সিটিজেন কাউন্সিল বা গণসিনেট) গঠন করবেন। লটারিতে নাম ওঠা গণসিনেটের সদস্যরা অধিবেশন ডেকে রাজ্যের জটিল ও বিতর্কিত এজেন্ডাগুলো নিয়ে আলোচনা করবেন এবং খোলামেলাভাবে মতামত ব্যক্ত করে তাদের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত জানাবেন।
ভোটের দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যে পার্লামেন্ট রয়েছে সেখানে উত্থাপিত নানা বিষয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চরম অসন্তোষ ও বিতর্কের সৃষ্টি করে। সেই বিতর্কিত বিষয়গুলোর ওপরই গণসিনেটের (লটারি করে নির্বাচিত) প্রতিনিধিরা তাদের মতামত দেবেন। তারা অধিবেশন ডেকে তাদের মতো করেই এজেন্ডাগুলো নিয়ে আলোচনা করবেন এবং সমাধানের দিকনির্দেশনা দেবেন। অর্থাৎ তারা পার্লামেন্ট সদস্যদের জানাবেন কিভাবে এবং কোন পথে একটি বিতর্কিত ইস্যুর সমাধান করতে হবে। অর্থাৎ একটি বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান খুঁজে বের করার জন্যই তারা পার্লামেন্টারিয়ানদের সহযোগিতা করবেন, যাতে ফাইনাল সিন্ধান্ত গ্রহণে জনগণের আশা আকাক্সক্ষারই প্রতিফলন ঘটে।
বেলজিয়ামের এই অংশে যারা বাস করেন তাদের ভাষা জার্মান এবং দেশটির অন্য দুই অঞ্চলের চেয়ে এরা সংখ্যালঘু। জাতীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও তারা কিছুটা অনগ্রসর এবং উপেক্ষিত। এক কোটি ১০ লাখ অধিবাসীর এই ক্ষুদ্র দেশটিতে জার্মানভাষীরা সংখ্যা মাত্র ৭৬ হাজার। তবে জার্মানির সান্নিধ্যে থাকায় তাদের ভিন্ন পরিচয়, পরিচিত ও স্বাতন্ত্র্যবোধ রয়েছে। বেলজিয়ামের এই ক্ষুদ্র অংশের রাজনৈতিক উদ্যোগ অনেকের কাছেই বেশ প্রশংসার দাবি রাখছে। অনেকেই এটাকে ‘টাইনি ডেমোক্র্যাসি’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। প্রশংসার দাবিদার এই কারণে যে, ইউরোপের এই ক্ষুদ্রতম অঞ্চলে তারাই পৃথিবীতে প্রথম এমন একটি ক্ষুদ্রতম ডেমোক্র্যাসি প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন। তারা লটারি করে নাগরিকদের মধ্য থেকে জনপ্রতিনিধি বানিয়ে জাতীয় ইস্যুতে তাদের অংশীদারিত্ব করার সুযোগ করে দিচ্ছেন।
এই নতুন পদ্ধতি গণতন্ত্রকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে বলেও মনে করছেন অনেকেই। যদিও অ্যারিস্টোটল এ বিষয়টিকে গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ বলে অনেক আগেই ধারণা দিয়ে গেছেন। জনগণের সরাসরি ভোটের বিপরীতে লটারি করে প্রতিনিধি নির্বাচন করার এই পদ্ধতিকে তিনি (অ্যারিস্টোটল) ‘অলিগার্সি’ বলে উল্লেখ করেন। এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যে অধিবেশনগুলো ডাকবেন, সেগুলো বর্তমান সংসদের সমান্তরালে চলবে এবং আইনসহ অন্যান্য এজেন্ডা প্রণয়নে তারা তাদের মতামত দেবেন। এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা এই মতামত এবং প্রস্তাবনাকে বিবেচনায় এনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের সমর্থনকেই রক্ষা করবেন।
কেউ কেউ এই রেন্ডোমলি সিলেক্টেড লোকের দ্বারা গঠিত নতুন গণতান্ত্রিক পন্থাকে রাজনৈতিক অসন্তোষ দমনের একটি কৌশল বলেও মনে করেন। কিন্তু বেলজিয়ামের সিনেটর আলেকজান্ডার মিসেন, যিনি এই নতুন ধারার পক্ষে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন, মনে করেন এটা একটা প্রেরণাদায়ক উপায় (কোজিয়ার)। এখানে সাধারণ মানুষ তাদের চিন্তা চেতনা শেয়ার করার সুযোগ পাবেন, তাদের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা পার্লামেন্টে উত্থাপন করতে পারবেন। এটা এক ধরনের উইন-উইন খেলা বলা যেতে পারে।
‘ক্ষুদ্র ডেমোক্র্যাসি’ অস্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে অনেকের কাছেই। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা আয়ারল্যান্ডে ইতঃপূর্বে একবার ঘটেছে। সেখানে জনগণের মধ্য থেকে লটারি করে কয়েকজনকে পার্লামেন্টে (নাগরিক পরিষদে) আনা হয়েছিল একটি জটিল বিষয় মীমাংসার জন্য। বিষয়টি ছিল গর্ভপাত আইনের সংশোধন করা। এক্ষেত্রে তাদের এ উদ্যোগটি সফলও হয়েছিল। বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিষ্পত্তির জন্য এ ধরনের প্রস্তাব উত্থাপন আসলে একেবারে নতুন কিছু নয়। তবে বেলজিয়ামের জার্মানভাষী অঞ্চলের (ইউপেন সিটিতে) নাগরিকরা আরো কিছুটা ভিন্ন ধারায় এগিয়ে যাবেন। তারা সংসদে উত্থাপিত শুধু বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করবেন এবং মতামত দেবেন। এভাবে তারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জাতীয় জটিল বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করবেন বৈকি। এ ক্ষেত্রে লটারির দ্বারা নির্বাচিতরা পার্লামেন্টারিয়ানদের (সংসদ সদস্যদের) মতের বিরুদ্ধেও তাদের সিদ্ধান্ত জানাতে পারবেন। যদিও পরবর্তীকালে ওই বিষয়টির ওপর চূড়ান্ত রায়টা পার্লামেন্টের সদস্যরাই দেবেন। কিন্তু রেন্ডোমলি সিলেক্টেড নাগরিকদের (ক্ষুদ্র আকারের পার্লামেন্টের) ধারণাগুলো এ ক্ষেত্রে কম গুরুত্ব পাবে না।
তবে বেলজিয়ামের এই ক্ষুদ্র আকারের পার্লামেন্টের কিছু দুর্বল দিকও রয়েছে। প্রধান দুর্বলতা হলোÑ এজেন্ডা মীমাংসার ক্ষেত্রটা যদি জনগণের হাতেই ছেড়ে দেয়া হয়, তা হলে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার অর্থহীন হয়ে পড়ে। আরেকটি অদ্ভুত বিষয় হলো এ ধরনের রেন্ডোমলি নির্বাচনী পদ্ধতির ধারণাটি কিন্তু তৃণমূল থেকে আসেনি। এটা এসেছে রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে অর্থাৎ সমাজের উপরমহল থেকে। আয়োজকরা এ কথা স্বীকার করেন যে, তারা একটি অজানা বিষয়ের দিকেই ঝুঁকছেন। ডেভিড রেব্রোকের মতে, একটি গোষ্ঠী এটা এমনভাবেই প্রচার করে বেড়াচ্ছে। তারা বলছেন, আসলে এটা একটি গেম চেঞ্জার, ক্ষুদ্র দেশগুলোর গণতন্ত্রকে পুনঃআবিষ্কারের উপায় আর কী।
এই আর্টিকেলটি ‘ক্ষুদ্র গণতন্ত্র’ নামে ই-ইকোনমিক্সের ইউরোপ বিভাগে সম্প্রতি ছাপা হয়েছে।

 


আরো সংবাদ

ছেলের নাম রেখে কর্মস্থলে ফিরছিলেন আল আমিন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বীর নরসিংদীর মিয়া চাঁনের স্বীকৃতি চায় পরিবার বিটিআরসি-অপারেটর দ্বন্দ্বে গ্রাহক সেবায় ভোগান্তি বিপুল আর্থিক ক্ষতিতে কোম্পানিগুলো আ’লীগ স্বাধীনতার প্রতিনিধিত্ব করে না : মওদুদ ভেজালবিরোধী অভিযান আরো জোরদার হবে : শিল্প প্রতিমন্ত্রী জাতীয় শ্রমিক লীগের নতুন নেতাদের সংবর্ধনা সিপাহি বিপ্লব না হলে আ’লীগের পুনঃজন্ম হতো না : লেবার পার্টি অনির্বাচিত সরকারের বিদায় হওয়া দরকার : আমীর খসরু কাউন্সিলর মঞ্জু অস্ত্র ও মাদক মামলায় রিমান্ড শেষে কারাগারে ৩ আইন কর্মকর্তার নিয়োগ প্রশ্নে রুল সংসদে রাঙ্গাকে তুলোধোনা বহিষ্কার দাবি

সকল