১৭ অক্টোবর ২০১৯

শান্তির পথে সৌদি-ইরান সম্পর্ক!

-

মধ্যপ্রাচ্যের দুই পরাশক্তি সৌদি আরব ও ইরান। সৌদি আরব সুন্নি মুসলিমপ্রধান দেশ। অন্যদিকে ইরান শিয়া মুসলিমপ্রধান। তেলসম্পদে সমৃদ্ধ উভয় দেশই। সীমান্তের হিসেবে কাছাকাছি অবস্থান দেশ দুটির। কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের জেরে এ দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্কের দেখা মেলেনি কোনো কালেই। এ বিরোধের মূলে আছে ধর্ম, রাজনীতি, আঞ্চলিক আধিপত্যসহ আরো কিছু বিষয়। এসব নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে দশকের পর দশক ধরে চলছে টানাপড়েন।
এ দুই দেশ প্রথম কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল ১৯২৯ সালে। কিন্তু দেশ দুটির মধ্যে চলতে থাকা অম্লমধুর সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে ১৯৭৯ সালে। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের স্বপ্নে থাকা সৌদিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয় ইরানের সে সময়ের ইসলামিক বিপ্লব। তেহরান সে সময় প্রকাশ্যেই সৌদি আরবের সমালোচনা করতে থাকে। অন্যদিকে সৌদি আশঙ্কা করতে থাকে ইরান এ অঞ্চলে আরো কিছু দেশে একই ধারার বিপ্লব ঘটিয়ে সম্ভবত নিজেদের বলয়ের বিস্তার ঘটাবে। এ অবস্থায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে।
এ ধারা চলতে থাকে এ শতাব্দীতে এসেও। ইরাকের সুন্নি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ছিলেন কট্টর ইরানবিরোধী। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাকে আগ্রাসন চালালে পতন হয় সাদ্দাম হোসেনের। তার পতন ইরানের জন্য স্বস্তি হয়ে আসে। ইরাকে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধির পথ খুলে যায়। বিষয়টি সৌদি আরবের জন্য চরম দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার ২০১১ সালের আরব বসন্তের ছোঁয়ায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতিকে নিজেদের জন্য একটা বড় ‘সুযোগ’ হিসেবে দেখে সৌদি আরব ও ইরান। আরব বসন্তের ঢেউ লাগা দেশগুলোতে প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে উঠে-পড়ে লাগে দুই দেশ। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবাননসহ বিভিন্ন দেশে ইরানের অবস্থান শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে বিগত কয়েক বছরে সৌদির নেয়া পদক্ষেপগুলোর বেশির ভাগই বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে। কাতারকে অবরোধ আরোপ করেও শায়েস্তা করা যায়নি, ইয়েমেনেও রিয়াদের সাফল্য শূন্যের কোটায়। তার ওপর একের পর এক আঞ্চলিক ব্যর্থতার সাথে শাসকদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ঘরে-বাইরে ভীষণ চাপে পড়ে সৌদি আরব, যা দুই দেশের মধ্যকার দূরত্বকে আরো বাড়িয়ে দেয়।
ঘটনার পর্যায়ক্রমে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তেহরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছেদ করে রিয়াদ। কিন্তু সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলে দুই পক্ষই। দুই দেশ সামনাসামনি যুদ্ধে না জড়ালেও সমরশক্তিকে কেউ কারো থেকে পিছিয়ে নেই। সৌদি আরব তো সরাসরি মার্কিন অস্ত্র কিনে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। সে তুলনায় ইরানের পক্ষে মার্কিন অস্ত্র কেনার সুযোগ কম থাকায় তারা ঘনিষ্ঠ হয় রাশিয়ার। মার্কিনবিরোধী জোটের হওয়ায় ইরান মস্কো থেকে সাহায্য যেমন পেয়ে আসছে তেমনি নিজেরাও বেশ কিছু অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করেছে, সক্ষমতার বিচারে যেগুলোকে হেলাফেলা করার কোনো উপায় নেই। আবার ইরান নিজে পরমাণু অস্ত্র তৈরির দাবি না করলেও প্রতিপক্ষ প্রায়ই দাবি করে, তেহরান সে অস্ত্রও তৈরি করে ফেলেছে। তাদের এ প্রচারণা ইরানের পক্ষেই গেছে।
এ অবস্থায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের দুই তেল স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় তেল শোধনাগার দুটির মারাত্মক ক্ষতি হয় এবং দেশটির তেল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে। ইয়েমেনের হাউছি আনসারুল্লাহ আন্দোলন দাবি করে, ১০টি ড্রোনের মাধ্যমে তারা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় আবকাইক ও খুরাইস তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র এ হামলার পেছনে তেহরানের হাত আছে দাবি করে কিছু প্রমাণও পেশ করে। পরবর্তী সময়ে জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনও ইরানকে দায়ী করে বিবৃতি দেয়। ইরান অবশ্য কোনো অবস্থাতেই সৌদির এ দাবি মেনে নেয়নি। বরং হাউছিদের দাবির সপক্ষে তারা জানায়, সৌদি আগ্রাসনের মুখে আত্মরক্ষার অধিকার ইয়েমেনিদের রয়েছে এবং তারাই এ হামলা চালিয়েছে। এমনকি পরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনও ইরানের নির্দোষিতার পক্ষে সাফাই গান। তিনি স্পষ্টভাষায় বলেন, ওই হামলায় তেহরানের কোনো হাত ছিল না।
বিষয়টি নিয়ে গত মাসের শেষ দিকে মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএসের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ হলে ধ্বংস হয়ে যাবে বিশ্ব অর্থনীতি। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ বিঘিœত হবে। তেলের দাম অকল্পনীয় হারে বেড়ে যাবে।
ওই সাক্ষাতকারে তিনি আরো বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানির ৩০ শতাংশের মতো উৎপাদিত হয় মধ্যপ্রাচ্যে। এ ছাড়া, বৈশ্বিক বাণিজ্যিক রুটের ২০ শতাংশ অঞ্চলটিতে অবস্থিত। এ অঞ্চল থেকে বৈশ্বিক জিডিপির ৪ শতাংশ আয় হয়ে থাকে। এসব থেমে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধস নামবে। আর তাতে কেবল সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বই আক্রান্ত হবে। সে সময় তিনি বলেন, বিশ্ব যদি ইরানকে নিরস্ত্র করার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে রিয়াদও এমন পদক্ষেপ নেবে যা বিশ্ব স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তেলের দাম অকল্পনীয় হারে বাড়বে।
তবে একই অনুষ্ঠানে সুর কিছুটা নরম করে সৌদি যুবরাজ বলেন, রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের চেয়ে অনেক ভালো। বৈশ্বিক অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ নয়, রাজনৈতিক সমাধান জরুরি। তিনি এ-ও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচিত ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সাথে দেখা করা। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন চুক্তি করে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখা।
বিষয়টি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে কিছুটা হলেও শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিয়েছে। কারণ দীর্ঘ দিনের সঙ্ঘাতের পথ পরিহার করে আলোচনার পথে হাঁটতে রাজি হয়েছে সৌদি আরব। এমনকি ইরানের সাথে আলোচনার ব্যাপারে মধ্যস্থতা করতে পাকিস্তান ও ইরাকের শরণাপন্ন হয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। বিষয়টিতে সম্মত হয়েছে ইরানও। ইরাক ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী। দেশ দুটির পক্ষ থেকেই বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে ইতিবাচক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জানা গেছে, গত ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর ইমরানের রিয়াদ সফরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে মধ্যস্থতার অনুরোধ করেছিলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে ইরানি স্পিকার আলী লারিজানি বলেন, সৌদি আরব এবং অঞ্চলটির অন্যান্য দেশের সাথে সংলাপের ব্যাপারে ইরান পুরোপুরি উন্মুক্ত। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ বলেছেন, সৌদি আরব যদি এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে থাকে যে, বহিঃশক্তির কাছ থেকে সমরাস্ত্র ক্রয় করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, তাহলে সে দেশের নীতি পরিবর্তনের বিষয়ে সাদরে গ্রহণ করবে তেহরান। আমরা সব সময় বলে এসেছি, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে আমরা সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে এবং উত্তেজনা পরিহার করতে চাই।
ইরান সরকারের মুখপাত্র আলী রাবিয়ি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানির কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন সৌদি নেতারা। আর ইরানের বার্তা প্রথম থেকেই সুস্পষ্ট। আমরা ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন ও গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছি এবং আমরা ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠাকে সমাধানের উপায় বলে মনে করি।
মধ্যপ্রাচ্যের দুই শক্তিশালী দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদিল আবদুল মাহদি। তিনি বলেন, আমার বিশ্বাসÑ তেহরানের সাথে উত্তেজনার পারদ কমিয়ে আনতে চাইছে রিয়াদ। এমনটা হলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য এর সুফল ভোগ করতে পারবে।
আসলে তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপিত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বই এর সুফল ভোগ করবে। স্বস্তির হাসি হাসতে পারবে মুসলিম বিশ্বও। হ


আরো সংবাদ

ট্রাম্পের 'অতুলনীয় জ্ঞানের' সিদ্ধান্তে বদলে গেল সিরিয়া যুদ্ধের চিত্র (৩২১৮৮)ভারতের সাথে তোষামোদির সম্পর্ক চাচ্ছে না বিএনপি (১৮৪৫৫)মেডিকেলে চান্স পেলো রাজমিস্ত্রির মেয়ে জাকিয়া সুলতানা (১৪৯৪৬)তুরস্ককে নিজ ভূখণ্ডের জন্য লড়াই করতে দিন : ট্রাম্প (১৪৭০৩)আবরারকে টর্চার সেলে ডেকে নিয়েছিল নাজমুস সাদাত : নির্যাতনের ভয়ঙ্কর বর্ণনা (১৩৮১৫)পাকিস্তানকে পানি দেব না : মোদি (১১২৭৪)১১৭ দেশের মধ্যে ১০২ : ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে ভারত (৮৯৭০)তুহিনকে বাবার কোলে পরিবারের সদস্যরা হত্যা করেছে : পুলিশ (৮৮৮৫)বাঁচার লড়াই করছে ভারতে জীবন্ত কবর দেয়া মেয়ে শিশুটি (৮৬৮৭)এক ভাই মেডিকেলে আরেক ভাই ঢাবিতে (৮৫২৩)



astropay bozdurmak istiyorum
portugal golden visa