১৫ অক্টোবর ২০১৯

সুদান সঙ্কট উত্তরণে চ্যালেঞ্জ

-

সুদানের স্বৈরশাসক ওমর আল বশিরের নাটকীয়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার চার মাস পর সামরিক বাহিনী এবং দেশটির আন্দোলনরত বিরোধীদলীয় কোয়ালিশন চলতি মাসের প্রথমার্ধে ক্ষমতা ভাগাভাগির মাধ্যমে দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ব্যাপারে একটি সমঝোতায় আসতে সক্ষম হয়েছে। দেশ পরিচালনার ব্যাপারে তারা চূড়ান্তভাবে একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছেন।
চুক্তি অনুযায়ী ১১ সদস্যের সমন্বয়ে একটি রুলিং অথরিটি গঠিত হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এ অথরিটি তিন বছর অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করবে। বিরোধী দল এবং সামরিক বাহিনীর মধ্য থেকে পাঁচজন করে সদস্য নিয়ে রুলিং অথরিটি বা ক্ষমতাসীন সরকার অথবা কর্তৃপক্ষ গঠিত হবে। আর দুই পক্ষের মধ্যকার চুক্তি বা সম্মতির মাধ্যমে ষষ্ঠ বেসামরিক সদস্য নিয়োগ দেয়া হবে। অন্তর্বর্তী সময়ের প্রথম ২১ মাস সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন এবং পরবর্তী ১৮ মাস একজন বেসামরিক ব্যক্তি সরকারপ্রধান থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টেকনোক্র্যাট সরকার গঠন করাই হবে প্রথম পদক্ষেপ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে জনগণের অবস্থান কর্মসূচির ওপর সামরিক বাহিনীর দমনাভিযানে শতাধিক বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার এক মাস পর উভয় পক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ব্যাপারে সম্মত হয়। এদিকে অন্তর্বর্তী সামরিক পরিষদের প্রধান লে. জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল বুরহান সুদানের সহিংস ঘটনার জন্য তৃতীয় একটি পক্ষকে দায়ী করেছেন। বিরোধী পক্ষ এ জন্য কুখ্যাত র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের কমান্ডার মোহাম্মদ হামাদন যিনি ‘হিমেদটি’ নামে পরিচিত তাকে দায়ী করেছে।
আফ্রিকান ইউনিয়নের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থনে সম্প্রতি উভয়পক্ষের মধ্যে এই সমঝোতা চুক্তি হয়। সুদানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এ সমঝোতা উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ কল্যাণের ব্যাপারে তাদের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এই চুক্তি ও সমঝোতা ভবিষ্যতে কল্যাণ বয়ে আনবে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ অন্তর্বর্তীকালীন তিন বছর কেমন যাবে তা আগেভাগেই অনুমান করা কঠিন। সুদানে গত এপ্রিল মাসে যা ঘটেছে তা বলতে গেলে ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। একটি জনপ্রিয় গণ-অভ্যুত্থান একটি সামরিক অভ্যুত্থান উভয়টিই একই সাথে সংঘটিত হয়েছে। ফলে একটি অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, আস্থাহীনতা তথা অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে এবং বিরোধীপক্ষ ও সামরিক কাউন্সিলের মধ্যে ক্রমবর্ধমানভাবে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে। দু’পক্ষের মধ্যে অবিলম্বে বিশ্বাস ও আস্থার পরিবেশ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করাটাই হবে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। প্রথমপর্যায়ের জন্য নতুন কর্তৃপক্ষের প্রধান হিসেবে আল বোরহানের নাম ঘোষণা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু হিমেদটি তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। হিমেদটির বাহিনী বিশেষভাবে দারফুরে অধিকতর সংগঠিত, সুসজ্জিত এবং যুদ্ধের জন্য কঠোরভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। বিরোধীদের প্রতিনিধিত্বকারী কোয়ালিশন দ্য ফোর্সেস অব ফ্রিডম অ্যান্ড চেইঞ্জের (এফএফসি) নেতাদের সমালোচনায় উচ্চ কণ্ঠ হিমেদটি। আর এটা কোনো গোপন বিষয় নয় যে, অন্তর্বর্তী সামরিক কাউন্সিলের ভেতরে তার প্রভাব রয়েছে। সুদানের স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাইÑ সেখানে সবসময় উচ্চাভিলাষী জেনারেলদের সামরিক অভ্যুত্থানের আতঙ্ক ছিল। এসব জেনারেল তথাকথিত আদর্শ, ক্ষমতার লিপ্সা অথবা বাইরের কোনো পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মিথ্যা অজুহাতে ক্ষমতা দখল করে। কয়েক সপ্তাহ আগে অন্তর্বর্তী সামরিক কাউন্সিল একটি অভ্যুত্থান প্রয়াস নস্যাৎ করে দিয়েছে বলে জানিয়েছে। সে সময় ব্যর্থ অভ্যুত্থানে জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম দুই বছরের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে সামরিক বাহিনী সত্যিকারভাবে ক্ষমতা ছেড়ে দেয় কি না, তা নিয়েও আশঙ্কা রয়েছে। খোদ এফএফসির মধ্যেও চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ সংস্থাটির মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে ঐক্য বজায় থাকবে কি নাÑ তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। এমন খবরও রটছে যে, কোয়ালিশনের সদস্য নিদা আল সুদান চুক্তির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে এফএফসি থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। আর যখন তিন বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে আসবে, তখন বেসামরিক সরকারের ধরন ও আকার নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। তখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো, বিচার বিভাগ এবং মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
সম্প্রতি সম্পাদিত চুক্তির বিষয়টি বিবেচনা না করে বিশেষ করে দারফুরে একটি নতুন কর্তৃপক্ষ কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ এবং সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতে পারে। অন্তত পাঁচটি বিদ্রোহী মিলিশিয়া গ্রুপ থেকে মাত্র দু’টি গ্রুপ এফএফসিতে যোগদান করেছে। অন্য গ্রুপগুলো সরাসরি সামরিক বাহিনীর সাথে আলোচনা অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে যুদ্ধ করতে চাইলেও পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নিতে পারে।
এদিকে, নতুন ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হলেও বশিরের তিন দশকের শামনামলে সৃষ্টি হওয়া তথাকথিত ডিপ স্টেট তথা রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য কাজ করতে হবে। উল্লেখ্য, ওই সময়ে সৃষ্টি হওয়া ডিপ স্টেটের মধ্যে প্রধান হলোÑ ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি। এই দলটি তার জনপ্রিয়তা হারিয়ে দেশটির ব্যর্থতার জন্য দায়ী বলে চিহ্নিত হলেও দলটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা এখনো প্রভাবশালী। তারা গণতন্ত্রের পথে সুদানের নতুন অভিযাত্রাকে নস্যাৎ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে পারে, এবং দেশে চূড়ান্তভাবে অবিলম্বে যে চ্যালেঞ্জটি দেখা দেবে সেটি হলোÑ অর্থনৈতিক ব্যর্থতা। আমরা জানি, গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান কারণ হলোÑ অর্থনৈতিক দুরবস্থা। এই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার জন্য সুদানকে প্রতিবেশীদের এবং অন্যান্য দেশের সহায়তা ও সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। বিশেষত যেসব দেশ সুদানের স্থিতিশীলতার পথে বাধা হয়ে আছে তাদের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সুদানের অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা ও সমর্থন প্রদানের লক্ষ্যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এগিয়ে এসেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তবে বিরোধী পক্ষ ও সেনাবাহিনীকে অবশ্যই নিজেদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ও সমঝোতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে এবং চুক্তির প্রধান লক্ষ্য অর্জনের জন্য পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার চেতনা ও পথ খুঁজে বের করতে হবে। হ


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum